তরঙ্গ – দ্বিতীয় পর্ব

-“এই যে, জে কে জি ! কি খবর ?” -অভ্যাস মত সোমনাথের পিঠে একটা অভদ্র চাপড় মেরে প্রশ্নটা করে স্বরূপ দা।

জে কে জি কথাটার অর্থ ‘জোরু কা গুলাম’। সোমনাথের একদম সহ্য হয়না এই নামটা, তবু স্বরূপদা সহ বেশ কয়েকজন ইচ্ছে করেই এই নামে ডেকে থাকে তাকে।

-“এই তো স্বরূপ দা, চলছে… তোমার কি খবর ?”

-“আমার আর কি খবর ভাই… অফিসে বসা তো কপালে নেই, তার ওপর বাড়িতে খান্ডার বউ। খবর তো হবে তোমার; ঠান্ডা ঘর থেকে বেরোনোর বালাই নেই, বাড়িতে সুন্দরী বউ।”

সোমনাথ একটা নকল হাসি হেসে তার মনের বিরক্তিটা লোকানোর চেষ্টা করে। সে জানে অফিসের অনেকেরই মেঘাকে দেখে চোখ টাটায়; আর সোমনাথের অল্প বয়সে অনেক উন্নতি করে ফেলাটাকেও ইর্ষার চোখে দেখে। আর স্বরূপদার চোখটা একটু বেশীই টাটায় এসব ব্যাপারে।

-“তুমি এখানে আজ ? কি ব্যাপার ?”

-“কি আবার ! হাওড়া ডিভিশনে লাইনের কাজের কাগজে তোর একটা সই লাগবে, তাই এলাম…” -এই বলে একটা ফাইল এগিয়ে দেয় স্বরূপ।

Photo by Stanislav Kondratiev on Pexels.com

সোমনাথ সেটা হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে ভাবে, এটাই সবচেয়ে বড় কারণ স্বরূপদার তাকে নিয়ে। স্বরূপদার নিচের পদে জয়েন করেও সে তাকে টপকে গেছে; সে সিনিয়র হলেও বয়সে বড় বলে ‘স্বরূপদা’ নামটা রয়ে গেছে। কিন্তু বার বার তার কাছে কাজের জন্য এলেও স্বরূপদার মনে যে কষ্ট বা ইর্ষা হয় না, সেটা ভাবলে ভুল ভাবা হবে।

স্বরূপদার কাগজের কাজ শেষ করে নিজের টেবলের ওপর তাকিয়ে একটা অদ্ভূত ধন্দে পড়ে যায় সোমনাথ। কিছুতেই তার টেবলে রাখা চৌকো জিনিসটার নাম মনে করতে পারে না; অথচ জিনিসটা তার খবই চেনা। সেটা হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে বেশ কিছুক্ষণ ভাবার পর, মনে পড়ে… এটা তো তার ফোনটা; মানে মোবাইল… মোবাইল কথাটা কেন মনে পড়ছিল না তার ? হ্যাঁ, লোকে মাঝে মাঝে অত্যন্ত সাধারণ জিনিস ভুলে যায়, কিন্তু মোবাইলটা যে মোবাইল, এটা ভুলে যাওয়া কি স্বাভাবিক ব্যাপার ?

ভাগ্য ভালো, মোবাইলটার দিকে তার এই বোকার মত চেয়ে থাকার ব্যাপারটা কেউ লক্ষ্য করেনি, নাহলে সেই নিয়ে আবার হাসাহাসি হত। অফিসের বেশিরভাগ লোকই সোমনাথের নরম-সরম স্বভাবের জন্য তাকে অপমান করার ছুতো খোঁজে শুধু শুধু। মেঘাও তাকে বোঝায়; এভাবে লোকের কথার প্রতিবাদ না করে থাকাটা মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়; কিন্তু এই ব্যাপারট ছোটবেলা থেকেই যেন সোমনাথের মধ্যে থেকে গেছে; তার জীনের মধ্যে… চাইলেও যেন পরিবর্তন করার ক্ষমতা নেই তার।

অফিসের কাজকর্ম নেই সেরকম। আজ একটু আগে বেড়িয়ে যাওয়াই যায়। লাঞ্চ ব্রেকে এইসব কথাই ভাবছিল সোমনাথ। রোজ খাওয়া শেষ করে অফিসের সামনে একটু ঘুরপাক খাওয়া স্বভাব ওর। প্রায় মিনিটা পাঁচেক হয়ে গেল তাই করছিল; কিন্তু এমন সময় লক্ষ্য করল চারপাশের অধিকাংশ লোক কেমন অদ্ভূতভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছে; যেন কি একটা আজব জিনিস দেখছে প্রথমবার। তারপর সোমনাথই ব্যাপারটা বুঝতে পারে। এতক্ষণ পায়চারী করতে করতে সে সিগারেট খাচ্ছিল। এবং একটান-দু’টান নয়; একটা কিং-সাইজ গোল্ড ফ্লেক প্রায় শেষের পথে। আর এটা আশ্চর্য্যের এই জন্যই, কারণ সোমনাথ কস্মিনকালেও সিগারেট খায় না। শুধু তাই নয়, সিগারেট-এর গন্ধও তার একেবারেই সহ্য হয় না। নাকে গেলেই কাশি হয়, গা গুলোয়। তাহলে সে এতক্ষণ ধরে একটা গোটা সিগারেট শেষ করে দিল ? কি করে ? হাতের পোড়া সিগারেটটা ঘেন্নায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে অপরাধীর মত মুখ করে নিজের টেবলে ফিরে আসে সোমনাথ। মনটা বড্ড বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। তার কি কোনো মানসিক রোগ দেখা দিল ? যেরকম সিনেমায় দেখায়, স্প্লিট পার্সোনালিটি গোছের ? তা না হলে এরকম হচ্ছে কেন ?

Photo by Kam Pratt on Pexels.com

বাথরুমে গিয়ে মুখে ঘাড়ে থাবড়ে থাবড়ে জল দেয় ভালো করে। রাস্তাঘাট অচেনা লাগা, কিছুক্ষণের জন্য মোবাইল কথাটা মনে না করতে পারা, মেনে নেওয়া যায়; কিন্তু মনের ভুলে একটা সিগারেট খেয়ে ফেলা ? সবার সামনে পায়চারী করতে করতে সিগারেট খেয়েছে… সবাই কি ভাবছে কে জানে। বাকী সময়টা টাবলে বসে আনমনা হয়েই কাটিয়ে দিল সোমনাথ। অফিসে তাকে নিয়ে যে একটা ফিসফিসানি আর হাসাহাসি শুরু হয়েছে, সেটা সে বুঝতে পারছে বিলক্ষণ।

একটু আগে আগেই বেড়িয়ে পড়ল সোমনাথ। তার কেমন যেন মনে হচ্ছে প্রতিটা কাজ খুব ভেবেচিন্তে, গুনে গেঁথে করতে হবে; না হলেই বিপর্যয় অবস্বম্ভাবী। অফিসে থাকাকালীন মেঘাকে সে ফোন করে না; আসলে অফিস আওয়ার্সে বাড়িতে ফোন করতে তার এথিক্সে বাধে। চারপাশে লোকে দিনরাত যদিও মা, বাবা, বউ, প্রেমিকা সব্বাইকে ফোন করে দিনরাত গজগজ করে যায়; কিন্তু অফিস কম্পাউন্ডের মধ্যে  সে কোনোদিন মেঘাকে ফোন করেনি। তাই অফিসের গেট পেরিয়েই তার প্রথম কাজ কানে ফোন ধরা এবং কথা বলা…

-“হ্যালো !!! কৌন বাত করতা হ্যায় ?”

-“তুমহারা স্বামী বাত করতা হ্যায়…”

-“ইতনা তাড়াতাড়ি অফিস সে নিকাল গিয়া ?”

-“হাঁ… কাজ-বাজ নেহি থা…”

-“ঘন্টা কাজ নেহি থা… তুম আজকাল প্রচুর কাজে ফাঁকি দেতা হ্যায়…”

এবার হেসে ফেলে সোমনাথ… সাথে সাথে মেঘাও হেসে ফেলে। আর সেই হাসির শব্দে সারাদিনের জমা হওয়া দ্বিধা, দ্বন্দ, গ্লানি সব মুছে গিয়ে এক মুহূর্তেই যেন নতুন মানুষ হয়ে ওঠে সে। কথা বলতে বলতে হাঁটতে থাকে কিছুটা রাস্তা, এইসময় হঠাৎ তার কাঁধে একটা টোকা পড়ে। পেছন ঘুরে সে একটি সম্পূর্ণ আচেনা লোককে দেখতে পায়। মাঝবয়সী লোক, শীর্ণ চেহারা। চুল পাকার বয়স হয়নি, কিন্তু জুলপি দু’টো ধপধপে সাদা চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। মুখে একটা স্মিত হাসি লেগে আছে।

-“এক মিনিট একটু কথা ছিল…”

লোকটার কথার উত্তরে মেঘাকে পরে ফোন করার আশ্বাস দিয়ে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে সোমনাথ বলল,

-“বলুন…”

-“আপনার নাম সোমনাথ সেন তো ?”

-“হ্যাঁ, কি ব্যাপার ?”

-“না… ব্যাপার মানে… আসলে কিছু না… এটা রাখুন… দরকার পড়লে আমাকে ফোন করবেন…”

-“এই বলে লোকটা একটা ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দেয় তার দিকে…”

সোমনাথ কার্ডটা নিয়ে দেখে, গোটা কার্ডে ঠিক তিনটে জিনিস লেখা;

ডক্টর অজিতেশ সামন্ত

৮৭৩৪২৯৮০৬৭

ajitesh.samanta@xmail.com

-“না, আপনাকে ফোন করব কেন ?”

কথাটা বলতে বলতে সামনের দিকে মুখ তুলে সে দেখল, লোকটা আর নেই। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে বেমালুম। কার্ডটা পকেটে ভরে বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটা লাগাল সে। মনটা আবার কেমন একটা হয়ে গেল। কে লোকটা ? এরকম অদ্ভূতভাবে কার্ডটা দিয়ে গেল কেন। আর সোমনাথ ওনাকে ফোন করতেই বা যাবে কেন?

বাসে উঠে বেশ কিছুটা রাস্তা চলে আসার পড়, সোমনাথের মনে পড়ল, আজ খাবার কিনে নিয়ে যাবে ভেবেছিল। সেটা ভুলে গেছে বেমালুম। বাসে বসে মেঘারও আর ফোন পেল না সে। উলটে মেসেজ এল ‘অ্যাই অ্যাম ইন অ্যা মিটিং’। বাস থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা মাঠের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে সোমনাথ। আবার কেমন মনে হয়, এই মাঠটা এখানে ছিল না তো…

আশা করি, গল্পটা যে নিছক প্রেমের নয়, সেটা একটু হলেও বোঝা যাচ্ছে; এই পোস্টের সাথে সাথে; কেউ পড়ুক বা না পড়ুক লিবারিশের ১৫০ পোস্ট সম্পূর্ণ হল; মোট ভিউয়ার সংখ্যা ৬৬৬৮, মোট ভিউ ১০,৮৯৭। এ গল্পটা কতদিন চলবে, এখনি বলতে পারছি না, কিন্তু খুব একটা বড় হবে বলে মনে হয় না। দেখা যাক। যাঁরা আমার ভিউ এবং ভিউয়ার সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছেন, তাঁদের জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ। আশা করছি, আপনাদের সময়ের সদ্ব্যবহার করার মতোই লেখা আরো লিখতে পারব ভবিষ্যতে।

ধন্যবাদান্তে,

নীল…

তরঙ্গ – প্রথম পর্ব

জনৈক নারীর মতে (পরিচয় উহ্য রইল) প্রেমের ব্যাপারে আমার মতো ‘আনাড়ি’ আর নাকি দু’টো হয় না।
কিন্তু আমি এই অভিযোগ মানতে নাচার; আর তাই একরকম জেদে পড়েই এই লেখাটা শুরু করা। তবু, আমি জানি একটা আপাদমস্তক প্রেমের গপ্পো লেখার ক্ষমতা আমারও নেই। তাই একটু অন্য ভাবে একটা প্রেমের গল্প লেখার চেষ্টা করছি।
এটা হয়তো আকারে স্তুপ বা তার থেকে একটু বড় হবে; কিন্তু ‘Somewhere in the Jungle of North Bengal’-এর
বপু ধারণ করবে না বলেই আমার বিশ্বাস…
আজ প্রথম কিস্তি। আর এই গল্পের দ্বিতীয় কিস্তির সাথে সাথে লিবারিশ-এ ১৫০ পোস্ট পূর্ণ হবে…

একটা লম্বা টানেল, আপাতদৃষ্টিতে যার কোনো শেষ পাওয়া যায় না, আর তার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে রেলের লাইন। কিছুক্ষণ দেখার পর সোমনাথের মনে হল টানেল নয়, বোধহয় মাটির নিচে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে একটা আস্ত রেললাইনকে কেউ ঢুকিয়ে দিয়েছে তার মধ্যে। তার মনে হল পাতালে কোন এক চির অন্ধকারের দেশে সে এসে পড়েছে; যেখানে আলোর চিহ্নমাত্র নেই। হঠাৎ সুড়ঙ্গের একদিকে আলোর আভাস দেখতে পায় সে, বুঝতে পারে আলোটা তার দিকেই এগিয়ে আসছে, দ্রুতবেগে, তারপরই দেখতে পায় আলোটার উৎস; আগুনের সর্বগ্রাসী লেলিহান শিখা প্রবল বেগে এগিয়ে আসছে তার দিকে; আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে সোমনাথ ছুটতে থাকে, আগুনটা স্রোতের মত তাকে পেছন থেকে তাড়া করে ধেয়ে আসে। ছুঁই ছুঁই করেও যখন শেষমেশ সেটা সোমনাথকে ছুঁতে পারে না, তখন ঘুমটা ভেঙে যায় তার।

সে শুয়ে ছিল চিৎ হয়ে। মাথার ওপর পাখাটা ঘুরছে বন বন করে। সোমনাথের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমাট বেঁধে বড় বড় ঘামের ফোঁটা তৈরী করতে শুরু করেছে। হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছে সোমনাথ পাশ ফিরে শোয়। আর পাশ ফিরেই মেঘার মুখটা দেখতে পায়। চোখ বন্ধ, দুটো হাত জোড় করে বালিশ আর গালের মাঝখানে রাখা পরম শান্তিতে ঘুমোচ্ছে মেঘা। কাল রাতের উদ্বৃত্ত কাজল এখনো চোখের কোলে রয়ে গেছে, খোলা কালো চুলগুলো গাল বেয়ে পড়েছে যেটা একটা চোখের সামনে ধোঁয়াটে একটা পর্দার সৃষ্টি করেছে।

Photo by Andrea Piacquadio on Pexels.com

ঘুমোলেও অপূর্ব লাগে মেঘাকে। এখন চোখদু’টো বন্ধ তাই… খোলা থাকলে বিয়ে করা বউয়ের চোখের দিকে চাইতেও কেমন লজ্জা লজ্জা করে সোমনাথের। সারাজীবনে, ওই চোখদুটোর চেয়ে সুন্দর কিছু আর দেখেনি সোমনাথ, কোনোদিনও না। তাই মাঝে মাঝে নিজের ভাগ্যকেও বিশ্বাস করতে অসুবিধা হয় তার। সে নিজেও জানে, মেঘার পাশে তাকে মানায় না। তাকে বিয়ে করে বোধহয় অনেক বেশী কিছু ত্যাগ করে ফেলেছে মেঘা। মেক আপ সে কোনোকালেই তেমন করত না, কিন্তু সোমনাথের যেন মনে হয় আজকাল বড্ডই কম মেক আপ করছে সে। কেন, যাতে তার পাশে বেশী সুন্দরী না লাগে ? বেমানান না লাগে ? একবার তো না থাকতে পেরে কথাটা পেড়েও ফেলেছিল সোমনাথ। জোরে হেসে উঠেছিল মেঘা; সে হাসির শব্দ পাহাড়ি ঝরণার থেকেও মিষ্টি, কানে একটা রিনরিনে বাজনার মতো বেজে যায় যেন…

-“আমাকে কখনো এর থেকে বেশী মেক আপ করতে দেখেছ ?”

-“জানি না… আমি বুঝি না… মাঝে মাঝে মনে হয়…”

-“কি ? আমি কম কম সাজছি ? কেন ?”

এর উত্তরটা দিতে পারে না সোমনাথ। কারণ উত্তরটা দিলেই মেঘার মুখে ঘনিয়ে আসবে অভিমানের কালো মেঘ; কথা বন্ধ হবে। আর চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়বে।আর সেটা সোমনাথ সহ্য করতে পারবে না একবারেই।

মনের ক্ষমতা বা সামর্থ্য কিছু হয় কিনা জানেনা সোমনাথ; জানলে বলতে পারত তার মনের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে সে মেঘাকে ভালোবাসে। আর যেটা কেউ বললে বিশ্বাস করবে না, সেটা হল, প্রথম যেদিন দেখেছিল মেঘাকে, প্রথম যেদিন ওই চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে তার হৃদয় কয়েক লহমার জন্য থমকে গেছিল, কেঁপে গেছিল তার হাঁটু, সেইদিন যতটা সুন্দর লেগেছিল, সেইদিনই যতটা ভালোবেসে ফেলেছিল, আজ সেই ভালোবাসায় একফোঁটাও খামতি হয়নি। বরং উত্তরোত্তর মনের অস্থির অস্থির পাগলামো টা বেড়েই গেছে।

সে জন্য অবশ্যই সোমনাথ সহকর্মীমহলে টোন-টিটকিরি শুনেই থাকে। ‘বউ-ন্যাওটা’, ‘বউ-হ্যাংলা’ কথাগুলো শুনে শুনে অভ্যেস হয়ে গেছে তার। কিন্তু যাদের সাথে পরিচয় কর্মক্ষেত্রেই শুরু আর শেষ, তাদের কথাই কান দিয়ে লাভ তো কিছু নেই।

আসলে ছোটবেলা থেকেই সোমনাথ বড় একা। ক্লাসের সবথেকে চুপচাপ, কথায় কথায় কেঁদে দেওয়া আর সহপাঠীদের হাতের মারধোর খাওয়া ছেলেটা ছিল সে। বন্ধু বলতে কিছু ছিল না; যারা যেচে পড়ে বন্ধুত্ব করেছে, তারা করেছে হোমওয়ার্ক আর প্র্যাকটিকাল খাতায় আঁকার স্বার্থে।

সোমনাথ সারাজীবনে সবথেকে বেশী ভালোবাসা পেয়েছে মেঘার কাছ থেকে, বন্ধু-প্রেমিকা-বউ সবক’টা খাতের ভালোবাসা মেঘা উজাড় করে দিয়েছে তাকে। তাই তাকে ভালোবেসে যদি গোটা দুনিয়ারও বিরাগভাজন হতে হয়, তো তাতে রাজী সোমনাথ। যারা তাকে নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি করে, তারা রোজ রাতে খাবার টেবিলে তার সামনে বসে খায় না, তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে সোমনাথের লজ্জায় মরে যেতেও ইচ্ছে করে না…

হাতঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে সকাল ছ’টা। মোবাইলে সওয়া ছ’টায় অ্যালার্ম দেওয়া আছে; আগে থেকেই সেটা বন্ধ করে উঠে পড়ে সে। দু’জনেরই অফিস আছে; এখন স্বামী-স্ত্রীর সংসারে দু’জনে হাত না লাগালে সংসার সামলানো মুশকিল; এখন কলকাতায় কাজের লোকের অভাব এবং দু’জনের রোজগার নেহাত মন্দ না হলেও, কাজের লোককে অতগুলো টাকা দেওয়াটা কেমন গায়ে লাগে। তাই যত্ন করে সাজানো এই দুই-কামরার ফ্ল্যাটটা দু’জনে নিজে হাতেই দেখভাল করে থাকে। তাই সকালে উঠে ঘর পরিষ্কার করে এবং দুপুরের খাবার রান্না করে আটটা নাগাদ স্নানে যায় সোমনাথ। আর স্নান সেরে বেরিয়ে দেখে, জলখাবার তৈরী করে বিছানা তুলে স্নানে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছে মেঘা। ঠিক সকাল ন’টায় দু’জনে রাস্তায় নামে। সোমনাথ যাবে পার্ক স্ট্রীটে, রেল ভবন আর মেঘা যাবে সেক্টর ফাইভ। তাদের ফ্ল্যাট কালীঘাটের একটু ভেতরে; রাসবিহারী থেকে তার অফিস যাওয়ার একটাই এ সি বাস এছাড়া সোজা রাস্তা আর কিছু নেই; মেঘার সুবিধা হল, ওর এ সি শাটল বুক করা আছে; সেটাই তাকে নিয়ে যায় এবং ছেড়ে দিয়ে যায় রাতে।

ঘর পরিষ্কার করে রান্না চাপিয়েছে কি চাপায়নি, এমন সময় মেঘা পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে তাকে…

-“আমাকে ডাকলে না কেন ?”

-“আরে! আমি তো কিছুক্ষণ হল উঠলাম। তুমি কাল কত রাত অবধি ব্যস্ত ছিলে, শুতে দেরী তাই আর ডাকিনি…”

মেঘার মুখটা একটু দুখী দুখী হয়ে যায় এ কথায়।

-“তোমায় আমি একদম সময় দিচ্ছি না, তাই না সমু ? আসলে এই নতুন ক্লায়েন্ট নিয় এত চাপ; আমি আসলে…”

সোমনাথ মেঘার ঠোঁটে একটা আঙ্গুল দিয়ে তাকে চুপ করায়।

-“একদম না… কাজটা জরুরী তো ? তুমি কি ইচ্ছে করে কাজের বাহানা করছ ? তা তো নয়; তাহলে এত চিন্তা করছ কেন ? তোমার কাজের চাপ আমার থেকে অনেক বেশী; তাই এরকম সময় তো মাঝে মাঝে আসবেই, তাই না ? কুছ পরোয়া নেহী… তোমার চাপ একটু কমুক… আমরা একটা ভালো কোথাও ডিনার করে আসব একদিন…”

মেঘা আধভাঙা ঘুম চোখে নিয়ে একটা হাসি হাসে, তারপর সোমনাথের ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে একটা গভীর চুমু খেয়ে বলে;

-“আর কিছু খাবে ব্রেকফাস্ট-এ ?”

এইসব মুহূর্তগুলোতে সোমনাথ কেমন বিহ্বল হয়ে পড়ে; সে কোনও উত্তরই দিতে পারে না। মেঘা খিলখিল করে হেসে ওঠে…

-“ভোঁদু কোথাকার… যাও রান্না কর…”          

আবার রান্নায় মন দেয় সোমনাথ। মনে মনে হেসে ফেলে… জীবনে ভালোবাসার কমতি তার নেই; সত্যি বলতে জীবনধারণের কোনও কষ্টই নেই তাদের। কষ্ট অন্য জায়গায় আছে, আর সেটা মেঘার জীবনে। মেঘার বাবা আপত্তি করেছিলেন তাদের বিয়েতে। কুলীন ব্রাহ্মণ হয়ে তিনি কখনই বদ্যির ছেলের হাতে নিজের মেয়েকে তুলে দিতে রাজি হননি। তাই বাবার অমতে গিয়ে, এক কাপড়ে তার সাথে ঘর ছাড়ে মেঘা। সেই থেকে বাবা মেয়ের আর মুখ দেখেননি। মেঘার মা মাঝে মাঝে ফোন করেন; বলেন আসতে। কিন্তু মেঘা তাঁকে বার বার সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যে বাড়িতে তার স্বামীকে অপমানিত হতে হয়েছে সেই বাড়িতে সে আর যাবে না, যতদিন না বাবা নিজের এসে তাদের নিয়ে যাবেন।

সোমনাথের বাবা মা যখন মারা গেছেন, তখন অনেক ছোট সোমনাথ। একমাত্র কাকা আর কাকীমা বুকে তুলে নিয়ে সন্তান্সনেহেই মানুষ করেছেন তাকে। ছোটবেলা থেকে মেধাবী সোমনাথের পেছনে উচ্চমাধ্যমিকের পর থেকে আর একটা পয়সা খরচ করতে হয়নি কাকাকে; স্কলারশিপ এবং গভার্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার দরুন নামমাত্র খরচায় বি টেক কমপ্লিট করে আর পেছন ফিরে দেখতে হয়নি তাকে। মাথা ছোটবেলা থেকেই পরিষ্কার, তাই প্রথমে নীচু পদে ঢুকেও খুব তাড়াতাড়ি রেলের উচ্চপদস্থ ইঞ্জিনিয়ারের পদে আসীন হয়। 

মেঘাও ততদিনে একটি বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত। কলেজ জীবনের প্রেমের অধিকারেই তাই মেঘা হাত ধরে টানতে টানতে সোমনাথকে তার বাড়ি নিয়ে গেছিল। সেই প্রথম, সেই শেষ বার। মেঘার যে কতটা একরোখা, জেদী মেয়ে সেটা সেইদিনই বুঝতে পেরেছিল সোমনাথ। মেঘার বাবার কথায় যখন সোমনাথের মুখ লাল হয়ে যাচ্ছিল; তখন মেঘা তার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে নিজের ঘরে ঢোকে, কারোর কথায় কান না দিয়ে। আলমারি থেকে একটা ফাইল বের করে আবার বাবার সামনে গিয়ে বলে;

-“তোমার ওই বস্তাপচা ভাবনা নিয়ে তুমি থাকো, বাবা… আমি চললাম। আমার সমস্ত মার্ক শিট, আর ডকুমেন্ট নিয়ে গেলাম। আর আসব না…”

সোমনাথ কিছু বলার আগেই তাকে আবার টানতে টানতে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল মেঘা। ট্যাক্সিতে ওঠা অবধি একটা টুঁ শব্দও করেনি, কিন্তু ওঠার পর তাকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠেছিল।

আজ হঠাৎ করে সকাল থেকে সব কথা কেন মনে পড়ে যাচ্ছে সোমনাথের কে জানে! রান্না, স্নান সেরে এসে সোমনাথ দেখে প্রাতরাশ সাজিয়ে টেবলে তার জন্য অপেক্ষা করছে মেঘা, দুপুরের খাবারও টিফিন বাক্সয় ভরে তৈরী।

-“আজ আমার একটু দেরী হতে পারে, বুঝলে… ক্লায়েন্ট মিটিং আছে।“

-“হ্যাঁ, ঠিক আছে… আমি অফিস থেকে বেরিয়ে ফোন করে নেব।“

-“হ্যাঁ, ফোনে না পেলে বুঝে নিও মিটিং-এ আছি। আর বাড়ি ফিরে সব কাজ একা করে ফেল না, আমার জন্য রেখ। রুটিটা তো করতে শেখো নি, ওটা আমিই না হয় করব ফিরে…”

-“কি ? এতবড় অপমান ? আমি রুটি করতে পারি না ?”

-“হ্যাঁ, আমার ওই চৌকো রুটি খাওয়ার কোনো শখ নেই…”

-“এরম বললে তো ? না হয় পুরো গোল হয় না… তা বলে চৌকো ?”

এবার হেসে ফেলে দু’জনেই।

ঠিক ঘড়ি ধরে সকাল ৯ টার সময় রাস্তায় নামে দু’জনে। প্রথমে হেঁটে রাসবিহারী, তারপর একজন বাসের জন্য অপেক্ষা করবে, আর অন্যজন উঠবে শাটেলে।

সোমনাথের বাসটাই আগে এল। সে উঠে বসল। বাসের রুট একটাই, কিন্তু বাসের সংখ্যা প্রচুর বলে একেবারেই ফাঁকা থাকে বাসগুলো। সোমনাথ জানলার ধারে একটা সিটে আরাম করে বসে।

আজ মেঘার ফিরতে দেরী হবে। ভালোই হল। বড্ড খাটনি যাচ্ছে ওর, আজ বরং অফিস থেকে বেরিয়ে কিছু খাবার প্যাক করে নেবে সোমনাথ। খাটনিও কমবে, মেঘা খুশিও হয়ে যাবে। এসব ভাবতে ভাবতে ফোন ঘাঁটছিল সে। ফোন থেকে মুখটা তুলেই, তার ভ্রুটা কুঁচকে গেল। রাস্তার এই জায়গাটা এরকম ফাঁকা ফাঁকা লাগছে কেন আজ ? এই রাস্তা দিয়েই তো সে রোজই অফিস যায়। কিন্তু এরকম তো কোনোদিন মনে হয়নি। মানে কালই তো গেছিল অফিস। কাল এরকম ছিল রাস্তাটা ? না… অনেক ভেবেও মনে করতে পারে না সোমনাথ। রাস্তায় কিন্তু অস্বাভাবিক কিছু নেই; একটা দোকান, রাস্তার ধারে একটা স্মৃতিসৌধ; এগুলো রোজই দেখতে পায় সে; কিন্তু আজ বার বার মনে হচ্ছে, রাস্তায় এই জায়গাটায় কি একটা ছিল যেটা আজ আর নেই।

মনটা খুঁতখুঁত করতে থাকে, সোমনাথের। আর সেটা আরো বেড়ে যায় অফিস পৌছোতে পৌছোতে। বাকী রাস্তার আরো কয়েকটা জায়গা দেখে তার মনে হয় এই জায়গাগুলো তেও কিছু ছিল, যেটা আজ আর নেই। এইসব চিন্তা মাথায় নিয়েই সে অফিসে ঢোকে। এমনিতেই রাস্তাঘাটে যাতায়াত করার সময় সে ফালতু এদিক ওদিক তাকিয়ে সময় নষ্ট করে না, আর আজ তো এমনিতেই এইসব হাবিজাবি চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই সে একবারও খেয়াল করল না, একটা লোক, যে রাসবিহারী থেকে তার বাসে উঠে তার পেছনের সীটেই বসে তাকে লক্ষ্য করে গেছে গোটা রাস্তা, আর তার পেছন পেছন এসেছে তার অফিসের দরজা অবধি। এবং সে অফিসের ভেতর ঢুকে যাওয় অবধি সেখানে অপেক্ষা করেছে, আর তারও কিছুক্ষণ পর চুপচাপ চলে গেছে।  

কেমন হচ্ছে ? বেশী ন্যাকা ন্যাকা প্রেম মনে হচ্ছে কি ? হতে পারে… তবে এ তো সবে প্রথম পর্ব… কলির সন্ধ্যে ঘনিয়ে রাত হতে বেশী দেরী নেই… সামনের পর্বগুলো আসতে দিন… আশা করছি, নিরাশ করব না…

নীল…

Evil…

This Covid-19 lock-down has taught us many things and, more importantly, we’ve discovered things that were deeply buried in our mind and soul. This 24×7 staying indoors has its effect on us, physical and mental, and people engaging more and more in social media once again brought forward the many positives and negatives of the said medium. And as you can imagine from the title itself, I’m here to talk about the negatives rather than positives.

Why? Because when I was penning down ‘Somewhere in the Jungle of North Bengal’ I was in a roll. But then came the dreaded writers’ block. Since then I’ve started two stories. I have chalked out the outcomes and most of the story line of both the stories in my mind, but all my futile tries resulted in 500-1000 words and then my mind blocked out the literature. But again, fortunately for me and unfortunately for those who are reading this overly boring article, by definition, I can write anything I want on Libberish. So, here I am taking a sledgehammer and attempting to break through the Writers’ block that’s boggling my mind like a parasite.

But, that’s it. Enough about me. Let’s begin. The idea of this article came to my mind first with a series of incidents that concluded with me watching the CBS TV Show ‘Evil’.

Pic Courtesy – IMDB

This TV show features three main characters; priest in training David Acosta (Mike Colter), clinical psychologist Kristen Bouchard (Katja Herbers), and the tech guy Ben Shakir (Asif Mandvi). These three are appointed by Vatican to Investigate and Debunk seemingly weird or unexplained phenomenon like demonic possessions and miracles. In the pilot episode we see a man named Orson LeRoux, who killed three families and subjected some of his victims to post mortal rape, but he claims he ‘blacked out’ and don’t remember committing any of those crimes. His wife claimed that Orson had shown signs of demonic possession, and Kristen, the skeptic herself saw such evidence. But their detailed investigation revealed that Orson is, a serial killer and a necrophiliac who got help from a man named Leland Townsend over social media on how to fake the signs of a demonic possession to get away with murders in mental health grounds.

After this revelation, Orson went to prison, and David said something to Kristen,

“There are people in this world, who are… connectors. They influence people. They have day jobs; teachers, stockbrokers… expert witnesses. They pretend to be normal, but their real pursuit is… evil… Encouraging others to do evil. You don’t have to believe in the supernatural to know that there are people out there who do bad things and encourage others to do bad things for the sheer pleasure of it.

The world is getting worse, because evil is no longer isolated. Bad people are talking to each other… They are connected.”

David Acosta, ‘Evil S01E01’

Yes, as long as are quotes are concerned, that’s a freaking paragraph. But please, humor me… Go through it once again.

What do you think ‘Evil’ means? The deeds of the devil? All the Satan’s doing? But look closely. People like Orson and Townsend might be living much near us. They are fictional characters no more. The ‘Speak no evil’ is buried deep inside our minds a long time ago, and now people who still insist on ‘seeing no evil’ and ‘hearing no evil’ will be called blind and naïve.

Pic Courtesy – IMDB

Speaking of evil in our doorsteps. Anything comes to mind? Does ‘bois locker room’ ring any bells? What do you call a bunch of teenagers (boys and girls) who plan on gang raping women over social media forums?

Are they demons? Vampires of Werewolves? Genetically they are homo sapiens sapiens. But psychologically, well that’s an entirely different story.

Conspiring and encouraging to kill maim or rape people is pretty high on the ‘scale of evil’ if there is such a thing; but evil lies in grassroots. An apparent harmless social media post or a WhatsApp forward. Next thing you know, it went viral, it’s blown out of proportion, taken out of context, now the post you shared is classified as hate speech.

Photo by Vinícius Vieira ft on Pexels.com

People are just waiting for an excuse to tear each other apart. We, the privileged class enjoy the Eid’s biryani and Puja’s prasad. But whether we like to admit it or not, deep inside our secular and liberal crust there exist a tiny bit of hinduphobia or islamophobia. Just waiting to come out and wreak havoc.

Like I said, there are layer and levels of evil, when elected governments feed on our false sense of religious superiority and sheer blindness, and nurture that speck of hate deep inside, disasters are just around the corner, waiting to happen.

Someone posted a video on Facebook, showing someone stomping a kitten to death.

What do you call that? Evil? Many will lose sleep seeing such horrifying and inhumane act. I know I did. But many people will scroll through it, leaving a ‘love’ react on the post.

Courtesy – Google Images

Yes, there is a community, where people pay good money to watch people torture and kill rabbits, kittens, turtles, puppies. And they get disappointed when the animal doesn’t suffer enough, or the video was not gory enough.

What do you call that? Evil? Or just a bunch of people with no empathy.

EMPATHY! EMPATHY!! EMPATHY!!!

In many of my articles I’ve elaborated how important empathy is. And how disastrous the lack of it can be. Forget about that. People who spend time in deep or dark web have stumbled upon live streams where women are brutally raped and killed ON A REGULAR BASIS.

You think this is my idea of a sick joke? Nope… luckily, I’ve never seen any of such streams with my own eyes, and most importantly, I don’t go looking for it.

Amir Khusro wrote,

Gar firdaus bar-rue zamin ast, hami asto, hamin asto, hamin ast.

If there is a heaven on earth, it’s here, it’s here. But all due respect to Janaab Khusro, I don’t see heaven. But hell, and purgatory are well within reach. I don’t believe in ghosts; I don’t believe in demons and stuff because they don’t scare me… People does. Because I started by crucifying social media; but just imagine if more and more psychopaths, more and more collectors start building groups and communities, and when social media influencers start encouraging rape and murder; where does that leave us? Like-minded people tend to stick together. But, when more and more of these communities of evil start to pop up, do we really possess the tools and courage to counter and nullify their collective evil?  

How do I know the man sitting next to me is not plotting to rape and murder his underage neighbor? How do I know the person standing in front of me takes great pleasure on inflicting pain upon creature and human beings alike? How do I know? Social media is a great place to connect and share ideas, but it’s even a better place to hide. Creating fake profile is child’s play, but someone dedicated enough can easily mimic others’ activities to build an entire fake self-image and an equally fake digital footprint.

Be very afraid people. A microbe just shown us how pathetically tiny and inconsequential world smartest animal is. And When people spending their smartness to do evil, well…

I’d rather get possessed by a demon, and black out… Forever…

Pe***

Neel    

স্তুপ – চতুর্থ পর্ব

সাত – দীর্ঘজীবি হোক !!!

পরেশ খিড়কীর দরজা দিয়ে বেরোতেই, তার মুখে প্রচন্ড জোরে এসে লাগল একটা আঁধলা ইট। নাকটা থেঁতলে গেল নিমেষে, সামনের দুটো দাঁতও ভাঙল। মুখে হাত চাপা দিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল সে।

-“তুই আজ থেকে না, সার্ভিস রিভলভারের বদলে কোমরে এক বস্তা ইঁট নিয়েই ঘুরিস… শালা… কি টিপ মাইরি !!!”

কথাগুলো বলতে বলতে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসে ডি সি পি রণদীপ গুহ নিয়োগী এবং এ সি পি হরিশ মহাপাত্র। ইঁটটা সেই ছুঁড়েছে। বাড়ির ভেতর থেকে একটা হইচই এর শব্দ শোনা গেল। হরিশকে ইশারা করতে, পরেশকে টানতে টানতে সে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। রণদীপ হাঁটতে হাঁটতে বাড়িটার সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কয়েকজন কনস্টেবল আর সাব ইন্সপেক্টর মিলে বাড়ির বাকি সবাইকে টেনে হিঁচড়ে বাড়ির বাইরে বের করে আনছে।  সবমিলিয়ে বাড়িতে ছিল দশ জন। আর যে ছেলেটা এই ডেরার হদিস দিয়েছে, সে তো রণর জীপে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে। মোট এগারো জন। এদের মধ্যে একজনকে একঝলক দেখেই চিনতে পারল রণ, শচীন তালুকদার। নক্সালদের প্রথম সারির নেতা।

-“অ্যাই হরিশ !!!”

হরিশ পেছন থেকে সাড়া দেয়…

-“একটা টেলিফোনের খুঁটি দেখে যন্তরটা লাগা, ভাই… রিপোর্ট তো করতে হবে…”

টেলিফোনের খুঁটি খুঁজে পেতে, আর তাতে টেলিফোনটা লাগাতে বেশী বেগ পেতে হল না। নির্দিষ্ট নম্বরে ডায়াল করে উল্টোদিকে উত্তর আসতেই, রণ কথা বলতে শুরু করল…

-“স্যার, আমি রণ বলছি…”

-“…………………………”

-“গ্যাংটাকে ধরেছি, স্যার। টোট্যাল এগারো জন।”

-“…………………………”

-“না স্যার, পালাতে কেউ পারেনি।”

-“…………………………”

-“আমি তো আপনাকেই সেটা জানতে ফোন করলাম; রমেন তো বলল ওর বাড়িতে এক সাথে এত লোক নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।“

-“…………………………”

-“আচ্ছা, স্যার…”

-“…………………………”

-“আচ্ছা, স্যার…”

-“…………………………”

-“চিন্তা করবেন না স্যার, আপনি শুধু দেখে নেবেন, সময়মত খবরের লোকজন যাতে পৌছে যায়…”

-“…………………………”

-“আচ্ছা, স্যার… গুড নাইট।”

হরিশ পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলে উঠল, কি অর্ডার, স্যার ?

-“কি আবার অর্ডার ? বুঝে নে। এগারোটা ছেলেকে অ্যারেস্ট করে  জেলে ভরে লপ্সি গিলিয়ে মামলা করার হ্যাপা কেউ নেবে নাকি।”

-“তাহলে ? সবকটাকে ঝেড়ে দিতে হবে ?”

-“হ্যাঁ, কিন্তু আমাদের জুরিসডিক্সনে নয়। রমেনের শালার একটা বড় জমি কেনা আছে, বারাসাতের কাছে; সেখানেই…”

-“এখন বারাসাত যেতে হবে ?”

-“ওটাই তো শালা হ্যাপা… রমেন নাকি ফোন করে বলেছে…  চেয়ারটায় বসে আছে বলে শালা খিস্তি মারতে পারি না। বাপের চাকর ভেবে রেখেছে যেন বাঞ্চোদ… তুললি সবকটাকে গাড়িতে ?”

হরিশ সম্মতি দেয়।

-“তুই ওঠ আমার জিপে। চল বেরোই…”

যশোর রোডে ওঠার পর অ্যাক্সিলেটরের চাপ বাড়াতে থাকে রণ। যত তাড়াতাড়ি কাজটা মিটে যায়, তত ভালো। ঠিকানা আর বর্ণণা মিলিয়ে যখন জায়গাটায় এসে পৌছোয়, তখন বাজে রাত দেড়টা। শুনশান চারদিকের রাস্তা। কেউ কোত্থাও নেই। ছেলেগুলোকে মাঠে নামানো হয় এক এক করে। সবার হাত আর পা বাঁধা। সবাইকে মাঠে বসান হল, হাঁটু মুড়ে। সব বাচ্চা বাচ্চা ছেলেপুলে; ভয়ে পাতার মত কাঁপছে। একজন ছাড়া। শচীন। সে হাঁটু গেড়ে বসে আছে, গম্ভীর মুখে।  শুধু একটা ছেলের নির্বুদ্ধিতার জন্য এতজন ধরা পড়ে গেল। কিন্তু কোথায় সে ? কোথায় সমীর ? বলতে বলতেই দেখতে পেল। একটা নগ্ন অচৈতন্য দেহকে জীপ থেকে টেনে হিঁচড়ে নামাচ্ছে রণদীপ। ও কি বেঁচে আছে ? মাঠে পড়ার পর থেকে একবারও নড়ল না সমীর। এবার তার সামনে এসে দাঁড়ায় রণ।

-“আমাকে চিনিস ?”

Photo by Jayberrytech on Pexels.com

শচীন মাথা নাড়ে।

-“ব্যস। তাহলে এবার বলে ফেল, তোদের বাকি ইউনিট কোথায় ক’টা আছে…”

শচীন চুপ।

তার চুলের মুঠিটা ধরে নাড়াতে নাড়াতে বলে রণ,

-“আরিব্বাস ! তোর মাথায় তো হেব্বি চুল ! চুলে খুশকি-উকুন হয় না ? দেখি তো…”

এই বলে অন্যহাতে কোমরের বেল্ট থেকে ছোরাটা বের করে শচীনের মাথার একগোছা চুল, গোঁড়া থেকে চামড়া সমেত কেটে নেয় সে। শচীন যন্ত্রনায় ছটফট করে ওঠে।

-“এ বাবা চামড়া সমেত কেটে নিলাম নাকি !!! সরি সরি… এই হরিশ, ফার্স্ট এইডের বক্সটা দে রে…”

হরিশ মুচকি হেসে তার জীপ থেকে একটা বাক্স এনে রণর পাশে রাখে, বলাবাহুল্য, সেটা ফার্স্ট এইড বক্স নয়; রণর জেরার করার নানা সামগ্রী তাতে।

-“দাঁড়া, ওষুধ দিয়ে দিই…”

এই বলে মাথার কাটাটায় বেশ কিছুটা নুন ছড়িয়ে দেয় রণ। শচীন আবার আর্তনাদ করে ওঠে। রণ খিলখিল করে হেসে ওঠে পেটে হাত দিয়ে। হাসতে হাসতেই সে হাঁটু গেড়ে শচীনের সামনে বসে পড়ে।

-“আসলে ব্যাপার কি বলত, ওপর থেকে অর্ডার, তোদের মেরে এখানেই ফেলে যেতে হবে। আমি মারতে চাই না, মাইরি বলছি… আমার কাজ পেট থেকে কথা বের করা। কিন্তু ওপরওয়ালার অর্ডার; কি করব। তা মেরেই যখন ফেলব, একটু মজাই করে নিই… কি বলিস…”

এই বলে তার বাক্স থেকে একটা সাঁড়াশির মত জিনিস বের করার জন্য হাত বাড়ায় রণদীপ।

আট – মহেঞ্জোদড়ো…

আজ ওরা চারজন ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিচ্ছে। দালাল লোকটি নেহাত মন্দ নয়, বাড়িওয়ালার সাথে কথাবার্তা বলে ডিপোসিটের একটা বড় অংশই তাদের ফেরত করে দিয়েছে। অন্বয় চেয়েছিল বাড়িওয়ালার সাথে একবার কথা বলতে, কিন্তু তিনি কথা বলতে রাজী হননি।

যেদিন রাতে ওরা চারজনে একসাথে ঘুমিয়েছিল, মাঝরাতে ওদের একসাথে ঘুম ভেঙে যায়। দুঃস্বপ্ন দেখে। প্রত্যেকেই দেখেছে এক দুঃস্বপ্ন। কোনো পুলিসের পোশাক পড়া লোক সাঁড়াশি দিয়ে ওদের হাতের নখ টেনে ওপড়াচ্ছে। পরের দিন তন্দ্রা আর অজেয়া জিনিসপত্র গুছিয়ে বেড়িয়ে যায়। বলে যায় নতুন ফ্ল্যাট না পাওয়া পর্যন্ত অজেয়ার মাসির বাড়ি থেকেই যাতায়াত করবে দু’জনে। ফ্ল্যাটে থেকে যায় প্রবাল আর অন্বয়। পরদিন অফিসেও ডুব মারে দু’জনে। দিনের গার্ডের কাছ থেকে অনেক কষ্টে ছাদের চাবি জোগাড় করে ছাদে ওঠে। গোটা ছাদে পড়ে রাশি রাশি চুল, মাছের কাঁটা, মাংসের হাড়,  হাত-পায়ের নখ… আর লোহার ফাঁপা প্রচুর পাইপ।

-“ভাই, এই পাইপগুলো গড়ালে কি পায়ের শব্দের কথা মনে হতে পারে ?”

-“তোর শুধু পাইপগুলোই চোখে পড়ছে ? রাশি রাশি চুল, নখগুলো দেখতে পারছিস না ? তুই এখনো মনে করিস, এই ফ্ল্যাটে আসা অবধি যা যা ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো তুই যুক্তি বা বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে পারবি ?”

এর কোনো উত্তর দিতে পারে না অন্বয়।

আর একটা ফ্ল্যাট খুঁজে পেতে আরও দু’চারদিন সময় লাগে ওদের। সেই কদিন দু’জনে অনেক অজানা আতঙ্কের সংশয় নিয়ে দিন কাটায়। এক সপ্তাহে যেন একটা চাপা অস্বস্তির আবহাওয়া তাদের জীবনগুলোকে পাল্টে ফেলেছে। অফিসেও সারাদিন মনে হয় আতঙ্কের একটা কালো মেঘ যেন তাড়া করে বেড়াচ্ছে, নিঃশব্দে।

নতুন ফ্ল্যাটটা চারজনে দেখে আসে। এত আলো হাওয়া নেই, আকারেও একটু ছোট, ভাড়াটাও হয়তো একটু বেশী, কিন্তু তবু আর একদিনও ওই ফ্ল্যাটে নয়।   

আবার একটা শনিবার, আবার জিনিস গোছানোর পালা। রাতে জিনিস গোছাতে গোছাতে অন্বয় আর প্রবাল আবার শুনতে পায় ছাদে পায়ের শব্দ। একটা রাত… শুধু একটা রাত কাটানো গেলেই এর থেকে মুক্তি। এই ভেবেই দু’জনে মুখ বুজে কাজ করে যায়। গোছানো শেষ করে আর ঘুমাতে ইচ্ছে করে না। ডাঁই করা লাগেজে হেলান নিয়ে সিগারেট টানতে টানতেই রাতটা কাটিয়ে দেয় দু’জনে।

কলিংবেলের শব্দে দরজা খোলে অন্বয়। তন্দ্রিকা আর অজেয়া দাঁড়িয়ে। অনেকদিন পর দু’জনের মুখে হাসি দেখে অন্বয়ের মুখেও হাসি ফোটে। সবাই হাত লাগিয়ে জিনিসপত্র ফ্ল্যাট থেকে বের করে দরজাটা বন্ধ করতে যাবে অন্বয়, এমন সময় হঠাৎ সে থেমে যায়। আবার ঢুকে পড়ে ফ্ল্যাটের ভেতরে।

-“কি হল ?” পেছন পেছন ঢুকে পড়ে প্রবাল।

-“একটা জিনিস দেখ। ফ্ল্যাটের ডানদিকে কিচেন আর একটা বেডরুম,কিন্তু অন্য ধারে শুধু একটা বেডরুম। তাহলে দুটো ঘরের সাইজ এক হয় কিভাবে ?”

-“এক কোথায় ? এ দিকে বাথরুম রয়েছে যে ?”

-“বাথরুম তো ওই দিকে, মানে অ্যাটাচড টা। ভালো করে খেয়াল কর, আমাদের ফ্ল্যাটে একটা বড় সড় ডেড স্পেশ রয়েছে…”

-“এখন এসব নিয়ে ভেবে কোনো লাভ আছে কি ?”

এ কথার উত্তর না দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় অন্বয়। ফ্ল্যাটের বাইরেটা দেখে আবার ভেতরে ঢুকে বলে,

-“না, এ ফ্ল্যাটে তো কোনো গারবেজ শ্যাফটও নেই, তাহলে ডেড স্পেশ কিসের ?”

এবার অজেয় বলে ওঠে,

-“ছাড় না ভাই… উই আর লিভিং… এখন এসব নিয়ে…”

-“তোরা লিফট-এ নাম, আইল টেক দ্যা স্টেয়ার্স…”

অন্বয়ের এই আচরণে একটু বিরক্ত হয়েই জিনিসপত্র নিয়ে লিফটের দিকে এগোতে শুরু করে তিনজনে। জিনিসপত্র নিয়ে নিচের তলায় নামার পর দেখে, অন্বয় দাঁড়িয়ে।

-“শুধু আমাদের ফ্ল্যাটে নয়, প্রতিটা ফ্লোরের কর্ণারের ফ্ল্যাটেই ডেড স্পেশ আছে…”

-“তুই কি প্রত্যেকটা ফ্ল্যাটে ঢুকে ঢুকে দেখলি নাকি ?”

-“না… কিন্তু বল তো, গ্রাউন্ড ফ্লোরে তো কোনো ফ্ল্যাট নেই, তাহলে এই দরজাটা কিসের ?”

এই বলে সে একটা হলুদ রঙের মলিন তালা দেওয়া দরজার দিকে দেখায়। এবার প্রবালও অবাক হয়ে যায়। সত্যিই তো! সে তো আগে এটা খেয়াল করেনি ! এটা তো কোনো ফ্ল্যাট নয়, তাহলে ?

-“সিকিওরিটিকে ডাক। এক্ষুণি…”

প্রবাল সিকিওরিটিকে পাকড়ে আনে।

-“এই দরজার চাবি দাও…”

সিকিওরিটি গার্ড চমকে ওঠে…

-“জ্বি, উঁয়াহা জানা শখত মনা হ্যায়…”

অন্বয় নাছোড়বান্দা, কিন্তু সিকিওরিটি গার্ডও দমবার পাত্র নয়… শেষে সে একপ্যাকেট গোল্ডফ্লেক ঘুষ নিয়ে দরজাটা খুলতে রাজি হল। তালা খোলার পর, অনেকদিনের জমে থাকা একটা পচা, ভ্যাপসা আর রাসায়নিক মেশানো গন্ধ ওদের নাকে এল। চারজনেই নাকে হাত চাপা দিল। সিকিওরিটি তালা খুলে দিয়েই একটু দুরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। দরজাটার পেছনে অন্ধকারে কিছুই ঠাহর করা যাচ্ছিল না। অন্বয় ফোনের টর্চটা জ্বালিয়ে সামনে ধরতেই, ওদের চারজনেরই হৃদযন্ত্র যেন এক সেকেন্ডের জন্য শিউরে উঠল। দরজার ওপারে স্তুপাকৃতি হয়ে পড়ে রয়েছে অনেকগুলো নগ্ন-অর্ধনগ্ন রক্তাক্ত লাশ। কারোর মাথার চুল গোঁড়া থেকে চামড়া সহ কাটা, কারোর একটা চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে ঝুলে আছে, কারোর বা কপাল থেকে বেরিয়ে একটা আধপোঁতা পেরেক। এই বীভৎস দৃশ্য দেখে অন্বয় দু-এক পা পেছিয়ে আসে। হাত থেকে ফোনটা পড়ে যায়। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা আবার তুলে সামনে ধরেই আবার চমক; কোথায় কি ? দরজার পেছনে শুধু কতদিনের ময়লা, চুল, মাছের কাঁটা, হাড়গোড়… আর কিচ্ছু না… 

Photo by Mitja Juraja on Pexels.com

আর ঘুরে তাকায়নি, ওরা… সোজা বেরিয়ে এসেছিল। একঝলকের জন্য যেটা দেখেছিল, সেটা ওরা ভুলতে পারেনি সারাজীবনে। যেমন ভুলতে পারেনি আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগের বারাসাতবাসী। সকালের প্রথম ফোটা আলোয় তারা দেখেছিল ডাঁই করে জঞ্জালের মত ফেলে রাখা এগারোটা লাশ খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে কাক আর শকুনে। পঞ্চাশ বছর আগে, যখন বারাসাত গ্রাম ছিল… যখন মাঠের বুকে বিরাট বড় এই কমপ্লেক্সটা গজিয়ে উঠে সব ধামাচাপা দিতে চায়নি…  

একবার গুগল করে দেখে নিন ‘১৯৭০ সালের বারাসাত হত্যাকান্ড’ বা ‘1970 Barasat Killings’ একটা ঘটনার সন্ধান পেয়ে যাবেন। দ্বিতীয় ঘটনাটাও সত্যি, মানে ভৌতিক ফ্ল্যাটবাড়ির ব্যাপারটা; শুধু সেটা কলকাতা শহরের ঘটনা নয়। এর বেশী আমি বলতে পারব না, মাফ করবেন। স্তুপ শেষ হওয়ার পর, এই শনিবার একটা নন-ফিকশনই লিখব ভাবছি। একটা বিষয় মাথায় ঘুরছে, সেটা নিয়েই লিখব। তারপর আবার হয়তো গল্পে ফিরব। দেখা যাক।

শান্তির আশায়,

নীল…

স্তুপ – তৃতীয় পর্ব

পাঁচ – শাসন

-“তোমাকে কি আমি ব্যাপারটা বোঝাতে পারছি না, নিয়োগী ? আর এক মাসের মধ্যে আমার এই পুরো ঝামেলাটার শেষ চাই, অ্যাট এনি কস্ট…”

-“আমি বুঝতে পারছি স্যার, আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি…”

-“আপ্রাণ চেষ্টা করছ… তোমাকে জাদুর গায়ে হাত বোলাতে কিন্তু আমি রাতারাতি ডি সি পি করে দিইনি, নিয়োগী… রমেনের বাড়ির পুরো অ্যাকসেস তোমার কাছে। আর বাবা মেক অ্যান একজাম্পল… মারধোর কর, হাত-পা ভেঙে দাও… তোমার মেথড আমার জানার ইচ্ছাও নেই। আমার রেজাল্ট চাই…”

-“রেজাল্ট কি পাননি, এতদিন স্যার ?”

-“বাজে তক্ক কোরনা… দু’চারটে চুনোপুঁটি ধরে নিজেকে ‘আবদুল মাঝি’ প্রমাণ করার কোনো দরকার নেই।“

-“না, স্যার… তর্ক করিনি, আসলে ওদের একটা ইউনিটকে অনেকদিক ধরে ট্র্যাক করছি, প্রায় এগারো-বারো জনের একটা দল। এদের কিন্তু একদম সোজাসুজি চারুর সাথেই কথা হয়। আশা করছি আজকালের…”

রণদীপের কথায় বাধ সাধে ঘরের দরজায় একটা টোকা। দরজা ঠেলে মাথা গলায় হরিশ।

-“এক্সট্রীমলী সরি, স্যারস… আসলে ডি সি পি স্যারের একটি খো… মানে মোল রিপোর্ট করেছে, আরজেন্ট…”

রণ আবার টেবলে বসা লোকটির দিকে মুখ ফেরাতেই, তিনি ইশারায় মাথা এবং দুই হাত নেড়ে তাকে যেতে বলেন। তাকে একটা স্যালুট ঠুকে দরজা পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রণদীপ মুখ খোলে;

-“বাঞ্চোদ !!! সেন্টার ওকে হুড়কো দেবে, আর সেই হুড়কো নিয়ে ও গুঁজবে আমার গাঁড়ে…”

হরিশ হেসে ফেলে…

-“আবার তাড়া মারছিল ?”

-“তা নয়তো কি ? যত তাড়া এখন। ছাড়, কোন মাল রিপোর্ট করল ?”

-“ওই তো, সমীর মৈত্র বলে ছেলেটির বাড়ির চাকর। আজ বাজারে ছেলেটাকে দেখে মায়ের অসুস্থ হওয়ার গল্প দেয়, তাতে সে নাকি কঁদে টেদে বলে আজ বিকেলে যাবে…”

-“ফলো করে ডেরার খোঁজ নিতে পারল না ?”

-“রণদা, অত বুদ্ধি থাকলে আর আমাদের কি হত ?”

বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফেলে রণদীপ গুহ নিয়োগী। তারপর বলে

-“সমীর না কি নাম ? তার বাড়িতে পোস্টিং…”

-“দু’জন আছে, রণদা… সাদা পোশাকে।”

-“গুড… বাড়ির কেউ দেখার আগেই যেন তুলে নেয়, আর সোজা রমেণের বাড়িতে গিয়ে ফেলে। আমি ওখানেই যাচ্ছি, তুই স্পটে চলে যা।”

-“ও কে…”

গট গট করে হেঁটে সোজা নিজের জীপে গিয়ে ওঠে রনদীপ। জীপ পাওয়া ইস্তক সে ড্রাইভার নেয়নি, নিজেই ড্রাইভ করে। আজ ছেলেটা ধরা পড়লে কলকাতার বুক থেক নক্সাল উচ্ছেদের পথে একটা বড় ধাপ সামনে যাওয়া যাবে। এদের ইউনিটের একটি ছেলেকে সপ্তাহ খানেক আগে ধরছিল রণ; বিশ্বনাথ বাগচি।  কিন্তু প্রায় ১০ ঘন্টা অকথ্য অত্যাচারের পরও সে একটুও মুখ খোলেনি। এরকম আর কয়েকটা তেজী বাচ্চা ব্রিটিশ আমলে থাকলে, দেশটা পঞ্চাশ বছর আগেই স্বাধীন হয়ে যেত। জেরার শেষ পনেরো মিনিট ছেলেটার বুকে একের পর এক সিগারেট নেভানোর পরও যখন মুখ খুলল না, তখন একরকম বাধ্য হয়েই ক্ষমতার উৎসের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে লাশটা শ্রদ্ধানন্দ পার্কের ধারে ফেলে এসেছিল সে।

Photo by Martin Lopez on Pexels.com

এনকাউন্টার ব্যাপারটা মজার, মানে সেটাতে একটা শিকার আর শিকারী খেলার স্বাদ পাওয়া যায়, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়না। পেট থেকে কথা বার করতে না পারলে আর লাভ কি হল ? তাই নামের পাশে এনকাউন্টারের সংখ্যা নিয়ে ভাবে না রণ। এনকাউন্টার মানেই সার্ভিস রিভলভার ব্যবহার করতে হবে, ফাইল বানাতে হবে, অনেক হ্যাপা। ক’টা ছেলে মিসিং হল সে নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।  আর কেউ থানায় ডায়েরী করতে এলে প্রথম প্রশ্ন করা হয় ‘ছেলে আপনার নক্সাল করে ?’ বাড়ির লোক না জানুক বা অস্বীকার করুক এই ডামাডোলের বাজারে ছেলে হারিয়েছে মানেই ছেলে নক্সাল করে, আশা ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে বসে থাকুন। লাশ পেলে সৎকারের ব্যবস্থা করবেন।

রমেন চৌধুরীর বাড়িটা শেয়ালদা আর বৈঠকখানার মাঝামাঝি জায়গায়। এককালের গুন্ডা, এখন সরকারী অনুগ্রহে মুচির কুকুরের মত ফুলে ফেঁপে উঠেছে। তার বিরাট বড় বাড়িতেই রণদীপের ‘ইন্টারোগেশন রুম’। তার একার নয়, সঙ্গে সহকারী প্রচুর; কিছু পুলিসের লোক, কিছু রমেনের ভাড়া করা গুন্ডা। তবে এখানে সমস্ত কাজ রণর নির্দেশমতই হয়।

বাড়ির সামনে জীপটা থামিয়ে গাড়ি থেকে নামে রণদীপ। বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে রমেন নিজে। তাকে দেখেই বলে ওঠে,

-“তোর ডানহাত ফোন করেছিল এইমাত্র। একটা ছেলেকে নাকি ধরেছে, নিয়ে আসছে…”

-“বাহ… খুব ভালো…”

কথাটা বলেই দরজা দিয়ে বাড়িটায় ঢুকে যায় রণ। একটা চওড়া উঠোন পেড়িয়ে সামনে একটা হলঘর। সেটাতে ঢুকলে একটানা গোঙানির শব্দ শোনা যায়। একটা ছেলে ন্যাতা দিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা রক্ত পরিস্কার করছে। ঘরের আবছায়ার মধ্যে ঠাহর করলে দেখা যাবে একগাদা নগ্ন লাশ… লাশ ? না ঠিক লাশ নয়, প্রায় লাশ। জীবন তাদের সরু সুতোয় ঝুলছে। কেউ কেউ হয়তো যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মরে যাবে। আর বাকিদের প্রয়োজন ফুরোলে মেরে ফেলা হবে।

ঘরটা পেরিয়ে একটা ছোট্ট ঘর, যেটা রণদীপের বসার ঘর, সেখানে গিয়ে চেয়ারে বসে, সামনের চেয়ারে পা তুলে একটা সিগারেট ধরায় সে। পেছন পেছন রমেন এসে ঢোকে।

-“যে মালটাকে ধরেছি, এ মুখ খুললেই একটা গোটা দল ধরা পড়বে…”

-“গোটা দল ? কতজন ?”

-“এই ধর এগারো-বারো…”

-“অতগুলো ছেলেকে কি এখানে এনে তুলবি নাকি ?”

এবার একটু বিরক্ত হয়ে রমেণের মুখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয় রণ…

-“তা নয়তো কি বাঁড়া তোর শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাব, জামাইষষ্ঠীর নেমন্তন্ন খাওয়াতে ? ঝাঁটজ্বালানো কথাগুলো বলিস কেন ?”

-“না ! এখানে আরো এগারোটা ছেলেকে আটকে রাখা সম্ভব নয়…”

-“তো বাঞ্চোদ অতগুলো ছেলেকে এখন কার গাঁড়ে ঢোকাবো আমি ?”

 -“আমি জানি না… একটা ছেলে আসছে, ঠিক আছে… তার চেয়ে বেশী…”

এবার বেশ রেগে ওঠে রণদীপ;

-“শোন রমেন, এইসব বালবাজারি না, বন্ধ কর। ওদিকে তোর বাপ আমার পোঁদে লেগে আছে, শালা ডেডলাইন মারাচ্ছে… আর তুই এবার বেশী আলবাল বকলে না, শালা তোরই চামড়া ছাড়িয়ে নেব। আমাকে চিনিস না যেন…”

রণদীপ কে হাড়ে হাড়েই চেনে রমেন। ‘আমার বাড়িতে আমার কথা চলবে’ এটা খুব জোর দিয়ে বোঝাতে গিয়ে নিজের বাড়িতে দাঁড়িয়ে রণর হাতে একটা থাপ্পড় খেয়েছিল রমেন। সে কথা ভাবলে এখনো মাঝে মাঝে গালটা টনটন করে। তাই এক পা পেছিয়ে গিয়ে, একবার ঢোক গিলে একটু নরম সুরে বলে,

-“দেখ রণ, মাথা ঠান্ডা করে শোন। পুরোনো বাড়ি, মোটা দেওয়াল, সব মানছি। কিন্তু এত লোকের চিৎকার বাইরের লোক শুনতে পাবে এবার। বিরাট সমস্যা হয়ে যাবে তখন। তোরও, আমারও। তাই এই ছেলেটা আসুক। এর ডেরার সন্ধান পেলে আমি ব্যবস্থা করে দেব তোকে অন্য জায়গার।”

রণদীপে কোনো উত্তর না দিয়ে একমনে সিগারেট টানতে থাকে। রমেন ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। বেরিয়ে দেখে, হরিশ একটা ছেলেকে টেনে-হিঁচড়ে ঘরে ঢোকাচ্ছে। তাকে কোণার একটা ছোট ঘর দেখিয়ে দিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগোয় রমেন। তার একটা জরুরী টেলিফোন করার আছে।

ছয় – একটি রাত

কৌটোটা হাতে ধরে ভালো করে দেখে একবার প্রবালের আর একবার অন্বয়ের মুখের দিকে তাকান ডক্টর দেবেশ সৎপতি। আবার কৌটোটার ভেতরের পেরেকদুটোকে ভালো করে দেখে সেটা টেবলে রেখে প্রবালের মুখের দিকে তাকান তিনি।

-“দিনে ক’টা ?”

-“কি ক’টা ?”

-“ছিলিম !? সবই তো গঞ্জিকার প্রভাবজনিত কথাবার্তা বলে মনে হচ্ছে…”

এবার প্রবাল বেশ বিরক্ত হয়ে বলে…

-“এ এ এই জন্য আমি বলেছিলাম ভাই, অন্য ডাক্তার দেখ, যাব না শালা দেবুর কাছে…”

-“তুই থাম। তুই এসে বলবি, কাশতে কাশতে তোর গলা থেকে লোহার পেরেক বেরিয়েছে, আর সেটা আমি বিশ্বাস করে নেব। কি ভাবিস আমায় বলতো ? এরপর তো কাল এসে বলবি স্বয়ং অ্যান্টমি হপকিন্স এসে তোর এক্সর্সিজম করে গেছে… নেহাত পসার জমার পর থেকে খিস্তি দেওয়া ছেড়ে দিয়েছি, নাহলে এতক্ষণে তোর বাপ-চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করে দিতাম…”

-“এই অন্বয়, ওঠ তো… শুধু শুধু সময় নষ্ট…”

-“তুই থাম… ওকে সালিশি মেনে কি হবে… বস…”

-“গলায় ব্যাথা আছে ?’

-“না, ব্যাথা যন্ত্রণা কিছু নেই…”

-“গুড… ঢোক গিলতে গেলে লাগছে ?”

-“আরে না রে বাবা ওসব কিছু হচ্ছে না…”

-“আচ্ছা; একবার হাঁ কর তো ভালো করে…”

একটা জোরালো টর্চ দিয়ে ভালো করে প্রবালের গলাটা আর মুখে ভেতরটা দেখল দেবেশ। তারপর চেয়ারে বসে বলল,

-“নাহ, কোন ইনজুরি তো দেখলাম না। ব্যাথা যন্ত্রণা যখন নেই, তখন ফালতু ফালতু এন্ডোস্কোপি করে পয়সা নষ্ট করার মানে হয় না। ক’দিন অবজার্ভ কর, আর কোন সমস্যা হলে তখন দেখা যাবে। আর যদি ফট করে মারা যাস, তো শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রনটা যেন পাই, ভাই…”

প্রবাল চোখ কপালে তোলে। অন্বয় এবার মুখ খোলে…

-“কিন্তু এটার কারণটা কি হতে পারে ?”

-“তুই সিরিয়াসলি এই প্রশ্নটা আমাকে করছিস ? একটা জ্যান্ত মানুষ কাশলে তার গলা দিয়ে কফ ওঠার কথা। তার বদলে পেরেক বেরোচ্ছে !!! এমন কথা আমি অন্তত কোনো অ্যানাটমির বইতে পরিনি, তবে হলিউডের সিনেমায় বিলক্ষণ দেখেছি। প্রবাল আজকাল ম্যাজিক ট্যাজিক প্র্যাকটিশ করছে না তো ?”

-“আরে না রে ভাই। অফিসের কাজের চাপে ঘুমের সময় পাই না, আর ম্যাজিক…”

-“যাক গে… বাড়ি যা, অফিসের কাজ কর, সস্তার গাঁজা কম খা… আর এত কমপ্লিকেটেড কেস আনিস না ভাই… সিফিলিস বা গনোরিয়া হলে বলিস, ওষুধ দিয়ে দেব। তবে এইডসটা না বাধালেই ভালো; ওটার ওষুধ জানা নেই…”

প্রবাল বিরক্ত হয়ে উঠে পড়ে।

-“চল তো… দুনিয়া রাজ্যের ভাট বকে ডাক্তার হয়েছে…”

এই বলে সে বেরিয়ে যায়, পেছনে পেছনে অন্বয়…

-“অ্যাই শালা ! আমার ফি দিয়ে যা !!!”

-“দেব না ! ভিক্ষে করে মর শালা…”

-“তোর মত রুগী দিনে দু’চারটে এলে তাই করতে হবে রে, শুয়ার…” 

দেবেশের চেম্বারের বাইরে এসে দু’জনে সিগারেট ধরায়। পেরেকের ব্যাপারটা অজেয়া আর তন্দ্রিকার কাছে চেপে গিয়ে যে সুবিধাই হয়েছে, সেটা আরও একবার স্বীকার করে প্রবাল। মেয়েদুটো অলরেডী জোমাটোতে জমজমের নেগেটিভ রিভিউ দিয়ে ক্ষান্ত হয়েছে। পেরেকের কথা জানলে যে কি করত… 

-“মেয়েদুটো অত রাতে প্যানিক করতে শুরু করলে খুব চাপ হয়ে যেত ভাই। একে তো বিরিয়ানীতে চুল নিয়ে নিয়ে একটা গা ঘিনঘিন করা ব্যাপার হয়েছিল।”

-“শুধু চুল না, রক্তমাখা চুল…” -ধোঁয়ার রিং ছাড়ার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে বলে অন্বয়।

-“ধুস ? আমার তো মনে হয় বিরিয়ানীর ঘি-মশলা-কেওড়ার জল এসব মিশে…”

-“বেশ, তাহলে বল, তোর মুখ থেকে পেরেক দু’টো বেরোলো কোথা থেকে…”

প্রবাল আবার চুপ করে যায়।

-“ভাই… ভূতের কাজ নাকি এগুলো ?”

-“নাও ইউ আর রিচিং…”

-“রিচিং ? কেন ? ভূত দেখিনি বলে ? তুই তো মানুষের গলা থেকে পেরেকও বেরোতে দেখিসনি… দেখেছিস ?”

সারাদিন অফিসে কাজে মন বসেনি দু’জনের। অন্বয়ই সন্ধ্যেবেলা একরকম জোর করেই দেবেশের চেম্বারে নিয়ে আসে প্রবালকে। কিন্তু দু’জনেই কি করবে কিছু ভেবে পায়নি। আসলে মানুষ কথায় বলে থাকে যে বোঝার বাইরে, বা যুক্তির বাইরে অনেক জিনিস আছে। কিন্তু যেইমাত্র কোনো অযৌক্তিক জিনিস প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়, তখনই সারাজীবন ধরে মাথায় চেপে থাকা জ্ঞানের বোঝা ‘চোখের ভুল বা মনের ভুল’ নামক যুক্তিটি খাড়া করে নিজের কাজ সমাধা হয়ে গেছে মনে করে।

সিগারেট শেষ করে দু’জনে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

সন্ধ্যেবেলা একবার স্নান না করলে তন্দ্রিকার মন ভরে না। ঘুমটারও বেশ সুবিধা হয়। অফিস থেকে ফিরে তাই শাওয়ারটা চালিয়ে সেটা হালকা ধারার নীচে দাঁড়িয়ে থাকাটাই তার জীবনের একমাত্র বিলাসিতা। সেদিনও অফিস থেকে ফিরে তাই করছিল।  মাথার চুলের মধ্যে আঙুল চালাতে চালাতে হঠাৎ নিজের নখের একটা বেয়াড়া খোঁচা খেয়ে বেশ অবাক হয়েই হাতটা সামনে নিয়ে আসে। এই তো ক’দিন আগেই ম্যানিকিওর করেছে; এরকম তো হওয়ার কথা না…

বাঁ হাতটা সামনে আনতেই দেখতে পেল, তর্জনীর নখটা খুব বেয়াড়াভাবে বেঁকে রয়েছে। ধরে একটু সোজা করতে যেতেই সেটা বেমালুম উপড়ে চলে এল তার হাতে। আর কয়েক মূহুর্তের মধ্যেই আঙুলের ডগা থেকে বেরোনো রক্তের ধারায় লাল হয়ে গেল গোটা বাথরুমের মেঝে। প্রচন্ড চিৎকার করতে ইচ্ছে করল তন্দ্রিকার। কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোলো না। কোনরকমে তোয়ালে জড়িয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে সামনে অন্বয়কে দেখেই তাকে জাপটে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল সে।

-“কি হয়েছে ? আরে কাঁদছিস কেন…”

-“আমার নখ… আমার হাতের…”

-“কি হয়েছে তোর হাতের নখের ?”

-“এই দেখ…” -কাঁদতে কাদতেই হাতটা এগিয়ে দেয় তন্দ্রিকা।

-“কি হয়েছে নখে ? দিব্যি তো আছে ?”

Photo by Ekrulila on Pexels.com

এবার আবার নিজের বাঁ হাতের তর্জনীর দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে যায় তন্দ্রিকা। তার হাতের প্রতিটা নখই অক্ষত। অন্বয় কে ছেড়ে দিয়ে এবার আবার বাথরুমে ঢুকে যায়। আর ভেতরের দৃশ্যটা দেখে ছিটকে বেরিয়ে আসে আবার। তার পেছন পেছন অন্বয় প্রবাল আর অজেয়া বাথরুমে উঁকি দেয়। তারা দেখতে পায়, বাথরুমের মেঝেতে জল জমেছে অল্প, জলটার রঙ হালকা গোলাপি। আর জলটা জমার কারণ, ড্রেনের মুখটা ব্লক করে রেখেছে একটা নয়, অনেকগুলো নখ, আর তাল তাল চুল।

“আমি এখানে আর থাকব না…”

কথাটা বলেই তন্দ্রা দৌড়ে তার বেডরুমে গিয়ে ঢোকে। অজেয়ার মুখটা ভয়ে সাদা হয়ে গিয়েছে, অন্বয় আর প্রবালের মুখ থেকেও কোনো কথা বেরোচ্ছে না। তখনই, ওরা শুনতে পায় পায়ের শব্দ। ছাদে পা ফেলে কে বা কারা যেন হেঁটে বেড়াচ্ছে।

-“আমি এখুনি ছাদে উঠব…” এই বলে অন্বয় ঘরের দরজার দিকে এগোয়।

তাকে আটকাবার জন্য পা বাড়ায় প্রবাল। কিন্তু তার আগেই তন্দ্রা তার শোবার ঘর থেকে আর্তনাদ করে ওঠে। তিনজনে আবার সেদিকে ছোটে। ঘরে তন্দ্রা তার মাথার বালিশটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার বালিশের জায়গায়, বিছানার ওপর পড়ে রয়েছে, একদলা কালো চুল। ছাদে তখনো দুপদাপ করে পায়ের শব্দ।

-“প্রবাল, তুই ওদের সঙ্গে থাক, আমি ছাদের চাবি জোগাড় করে আনছি।”

এবার অন্বয় কে বাধা দেওয়ার সাহস বা শক্তিও কারোর নেই। অন্বয় লিফটের তোয়াক্কা না করেই সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে নেমে যায় নিচে। বিল্ডিংয়ের দরজার বাইরে বসে ঢুলতে থাকা দারোয়ানকে একরকম ধাক্কা দিয়েই জাগিয়ে তোলে সে।

-“ছাদের চাবি কোথায় ? দাও…”

-“ছাদের চাবি তো আমার কাছে নেই, স্যার… সকালে যে ডিউটি করে, সে ভুল করে নিয়ে চলে গেছে…”

-“তাকে আজকেই নিয়ে যেতে হল ?”

ছাদের চাবি না পেয়ে আবার ঘরে ফিরে আসে অন্বয়। ঘরের পরিবেশ অত্যন্ত থমথমে। তন্দ্রিকা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। অজেয়ার অবস্থাও তথৈবচ। প্রবাল দুজনকে সাহস বা সান্ত্বনা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। অন্বয় ঘরে ঢুকতেই তন্দ্রিকা প্রায় চিৎকার করে ওঠে।

-“আমি এখানে আর একমূহুর্ত থাকব না… একমুহূর্ত না…”

-“কাম ডাউন… এত রাতে কোথায় যাব…”

-“আমি জানতে চাই না, দরকার হলে ওয়ো বুক কর…”

-“তন্দ্রা, প্লিজ মাথা ঠান্ডা করে আমার কথাটা শোন। আজকের রাতটা কাটাই। কাল সকাল হলে ভাবব… কাউকে একা থাকতে হবে না, আমাদের ঘরের খাটটা বড়, ওখানেই চারজনে শোবো আজকে… চোখ মোছ… প্লিজ…”

তন্দ্রা কোনো কথা না বলে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখ মুছে ফেলে। ছাদে পায়ের শব্দ তখন আর নেই।

-“ছাদের চাবি পেলি না ?” -প্রশ্ন করে প্রবাল।

-“না, সকালের গার্ড নিয়ে চলে গেছে। কাল দেখা যাবে…”

তারপর চারজনে একই ঘরের খাটে গিয়ে শোয়ার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু সে রাতে আলো নেভাতে কেউই রাজি হয় না। একটা ছোট আলো জ্বেলে, খাটে শুয়ে থাকতে থাকতে চোখ বুজতেও ভয় করে সবার। কিন্তু রাতের নিশ্তব্ধতা আর সারাদিনের ক্লান্তি একটু একটু করে চোখের পাতাগুলোকে ভারী করে তোলে। আর একটা খাটে গাদাগাদি করেই ঘুম আসে সকলের।

আগামী পর্বে শেষ হয়ে যাচ্ছে ‘স্তুপ’। নক্সাল আমলের সাথে সত্যিই এই কাহিনীর কোনও যোগাযোগ ছিল কিনা সেটা শেষ পর্বের উপসংহারেই লিখব। তাই আর একটা সপ্তাহের অপেক্ষা। গল্প শেষ হোক, জানান কেমন লাগছে, আর এরপর কি হবে, সেটা না হয় পরেই ভাবা যাবে।

স্তুপ – দ্বিতীয় পর্ব

বিধিসম্মত সতর্কীকরন : গল্পটা একেবারেই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। গল্পের ভাষা অনেকের গাত্রদাহের কারণ হতে পারে, ভাষা নিয়ে ছুৎমার্গ থাকলে পড়বেন না। এ গল্প আপনার জন্য নয় তাহলে।

তিন – পরোয়ানা

শচীন দেয়ালটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। কালচে লাল, কমলা আর গেরুয়ার অদ্ভূত সংমিশ্রনে তৈরী ওই দেয়ালের রঙ। তার ঠিক মাঝে সাদা গোটা গোটা অক্ষরে লেখা “বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস…”। ঠিক চারদিন আগে এই রঙ করাটা শেষ হয়েছে… সমীর একা হাতে করেছে পুরো কাজটা। তাদের দলের সবথেকে কমবয়সী এবং সবথেকে উৎসাহী সদস্য সে। কথায় কথায় ‘চারুদা চারুদা’ করে মাথা খারাপ করে দেয়। কমবয়সে হয়তো শচীনও এরকম ছিল… হ্যাঁ সক্রিয় রাজনীতিতে যোগদান তার বেশীদিনের নয়, কিন্তু নীজের ভেতরের সেই উদ্দীপনাটার অভাব সে বড্ড বোধ করে আজকাল। আর তাই বোধহয় দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে, আজ নিজের আখেরের কথা ভাবতে বাধ্য হচ্ছে সে। তাদের এই ডেরার এগারো জন, যাদের পেছনে আদা-জল খেয়ে লেগে রয়েছে রনদীপ গুহ নিয়োগী। কলকাতার ‘নকশাল দমন বাহিনী’র প্রধাণ। লোকটা ধূর্ত, ক্লান্তিহীন এবং প্রচন্ড নিষ্ঠুর। আসলে নিষ্ঠুর বললে কম বলা হয়। ইংরেজীতে ‘স্যাডিস্টিক’ বলে যে কথাটা আছে, রনদীপ সেটারই প্রতিভূ।

শুধুমাত্র দলের আদর্শ মাথায় তুলে নাচবে, এত ছেলেমানুষও নয় শচীন। আর এখন দলের আদর্শ আর নিজের পিঠ বাঁচানোর মাঝে দাঁড়িয়ে আছে গত সপ্তাহের ঘটনা। শচীনের অভিন্যহৃদয় বন্ধু বিশ্বনাথ। শচীন নিজে যেতে পারেনি, ধরা পড়ার ভয়ে। পরেশ কাঁপতে কাঁপতে এসে যেটা বলেছিল, সেটা হজম করা শচীনের পক্ষেও অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বিশ্বনাথের লাশের পোস্ট মর্টেম হয়েছিল কিনা জানে না, কিন্তু হয়ে থাকলে সেটার রিপোর্ট-এ লেখা থাকত পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করে মারার আগে ভিক্টিমের দু’হাতের প্রতিটা নখ উপড়ে ফেলা হয়েছে, পায়ের আঙুলের প্রতিটা গাঁটে পোঁতা হয়েছে পেরেক। পিঠের চামড়া অনেকটাই ছাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে…

সবটা বলতেই পারেনি পরেশ; হড় হড় করে বমি করে ফেলেছে…

রাতে আজকাল আর ঘুম হয়না শচীনের। এক আধবার চোখটা লেগে গেলে একটা বীভৎস মুখ দেখে ঘুম ভেঙে যায়। বিশুর মুখ। ছোটবেলার বন্ধুকে বাঁচাতে পারেনি বলেই কি… কিন্তু না… তাকে বাঁচানোর দায়িত্ব তো কখনো নেয়নি শচীন; শুধু তাকে কেন, দলের কারোর সুরক্ষার দায়িত্বই সে নেয়নি। সবাই জানে, কি কি বিপদ আসতে পারে, শাসকদলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনে নামলে। শুধু বিশ্বনাথের মৃত্যু তাকে মনে করে দিয়েছে সেই বীভৎসার কথা, যেটা শুধু কথায় শুনে এসেছে এতদিন। বিশুর সাথে যা হয়েছে, সেটা তার সাথেও হতে পারে। দলের যে কোনো ছেলের সাথেই হতে পারে। আর হলে কারোরই কিছু করার থাকবে না। এসব নিয়েই ভাবছিল সে, এমন সময় পরিমল এগিয়ে এসে, পেছন থেকে ডাকে।

-“কি ভাবছ, শচীন দা ?”

-“কিছু না রে… চিন্তা হচ্ছে… সবার জন্য…”

-“চিন্তা করে কি হবে, কমরেড ? সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কি ভয়…”

হেসে ফেলে শচীন। পরিমল আর সমীর এই ডেরার কনিষ্ঠতম দুই সদস্য, তাই দু’জনের এই একটা ব্যাপারে বেজায় মিল।

-“বাকিরা সব কি করছে ? সমীর কই, ওকে তো দেখছি না ?”

এবার একটু আমতা আমতা করে পরিমল…

-“বাকি সবাই ঠিকই আছে, সমীর…”

ভুরু কুঁচকে যায় শচীনের।

-“সমীরের কি হল আবার ?”

-“না, কিছু হয়নি, ও বাড়ি গেছে…”

এবার আকাশ থেকে পড়ার উপক্রম হল শচীনের।

-“বাড়ি গেছে মানে ? ও জানে না, ওর বাড়িতে পুলিশ নজর রাখছে ? কে যেতে দিল ওকে ? কেন গেল ?”

-“আসলে দাদা, ওর বাড়ীর কাজের লোকের সাথে নাকি বাজারে দেখা হয়েছিল, সে বলল, ওর মায়ের খুব শরীর খারাপ, তুমি ছিলে না তখন, ও বাড়ি এসে আমাকে বলতে… আমি বারণ করেছিলাম, শুনল না। মা এর ব্যাপার, তাই আমি আর বেশী কিছু বলতে পারিনি…”

-“তুই কি পাগল ? তুই জানিস, বাড়ির কাজের লোকগুলোকে হাত করা কত সহজ ? আর এভাবে পুলিস গোটা শহরে কত খোচড় ছড়িয়ে রেখেছে ?”

পরিমল চুপ করে থাকে। তার দুটো কাঁধ চেপে ধরে জোরে একটা ঝাঁকানি দিয়ে বেশ কড়া সুরে বলে ওঠে শচীন।

-“বিশুর কথা ভুলে গেলি ? ভুলে গেলি ? যদি গুহ নিয়োগীর হাতে পড়ে, তাহলে সেই থার্ড ডিগ্রী সহ্য করার ক্ষমতা ওর আছে বলে তোর মনে হয় ? আমাদের আর লুকোবার জায়গা নেই, জানিস তো সেটা ?”

পরিমল মুখ খোলে,

-“না, না, দলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার মত ছেলে সমীর নয়…”

শচীন বিরক্ত মুখে মৃদু ধাক্কা দিয়ে পরিমলের কাঁধ ছেড়ে দেয়, তারপর প্রায় চিৎকার করে ওঠে।

-“ওই কশাইটা যখন হাতের নখ ওপরাবে আর পিঠের ছাল ছাড়িয়ে নেবে, তখন কোথায় দল থাকে, আমিও দেখব… সবাইকে ডাক, খবর জোগাড় করতে হবে।”    

সবাইকে ডাকার পর, পরিমল একটু অপরাধী অপরাধী মুখ করে বলে উঠল,

-“আমি কি একবার ওর বাড়ি গিয়ে দেখব ?”

সে কথার উত্তরে শচীন বলে ওঠে

-“ওর মত মরার ইচ্ছে আর কার কার হয়েছে এখনি বলে ফেল…”

কেউ তার উত্তরে মুখ খোলে না। শচীন আবার বলতে শুরু করে…

-“আর আধঘন্টার মধ্যে সমীর না ফিরলে, সবাই একসাথে বেরোবো… পরেশ, তুই ডেরার আশেপাশেই ঘোরাফেরা করবি, নজর রাখবি, আমরা কাল সকালে ঠিক সাতটার সময় ফিরব মাঠের পাশের বটগাছের নিচে। যদি ডেরায় পুলিস তার আগে এসে থাকে, তাহলে তুই গাছের গায়ে একটা সাদা রঙের ঢ্যাড়া দিয়ে রাখবি।“

এই বলে পরেশের দিকে একটা সাদা বড় চকের মত জিনিস ছুঁড়ে দিল শচীন।

-“কিন্তু শচীনদা, সারারাত আমরা কোথায় থাকব ? মানে কোথায় গা ঢাকা দেব ?”

দু’এক মূহুর্ত চুপ করে থেকে আবার মুখ খোলে শচীন;

-“যে যার নিজের দায়িত্বে। এ ডেরাটা কম্প্রোমাইজড হলে, একসাথে পালাবার কোনো জায়গাই থাকবে না আর। আজ রাতে যদি এ ডেরার হদিস কেউ না পায়, তাহলে কাল একজোট হয়ে চিন্তা করা যাবে, কিন্তু আজ রাত, নিজের প্রাণ নিজে বাঁচাও।”

কথাটা শেষ হলে ঘরের মধ্যে একটা বিষণ্ণ স্তব্ধতার ছায়া নেমে আসে। সবাই এর ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে, তারপর জিনিসপত্র গুছোনোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

ছবিস্বত্ব – SVF

চার – চোখের ভুল ?

-“সিরিয়াসলি তন্দ্রা ? আমি কাল সকালে বেসিনটা পরিস্কার করলাম, তুই এর মধ্যেই আবার এখানে আবার একগাদা চুল ফেলেছিস ?”

বেশ রেগেই বলে ওঠে অন্বয়। গত চারদিনে এটা তৃতীয়বার। সিঙ্ক এ একতাল দলা পাকানো কালো চুল, চটচটে কিছু একটা লেগে আছে তাতে। তন্দ্রার রোজ চুলে তেল না দিলে হয় না, আর তাই চটচটে ব্যাপারটা যে তন্দ্রার স্পেশ্যাল হার্বাল তেলের, সেটা অনুমান করে অন্বয়। তার কথা শুনে তন্দ্রা বাথরুম-এ ঢুকে সিঙ্কের চুলের গোছার দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে, বেশ রাগত স্বরে বলে ওঠে তন্দ্রা;

-“আকাঠের মত কথা বলছিস কেন ? আমার মাথার চুলগুলো কি অতটা ছোট ? পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে কোনো ছেলের চুল…”

-“হ্যাঁ, নিশ্চয় প্রবাল মাথায় তেল মেখে এখানে চুল ফেলে গেছে।”

তন্দ্রা কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। অন্বয় আক্ষেপের সাথে মাথা নাড়তে নাড়তে চুলের গোছাটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে হাত ধোবার জন্য সাবানের দিকে হাত বাড়ায়। আর তখনই প্রথম ব্যাপারটা লক্ষ্য করে। চুলের মধ্যে লেগে থাকা চটচটে পদার্থটার রঙ, লাল… এর আগের দু’বার ব্যাপারটা খেয়াল করে দেখেনি, কিন্তু এবার ভালো করে হাতটার দিকে দেখে কি মনে হতে একবার হাতটা নাকের কাছে নিয়ে এসে শোঁকে।  গন্ধটা খুব চেনা, তবে তেলের নয়; তন্দ্রার মাথার তেলের গন্ধ সে চেনে, আর সেটা মোটেই লাল রঙের নয়। গন্ধটা রক্তের। অন্তত তাই মনে হল তার। এক মূহুর্ত থমকে তারপর নিজেকেই ধমক দেয় মনে মনে; কি সব আবোল-তাবোল ভাবছে ? আর না ভেবে সাবান দিয়ে হাতটা ধুয়ে ফেলে অন্বয়। ডেটলের কড়া গন্ধ নিমেষেই ঢেকে দেয় নাকে লেগে থাকা অস্বস্তিকর গন্ধটাকে।

নতুন বাসস্থানে শিফট করার পর থেকে, একদিনও একসাথে আড্ডা জমানোর সময় পায়নি চারজনে, প্রবালের অফিসের চাপ বেড়েছিল মারাত্মক, সে একদিন তো বাড়িই ফেরেনি এত দেরী হয়েছিল। অজেয়ার কাজ কল সেন্টারে, তার কপালেও পর পর নাইট শিফট জুটেছিল।  অফিস থেকে ফিরে দুটো চাল-ডাল ফুটিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে অন্বয়-তন্দ্রা। তাই শেষমেষ আজ তাদের বহুপ্রতিক্ষীত ‘হাউসওয়ার্মিং পার্টি’। প্রবাল জমজম থেকে প্রসিদ্ধ বিফ বিরিয়ানী নিয়ে এসেছে, অফিসের কাজে সল্টলেক গেছিল বলে অন্বয় করিমস-এর গালাওঠি কাবাব। আরো বিবিধ খাদ্যদ্রব্যের সমাহার আজকের নৈশাহারে।

কলিংবেলের শব্দ পেয়ে দরজা খুলতে অজেয়া ঢুকে আসে, তার হাতে একটা রেড ওয়াইনের বোতল।

-“সরি সরি সরি, ভেরী সরি… কাউন্টার থেকে এটা তুলতে লেট হয়ে গেল।”

প্রবাল টেবল সাজাচ্ছিল, অজেয়া টেবলে বোতলটা বসিয়ে একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ে।

-“আপাতত এক মাসের জন্য কোনো নাইট ডিউটি নেই, ওফফফ, রাতে না ঘুমোনোটা জাস্ট নিতে পারি না…”

তন্দ্রা তার কথায় সায় দেয় আর অন্বয় তন্দ্রিকার ঘুমের বহর নিয়ে রসিকতা করা শুরু করে, প্রবালও তার সাথে যোগ দেয়। তাদের কথার মাঝখানেই, মৃদু ক্যাঁচ শব্দে রান্নাঘরের দরজাটা খুলে যায়। চারজনেই চমকে সেইদিকে তাকায়। রান্নাঘরের ভেতরে জমাট বাঁধা অন্ধকার। একটিমাত্র জানলা দিয়ে আবছা আলো এসে পড়েছে ভেতরে। সেই আলোয় রান্নাঘরের বাসনপত্রের, গ্যাস স্টোভের একটা আবছায়া আন্দাজ পাওয়া যাচ্ছিল। একটা ঘরের দরজা, সেটা আপনি আপনি খুলে যেতেই পারে, কিন্তু তারপরই ভেতর থেকে আসা ‘ঝণাৎ’ শব্দটা কাকতালীয় বলে মনে করতে অনেকেরই বাধে। অজেয়া সেই শব্দ শুনে মুখে একটা ‘আউচ’ শব্দ করে শিউড়ে উঠল। অন্বয় বিনা বাক্যব্যায়ে রান্নাঘরে আলো জ্বালিয়ে ঢুকে দেখল, মেঝেতে কিছু বাসনপত্র ছড়ানো। সেগুলো কুড়িয়ে রেখে বিরক্ত মুখে রান্নাঘরের আলো নিভিয়ে বেড়িয়ে বলল,

-“প্রবাল, এবার তোর নামের প্রথম অক্ষরটা কেটে দেব আমি। গাড়োল, বাসনগুলো ধুয়ে, অত ধারে কেউ রাখে ? সব পড়ল দুম দাম করে… আর মাইয়াগুলা ভাবসে ঘরে ভূত আইল বুজি…”

প্রবাল কিছু বলার আগেই তন্দ্রা রেগে মেগে বলল,

-“আমি মোটেও ভয় পাইনি… যত্তসব…”

-“ওই দেখো… আমি ভয় পাওয়ার কথা কখন বললাম ? আমি তো শুধু ভূত আসার কথা বললাম। ভয় পাওয়ার কথা তো তুই তুললি ?”

তন্দ্রিকা আবার রেগে মেগে কিছু বলতে যায়, কিন্তু প্রবাল তাদের থামিয়ে দিয়ে বলে…

-“ওকে ওকে ওকে ওকে… নো মোর চুদুরবুদুর… লেটস ইট।”

সবাই গুছিয়ে খেতে বসে, খাওয়া এবং আড্ডা চলতে থাকে। অফিস, সিনেমা, রাজনীতি সব নিয়ে কথা চলতে চলতে, হঠাৎই প্রবাল বলে ওঠে,

-“ভাই, আমি কিন্তু বাসনগুলো অতধারেও রাখিনি যে সব দুমদাম করে পড়ে যাবে।“

-“তাহলে বেড়াল-ফেরাল ঢুকেছিল হয়তো… মানে ‘ফেরাল বেড়াল’…”

-“পাঁচতলায় বেড়াল ?”

-“আরে বাবা বেড়াল তো, কুকুর তো নয়, ওদের সর্বত্র গতি।”

অন্বয় এ কথার কোনো উত্তর দেয় না, চুপচাপ ওয়াইনে একটা ছোট্ট চুমুক লাগায়। টেবলে তখনো একটা আস্ত বিরিয়ানীর প্যাকেট উন্মুক্ত এবং অভূক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। হঠাৎ প্রবাল সেটা দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলে, আর বাঁহাতের দুটো আঙুল বিরিয়ানীর দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে ভাতের মাঝখান থেকে বের করে আনে একগোছা চুল।

Photo by lalesh aldarwish on Pexels.com

সেটা দেখে অন্বয় প্রায় স্প্রিংয়ের পুতুলের মতো লাফিয়ে ওঠে। ভিজে চুলের গোছা থেকে টপটপ করে যে লাল তরলটা ঝড়ে পড়ছে, সেটা কি ? রক্ত ?

অজেয়া আর তন্দ্রিকা প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে… অজেয়া একবার ওয়াকও করে। প্রবাল দ্রুত ঝেড়ে ফেলে হাতটা, আর বাথরুমে দৌড়োয়, হাতটা ধুয়ে ফেলতে। অন্বয় কোনরকমে ঠান্ডা করার চেষ্টা করে তন্দ্রা আর অজেয়াকে। অজেয়া চোখ বড় বড় করে বার বার একই কথা বলতে থাকে;

-“বাকি বিরিয়ানীতেও কি ছিল ? মানে আমাদের পেটে…”

তাকে একটু ধমক দিয়ে বলে অন্বয়,

-“কি আবোল তাবোল বকছিস ? না বুঝে চুল খেয়ে ফেলবি ?”

-“তুই প্লিজ আর মনে করাস না…” তন্দ্রা প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলে ওঠে।

-“আচ্ছা, আচ্ছা, চিল… চাপ নিস না… আমি ফেলে দিচ্ছি এটা…”

বিরিয়ানীর প্যাকেটটা হাতে করে ফেলতে গিয়ে অন্বয়ের মনে হল, ‘আবার চুল ?’ কিন্তু বিরিয়ানীতে চুল কোথা থেকে এল ? প্যাকেটটা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার পরই সে শুনতে পেল, বাথরুম থেকে খুব বিচ্ছিরি ভাবে কাশছে প্রবাল। ওরও বোধহয় ঘেন্নায় গা গুলোচ্ছে। তাড়াতাড়ি সে ছুটে বাথরুমে যায়, আর বেসিনে মুখ নামিয়ে যক্ষা রোগীর মত কাশতে থাকা প্রবালকে পিঠে হাত দিয়ে চাপড়াতে চাপড়াতে বলে,

-“আরে ইয়ার… ডোন্ট প্যানিক… কিচ্ছু যায়নি পেটে।”

কাশতে কাশতে থুঃ করে এবার মুখ তোলে প্রবাল। কেশে কেশে চোখদুটো লাল, চোখে জল, আর সারা মুখে আতঙ্কের চিহ্ন।

-“রিল্যাক্স, চোখে মুখে জল দে…” প্রবাল কথা উত্তর না দিয়ে শুধু আঙুল দিয়ে বেসিনের দিকে নির্দেশ করে। অন্বয় মুখ বাড়িয়ে বেসিনের দিকে দেখে। বেসিনে পড়ে রয়েছে একদলা রক্ত। আর সেই রক্তে মাখামাখি অবস্থায় দুটো লোহার পেরেক।

একটা প্রশ্ন রইল… যদি কোনোদিন কাশির সাথে দুটো পেরেক বেড়িয়ে আসে, ঠিক তার পরের কাজটা কি করবেন ?

স্তুপ – প্রথম পর্ব

Somewhere in the Jungle of North Bengal শেষ হওয়ার পরে, বেশ দ্বন্দে পড়ে গেছিলাম। আবার গল্পই লিখব, নাকি অন্য কিছু। এখন অন্য কিছু লেখার বিষয়ে তো চারদিক ভর্তি, এবং সে নিয়ে এন্তার লিখে গেছি বহুদিন ধরে। কিন্তু সত্যি করে মৈনাকদের জঙ্গল সফরের পড়, এই ব্লগে আর গল্প ছাড়া কিছু লিখতে আপাতত ইচ্ছে করছে না। তাই আজ শুরু হল অপ ঘটনা সিরিজের তৃতীয় গল্প, ‘স্তুপ’। এটাও বাস্তব ঘটনার ভিত্তিতেই লেখা, কিন্তু অবশ্যই নাম উহ্য রেখে। তবে কয়েকটি চরিত্রের নাম পরিবর্তন করলেও, মনোযোগী পাঠকদের তাদের চিনতে অসুবিধা হবে বলে মনে হয় না। যাই হোক; গৌরচন্দ্রিকা ঠিক গল্পের আগে মানায় না। আসুন, শুরু করা যাক।

বিধিসম্মত সতর্কীকরন : গল্পটা একেবারেই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। গল্পের ভাষা অনেকের গাত্রদাহের কারণ হতে পারে, ভাষা নিয়ে ছুৎমার্গ থাকলে পড়বেন না। এ গল্প আপনার জন্য নয় তাহলে।

এক – গোড়ার কথা

-“বল, কোথায় পাবো বাকীগুলোকে ?”

-“জানিনা স্যার, সত্যি বলছি…”

একটা কঠিন, তামাকের কড়া গন্ধ মাখা হাত সপাটে আছড়ে পড়ল সমীরের গালে। কয়েক মূহুর্ত চোখে অন্ধকার দেখার পর আবার সামনের লোকটার দিকে তাকাল সে। মুখটা খোলার সময় বুঝল, বিরাশি সিক্কার ওই চড়ে তার ওপরের পাটির সামনের দাঁত গিঁথে গেছে নীচের ঠোঁটের মধ্যে। মুখটা খোলার সঙ্গে সঙ্গে একটা অস্ফুট আর্তনাদের সাথে সাথে একটা তাজা রক্তের ধারা নেমে এল নীচের ঠোঁট বেয়ে।

-“শেষবার জিজ্ঞাসা করছি… না বললে ফল কি হবে বুঝতেই পারছিস…”

হাঁটুতে ভর দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে সমীর কে… গায়ে একটুকরো কাপড় নেই, হাতদুটো পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা, আর সেই দড়িটা পেছনের দেয়ালে আটকানো। জেরার আগের তিন ঘন্টা হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে বসে থেকে, পা দুটো প্রায় অকেজো, তার ওপর গালে চোয়ালে ব্যাথা, আর নীচের ঠোঁটটা জ্বলছে হু হু করে। তাই এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেওয়ার মত অবস্থায় নেই সমীর। কিন্তু এই নীরবতার ফল হল মারাত্মক। সামনের লোকটা একমুঠো নুন নিয়ে ছুঁড়ে মারল তার মুখে। নুনের দানা ঢুকে গেল তার চোখে, নাকে, খোলা মুখে। মনে হল ঠোঁটের কাটা জায়গাটায় কে যেন আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। অসহ্য যন্ত্রনায় চিৎকার করে ছটফট করে ওঠে সমীর। লোকটা শক্ত হাতে তার চুলের মুঠিটা ধরে, তারপর আবার বলে ওঠে;

-“এখনো বলছি, ভালোয় ভালোয় বলে দে… ছেড়ে দেব… আমাকে রাগালে কিন্তু, তোর লাশটা কুকুরেও খাবে না এমন অবস্থা করব।”

নুনের প্রভাবে সমীরের চোখদুটো প্রায় অন্ধ, সামনে কিছু দেখতেও পাচ্ছে না। চোখের জলটা কান্না, নাকি চোখ জ্বলার প্রতিক্রিয়া, নিজেও জানে না সে। এভাবে যে ধরা পড়বে, সেটা ভাবেনি কখনো। আর ধরা পড়ার পরের অবস্থাটা যে এরকম ভয়াল হবে, সেটা আন্দাজও করতে পারনি; অন্যদের মুখে শুনেছিল, তিন সপ্তাহ আগে যখন শ্রদ্ধানন্দ পার্কের ধারে বিশুদা, মানে বিশ্বনাথের লাশ পাওয়া যায়, তার হাতের আঙুলে নাকি একটাও নখ ছিল না। গায়ে অসংখ্যা কাটার দাগ, আর শরীরের অংশের অংশের চামড়া নেই। সে লাশ চোখে দেখেনি সমীর, ভেবেছিল হয়তো সবাই বাড়িয়ে বলছে। শপথ নিয়েছিল দলের প্রতি, দলের আদর্শের প্রতি আমরণ একনিষ্ঠতা বজায় রাখার; কিন্তু ঝাপসা চোখে মৃত্যুকে দেখতে না পারলেও, তার স্বাদ এবং গন্ধ সমীরকে ভেতর থেকে একটু একটু করে ভেঙে দিচ্ছে। আমরণ কথাটা বড্ড বড় মনে হচ্ছে তার।

ছেড়ে দেবে ? বলে দিলে সত্যি করে ছেড়ে দেবে ?

সমীরের চিন্তার মায়াজাল ছিঁড়ে যায় চুলের একটা দৃঢ় ঝাঁকুনিতে…

-“কি রে হারামজাদা, বলবি ?”

Photo by NEOSiAM 2020 on Pexels.com

কি একটা বলার চেষ্টা করে সমীর, মুখ দিয়ে মৃদু চিঁচিঁ ছাড়া আর কিছু বেড়োয় না। লোকটা অন্যহাতের বুড়ো আঙুলের নখটা বসিয়ে দেয় ঠোঁটের কাটাটার ওপর। একটা জান্তব চিৎকার করে ওঠে সমীর;

-“বলছি ! বলছি…”

লোকটা ঠোঁট থেকে নখটা সরায়, কিন্তু চুলের মুঠিটা ছাড়ে না।

-“গুড বয়… বলে ফেল…”

-“……………”

উত্তরটা শুনে মুখে একটা আওয়াজ করে লোকটা বলে ওঠে;

-“ওঠ খোকা, তোমার বন্ধুদের সাথে একটু দেখা করে আসি; সবক’টাকে হাতে পেলে তোমার ছুটি… এই হরিশ… একে খুলে দাও”

দড়ির বাঁধনটা মুক্ত হলেই, মুখ থুবড়ে মাটিতে কাটা কলাগাছের মত লুটিয়ে পড়ে সমীর। কেউ একটা তার মাজায় সজোরে লাথি কশায়…

-“ওঠ শুয়ারের বাচ্চা… শালা এই ননীর শরীর নিয়ে খানকির ছেলে নাকি বিপ্লব করবে।”

ওঠার চেষ্টা করে সমীর; কিন্তু গোটা গায়ে অসহ্য যন্ত্রণা। একটা হাত তার চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে মেঝে দিয়ে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়তে নিয়ে গিয়ে বাইরের রাস্তায় ফেলে দেয়, তারপর কেউ তাকে একটা জীপের পেছনে তোলে। তারপরই তার গলা চেপে ধরে একটা ভারী বুট।

-”শোন বাঞ্চোদ, যদি ঠিকানা ভুল বেরোয়, জ্যান্ত পুঁতে দেব, শালা… দেখব তোর বাপ চারু কি করে তোকে বাঁচায়।”

কর্কশ শব্দ তুলে জীপটা রওনা দেয়। জীপের পাদানিতে পড়ে থাকা উলঙ্গ একটা শরীর প্রচন্ড ব্যাথায় ধীরে ধীরে জ্ঞান হারাতে থাকে। পঞ্চ-ইন্দ্রীয় তার কাজে অব্যাহতি চাইছে। সে কি ঠিক করল ? কিছু ভাবারও যেন শক্তি পাচ্ছে না সমীর। সামনে আবছায়ার মত মায়ের মুখটা ভেসে উঠছে বার বার। শেষ কবে বাড়ি ফিরেছিল, মনে পরছে না তার। মায়ের হাতের রান্না… কলেজ থেকে ফিরে একটু কোলে মাথা রেখে শোয়া… বা একটু বৌদির সঙ্গে খুনসুটি… এগুলো যেন বড্ড অলীক স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে আজ। ছেড়ে দেবে তো ? নাকি তার অবস্থাও বিশ্বনাথের মত হবে? এবার কান্না পায় সমীরের আর মুখ থেকে একটা হালকা গোঙানির মত শব্দ বেড়িয়ে আসে। আর সেই অপরাধেই, চোয়ালে এসে জমা বুটের লাথিটা তার চেতনার ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকা প্রদীপটাকে নিভিয়ে দেয়।

দুই – বাসস্থান

অন্বয় ফ্ল্যাটের দরজাটা খুলে ভেতরে পা রাখে। সদ্য রং করা ফ্ল্যাটের দেওয়াল থেকে একটা রাসায়নিক গন্ধ তার নাকে ধাক্কা মারে আর বড় বড় জানলা থেকে আসা আলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য ধাঁধিয়ে দেয় চোখ। তারপরই ফ্ল্যাটের চেহারাটা নজরে পড়ে তার। দরজা দিয়ে ঢুকলেই একটা প্রশস্ত ড্রয়িং/ডাইনিং স্পেশ, তার ডানহাতের দেয়ালে দুটো দরজা, বাঁহাতের দেয়ালে একটা। দরজার বাঁদিকে একটা দেয়াল ইংরেজী ‘এল’ অক্ষরের মত বেরিয়ে এসেছে ভেতরে ঢোকার পর বোঝা গেল সেটা স্নানঘরের উপদৃদ্ধি।

ডানদিকের দেওয়ালের প্রথম দরজাটা রান্নাঘরের এবং দ্বিতীয়টি একটি বেডরুমের। দুটো বেডরুমের দরজা মুখোমুখি, এবং আকারে দুটোই সমান, এবং বেশ বড়।

-“আসলে আমরা চারজন থাকব তো, তাই আর একটা দিন সবাই মিলে দেখে নিলে ভালো হত…”

সাফারি স্যুট পড়া এবং মুখে সর্বদা বিড়ি ধরে থাকা লোকটি মুখটা কাঁচুমাচু করার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল,

-“সে কি করে হবে স্যার… আর এক পার্টি তো অ্যাডভান্স দেওয়ার জন্য একেবারে মুখিয়ে আছে… এখন আপনি আজ ফাইনাল না করলে আমি তো ফেঁসে যাব।“

-“না, বুঝতে পেরেছি কিন্তু একাই সব ডিসিশন নিয়ে নেব ? তাই ভাবছি…”

-“স্যার, আপনার সাথে আমার একটা বিশেষ সম্পর্ক বলেই আপনাকে এই ভাড়ায় করে দিচ্ছি… আর এক পার্টির কথা তো মালিক জানে না… সে তো যা ভাড়া বললাম, তাতেই রাজি হয়ে গেল।“

হ্যাঁ, খুব নিকট সম্পর্ক… আমার মেলায় হারিয়ে যাওয়া ভাই তুমি। মনে মনে কথাটা বলতে বলতে ফোনটায় তন্দ্রিকার নম্বর ডায়াল করল সে।

-“হ্যালো ! বল…”

-“বলছি, তোর কাজের চাপ কিরকম ?”

-“প্রচন্ড… ফেটে গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া হয়ে যাচ্ছে…”

-“ও… কে… আসলে একটা ফ্ল্যাট দেখতে এসেছিলাম…”

-“হ্যাঁ, তো পরশু শনিবার, ওইদিন চারজনে দেখে ফাইনাল করি…”

-“সেটাই তো প্রবলেম… যে দালাল নিয়ে এসেছে, সে বলছে অন্য লোক ঝোলাঝুলি করছে।“

-“ওরকম সবাই বলে…”

-“জানি, কিন্তু এই ফ্ল্যাটের চেহারা আর ভাড়াটা খুব স্পট অন…”

-“টু বিএইচকে ?”

-“হ্যাঁ… একটা অ্যাটাচড বাথ, একটা কমন…”

-“আলো হাওয়া ? সে সব…”

-“দেখ, নতুন রঙ করা আনফারনিশড ফ্ল্যাট… আলো তো প্রচুর দেখছি…”

-“আর ডিপোসিট ? ভাড়া ?”

-“ডিপোসিট ৭০,  ভাড়া ২০, আর এনার দালালি ২৫ চাইছে।”

-“চাকরি ছেড়ে এবার দালালীই করতে হবে মনে হচ্ছে…”

অন্বয় হেসে ফেলে… একটু হেসে বলে,

-“তাহলে কি করব বল ?”

-“একবার প্রবাল আর অজেয়ার সাথেও কথা বলে নে… ওরা গ্রীন লাইট দিলে গো ফর ইট… আর আমাকে কটা ছবি তুলে হোয়াটস্যাপ কর।”

আরও আধঘন্টা ফোনে প্রবাল এবং অজেয়াকে নিয়ে মৌখিক কুস্তি চলল, একজনকে ভিডিও কল করে, আর একজনকে ছবি পাঠানোর পর এই ফ্ল্যাটটা নেওয়াই সাব্যস্ত হল। দালালের সাথে রফা করার পর, ফ্ল্যাট থেকে বেরোবার আগে একবার প্রতিটা ঘরই ভালো করে দেখল অন্বয়। সবই ঠিক আছে, সদ্য রঙ করা হলেও, একবার ভালো করে পরিস্কার না করে বসবাস করা যাবে না। রান্নাঘরের সিঙ্ক-এ একগাদা দলাপাকানো চুল ভর্তি। শিফট করার আগে লোক ডেকে ভালো করে গোটা ফ্ল্যাটটাই ধোয়ামোছা করাতে হবে।  

Photo by Athena on Pexels.com

পাঁচতলায় ফ্ল্যাট, লিফট আছে। জায়গাটা একটা কমপ্লেক্স মত। একই রকম দেখতে তিনখানা ফ্ল্যাটবাড়ি পাশাপাশি, ভেতরে গাড়ি রাখার জায়গা, একটা খেলার মাঠ আর ছোট একটা বাগান। কমপ্লেক্স থেকে বেড়িয়ে একটু হেঁটে গেলেই যশোর রোড; তবে একটু ভেতরে হওয়ার দরুন গাড়ির শব্দ তেমন একটা ঢোকে না ভেতরে। একটা চায়ের দোকান দেখে একটা সিগারেট ধরাল অন্বয়। রোজ রোজ সেই হালীশহর থেকে যাতায়াত করাটা একটা বিড়ম্বণা হয়ে উঠেছিলা তার পক্ষে। তন্দ্রা, মানে তন্দ্রিকাও বাড়ি ছেড়ে বেড়োতে পারলে বাঁচে। আর প্রবাল তো পিজি থেকেই অফিস করছিল কয়েকদিন ধরে। কপাল তার এমনই খারাপ, দু’টো গামবাটের সাথে রুম শেয়ার করতে হয়েছে, ফলে শখের গান-গিটার একেবারেই বন্ধ। অজেয়াও ‘লিভ-টুগেদার’-এর কথা নিয়ে তার মাথা খাচ্ছিল। কিন্তু আলাদা ফ্ল্যাটে থাকতে গেলে যে খরচ, তার চেয়ে একটু ত্যাগস্বীকার করে চারজনের একটা যৌথ সংসার পাতার কথাটাই সাব্যস্ত করে সবাই। কিন্তু এ তল্লাটে ফ্ল্যাট খুঁজে পাওয়াই দুস্কর হয়ে উঠেছিল। অতিকষ্টে এই ফ্ল্যাটটা পেয়ে মনে মনে বেশ খুশি অন্বয়। আশা করছে বাকীদেরও পচ্ছন্দ হবে।

সিগারেটটা শেষ করে সে অফিসের পথে হাঁটা লাগায়। তার হাফবেলার ছুটি শেষ হতে চলল বলে। বসের গালাগাল খেয়ে দিন শেষ করার ইচ্ছা তার বিন্দুমাত্র নেই।

শনিবার প্রবাল বাদে বাকি তিনজনেরই ছুটি থাকে, তাই সে একটা দিন ম্যানেজ করে, ঘর গোছানোর কাজ ওইদিন থেকেই শুরু করে দেয়। আগের বাসাগুলো থেকে কিছু জিনিস নিয়ে আসে, আর কিছু জিনিস কিনতে হয়। অন্বয় একটা লোককে জোগাড় করে আনে যে বাথরুম, কিচেন ধুয়ে গোটা ফ্ল্যাটটা ঝাড় দিয়ে মুছে দেয়। খাট বিছানা পেতে, জামাকাপড়, রান্নার সরঞ্জাম গুছোতে গুছোতে প্রায় সন্ধ্যে হয়ে যায়। খেয়ে দেয়ে, সারাদিনের খাটাখাটনির পর বিছানায় শুয়ে চারজনেই কখন ঘুমিয়ে পড়ে খেয়াল থাকে না।

রবিবার সকালটা চাকুরীজীবীদের কাছে বিলাসিতার দিন, অন্বয়ের ঘুম ভাঙল তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। পাশে তন্দ্রিকা তখনো তন্দ্রাচ্ছন্ন। এরকম সার্থকনামা মেয়ে জীবনে দেখেনি অন্বয়। মাঝে মাঝে এই নিয়ে অনেক রসিকতাও তারা করে থাকে। যাইহোক, ঘুমন্ত তন্দ্রিকার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে হাই তুলতে তুলতে ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে অন্বয়। ড্রয়িং-এ বেড়িয়ে এসেই তার ভ্রু কুঁচকে যায়। ঘরের মেঝের ঠিক মাঝখানে পড়ে রয়েছে একতাল কালো চুল। কাল অত ভালো করে গোটা ঘর পরিস্কার করার পর চুল কোথা থেকে এল ? কেউ চুল আঁচড়ে ফেলেছে ? বিরক্ত মুখে হাতে করে দলাপাকানো চুলটা মেঝে থেকে তুলতে গিয়ে সে দেখল, একটা চটচটে আঠালো জিনিস সেটার মধ্যে লেগে আছে। ডাস্টবিনে জমা করার পর, আর সেটা নিয়ে ভাবে না অন্বয়। নতুন বাড়ি, নতুন জায়গা, সেখানে চোখের আড়ালে কিছু ময়লা থেকে যেতেই পারে; হয়তো ছুঁচো বা ইঁদুরে এনে ফেলেছে। এবার প্রবাল আর অজেয়ার ঘরের দরজায় টোকা মারে সে…

কেমন লাগছে ? এ গল্পের সাথে আগের গল্পের কোনও মিল পাবেন না… সত্য ঘটনা বলেই পাবেন না…

Somewhere In the Jungle of North Bengal… Appendix

গল্পটা এখানেই শেষ করা যেত, আর কিছু না বলেই। কিন্তু তবু মনে হল, সুযোগ যখন আছে, কয়েকটা কথা বলেই যাই।

জয়ন্তী

এই গল্পটা আমি শুনেছিলাম… না… নাম বলব না। শুনেছিলাম মৈনাকদের মধ্যেই কারোর কাছে। সবারই নাম পরিবর্তন করা হয়েছে গল্পে। যারা উত্তরবঙ্গে আমার চেয়ে অনেক বেশী ঘুরেছেন, তাদের মনে হতে পারে আমার ভূগোলের জ্ঞান বড়ই কম; কিন্তু ভুলে যাবেন না, আমার লেখার নাম “Somewhere in the Jungle of North Bengal”। বেশীরভাগ জায়গাতেই আমি আসল স্পটের নাম ব্যবহার করলেও, একটু ইচ্ছে করেই কিছু এদিক ওদিক করা আছে; লেপার্ডস নেস্ট-এর ‘রহস্য’ অটূট রাখার জন্য।

বক্সা ফোর্ট

মৈনাকদের অভিজ্ঞতার সাথে সাথে আমার নিজের বারদুয়েক নর্থ বেঙ্গল যাওয়ার ঘটনা মিশিয়েই গল্পের পরিবেশ তৈরী করেছি। আর মৈণাকদের দলটা গেছিল ওঁরাওদের স্টাডী করতে; এবং সেই তথ্যের যৎকিঞ্চিত আমি ব্যবহার করেছি এই গল্পে। কারণ বাকী তথ্য, মানে যা যা পেয়েছি, সেটা থেকে আরো কত গল্প যে তৈরী করা যাবে, সেটার ইয়ত্তা নেই। তাই সেই লোভটা ছাড়তে পারিনি আর…

খগেন ওঁরাও
শূকর শিকারের পথে ওঁরাওরা…

বলাই বাহুল্য, গল্প মাত্রই সত্য-মিথ্যার মিশেল। তাই যা শুনেছি, সেটার সাথে আমার মশলা মাখিয়েই এই গল্পের অবতারণা। তবে কয়েকটা জিনিসা না বললেই নয়; ১০০ বছরের বেশী বয়সী খগেন ওঁরাও সত্যিই ছিল; খুনিয়ার কিংবদন্তিও লোকের মুখে মুখে ফেরে। আকাশপাতাল নামের বিসদৃশ্য দাঁতওয়ালা মদ্দা হাতিও, সত্যিই ছিল। আর, মৈনাকরা ওঁরাও বস্তিতে ‘ধর্মেশ’ বা ধর্ম ঠাকুর’-এর মন্দির পেয়েছিল। এবং সেখানে বারো বছরে একটা করে নরবলি এখনো নাকি হয়ে থাকে।

ধর্মেশের পূজো

আসলে এর থেকে কিছু বেশী বললে, সেটা এবার অন্য সমস্যা তৈরী করতে পারে; যাক গে। অন্য কথায় আসি। ভূত আছে না নেই, এই বিতর্ক বোধহয় সৃষ্টির অন্তিমকাল অবধি চলবে। কিন্তু আমি জানি না, ওই জঙ্গলের মধ্যে ওই পরিবেশে ক’টা দিন কাটিয়ে এলে, আমি তর্কের কোন পক্ষে থাকতাম। গল্পের শেষ তিনটে কিস্তি লেখার সময় তিন রাত না ঘুমিয়ে লিখে গেছি; পাগলের মতো। ফুটেজ খাওয়ার জন্য বলছি না; যে গরাম ঠাকুর লিখিয়েছেন; কিন্তু এই গল্পটা লেখা এবং শেষ করা আমার কাছে একটা অন্যরকমই স্মৃতি হয়ে থাকবে। জীবনের প্রথম উপন্যাসিকা বা বড়গল্প… এবং এতদিন ধরে লিখে যে শেষ করতে পারব, না ঝুলিয়ে, সেটা সত্যিই ভাবিনি; আর তাই ওই তিনরাত জেগে লেখাটা আমার সার্থক বলেই ধরছি।

লেপার্ডস নেস্ট…

এখন সবই আপনাদের হাতে; লেখা পড়ুন, মতামত জানান, গালাগাল দিন… কিন্তু পড়ুন… অবশ্যই পড়ুন।

এই শনিবার হয়তো আর একটা অপ ঘটনার আমদানী হতে পারে… কিম্বা অন্য কিছু ? দেখা যাক… শনিবারের কথা শনিবারে ভাবা যাবে…



শান্তির আশায়…

নীল…  

Somewhere In the Jungle of North Bengal… Last Part

Pain… You made me a you made me a believer, believer…

“Believer” – Imagine Dragons

||১৮||

অনেকের প্রেমে পড়ে রাতের ঘুম উড়ে যায়, অনেকের প্রেম ভেঙে গেলে রাতে ঘুম আসেনা। আবার প্রচুর লোকে ভূতের ভয়েও রাতে জেগে বসে থাকে। কিন্তু অভিযোজন এবং মানুষের মস্তিষ্কের কিছু সহজাত তথ্য শরীরকে বোঝাতে সক্ষম হয় বিশ্রাম এবং ঘুমের প্রয়োজনীয়তা। তাই সারারাত যুদ্ধ করে শত্রুশিবিরের একেবারে নাগালের মধ্যে ঘাঁটি গাড়া সৈনিকদেরও ঘুম আসে, ফাঁসীর আগের রাতেও শান্তিতে ঘুমায় কয়েদি।

আর তাই ঐ বিভীষিকাময় রাতের পরেও, ওদের চোখে ঘুম আসে। দিনের আলোটা ভালো করে ফুটলে ওরা ঘুমোতে যায়, দরজা হাট করে খুলে। স্যার একবার এসে ঘুরে গেলেও ঘুম ভাঙ্গান না ওদের ঘুমের বহর দেখে।

যখন ঘুম ভাঙে তখন চারদিকে রোদ খাঁ খাঁ করছে। বেলা প্রায় সাড়ে এগারোটা। স্যার মৃদু তিরস্কার করেন ওদের, রাত জাগার জন্য।  তার উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকে সবাই। প্রাতরাশ করার সময় প্রথম মুখ খোলে মৈনাক।

-“তোদের সাথে কিছু কথা আছে। খাওয়ার পর চ’ একবার খড়িয়া-এর ধারে যাই।”

এ কথার উত্তর কেউ দেয় না। খাওয়া হয়ে গেলে, স্যারের অনুমতি নিয়ে পাঁচজনেই নদীর ধারে যায়। আকমল সঙ্গ ছাড়ে না। নদীর ধারে বসে মৈনাক বলতে শুরু করে…

-“আমি একটা জিনিস লুকিয়ে গেছি তোদের থেকে…”

-“সেটা আমি আন্দাজ করেছি… হঠাৎ তোর মেল করার কি দরকার পড়ল, বুঝিনি…” উত্তর দেয় অসীমাভ।

-“হুঁ… আসলে তোদের এতদিন বলব বলব করেও বলিনি কারণ, পুরোটাই আমার অনুমান, তার সাথে লোকের মুখের কথা আর লোকাল লেজেন্ড জুড়ে… কিছুটা কানেক্টিং দ্য ডটস, কিছুটা অন্ধকারে ঢিল…”

-“অনেক গৌরচন্দ্রিকা হল, এবার ভেতরে ঢুকবি কি ?”

মৈনাক কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে, তারপর একটা গলা খাঁকড়ি দিয়ে শুরু করে;

-“আমার মাথায় প্রথম খটকাটা লাগে তারাদার কথায়। মনে আছে, সাখাম যাওয়ার দিন তারাদা বলেছিল জঙ্গলের প্রাণ আছে, একটা নিজস্ব সত্ত্বা আছে ?”

-“হ্যাঁ… মনে আছে…”

-“তারপর তুই রতনকে জেরা করলি। রতন বলল রাতে ভয় পেলে গরাম ঠাকুরের নাম করে। তোরা সেটা নিয়ে বিশেষ কিছুই ভাবিস নি, কারণ এইসব ট্রাইবাল এলাকায় প্রচুর পেগান গড-এর পূজো হয়ে থাকে। কিন্তু আমি ভাবলাম রতন কে একটু জিজ্ঞাসা করি। করলামও পরের দিন। রতন শুধু বলল, গরাম ঠাকুর ওঁরাও-দের ভগবান, ওঁরাও বস্তির কাছে একটা মন্দির গোছের জিনিস আছে। সে গরাম ঠাকুর নিয়ে আর বিশেষ কিছু বলতে পারল না। তবে বলল, ‘খগেনদাদু জানে’।”

-“খগেন দাদু মানে? সেই খগেন, যে মাঝে মধ্যেই দুমদাম কোর এরিয়ায় ঢুকে যায় ?” -প্রশ্ন করে শ্বেতাংশু।

-“কারেক্ট। জীবিত ওঁরাওদের মধ্যে প্রবীনতম খগেন ওঁরাও, বয়সের গাছ পাথর নেই, পরে দিলীপ বাবুর কাছ থেকে জেনেছিলাম নাকি একশ’রও ওপরে বয়স। গরাম ঠাকুরের ব্যাপারে তার থেকে ভালো কেউ জানবে না। কারণ ওঁরাও রা এখানে এসেছে মূলত ব্রিটীশ আমলে, ছোটনাগপুরের নানান এলাকা থেকে, তাই তারা নিজেরাও তাদের শুরুর ইতিহাসটা ঠিক করে জানে না, দু-একজন ছাড়া।  এখন সমস্যা হল ভাষা। খগেন পাক্কা ওঁরাও, বাংলা একটু একটু বুঝলেও, বলতে পারে না। তার ভাষা হল কুরুখ আর এন্দেরমেন্দের।”

-“অ্যাঁ ! এসব কি ভাষা ?”

-“কুরুখ এসেছে দ্রাবিড় স্ক্রীপ্ট থেকে, কিন্তু এন্দেরমেন্দের ? একেবারেই লোকাল ল্যাঙ্গুয়েজ, লোকাল ডায়ালেক্ট। ফরচুনেটলি ফর মি, ওঁরাও আর মুন্ডাদের সাথে বড় হওয়া রতন, দু’টো ভাষাই বলতে এবং বুঝতে পারে। আমি গেলাম বীট অফিস যাওয়ার নাম করে ওঁরাও বস্তিতে। খগেনবুড়ো মিশুকে লোক, হাসিমুখে কথা বলল, আমিই তাকে গরাম ঠাকুরের কথা জিজ্ঞাসা করলাম। সেটা শুনে সে একটু গম্ভীর হয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু উত্তর সবই দিল।”

-“কি বলল…”

-“আমরা যারা আজ গাছ লাগাও, গাছ বাঁচাও বলে চিৎকার করি, তাদের পক্ষে বোঝা সম্ভবও নয়, জঙ্গলের মধ্যে বেড়ে ওঠা এইসব উপজাতিগুলোর সাথে অরণ্যের সম্পর্কটা কতটা সিমবায়োটিক। অরণ্যকে কতটা শ্রদ্ধা করে তারা। তারা জঙ্গল থেকে যেমন ন্যাচারাল রিসোর্সেস পায় যেমন কাঠ, মহুয়া, গালা, রজন… তেমনই যত্ন করে জঙ্গলের প্রতিপালনও করে থাকে;  আর গরাম ঠাকুর হল এই অরণ্যের দেবতা। ‘স্পিরিট অফ দ্য উইল্ডারনেস’ বা ‘গড অফ দ্য ফরেস্ট’… যা ইচ্ছে নাম দিতে পারিস। ইন ফ্যাক্ট শুধু গরাম ঠাকুর কেন, দেশে দেশে, বিভিন্ন কালচারে এরকম অনেক দেবতার, অনেক ডেইটির উল্লেখ রয়েছে। যেমন সুন্দরবনের দক্ষিণরায় বা বনবিবি। আবার ডুয়ার্সের অন্য অঞ্চলে ধর্মেশ বা ধর্ম ঠাকুর। এমনকি নর্স মাইথোলজিতে ‘ভিডার’।”

-“বলিস কি ? তোকে খগেনবুড়ো নর্স মাইথোলজির গল্প শোনালো ?”

-“এত ভাট বকে কি পাস, শ্বেতাংশু ? আমি ফেরার পথে বীট অফিস গিয়েছিলাম, খগেনদাদুর মুখের কথাগুলো অনেকটাই ইন্তারনেট থেকে ভেরিফাই করেছি।

-“দোষ হয়ে গেছে… তুই তারপর বল। -শ্বেতাংশু বলে।

-“তা এই গরাম ঠাকুর হলেন কাঁচাখেকো দেবতা, ওঁরাওরা এখনো ১২ বছরে একটা করে নরবলি দেয় তার কাছে। আর আমি দিলীপবাবুর অফিসে ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখেছি, এখানে শেষ নরবলি হয়েছে ২০০১ সালে…”

-“মাই গড !!!”

-“তোর না, ওঁরাও-দের গড… ”

-“ওই হল… কন্টিনিউ…”

-“হ্যাঁ…   

-“তা গরাম ঠাকুর তাঁর জঙ্গলে কোনও অনাচার সহ্য করতে পারেন না। যতদিন কাঠকল ছিল, এবং কাঠকলের মালিক সর্বেশ্বরবাবু প্রতি সপ্তাহে গরাম ঠাকুরের পূজো দিতেন, ততদিন কোনও অশান্তি ছিল না… অশান্তি শুরু হল রতনের দাদা মারা যাওয়ার পর থেকে। লোকজন পলিটিক্স আর ইউনিয়নবাজী করে স-মিল লাটে তুলে দিল, ভদ্রলোক বাধ্য হয়ে সব বেচে বুচে… তার পরের ঘটনা তোরা জানিস… তার পর থেকে, মানে ওঁরাওদের বিশ্বাস গরাম ঠাকুরের রোষে, ওই জমিতে আর কেউই টিকতে পারেনি। পাঁচজন গ্যাংরেপ কেসটার সাথে জড়িত ছিল, সঞ্জয় লাহোটি আর চারজন লোকাল লোক। সঞ্জয় বড়লোকের কুপুত্তুর, সে পালিয়ে বেঁচেছে, কিন্তু বাকী চারজন জেলে ছিল, তাদের একজন জেলেই আত্মহত্যা করে; আর গত বছর ১৫ই আগস্ট ভালো ব্যবহারের জন্য ছাড়া পেয়েছিল বাকি তিনজন। ছাড়া পেয়ে বস্তিতে ফিরেছে, রাতে শুয়েছে, দরজা জানলা বন্ধ করে। সকালে দেখা গেছে, তিনজনে তিনটে আলাদা জায়গায় হার্ট ফেইল করে মরে কাঠ হয়ে পড়ে আছে। সেটাও নাকি গরাম ঠাকুরের রোষ; তার জঙ্গলের স্যাংটিটি নষ্ট করার শাস্তি। তাই লেপার্ডস নেস্ট-এ আমাদের অবাধ অনুপ্রেবেশও সহ্য হয়নি গরাম ঠাকুরের।”

-“মানে, ওই জিনিসটা… মানে যেটা কাল আমাদের ঘরে ঢুকেছিল… সেটা ওই গ-গরাম ঠাকুর ?” -অসীমাভর গলাটা কেঁপে ওঠে যেন…

-“গরাম ঠাকুর বল, স্পিরিট অফ উইল্ডারনেস বল, জঙ্গলের আত্মা বা সত্ত্বাও বলতে পারিস…”

-“কিন্তু এ ব্যাপারে তুই শিওর হচ্ছিস কি করে ?”

-“আরে ! আমি কখন বললাম আমি শিওর ? আমি তো প্রথমেই বলেছিলাম এটা আমার আন্দাজে ঢিল মারা; আর আমি অনেক আগে এও বলেছিলাম ভূতের পেছনে কি আর কেন জোড়াটা আমার ধাতে সয় না। এক্সপ্ল্যানেশন তো তুই চাইলি… এখন সেটা পাওয়ার পর শিওরিটির কথা তুলছিস… তবে… এর পেছনে আমার আর একটা যুক্তি অবশ্যই আছে।”

-“কি যুক্তি ?”

-“সব পেগান গডদের একটা করে প্রতিক বা টোটেম থাকে। জানিস, গরাম ঠাকুরের টোটেম কি ?”

-“কি ?”

-“কালো কুকুর…”

-“আচ্ছা, বোঝা গেল। কিন্তু, একটা জিনিস ক্লীয়ার কর, তুই ব্যাপারটার সূত্র তো প্রথম তারাদার কাছ থেকেই পেলি; তাহলে তুই গরাম ঠাকুর নিয়ে তারাদা কে প্রশ্ন না করে সিধে খগেনবুড়োর কাছে চলে গেলি কেন ?”

-“তিনটে কারণে। এক, রতনের সাথে কথা বলার পর তারাদার সাথে আমার দেখা হয়েছিল একদিন পড়ে, রাজাভাতখাওয়া যাওয়ার দিন; আর সত্যি করেই আমার তর সইছিল না ভাই… গরাম ঠাকুরের নাম শোনা ইস্তক আমার মনে হচ্ছিল এই ধাঁধার একটা বড় সূত্র হল গরাম ঠাকুর। আর দুই, যেখানে ওঁরাওরাই নিজেরাই নিজেদের ইতিহাস ঠিক করে বলতে পারে না, সেখানে তারাদা খুব একটা হেল্প করতে পারবে বলে আমার মনে হয়নি। আর তিন,  নিজের চোখে একটা ১০০+ বছর বয়সী লোককে দেখার কৌতুহল দমন করতে পারিনি…”

-“একটু পায়ের ধুলো দে, ভাই। মাইরি বলছি, জিওলজি নয়, তোর অ্যান্থ্রোপলজী নিয়ে পড়া উচিত ছিল।”

এরপর নির্বীঘ্নেই কেটে গেছে একটা দিন। প্রথমে একটু ভয় ভয় করলেও, রাতে আলো নিভিয়েই শুতে পেরেছে সবাই। আজ সকাল থেকেই সাজো সাজো রব। কাল বিকেলের সরাইঘাট এক্সপ্রেস ধরে কোলকাতায় ফেরার পালা। এত দিনের পরিশ্রম, এত দিনের কষ্ট, এবং এত আতঙ্কের পরও, মনটা সবারই বেশ খারাপ। দিলীপবাবু সক্কাল সক্কাল হাফডজন বনমূর্গী পাঠিয়ে দিয়েছেন, আর জানিয়ে দিয়েছেন বিকেলে এসে মাংসটার তদারকি তিনি নিজেই করবেন। গোছগাছ করা, ছবি তোলা আর বাকী রিপোর্টটুকু লিখতেই দিনটা কাবার হয়ে যায়।

বিকেলে রতনের সাথে অসীমাভ আর মৈনাকও হাত লাগায়। এসে পড়েন দিলীপবাবু, তারা দা, এবং দুই জিপের ড্রাইভার। হৈচৈ, ক্যাম্পফায়ার করতে বেশ রাত হয়ে যায়। স্যার-দিলীপবাবু-তারাদা আগে খেয়ে নিলেও মৈনাকরা খায়নি। পরে পরে করতে করতে আবার শুরু হল বৃষ্টি। পরি কি মরি করে মাংস আর ভাতের থালা সমেত সব ঘরে ছুটল সব্বাই। খাওয়া দাওয়া করে দরজার বাইরে একগাদা মাংসের হাড় সহ থালাগুলো রেখে শ্বেতাংশু বিছানায় বসেছে কি বসেনি, দরজায় টোকা পড়ল।

-“আমি খুলছি না…” শ্বেতাংশু ঘোষণা করল।

আবার টোকা…

-“কে ?” -অসীমাভর প্রশ্নে কোনও উত্তর নেই।

মৈনাক বলে,

-“আরে ভাই, চল… একসাথে যাই…”

অনুপ্রিয়া বলে ওঠে

-“হোয়াই আর ইউ গাইজ বিয়িং উইয়ার্ড… আমি খুলছি…”

অনুপ্রিয়াকে কিছু বলার আগেই সে উঠে গিয়ে সটান দরজাটা খোলে এবং ‘ও মা গো’ বলে দু’পা পিছিয়ে আসে।

অসীমাভ আর মৈনাক প্রায় দৌড়ে যায়। গিয়ে দেখে দরজার বাইরে চুপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই কালো কুকুরটা, আর দু-এক মিনিট আগেই নামিয়া রাখা সবার এঁটো হাড়ের বিশাল স্তুপটা উধাও। কালো কুকুরটাকে দেখেই অসীমাভ দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। তারপর ঘরটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে দেখে। না, আলো নেভেনি, অস্বাভাবিক কিছুই হয়নি। একটা হাঁফ ছেড়ে, এবার সে অনুপ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে খেঁকিয়ে ওঠে

-“এই যে, বাংলা মায়ের অ্যাংলো মেয়ে, একটা কুকুর দেখে ভয় পেয়ে মুখ দিয়ে বাংলাই বেরোলো তো ? যত্তসব।”

একটু পড়ে, মেয়েরা মেয়েদের ঘরে শুতে চলে যায়। মৈনাকরাও শুয়ে পড়ে, তবে শুয়ে পড়ার পর অসীমাভ দু-একবার টর্চ জ্বালিয়ে ঘরটা দেখে নিচ্ছিল। সেটা দেখে মৈনাক বলে,

-“চাপ নিস না… গরাম ঠাকুর গুডবাই বলতে এসেছিল…”

কথাটা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অসীমাভ। তারপর টর্চটা রেখে চোখ বুজে বিড়বিড় করতে থাকে

-“জয় বাবা গরাম ঠাকুর… শাপমুন্নি কোরো না বাবা, মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছি…”

ভারতীয় রেলের ঐতিহ্য মেনে সরাইঘাট এক্সপ্রেস মাত্র দু’ঘন্টা লেট করে চলছিল, তাই স্টেশনে বসে মাছি তাড়াচ্ছিল মৈনাক আর অসীমাভ। শ্বেতাংশুও কিছুক্ষণ মাছি তাড়াবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু একটা নাছোড়বান্দা মাছি বার বার ফিরে এসে তার নাকের ডগাতেই বসতে থাকার পর সে হাল ছেড়ে দিয়ে ব্যাজার মুখে গান ধরেছিল।

“জিন্দেগীনে, জীন্দেগীভর ‘গম’ দিয়ে…”

এমন সময় পিঠে রুকস্যাকধারী একটি ছেলে এসে শ্বেতাংশুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,

-“আরে ! শ্বেত ! তুই এখানে ?? খবর কি ?”

শ্বেতাংশু লাফিয়ে উঠে ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরে,  আর কুশল বিনিময় করার পর পরিচয় করিয়ে দেয়,

-“ভাই, এটা আমার ছোটবেলার, স্কুলের বন্ধু নীলাদ্রী…”

অসীমাভ আর মৈনাকও আলাপ করে। জানা যায় ছেলেটি এসেছিল মহাকাল গুহা ট্রেক করতে, কিন্তু বৃষ্টির জলের জন্য নিরাশ হয়েই ফিরতে হচ্ছে তাকে। কথায় কথায় জানা যায়, ছেলেটির সিটও শ্বেতাংশুদের কাছেরই ক্যুপে। ট্রেন আসতে বেশ দেরী আছে,  তাই গল্পের আসর বসে যায় স্টেশনেই। কথায় কথায় শ্বেতাংশু বলে,

-“আমার কাছে একটা হেব্বি গল্প আছে ভাই… কলকাতায় চ’ বলব… ট্রেনে ঠিক জমবে না…”

দু’ঘন্টারও বেশ কিছুটা দেরী করে আসে ট্রেন। আর স্টেশন ছাড়তে ছাড়তে আবার সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসে।  সবাই মিলে হৈহৈ করতে করতে যাওয়া হচ্ছে, মৈনাকের মন অনেকটাই ভালো এখন। যে মানসিক অবস্থা নিয়ে সে এসেছিল, সেই ভাঙাচোরা, দূর্বল মৈনাকটাকে সে বোধহয় উত্তরবঙ্গের জঙ্গলেই ফেলে রেখে এসেছে।

অন্ধকারের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে ট্রেন… জালনার কাচে ভালো করে চোখ লাগিয়ে বাইরে দেখে মৈনাক… নাহ, জমাট বাঁধা অন্ধকার ছাড়া, আর কিছুই দেখতে পায় না সে…

তিন দিন পর…

-“কেমন কাটল তোর নর্থ বেঙ্গলের ক্যাম্প ?”

-“ভালো কাটল, বাপি… খুব ভালো…”

-“তোরা কোথায় ছিলি রে, ওখানে ?”

-“ওই তো, বক্সায়, সান্তালাবারির কাছে ‘লেপার্ডস নেস্ট’ বলে একটা রিসর্ট…”

-“ও বাবা, সেটা এখনো চলছে নাকি ? লেপার্ডস নেস্ট ?”

-“না, চলছে না, আসলে ফরেস্ট ডিপার্ট্মেন্ট-এর প্রপার্টি এখন…”

-“তাই বল… আমি তো শুনেছিলাম সেই ঝামেলার পর বন্ধ হয়ে গেছিল…”

-“কোন ঝামেলা ? আমি তো…”

-“ও, অবশ্য তোর তো তখন জ্ঞানই হয়নি। কত বয়স হবে ৩ কি ৪… আমি আর তোর মা একটা তোকে নিয়ে নর্থ বেঙ্গল গেছিলাম, আমার কোম্পানি থেকে প্রমোশনাল ইভেন্টে। দু’রাত ছিলাম ওই লেপার্ডস নেস্ট-এ। এলাহি ব্যবস্থা। কিন্তু দ্বিতীয়দিন রাতে নাকি, হোটেলের যে ওনার, সে দল পাকিয়ে দু’টি মেয়েকে… যাই হোক, পরের দিন দুপুরে চেক আউট করার কথা, পুলিস এসে আটকে দিল, জেরা করল, ট্রেন…”

বাবার এর পরের কথাগুলো আর একদমই কানে যায় না মৈনাকের। তার ফের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।  সে ‘কী’ ও ‘কেন’র উত্তরগুলো কেমন না চাইতেই পেয়ে যাচ্ছে; তাহলে নর্থ বেঙ্গলের ওই রহস্যের শেষ সূত্র কি সে নিজেই ? না চাইতেও ওই ভয়ঙ্কর অপরাধের সময় উপস্থিত থাকতে হয়েছিল লেপার্ডস নেস্ট-এ, তাই কি এত দুঃস্বপ্ন, তাই কি সে-ই প্রথম টের পায় অলৌকিকের অস্তিত্বের ? আর তাই কি গরাম ঠাকুর জলন্ত চোখে তাকে আড়াল থেকে লক্ষ্য করে গেছে, তাড়া করে বেরিয়েছে লেপার্ডস নেস্ট থেকে বক্সা ? এর উত্তর মৈনাকের কাছে অন্তত নেই, থাকলে আছে উত্তরবঙ্গের জঙ্গলের কোথাও একটা, যেখানে এখনো রাত হলে এক অলৌকিক শক্তি মানুষের কাছে তার অস্তিত্ব জানান দেয়; বুঝিয়ে দেয় এই জঙ্গলের অধিপতি সে, রক্ষাকর্তাও সে…

-সমাপ্ত-

আমাদের নর্থ বেঙ্গল সফর আপাতত শেষ। কাল এই লেখার পরিশিষ্ট লিখলেই ষোলকলা পূর্ণ হবে। এই পর্বের সাথে সাথে আমি সব পর্বের লিংক একসাথে নিয়ে আবার পোস্ট করছি; পড়ুন, পড়ে জানান কেমন লাগল… মোট ২৬,৭৩২ শব্দ এবং ৭৫ পাতার পর শেষ হয়েছে গল্প… কমেন্ট করুন, ফেসবুকে বলুন, হোয়াটস্যাপ-এ বলুন… সামনের শনিবার কি লিখব, সেটা জানিয়ে দেব কাল-পরশুই… আপাতত বিদায়…

শান্তির আশায়…

নীল…

Somewhere In the Jungle of North Bengal… Part XVII

Hope not ever to see Heaven. I have come to lead you to the other shore; into eternal darkness; into fire and into ice.

Dante Alighieri

||১৭||

এত সুন্দর আবহাওয়া, লেপচাখায় এই প্রথম পেল ওরা। রূপোলী নদীগুলো আজ কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে নেই; আর দু’দিন আগের বৃষ্টিতে মাজা-ধোয়া আকাশ কাচের মতই চকচক করছে। এগারোটায় লেপচাখা পৌছোনোর পর, কাজ গোছানো হয়ে যায় দেড়টা নাগাদ। তারপর প্রথমে লেপচাখা আর তারপর বক্সা ফোর্ট-এ বেশ কিছুটা সময় কাটায় সব্বাই। অনেক দিক থেকেই স্মরণীয় এই সফর কে আরো বেশী করে মনে রাখার প্রচেষ্টায় অসীমাভর ক্যামেরাটা আজ খেটে চলেছিল ওভারটাইম।

বক্সা ফোর্টের আনাচে কানাচে আপনমনে অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়াল মৈনাক। বন্ধুদের কাছে একটা ব্যাপার সে বেমালুম চেপে গেছে; আসলে ব্যাপারটা চেপে কোনও দরকার ছিল কিনা সেটা ভেবে পায়নি; তবে যতবার মনে হয়েছে, ‘এবার বলে দিই’; ততবারই মন বলেছে, ‘এখন নয়, পরে… ঠিক সময় আসবে’।

-“তুই না, কিছু একটা চেপে যাচ্ছিস…” -পেছন থেকে শ্বেতাংশুর আবির্ভাব হয়।

মৈনাক একটু চমকেই ওঠে; অপদেবতার তো অভাব নেই চারপাশে; এখন শ্বেতাংশু কি শেষে অন্তর্যামী হয়ে উঠল নাকি ? সে হেসে উত্তর দেয়,

-“না ভাই… কি আর চেপে যাব ? চাপার মত আছেটা কি ?”

-“না না, কিছু নিশ্চয়ই চেপে যাচ্ছিস… আমার মনে হয় তিয়াসার সাথে আবার প্যাচ-আপ করে নিয়েছিস, আর অসীমের ভয়ে সেটা লুকোচ্ছিস…”

-“আরে ধুর! না ভাই… ও চক্করে আমি নেই… হ্যাঁ, জানি এত বছরের প্রেম, ভেঙে গেলে প্রথম প্রথম ফিরে পেতে মন চায়, কষ্টও হয়, কিন্তু ক’টা দিন গেলে বোঝা যায় যা হয়েছে ভালোই হয়েছে…”

-“যাক! এটা যে তোর মাথায় ঢুকেছে সেটা জেনে আমি অভিভূত, আপ্লুত ! এবার চল, অসীম একটা গ্রুপ ফটো তুলবে বলে ডাকছে।”

গ্রুপ ফটো তুলে হেলে দুলে রিসর্টে ফেরা হল বিকেল পাঁচটা নাগাদ। মাঝখানে দু’টো দিন নষ্ট হয়েছে বলে আর দেরী না করে পর পর কাজগুলো মিটিয়ে নেওয়াই ঠিক হবে, সেটা স্যার এবং তারাদা দু’জনেরই মত। তাই কালই যাওয়া হবে জয়ন্তী। তাই ঘরে ডেটার কাজও চলছে জোরকদমে; অনুপ্রিয়া আর সমীরা নিজের নিজের রিপোর্টের কাজ অনেকটাই এগিয়ে রেখেছে; অন্যরা ডেটা নিয়ে আপাতত ব্যস্ত, ভেবে রেখেছে, শেষ দু-তিন দিনে রিপোর্ট লেখা যাবেখন, এখন আপাতত এতদিনের এবং নতুন সংযোজিত হওয়া ডেটার কাজটা মিটিয়ে ফেলাই বাঞ্ছনীয়।

এর আগের দু’দিন একেবারে নির্বিঘ্নে কেটেছে; কিন্তু আজ কাটল না, রাতে আবার নামল বৃষ্টি। খুব জোরে নয়, আবার খুব আস্তেও নয়। আর বৃষ্টির মধ্যেই শোনা গেল শ্বেতাংশুর ভাষায় ‘অতীন্দ্রিয় করাতি’র শব্দ। শুধু তাই না, সেটার সাথে যুক্ত হল আর একটা শব্দ; অনেকটা কাঁচ ভাঙার মত; একটানা বার বার… যেন কেউ কাঁচের শিশি বা বোতল একটা একটা করে আছাড় মেরে ভাঙ্গছে। কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে বাইরে গিয়ে অনুসন্ধান করার ইচ্ছে কারোরই হল না। সবাই ঘুমের দেশে পারি দেওয়ার কাজেই মন দিল।   

সান্তালাবারি থেকে জয়ন্তী আর রাজাভাতখাওয়া মোটামুটি সমদুরত্বে। তাই ওটাও যাতায়াত করেই সার্ভে করা যাবে, ওখানে গিয়ে থাকার দরকার পড়বে না। রাতে বৃষ্টিটা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে যায়নি বলে সকালে বেরোতে কোনও অসুবিধাই হল না। জয়ন্তী পৌছোতে সময় ও বেশী লাগল না। রাস্তা চমৎকার। এখানে যা কাজ আছে, তাতে প্রথমে তিনদিন মনে হলেও এখন বোঝা যাচ্ছে দু’দিন সময় পেলেই হয়ে যাবে। আর প্রথম দিনে বেশী কাজটা মিটিয়ে নেওয়ায়, দ্বিতীয় দিনে আবারও অনেকটা সময় বেঁচে গেল। ঘুরতে যাওয়া হলে জয়ন্তী নদীর তীরে।

ডুয়ার্সের অপেক্ষাকৃত ছোট নদীগুলোর সৌন্দর্য্য একদমই অন্যরকম সে মূর্তি হোক, সান্তালিখোলা হোক, বা জয়ন্তী। কনকনে ঠান্ডা জল, আর কাচের মতো পরিষ্কার। ছোট ছোট নুড়িতে ভর্তি গোটা নদীখাত। পার্বত্যগতি হলেও, জলের গভীরতা কম বলে জলের শক্তিও কম। তাই সেই হাঁটু অবধি ঠান্ডা জলে নেমে ছবিতোলা থেকে শুরু করে এ ওর গায়ে জল ছেটানো সবই হচ্ছিল। আকমলের জলে ভয়, তাই সে নদীর একদম পাড়ে বসেই নুড়ি ঘাঁটছিল, আর ফোন কানে নিয়ে কাউকে শোনাচ্ছিল, জয়ন্তী নদীর পাড়ে কিরকম হরপ্পা সভ্যতার নিদর্শন এবং ডাইনোসরের ডিম পাওয়া গেছে। অসীমাভ ছবি তুলছিল। ক্যামেরায় চোখ লাগালে, তার হুঁশ থাকে না অন্যদিকে। এক পা দু’পা করে এগোতে পেছোতে, তার সংঘর্ষ হয় উবু হয়ে বসা আকমলের সঙ্গে। দু’জনেই টাল সামলাতে পারে না, অসীমাভ নিজের ক্যামেরা সামলাতে সামলাতে সপাটে নদীর তীরে আছাড় খায়। আর আকমল ভারসাম্য হারিয়ে সোজা জয়ন্তীর জলে। তারা দা দৌড়ে এসে আকমলকে টেনে তোলে, কিন্তু ততক্ষণে তার মোবাইলের সলিল সমাধি ঘটেছে। ঠান্ডা জলে ভিজে সে হি হি করে কাঁপছে। অসীমাভরও লেগেছে, কিন্তু সে ব্যাথার তোয়াক্কা না করে আগে ভালো করে ক্যামেরাটা পরীক্ষা করে দেখে।

-“চিন্তা করিস না, ভাই… তোর মোবাইল ঠিক হরপ্পা সভ্যতা থেকে ডাইনোসরের ডিম খুঁজে নিয়ে আসবে…”

শ্বেতাংশুর এই টিপ্পনীর উত্তরে আকমল কিছু না বলে শুধু কটমট করে তাকায়।

আকমল আর অসীমাভর এই দূর্ঘটনার জন্য একটু তাড়াতাড়িই ফিরতে হয় আজ। ঠিক দু দিন বাদ দিয়ে তৃতীয় দিনের দিন তাদের ফেরার টিকিট। আর কাজও আজকেই শেষ;  তাই ডেটা আর রিপোর্টের কাজ শেষ করেও হাতে অঢেল সময় আছে। তার মধ্যে তো মৈনাক একদিন ফিস্টের প্ল্যান করেই রেখেছে।

যখন ওরা লেপার্ডস নেস্ট-এ ঢুকলো, তখন বিকেল গড়িয়ে সবে সন্ধ্যেটা নামছে। রতন যেন তাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল, ছুটতে ছুটতে এসে বলল,

-“দা’বাবুরা… একটা বাচ্চা ঢুকেছে হোটেলের মদ্যি…”

অন্যরা কিছু বলার আগেই, তারাদা বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠে বোঝাল, কাছের যে নেপালি এবং ওঁরাওদের বস্তি আছে, সেখান থেকে মাঝে মাঝে বাচ্চা ছেলেপুলে এটা ওটা চুরির মতলবে রিসর্টে ঢুকে পড়ে, আর পরে সময়মত বেরোতে না পারলে রাতে জঙ্গলের পথে পালাতে গিয়ে বিপদে পড়লে ছেলের বাড়ির লোকজন হোটেল বা রিসর্টের বোর্ডারদের ওপরই চড়াও হয়ে থাকে। রতন দেখেছে একটা বাচ্চাকে চা বাগানের দিক দিয়ে ঢুকতে, তারপর কোথায় লুকিয়েছে, আর খুঁজে পাচ্ছে না। তার ওপরে এখন অন্ধকার নামছে দ্রুত।

তারাদার কথা মত, অসীমাভ তাদের ঘর খুলে সবক’টা ফ্ল্যাশলাইট বের করে ঘরের দরজা জানলা ভালো করে বন্ধ করে।  স্যারের ঘরেও তাই করা হয়। তারপর সবাই মিলে আঁতিপাঁতি করে খোঁজা শুরু হয় গোটা রিসর্ট চত্তর। কিন্তু প্রায় দু’ঘন্টা চলে যায়, অন্ধকার গাঢ় কয়ে ঘন্টিপোকা ডাকতে থাকে, ছেলেটার কোনো চিহ্নই পাওয়া যায় না।

গেল কোথায় ? এই অন্ধকারে তো পেছনের জঙ্গল বা চা বাগান দিয়ে পালানো সম্ভব নয়, আর রিসর্টের সামনের দিকে দাঁড়িয়ে স্যার নিজে। তার চোখকে ফাঁকি দেওয়া মুশকিল।

-“হ্যাঁ রে, ঠিক দেখেছিলি তো ?” তারাদা প্রশ্ন করে রতন কে।

-“হ্যাঁ, দাদা… পস্ট দেকিচি…”

কিন্তু রতন পস্ট দেখলেও কোনো মানবসন্তানের চিহ্ন পাওয়া যায় না গোটা এলাকার মধ্যে। ছেলেটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। তন্নতন্ন করে গোটা রিসর্ট খুঁজে অগত্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ হাল ছেড়ে তারা দা চলে যায়, রতনও রান্নার জোগাড়ে লাগে।

ঘরে এসে জামাকাপড় ছেড়ে আকমল আর অসীমাভ গায়ে ভোলিনি মালিশ করে ধাতস্থ হয়ে বসে। আজ খাবার পেতে দেরী হবে বলাই বাহুল্য, তাই কাজের জিনিস খুলে বসে চারজনে। অনুপ্রিয়া আর সমীরার নাকি রিপোর্টের একটু কাজ শেষ, তাই ডেটার কাজ যা আছে, খাওয়ার আগে শেষ করা গেলে খাওয়ার পরে চারজনে নিজেদের রিপোর্টগুলো নিয়ে বসা যাবে।

এবং হয়ও তাই। রাত দশটায় খেতে যাওয়ার আগে, ডাটার কাজ শেষ হয়ে যায়, এবং খেয়েদেয়ে পুরোদমে রিপোর্ট লেখার কাজ শুরু হয়। ভেতরের ঘরে অনুপ্রিয়া আর সমীরা খেয়ে দেয়ে এসেই ঘুমোতে যায়।

তখন বাজে রাত ঠিক দেড়টা। সবাই একাগ্রচিত্তে রিপোর্ট লিখছে। আর লেখার সাথে সাথেই, মৈনাক ভাবছে, এবার সবাইকে বলে দিলেই হয় কথাটা… কিন্তু আকমলটা যে জেগে আছে… এসব ভাবছে, আর লেখা চলছে; এমন সময় দরজায় খুব পরিচিত একটা টোকা পড়ল।

Photo by Pedro Figueras on Pexels.com

এত রাতে কে ? স্যার নাকি ? টোকার ধরণটা শুনে তো সেরকমই মনে হল।

অসীমাভ উঠে দরজাটা খোলার সঙ্গে সঙ্গে দু’টো ঘটনা ঘটল। এক, কয়েক মুহূর্তের জন্য দেখা গেল দরজার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে নেই। আর তারপরই ঘরের সমস্ত আলো ঝপ করে নিভে গেল। শুধু তাই নয়, অসীমাভর খোলা ল্যাপটপটাও বন্ধ হয়ে গেল।

-“যাহ শালা ! পাওয়ার সার্জে ল্যাপটপটাও গেল নাকি… ওরে, কেউ আলো জ্বালা…”

এই বলে ঘরের দরজা বন্ধ করে ল্যাপটপের চার্জারটা প্লাগ পয়েন্ট থেকে খুলে নিয়ে এসে সেটা পরীক্ষা করতে থাকল সে। শ্বেতাংশু আর মৈনাক ফ্ল্যাশলাইট জ্বালাতে গিয়ে দেখল, একটু আগেও কাজ করা টর্চগুলো আর জ্বলছে না…

-“ব্যাটারি গেল নাকি ? -শ্বেতাংশু বিরক্ত হয়।

-“এত সহজে ? মনে হয় না… দাঁড়া, অসীমাভরটা দেখি…”

অসীমাভর ফ্ল্যাশলাইটও জ্বলল না। তখন দিলীপ বাবুর দেওয়া সোলার লাইটগুলোও জ্বালানোর চেষ্টা করা হল, কিন্তু না। সেগুলোও জ্বলছে না।আর অসীমাভ এতক্ষণ খুটখাট করে ল্যাপটপটাও অন করতে পারেনি।

-“দাঁড়া তো, আমার ব্যাগে মোমবাতি আছে…” এই বলে শ্বেতাংশু উঠে গেল ব্যাগ হাতড়াতে।

পল্লবী তার জায়গায় চুপ। একেবারে পাথরের মত বসে আছে। তবে সত্যি বলতে ভয় সবারই করছে; এমনকি আকমল অবধি একবার ‘মুশকিল হল’ বলে চুপ করে গেছে।

শ্বেতাংশু তার ব্যাগ থেকে একগাদা মোমবাতি আর দেশলাই বের করে একটা কাঠি জ্বালালো। সেটা জ্বলে উঠে, মোমবাতির সলতে অবধি পৌঁছোনোর আগেই নিভে গেল। তারপর আর একটা, তারপর আর একটা… ঘোড়া বিন্দুমাত্র হাওয়া না  থাকা সত্ত্বেও, তিন তিনটে কাঠি এমনি এমনিই নিভে গেল। মৈনাক আর শ্বেতাংশুর যৌথ প্রচেষ্টায় চতুর্থ কাঠিটা একটা মোমবাতি জ্বালাতে সক্ষম হল ঠিকই, কিন্তু সেটাও সঙ্গে সঙ্গে দপ করে নিভে গেল।

যতবার আলো জ্বালাতে চাই                      নিবে যায় বারে বারে।

এই বিপর্যয়ের মধ্যেও শ্বেতাংশু এক কলি গেয়ে ওঠে। অসীমাভ ল্যাপটপটা রেখে দিয়ে এতক্ষণ চুপ করে দেখছিল। সে এবার খেঁকিয়ে ওঠে।

-“তামাশা রাখ… দরজার টোকাটা দিল কে দেখেছিলি ?”

-“আমি তো কাউকেই দেখলাম না…”

শ্বেতাংশুর কথা শেষ হওয়ার আগেই, মৈনাক হঠাৎই ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বেশ জোরে শশশশশশ করে শব্দ করে। সবাই চুপ করে যায় তার এই ভঙ্গিতে। এবার কান পাতলে শোনা যায়…

শোনা যায় ? না কিছুই শোনা যায় না… বাইরে ঘন্টিপোকার আওয়াজ নেই, হাওয়ার শব্দ নেই, একটা অপার্থিব নিস্তব্ধতা যেন আরও একবার তাদের গ্রাস করেছে। এবার সবাই সোজা সামনের দেয়ালের দিকে তাকায়, আর একবার ছাদের দিকে। ঘরে আলো নেই, থাকলে দেখা যেত, সবার মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। সবার মনে হচ্ছে, গোটা ঘরের ছাদ আর দেয়াল থকে সম্মিলিত হয়ে কিছু একটা বিরাট জিনিস যেন তাদের দিকে এগিয়ে আসছে; যেন গোটা ঘরের অন্ধকারটা  সংকুচিত হয়ে একটা বিরাট বড় হাঁ করে ওদের গিলতে আসছে। এরকম অভিজ্ঞতা মৈনাকের হয়েছে, ক’দিন আগে হয়েছে শ্বেতাংশু আর অসীমাভেরও। কিন্তু সেটা ঘরের ভেতরে নয়। বাইরে, জঙ্গলের সামনে, খোলা আকাশের নিচে।

জঙ্গলের সেই জিনিসটি এখন প্রবেশ করেছে ঘরে। চারটে জলজ্যান্ত মনুষ্যসন্তানের সাথে এক ঘরে বন্দি কোনও এক অজানা অলৌকিক জীব, যে তার অতপ্রাকৃতিক শক্তির বলে যেন থামিয়ে দিয়েছে সময়, থামিয়ে দিয়েছে হাওয়া, শব্দ, নিভিয়ে দিয়েছে ঘরের আলো… শুধু সর্বগ্রাসী ক্ষুধায় গিলে খেতে চাইছে চারটি প্রাণীকে, যাদের হৃৎপিন্ড এখন কনসার্টে বেজে ওঠা ড্রামসেটকে টেক্কা দিতে পারবে অনায়াসে।

পল্লবীর সারা শরীর কাঁপছে, তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে… সে শক্ত করে ধরে আছে অসীমাভর কাঁপতে থাকা হাত। আকমলকে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু সে বিরবির করে কিছু বলে চলেছে। শ্বেতাংশুও স্থির, সে দেয়ালের দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না, যেন মনে হচ্ছে চোখ ঘোরালেই, জিনিসটা লাফিয়ে পড়বে তাদের গায়ের ওপর।

এর মধ্যেও একমাত্র মৈনাক সচল।

সে আসতে আসতে জানলার কাছে গিয়ে জানলা দিয়ে মুখ বাড়াল। ভালো করে চারদিক দেখে, আবার সেখানেই বসে পড়ল। অতিকষ্টে অসীমাভ তার শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া গলা থেকে আওয়াজ বের করল।

-“কি দেখলি ?”

-“দেখলাম… স্যারের ঘরে আলো জ্বলছে, রতনের ঘরেও। এটা পাওয়ার ফেলিওর নয়…”

-“আর…”

-“রিসর্টের জমির মাঝখানে কালো কুকুরটা বসে আছে… আমাদের কুকুরগুলো ত্রীসিমানায় নেই…”

এ কথার উত্তর কেউ দিল না। আসলে কথা বলার মত অবস্থায় কেউ নেই। পাশের ঘর থেকে অনুপ্রিয়ার নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে।

-“ভাই… এ তো জ্বীন-জন্নতের ব্যাপার মনে হচ্ছে…” -আকমল মুখ খোলে।

অসীমাভ একটা মৃদু হুঁ ছাড়া আর কিছু বলে না। মৈনাক শ্বেতাংশুর কাছে সরে আসে। একটু একটু করে সবাই কাছাকাছি সরে আসে। এখন সবাই বিছানাটার মাঝখানে জমাট বেঁধে বসে, সবার নিঃশ্বাস আর হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছে পরিষ্কার।

একজন কতটা ভীতু, সাহসী বা বেপরোয়া ধরণের বোকা, সেটা বোঝা যায় ভয়ের সম্মুখীন হলে। প্রচন্ড ভয়ের সম্মুখীন হয়ে কারো কারো মনের ভেতরে সাহসের সঞ্চার হয় তৎক্ষণাৎ, আবার নিজেকে হাজার সাহসী বলে দাবী করা অনেকেই ভয়ের মুখে পড়ে জ্ঞানবুদ্ধি হারায়। আর শহরে থেকে থেকে বৈদ্যুতিক আলোর চটকে ভুলে, অন্ধকারের, মানে প্রকৃত জমাট কালীগোলা নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের বড় অভাব বোধ করে সবাই। তাই হয়তো অন্ধকারের ভেতরের আদিম শূন্যতাই আমাদের মনে ভয়ের উদ্রেক করে। কিন্তু যখন মনে হয় সেই অন্ধকারটাই হাঁ করে গিলে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে আমার অস্তিত্বকে, তখন অতিবড় বীরপুরুষেরও গলা শুকিয়ে যায়, হৃৎকম্প জাগে।

কিন্তু ভাগ্যের কথা, কাঁপতে কাঁপাতে, চোখের জল ফেলতে ফেলতেও অজ্ঞান কেউই হয় না। বরং একসাথে একজোট হয়ে বসে মনে অত্যন্ত সামান্য পরিমাণেই হলেও সাহস জেগে ওঠে। চুপ করে স্থানুর মত বসে থাকা ছাড়া আর কোন উপায়ন্তর না পেয়ে সবাই ঠায় বসে থাকে, হাত পা নাড়তে, একটু সরে বসতেও যেন ভয় লাগে… মনে হয় জিনিসটা, সেটা যাই হোক না কেন, জমাট অন্ধকারে মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে শিকারি বাঘের মতই ওত পেতে বসে আছে, আর পলকহীন দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে যাচ্ছে ঘরের বাকী বাসিন্দাদের। যেন সামান্য একটু বেচাল দেখলেই তার প্রস্ফুটিত বিভৎসা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে; নিজের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে।  

প্রথম ঝিঁঝিটা ডাকলে মনে হয়, বাইরের প্রকৃতি যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। অসীমাভ ঘড়ি দেখে, পৌনে চারটে, একটু বাদেই ভোর হবে। সবার চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে, ঘরের আলোগুলো জ্বলে ওঠে। দেখা যায় টর্চগুলোও কাজ করছে আবার। যান্ত্রিক শব্দ করে অসীমাভর ল্যাপটপটাও চালু হয়ে যায় নিজে নিজেই। শ্বেতাংশু মোমবাতি জ্বালায় না, কিন্তু সে আন্দাজ করে, এখন সেটা জ্বালতেও কোনও সমস্যা হবে না। মৈনাক উঠে গিয়ে আবার জানলা দিয়ে উঁকি মারে। কালো কুকুরটা আর নেই। আর তাদের চারটে কুকুর আবার কোথা থেকে ফেরত এসেছে।  সকালে হওয়া অবধি আর আলো নেভানো হয় না, কিন্তু নেভালে দেখা যেত, ঘরের অন্ধকার দেওয়ালটা আর, বুভুক্ষু দানবের মতো ওদের গিলতে আসছে না।

একটা কথা জানিয়ে রাখা, আগেই বলেছি গল্পের খাতিরে রং আমি একটু কেন, অনেকটাই মিশিয়েছি। কিন্তু এই পর্বের ধরে নিন ৮০-৯০ শতাংশই অবিকৃত এবং প্রত্যক্ষদর্শীর মুখের থেকে শুনেই লেখা…

পরের পর্বেই শেষ হয়ে যাচ্ছে “Somewhere… In the Jungle of North Bengal…” তারপরেই আসবে একটা পরিশিষ্ট পর্ব।

Somewhere In the Jungle of North Bengal… Part XVI

The forest is a peculiar organism of unlimited kindness and benevolence that makes no demands for its sustenance and extends generously the products of its life and activity; it affords protection to all beings.

Buddhist Sutra

||১৬||

মৈনাক ফিরল বেলা ১২টা নাগাদ। অসীমাভ রেগে ফায়ার হয়েছিল তার ওপর।

-“এই যে, চাঁদু… এতক্ষণ লাগে তোমার একটা ই-মেইল করতে ? নাকি প্রিন্ট-আউট নিয়ে হাতে করে পৌছাতে গেছিলে ব্যাঙ্গালোর ?”

মৈনাক হেসে বলে,

-“আরে না রে… আসলে দিলীপবাবুর সাথে দেখা করে, মেইল করা হয়ে গেলে রতনের সাথে একটু এদিক ওদিক ঘুরছিলাম; আর তাই একটু লেট হয়ে গেল… সরি…”

-“হ্যাঁ, উনি এদিক ওদিক ঘুরছিলেন আর ওনার জন্য আমরা ঘরে বসে আছি…”

-“চল, চল, সরি…”

কোনরকমে নাকে মুখে গুঁজে রাস্তায় বেরোয় পাঁচজনে, মৈনাক, শ্বেতাংশু, অসীমাভ, পল্লবী আর আকমল। অনুপ্রিয়া এবং সমীরা রিপোর্ট লেখার কাজটা এগিয়ে রাখতে চায়; ওদের প্রকৃতি দর্শনের অত ইচ্ছা নেই।

দিলীপবাবু বলেই দিয়েছিলেন, দিনের বেলা, দল বেঁধে বেরোলেও; সঙ্গে যেন কুকুরগুলো থাকে। তাই পাঁচজনে সঙ্গে দু’টো কুকুর নিয়ে বেরিয়েছে। রিসর্টের সামনে জঙ্গলের পাশ দিয়ে যাওয়া রাস্তাটা ধরে, সোজা এগোতে থাকে সবাই। ক’দিন ধরে বৃষ্টি হয়ে একটা চমৎকার সতেজ গন্ধ ছাড়ছে জঙ্গল থেকে; বাতাসেও একটা ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব; সেটার ওপর হাল্কা রোদটা যেন একটা অত্যন্ত মনোরম পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। রাস্তার ধারে আর একটা বাংলো চোখে পড়ল ওদের; দেখে বোঝা গেল এটা সান্তালাবারির সরকারী বনবাংলো। শ্বেতাংশু হাঁটতে হাঁটতেই গান ধরল;

“সানশাইন… অন মাই শোল্ডার মেক্স মি হ্যাপি…”

হাঁটতে হাঁটতে এবার রাস্তার দু’ধারেই শুরু হল জঙ্গল। সেই রাস্তায় যেতে যেতে ওরা গাছের মাথায় প্রথম দেখল নীলকন্ঠ; অসীমাভ ছবি তুলতে পেরে খুশি হয়ে গেল খুব। আরও কিছুদুর যাওয়ার পর দেখা গেল সামনের রাস্তাটা দু’ভাগ হয়ে গেছে। একটা রাস্তা অপেক্ষাকৃত সরু; এবং সামনে ঢালু হয়ে গেছে। অসীমাভ বলে উঠল;

-“চল, আগে সরু রাস্তাটা ধরেই না হয় ঘুরে আসি; তারপর এদিকে যাওয়া যাবে ?”

সে কথায় কেউই আপত্তি করল না; রাস্তাটা ধরে কিছুটা চলার পর, দেখা গেল সেটা ঢালু হয়ে একটা ছোট্ট পাহাড়ি নদীতে গিয়ে মিশেছে; এত বৃষ্টির পরও, জল প্রায় নেই বললেই চলে; নুড়ি আর পাথরে ভর্তি। সবাই মিলে নদীর ধারে বসে, কুকুরগুলোকে ছেড়ে দেয় তখন।

-“বাহ ! এখানে যে এরকম একটা পিকচারেস্ক নদী আছে, সে তো না এলে জানতেই পারতাম না ! এ নদীর নাম কি জানতে হবে…”

-“এর নাম ‘খড়িয়া’; আমি জানতাম না; আজ রতন বলছিল, কাছেই খড়িয়া নদী আছে…”

অসীমাভর প্রশ্নের উত্তরটা মৈনাকই দিয়ে দেয়।

-“ভালোই র‍্যাপো বানিয়েছিস তো, রতনের সাথে…”

মৈনাক হাসে। এমন সময় শোনা যায়, আকমল কার সাথে কথা বলছে ফোনে;

-“না না, সে তো ভারী মুশকিল হয়ে যাবে… আমি কি বলে… এক্সক্যাভেশনে এসেছি তো… না না রাজস্থানে নয়; নর্থ বেঙ্গলে; হ্যাঁ… এখানে কিছু হরপ্পা সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে…”

অসীমাভর চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়, সে ফিস ফিস করেই বলে

-“এই ডাহা ডাহা গুলগুলো কাকে মারছে ভাই !”

ওদিকে আকমল গম্ভীর হয়ে কথা চালিয়ে যায়;

-“না না… ফান্ডিং এখানের না… ফান্ডিং বাইরের… হ্যাঁ, বাইরের ফান্ডিং ছাড়া আমি কাজ করি না… না না আমাদের গভমেন্ট টাকা ক্লিয়ার করতে অনেক সমস্যা করে…”

এবার ওরা হেসে ফেলে, পল্লবীও বাদ যায় না। আকমল বিরক্ত হয়েই ওদের দিকে তাকায়, তারপর আবার ফোনে ফিরে যায়,

-“কোন ইন্সটিট্যুট ? সন্ডার্স-হার্ডিম্যান ইন্সটিট্যুট অফ আরকিওলজি…”

এবার অসীমাভ বিশাল জোরে হেসে ফেলে; আর আকমল বেশ অপ্রস্তুত হয়ে গিয়ে ‘পরে কথা বলছি’ বলে ফোন কেটে দেয়।

-“এভাবে হাসার কি মানে হল ?”

-“কি মানে হল মানে ? তুই টিনটিনের গপ্পের প্লট ঝেড়ে গুল দিবি, আর আমি হাসতে পারব না ? কাকে গুল দিচ্ছিলে, চাঁদু ?”

-“হ্যাঁ, খালি গুল দিচ্ছি, ওই ভেবে যা… কত কষ্ট করে একটা মেয়ে পটাচ্ছি…”

এটুকু বলামাত্র বাকী তিনজন এ-ওর গায়ে ঢলে পরে বেদম হাসতে থাকে, হাসির দাপটে কুকুরগুলো দুর থেকে ছুটতে ছুটতে ওদের কাছে চলে আসে ব্যাপার বোঝার জন্য। ওরা তখনো হেসে চলেছে। শ্বেতাংশু কোনরকমে বলল,

-“ভাই, জল দে, জল খাবো… এখানে আসা ইস্তক এত হাসিনি… ওরে মা রে মা…”

আকমল মুখটা ভার করে বলে ওঠে –“এগুলো বড্ড মুশকিল করিস…”

আর কিছুক্ষণ নদীর পারে বসে, নদীর জলে একটু পা ভিজিয়ে আর নুড়ি কুড়িয়ে আবার ফিরতি পথে চলা শুরু করে ওরা। বড় রাস্তায় ওঠার পড়ে, সেটা ধরেই আবার সামনে চলতে থাকে। আরও কিছুদুর যাওয়ার পর, দেখা যায় একটা চা বাগান। বিরাট বড় একটা সবজে গাছের কারপেট নেমে গেছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। এখানে আসার পড় চা বাগান, চা পাতা তোলার দৃশ্য, ওরা দেখেছে, কিন্তু সবই গাড়ি থেকে; তাই পায়ে হেঁটে চা বাগানে একটু ঘোরার লোভ ওরা কিছুতেই সংবরণ করতে পারল না। তবে আশ্চর্য্যের বিষয় হল, এই চা বাগানে তখন কেউ কাজ করছে না; দেখা যাচ্ছে চা-এর বন থেকে বেরিয়ে সবাই একধারে দাঁড়িয়ে।

-“এখন হয়তো লাঞ্চ চলছে ওদের…” -এই বলে অসীমাভ যেই না বাগানের দিকে পা বাড়িয়েছে, দু’টো কুকুর পরিত্রাহি চিৎকার করতে আরম্ভ করে দিল, শুধু তাই নয়, দু’জনে মিলে এমন ভাবে রাস্তা আগলে দাঁড়ালো , যেন কিছুতেই সামনে এগোতে দেবে না ওদের। কুকুরের চিৎকারে, চা বাগানের সামনের একটা গুমটি থেকে একটা লোক বেরিয়ে এসে বলল,

-“উঁহু, বাগানে ঢুকবেন না… লেপার্ড বেরিয়েছে…”

তখনই বোঝা গেল, লাঞ্চ করতে নয়, আপন প্রাণ বাঁচাতেই, চা এর মোহ ছেড়ে রাস্তার ধারে ভীড় করেছে চাচারা…

সে যাত্রায় আর চা বাগানে ঢোকা হলনা ওদের। আর কিছুটা এগিয়ে গিয়ে, এদিক ওদিক ঘুরে আবার ফিরতি পথে চা বাগানে ঢুকে, ছবি টবি তুলে, রিসর্টে যখন ফিরল, তখন বাজছে বিকেল পাঁচটা।

তারাদা এসে বসে স্যারের সাথে গল্প করছিল; ওদের দেখে কেমন ঘোরা হল সেটা জিজ্ঞাসা করার পর, বলল,

_”কাল তাহলে আমরা ভোর ভোর রাজাভাতখাওয়া বেরোচ্ছি; সারাদিন ঘুরে, একটা ভালো জায়গায় নিয়ে যাব লাঞ্চ করাতে, আর বিকেল বিকেল ফিরব…”

আরও কথা বলতে বলতে বোঝা গেল, লেপচাখার রাস্তা প্রায় পরিষ্কার, কিন্তু কালকের দিনটা গেলে একেবারে ঠিকঠাক হয়ে যাবে রাস্তা। জয়ন্তীরও জল নেমেছে, আর বৃষ্টি না হলে এবার আর সার্ভের পথে কোনও বাধা নেই। বাকী গল্পও হল, খড়িয়া নদী, চা বাগানে লেপার্ড, সবই…

তারাদা চলে গেলেই, আকমল ‘হেবি ঘুম পাচ্ছে’ বলে ঘরে চলে যায়;  স্যার এবার বলেন,

-“কি, মৈনাকবাবু ? কেমন লাগছে ? মনটা আগের থেকে ভালো তো ?”

মৈনাক এ কথায় মাথা নেড়ে হাসিমুখে সম্মতি জানায়।

-“আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, জোয়ান ছেলে, কতই বা বয়স হল ? জীবনে এক-দুবার ল্যাং না খেলে কি আর প্রেমের বেস শক্ত হয় ? এই আমাকেই দেখ না… তোদের কাকীমার সাথে প্রেম-বিয়ে এসবের আগে কলেজে একটা কচি প্রেম আমারও ছিল… টিকেছে ? যেই মাস্টার্স পড়তে গেলাম, বিয়ে করে ভেগে গেল…”

মৈনাক একথায় লজ্জায় লাল হয়ে যায় প্রায়, শ্বেতাংশু অপ্রস্তুতের হাসি হাসে। আরও কিছুক্ষণ হাসিঠাট্টা করার পর, ওরা ঘরে ফেরত যায়। ঘরে ঢুকেই মৈনাক বলে,

-“একটা কথা জানিয়ে রাখি ভাই… সকালে দিলীপবাবুর সাথে কথা হল, ওনারা সারারাত জঙ্গলে কিন্তু কিছু খুঁজে পাননি। রাতে কাঠচেরার মত শব্দটা পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেটার কোনও উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি; যতবার মনে হয়েছে কাছে এসে পড়েছেন, ততবার আবার যেন একটু দুরে নতুন করে শুরু হয়েছে। শব্দটা যেন লুকোচুরি খেলার মত পালিয়ে বেরিয়েছে জঙ্গলের মধ্যে।”

অসীমাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসে পরে ধপ করে, শ্বেতাংশু বলে-

-“শেষে অতীন্দ্রিয় কাঠুরে ?”

-“আমি তো আগেই বলেছিলাম, জঙ্গলের ওই শব্দটা আমার খুব একটা সাধারণ শব্দ বলে মনে হয়না ভাই…”

অসীমাভ বলে,

-“যাকগে, ওসবকে এখন গুলি মারো, আপাতত আমাদের কাজ ডেটা অ্যানালিসিস শেষ করা, আর কাল ভোরে আমাদের গন্তব্য রাজাভাতখাওয়া…”

সেই রাতটা একেবারেই নির্বিঘ্নে কাটে; না জঙ্গলের কোনও শব্দ শোনা যায়, না কান্নার আওয়াজ। খাওয়া দাওয়া আর ডেটার কাজটা শেষ করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে সবাই।

বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের দু’টি মূল অংশ, জয়ন্তী যেটাকে অনেকে বক্সা-জয়ন্তীও বলে থাকেন এবং রাজাভাতখাওয়া। ভোর ভোর বেরিয়ে রাজাভাতখাওয়ার ঢোকা হল সকাল ন’টায়। বৃষ্টি না থাকলেও আজ দু’টো জীপ নেওয়া হয়েছিল। জীপে করে জঙ্গলে ঘোরা হল; নাম ‘টাইগার রিজার্ভ’ হলেও, বেঙ্গল টাইগার যে ডুমুরের ফুল, সেটা সবার আগে থেকেই জানা ছিল, তবে তার পদচিহ্ন দেখা গেল। অসীমাভ প্রশ্ন করেছিল, পায়ের ছাপ থাকলেও বাঘটা দেখা যায় না কেন; উত্তরে তারাদা বলেছিল, একটা প্রাপ্তবয়স্ক বাঘ, একরাতে শিকারের সন্ধানে প্রায় ৬০-৭০ কিলোমিটার হাঁটে, তাই জঙ্গলের অনেকটা অংশ সে হেঁটে ঘুরে ফেললেও, রাতের শেষে নিজের এলাকার গভীরতম অংশেই সে থাকতে ভালোবাসে।

তবে বাঘ দেখা না গেলেও, দেখা গেল বার্কিং ডীয়ার, স্পটেড ডীয়ার, এবং অজস্র পাখি… শখের বার্ড-ওয়াচার অসীমাভ প্রথমে গুনে গুনে পাখির ল্যাটিন নাম কপচালেও, কিছুক্ষণ পরেই খেই এবং হিসেব দুটোই গুলিয়ে ফেলল। তবে সে ছবি তোলে প্রচুর।

দুপুরে তারা দা, তার এক বন্ধুর বাড়িতে খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। সরু চালের ভাত, আনাজ দিয়ে ডাল, কষা পাঁঠার মাংশ, শেষে দই আর মিষ্টি। এক কথায় এলাহি ব্যবস্থা। খাবারের সাথে স্যালাড দেওয়া হয়েছিল, আর স্যালাডের মধ্যে ছিল ছোট্ট ছোট্ট গোল গোল লংকা। মাঝেমাঝেই ট্রেক করতে যাওয়া অসীমাভর ধারণা ছিল ওই লঙ্কায় কি মারাত্মক ঝাল হতে পারে, তাই সে ছুঁয়েও দেখেনি। কিন্তু যখন দেখল শ্বেতাংশু সেদিকে হাত বাড়াচ্ছে, সে বলল,

-“নিচ্ছিস তো… খেতে পারবি ?”

-“ভাই, রোজ লঙ্কা খাই…  খেতে কেন পারব না ?”

-“ভাই, এই লঙ্কা একটা খেলে তোকে আমি নোবেল দেব, দু’টো খেলে অস্কার… আর তিনটে খেয়ে ফেললে তোর পোড়ানোর খরচ আমার…”

তাচ্ছিল্যের সাথে লঙ্কায় একটা কামড় বসানোর পর, শ্বেতাংশু যে লঙ্কাকান্ড শুরু করে সেটা থামাতে লাগে প্রায় ২ লিটার জল আর তিনশো গ্রামের কাছাকাছি দই।

এই গ্র্যান্ড লাঞ্চের জন্য সবাই তারাদা অনেক অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে রিসর্টে ফেরা হয়। আজও বৃষ্টি হয়নি ভাগ্যক্রমে, তাই শুভস্য শীঘ্রম মেনে, কালই লেপচাখার কাজ শেষ করে জয়ন্তীর জন্য তৈরী হতে হবে।

কি মনে হচ্ছে ? ঝড়ের আগে একটু নিশ্তব্ধই লাগে চারদিক… আর এই সিরিজে ব্যবহূত অনেক ছবির মতোই, এটাও শ্বেতাংশুর তোলা, অসীমাভ্র তোলা কিছু ছবিও দিয়েছি… আর দুটো পর্ব… তারপরেই যবনিকা পতন…

Somewhere In the Jungle of North Bengal… Part XV

||১৫||

রতনের সাথে কথা বলে মোটের ওপর খুব একটা কিছু লাভ হয় না ওদের। ডেটার কাজ কিছুটা করে দুপুর নাগাদ ঘুমিয়ে উঠে বিকেলে উঠতেই দেখে, তারাদা এবং দিলীপ বাবু এসে হাজির। হাসিখুশি দিলীপ বাবুর মুখ আজ অনেকটাই গম্ভীর। ওদের কথায় জানা গেল কাল রাত থেকে ওই প্রচন্ড বৃষ্টিতে  লেপচাখার রাস্তায় ধস নেমেছে, আপাতত দিক দু-তিনের জন্য রাস্তা বন্ধ; অন্যদিকে জয়ন্তীতেও জল বেড়ে গেছে; তাই ওই দু জায়গাতেই আপাতত সার্ভেতে যাওয়া যাবে না। এর মধ্যে যদি আবার ওইরকম বৃষ্টি হলে, সেটা সমস্যাটাকে আরো বাড়িয়ে দেবে।

এটা একদিকে ভালো কারণ এই দু-তিন দিন বৃষ্টি না হলে একটু এদিক ওদিক ঘুরে দেখা যাবে; আর খারাপ খবর হল সার্ভের কাজে দেরী হচ্ছে, আর যদি অনেকদিন দেরী হত পারে ভেবেই ফেরার টিকিট কাটা হলেও; সেই আন্দাজের বেশী দেরী হয়ে গেলে তখন সেই টিকিটও বেকার হয়ে যাবে।

স্যার বললেন,

-“অত উৎফুল্ল হওয়ার কিছু নেই; আপাতত যাও, ডেটার কাজ শেষ করে ফেল, তারপর তোমরা তারাশঙ্করের সাথে আলোচনা করে নিও এই দু’দিন কিভাবে ব্যবহার করা যায়।”

তবে আলোচনার দরকার পড়ল না; তারা দা নিজে থেকেই বলে উঠল;

-“কাল আমার হবে না, একটা কাজ আছে থাকব না, পরশু তোমাদের রাজাভাতখাওয়া ঘুরিয়ে আনছি। কাল বরং তোমরা আশেপাশে ঘুরে দেখে নিও দিনের বেলা… ঠিক হ্যায় ?”

ঠিক হ্যায় তো বটেই; বিকল্প তো কিছু নেই। এখন এই দু’দিন বৃষ্টি না হলেই বাঁচোয়া। না হলে কাজের তো দেরী হবেই, উপরন্তু ঘর থেকে বেরোনোও যাবে না। সবাই বসে আড্ডার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন সময় মৈনাক কোথায় উধাও হয়ে যায়। অসীমাভ সেটা খেয়াল করলেও প্রথমে কিছু বলে না, তারপর স্যার সেটা খেয়াল করে হাঁকডাক করতে মৈনাক এসে হাজির হয়, রতনের ঘরের দিক থেকে।

-“কোথায় গেছিলি ?” -স্যার প্রশ্ন করেন।

-“ওই তো স্যার, রতনকে জিজ্ঞাসা করতে গেছিলাম ও কোথা থেকে বাজার করে… ভাবছি কাজ মিটে গেলে ফেরার আগে একদিন জমিয়ে এখানেই একটু ক্যাম্পফায়ার আর পিকনিক করব।”

-“বাহ ! এ তো উত্তম প্রস্তাব ! তা আমি আর তারা নেমন্তন্ন পাবো তো ?” -হাসি মুখে জিজ্ঞেস করেন দিলীপবাবু।

এ কথার উত্তর মৈনাকের বদলে অসীমাভই দেয়;

-“সে আর বলতে কাকু !?  যত বেশী লোক, ততই তো আনন্দ !”

-“এটা এক্কেবারে খাঁটি কথা বলেছ হে…” -সম্মতি জানান দিলীপ বাবু।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে কেটে যায় হাসি-ঠাট্টা আড্ডায়। দিলীপবাবু জানান, আজ রাতে ওনারা আবার সার্চ পার্টি নিয়ে জঙ্গলে ঢুকবেন; কাঠ-চোরের সন্ধানে। কথাটা শুনে মৈনাকরা একবার মুখ চাওয়া চাওয়ি করে নেয় শুধু।

দিলীপবাবু আর তারাশঙ্কর বিদায় নেওয়ার সময় মৈনাক একটা অদ্ভূত প্রশ্ন করে।

-“আচ্ছা কাকু, এ দিকে সাইবার ক্যাফে আছে কোথাও ?”

-“সাইবার ক্যাফে… নাহ… এ তল্লাটে নেই… কেন, কি দরকার ?”

-“ওই আমার একটা মেইল করার ছিল…”

-“মেইল করার ছিল ? তো তুমি একটা কাজ কর, কাল সকালের দিকে আমার অফিসে চলে এস; ওখান থেকে করতে পারবে…”

ওরা চলে যাওয়ার পর, অসীমাভ মৈনাককে জিজ্ঞাসা করে,

-“কাকে মেইল করবি, ভাই ?”

-“বলব, বলব, সব বলব… এখন চল তো… ঘরে যাই…”

সেদিন সন্ধে থেকে রাতে খাওয়া পর্যন্ত, মৈনাক মুখ বুজে কাজ করে যায়; অস্বাভাবিক রকমের গম্ভীর দেখায় তাকে। শ্বেতাংশু আর অসীমাভ বার বার জিজ্ঞাসা করলে একই উত্তর দেয়;

-“কিছু না রে… একটা জিনিস ভাবছি…”

-“কি জিনিস ?”

-“সে পরে বলব’খন…”

রাতে খাওয়া দাওয়ার পরও মৈনাক একইরকম গম্ভীর মুখে কাজ করে থেকে যায়।

-“তোর কি হয়েছে বলবি কি ?” -এবার বেশ রেগেমেগেই বলে ওঠে অসীমাভ।

-“আরে কিছু না রে ভাই… মনটা হঠাৎ করে খারাপ লাগছে; তাই আর কি। কিন্তু তুই চাপ নিস না, কাউকে ফোন বা মেসেজ করব না; তোর দিব্যি।”

-“থাক থাক… অকালে এরকম দিব্যি গেলে দিস না… মরে যাব পট করে… আর কাকে মেইল করতে যাবি রে ?”

একগাল হেসে মৈনাক বলে; আরে আমিই ভুলে গেছিলাম… যাওয়ার আগে একটা ওয়ার্কশপের ইনভাইট এসেছিল; সামনের মাসে IISc ব্যঙ্গালোর-এ… আসার আগে রিপ্লাই করতে হত; পরশু লাস্ট ডেট।

কথাটা যদিও অসীমাভর মনোঃপূত হল না, তবু সে চুপ করে গেল। কাজ চলতে থাকল, এমন সময় আবার রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে শুরু হল সেই ঘাঁষষ্যাঁষে আওয়াজ। কাজ বন্ধ করে চারজনে চুপ করে শোনে সেই শব্দ।

-“আজ দিলীপবাবুরা জঙ্গলে যাবেন বললেন না ? -প্রশ্ন করে পল্লবী।

-“হুঁ। এটার অন্তত কোনও উৎস পাওয়া গেলে হয়। -অসীমাভ স্বগতোক্তির মত করে বলে কথাটা।

মৈনাক উঠে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। অসীমাভ আর শ্বেতাংশু এসে দাঁড়ায় তার পাশে। বাইরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর প্রথম অসীমাভই বলে,

-“যাবি নাকি একবার বাইরে ?”

কেউ এর উত্তর দেওয়ার আগেই পেছন থেকে পল্লবী বলে ওঠে,

-“কেন ভাই ? এত পুরকি কিসের তোদের ? চুপচাপ বস না…”

অসীমাভ বলে,

-“আরে টুক করে যাব আর আসব, তুই একটা কাজ কর; দরজার একটা পাল্লা খুলে দাঁড়িয়ে থাক। ভূতে তাড়া করলে দৌড়ে ঢুকে আসব…”

-“হ্যাঁ, সেই… তোরা বড় হনু, বাইরে বাইরে ঘুরবি, আমি ঘরে বসে থাকব।।”

-“আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে, ঠিক আছে… একটা কাজ করি, মৈ আর অসীম যা, আমি আর পল্লবী দরজা আগলাচ্ছি…”

সন্তর্পণে দরজা খুলে মৈনাক আর অসীমাভ বাইরে বেরোয়। চারপাশ দেখে নিয়ে আস্তে করে দরজার বাইরে পা রাখে। দরজাটা পেরিয়ে একটু যেতেই দু’জনের চোখে পড়ে, মৈনাকের বর্ণণায় ‘হাউন্ড অফ বাস্কারভীল’-এর মত কুৎসিত, ভয়ঙ্কর চেহারার একটা কালো কুকুর চুপ করে বসে আছে সামনে। আর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট-এর একটি কুকুরেরও কোথাও দেখা নেই।

-“মাইরি… কি কদাকার কুত্তা রে ভাই !”

-“হুঁ, কদাকার… কিন্তু ওখানেই বসে থাকে… নড়ে চড়ে না…”

কুকুরটার থেকে নিরাপদ দুরত্ব বজায় রেখে রিসর্টের মূল দ্বারের দিকে এগোতে থাকে দু’জনে।

প্রথম যেদিন, যে পাথরটার ওপর বসে মৈনাক অতীন্দ্রিয় পায়ের শব্দ আর ছাপ প্রত্যক্ষ করেছিল, সেটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় দু’জনে। জঙ্গলের শব্দটা বেশ স্পষ্ট। ভালো করে শুনলে সত্যিই মনে হল, যেন কাঠে কেউ করাত চালাচ্ছে। দু’জনেই অনেক চেষ্টা করে জঙ্গলের মধ্যে কিছু দেখা যায় কিনা । জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ অসীমাভই প্রথম দেখতে পায়, দু’টো জ্বলজ্বলে চোখ। না, সেই মানুষের ছায়ামূর্তির জ্বলন্ত চোখ নয়, মানে জঙ্গলে জানোয়ারের চোখ যেরকম জ্বলে, সেরকম। অসীমাভ মৈনাককে ডেকে দেখায় সেটা।

-“বাঘ নাকি রে ?”

-“বাঘ ? আমার মনে হচ্ছে না… বাঘ এত কাছে এলে গন্ধ পেতাম না ? খুনিয়ায় যেদিন বাইসন দেখলাম, সেদিনও কেমন বোঁটকা গন্ধ পেয়েছিলি, মনে নেই ? আর বাঘ এত কাছে বসে আছে, তার কোনো গন্ধ নেই ?”

-“তাহলে কি ওটা ? ধুর ! ফ্ল্যাশলাইটও আনা হল না ! একটা কাজ কর; আমি এখানে দাঁড়াই, তুই গিয়ে…”

অসীমাভকে কথা শেষ না করতে দিয়েই মৈনাক বলে উঠল

-“না। একদম না… কথা হয়েছিল কোথাও একা যাব না; তো দু’জনেই যাব, গিয়ে টর্চ নিয়ে আসব…”

অগত্যা, দু’জনকেই আবার ঘরের দিকে ফিরতে হয়। ফেরার সময়েও দেখে, কালো কুকুরটা চুপ করে বসে আছে তখনো। ঘরে থেকে টর্চ নিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে, আর চোখদু’টোকে দেখতে পায় না ওরা; ইতিমধ্যে, জঙ্গলের শব্দটাও থেমে যায় আস্তে আস্তে।

বেশ নিরাশ হয়েই দু’জনে ঘরে ফিরে আসে। ফেরার পথে দেখে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট-এর কুকুর গুলো এদিক ওদিক থেকে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে বেড়িয়ে আসছে আর কালো কুকুরটা উধাও।

রাতে আর কিছুক্ষণ কাজ করে, শুয়ে পড়ল সবাই। ঘড়িতে বাজছে তখন রাত দেড়টা। ক্লান্তি যথেষ্টই ছিল, তাই শুয়ে শুয়ে অন্যদিনের মত আর গল্প করা হল না ওদের। শুয়ে কয়েকবার এপাশ ওপাশ করতে করতেই ঘুম এসে গেল।         

 অসীমাভর ঘুম ভাঙল বেলা ন’টা লাগাদ। সুন্দর রোদ উঠেছে, শ্বেতাংশু তার পাশেই বসে আছে, তার ঘুম কাটেনি তখনো পুরোপুরি। আকমল তখনো নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। ঘরে মৈনাক নেই।

-“মৈনাক কোথায় গেল রে ?”

-“জানি না ভাই… আমি তো এই একটু আগে উঠলাম। উঠে থেকে দেখছি ছেলে ঘরে নেই…”

দু’জনে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বাইরে বেরিয়ে স্যারের কাছে জানতে পারে, মৈনাক একটু আগেই, রতনকে সঙ্গে নিয়ে বেড়িয়েছে।

-“কাল বলছিল না, ওর মেইল করার আছে… বলল একটু পরেই ফেরত চলে আসবে। তোরা তৈরী হ’ না… ও তো ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়েছে।”

শ্বেতাংশু আর অসীমাভ ঘরে ফিরে আসে, তৈরী হবে বলে…

<<———————– Read Previous Installment

সবাই কে জানাই ১লা বৈখাশের একাকিত্বের অভিনন্দন। ঘরে বসে বসে পড়ে ফেলুন; আজকের পর আর মাত্র তিনটি অধ্যায়, আর তার পরেই আপাতত উত্তরবঙ্গ কে বিদায় জানাতে হবে। গল্প শেষ হলে বাস্তবের সাথে যোগসূত্র কিছুটা টেনে দেব আমি; কিন্তু আমার হাত পা বাঁধা, কারণ গল্পের চরিত্রগুলোর আসল পরিচয় আমি গোপন রাখতে বাধ্য। কিন্তু দেখুন, শেষটা কেমন লাগে…

%d bloggers like this: