ভূতের রাজা দিল বর

ক্যলাকাটা ইউনিভার্সিটিতে অনার্স পড়ার চেয়ে অনেক সময় মনে হয় লটারির টিকিট কাটা ভালো ছিল। কথাটা বলছি কারণ, নিজে কখনো তিন বছর পর পর এরকম ধারাবাহিকভাবে রেজাল্ট খারাপ জীবনে কখনো হয়নি। শেষমেষ তৃতীয় বছর রেজাল্ট খারাপ করার পর, যখন ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না, কেন এই দূরবস্থা, তখনই এই গল্পটা লেখা। মানে ২০১৩ সালে। তা নতুন দশকের শুরুতে ৭ বছর আগের গল্পের শিশুসুলভ চপলতা এবং প্রগলভতাগুলো আশাকরি আমার অত সীমিত সংখ্যক পাঠকেরা ক্ষমা করে দেবেন।

এবং, অবশ্যই, এই গল্পটা মনে মনে উৎসর্গ করেছিলাম, সত্যজিৎ রায়কে। এবং গতবছর বাংলা ই-পত্রিকা ‘ব্ল্যাকবোর্ড’-এ লেখাটি প্রকাশিতও হয়েছে।

ট্রেনের কামরায় একটা সীটে কোনও রকমে বসে ঘুপচি গরমে সিদ্ধ হতে হতে সোমনাথ ভাবছিল, বাড়ি গিয়ে কোন মুখে দাঁড়াবে মা-বাবার সামনে… মা বাবা ভাইয়ের ব্যাপারটা তো মানা যায়। কিন্তু তিতলি ? কত বড়মুখ করে সবাইকে কত বড় বড় কথা বলে, বাবার সঙ্গে তো প্রায় হাতাহাতি করে কোলকাতায় গেছিল, ফিজিক্স পড়তে। স্কুলের স্যারেরা অবশ্য বলেছিলেন, “তোর হবে। লেগে থাক ফিজিক্স নিয়ে।” কিন্তু সেসব অনেক আগের কথা। তিন তিন বছর পর পর খারাপ রেজাল্ট করার পর, আর প্রথম দু’বছর ইউনিভার্সিটি কে দোষ দিলেও, শেষে আজ মনে হচ্ছে, সব তারই দোষ। তার দোষেই প্রতি বছর রেজাল্ট খারাপ হয়েছে, সে ফিজিক্স কিসসু বোঝে না। ট্রেনের ভীড়ে দম বন্ধ হয়ে আসছে, না তার চারপাশের পৃথিবীটা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে, বুঝতে পারছে না।

বর্ধমান থেকে একটু ভেতরে যেতে হয় স্টেশন থেকে বাস ধরতে হয় আবার। গ্রামে তার বাড়িতে যখন ঢুকল সোমনাথ তখন রাত আটটা। কারোর সাথে প্রায় কিছু কথাই হয়নি তার। মা ভাত দিয়েছে, খেয়ে শুয়ে পড়েছে সে। আর অদ্ভুত এক অস্বস্তিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, খেয়াল নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাবার সাথে দেখা। বাবার সাথে ঝগড়াঝাঁটি করে ফিজিক্স পড়তে গেলেও, বাবা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেন না কখনোই। সাধারন ভাবেই জিজ্ঞাসা করলেন,

-“এবার কি করবি ভাবছিস?”

-“এম. এস. সি-ই করবো বাবা, কয়েক জায়গায় পরীক্ষা দিয়েছি। দেখি সেখানে কি বলে।”

-“বেশ, তবে আমার মনে হয় ওসব না ভেবে, এবার ব্যাবসাটা দেখ। আমার তো বয়স হচ্ছে। আর তোর ভাই তো মাধ্যমিক-ও পাস করেনি। তুই না দেখলে…”

-“ব্যবসা আমার দ্বারা হবে না বাবা, ওসব আমি পারব না। আমি আরও পড়াশোনা করতে চাই। এম.এস.সি পেয়ে যাব কোথাও না কোথাও।”

বাবা একটু অসন্তুষ্ট হয়েছেন বোঝা গেল, তবে তিনি আর কোনও কথা না বলে চলে গেলেন। মা বিশেষ কিছু বলেননি, তবে আকারে ইঙ্গিতে বার বার বোঝাতে চেয়েছেন যে ছেলের ভবিষ্যত নিয়ে তিনি কতটা চিন্তিত। তিতলির সাথে দেখা হল দুপুরে। সে কাছেরই কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে পরছিল, তার রেজাল্ট খুবই ভালো হয়েছে, এমনিতেই তিতলি পড়াশোনা ছাড়া আর কিছুই করে না বলতে গেলে।

-“আবার দিলি তো? সত্যি, খালি গান গেয়ে বেড়া দিনরাত। পড়াশোনা তো করিস না।”

-“বা রে! কোথায় দিনরাত গান গেয়ে বেড়ালাম? মোটে তো তিনটে কম্পিটিশনে নাম দিয়েছিলাম। আর ফার্স্টও তো হয়েছি তাতে।”

-“কৃতার্থ করে দিয়েছ আমাকে। রেজাল্টের কি হবে?”

এবার একটু বেশীই দুঃখ পেল সোমনাথ। সেটা বুঝতে পেরে তিতলিও তাড়াতাড়ি এগিয়ে এল ওর দিকে। দুগালে দুটো হাত দিয়ে সোমনাথের মুখটা ওর দিকে ঘুরিয়ে বলল,

-“আচ্ছা বাবা, সরি। রাগ করিস না প্লিজ। তোর রেজাল্ট খারাপ হলে আমার কতটা কষ্ট হয় বুঝিস তো?”

সোমনাথ মাথা নেড়ে সায় দেয়।

গ্রামের ভেতর দিকে, একটা বাঁশবাগান আছে। সেটার ধারে বসে হাওয়ায় বাঁশ পাতার শব্দ শুনতে ভারী ভালো লাগে সোমনাথের। বিকেলে সেখানে বসে আছে চোখ বুজে, মনটা এখন অনেকটা হালকা হয়ে গেছে। হঠাৎ একটা অচেনা গলার ডাকে, চমকে উঠে সামনের দিকে তাকাল সোমনাথ।

-“কী হে ছোকরা, ব্যাপার কী? চোখবুজে বাঁশবনের কানা ডোম সেজে বসে আছো নাকি?”

একটা অচেনা লোক দাঁড়িয়ে আছে সোমানাথের সামনে। লম্বা, ফরসা, বেশ শার্প চেহারা।  

এরকম অদ্ভুত প্রশ্নে বেশ বিরক্তই হল সোমনাথ। বলল,

-“ডোম সাজতে যাব কেন? এমনি বসে আছি। এ জায়গাটা ভালো লাগে।”

-“মন খারাপ? কেন রেজাল্ট খারাপ হয়েছে বুঝি?”   

সোমনাথ এবার বেশ রেগে মেগে বলে ওঠে,

-“আপনি কে বলুন তো? এত প্রশ্ন করছেন তখন থেকে?”

লোকটা মুচকি হেসে, সোমনাথের পাশে বসল। পাঞ্জাবীর পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল,

-“আজকালকার ছেলেপুলে, বললে কি আর বিশ্বাস করবে, সবতো খালি এটা মানি না, সেটা মানি না, হ্যানা বিশ্বাস করি না, ত্যানা বিশ্বাস করি না…”

-“এই আপনি না বড্ড বাজে বকে চলেছেন তখন থেকে। আপনি কে বলুন দেখি, বিশ্বাস করি কিনা ভেবে দেখব।”

-“বটে? আমি ভূতের রাজা।”

-“ইয়ার্কি মারার জায়গা পাননি?”

-“দেখেছ! বললাম, আজকালকার ছেলেপুলে, এসব মানবে কেন? যত্তসব নাস্তিকের দল।”

-“দেখুন, ফাজলামির একটা লিমিট আছে। আমি পড়াশোনা শিখেছি, কচি খোকা নই, আর আপনি এন্তার ঢপ দিয়ে যাবেন আমায়, আমি বিশ্বাস করে নেব?”

-“কোর না, কে বিশ্বাস করতে বলেছে? গুপি আর বাঘার মত লক্ষী ছেলে আর কটা পাওয়া যায়। এখনকার দিনে তো অসম্ভব।”

হঠাৎ সোমনাথের মনে হল, মজার লোকতো। ঢপ দিচ্ছে দিক, দেখি কোথাকার জল কোথায় গড়ায়। সে বলে উঠল,

-“বিশ্বাস কি করে করব? সবাই জানে ভূতের রাজাকে কেমন দেখতে, আর আপনি দুম করে এসে বলছেন আপনিই তিনি। আপনাকে দেখে তো দিব্যি মানুষ বলে বোঝা যাচ্ছে।”

-“অই। মানিকবাবু আমার সব্বনাশটি করে গেছেন। তিনি তো দিব্যি আলোর তারা-ফারা দিয়ে একটা ফিলিম বানিয়ে দিলেন, আর লোকে ভাবে আমি ওইভাবে আসব। এ কি ফাজলামি না কি? শোন হে ছোকরা, চোখ খুলে আমার বদলে যদি দেখতে, নাকি সুরে গান গাইতে গাইতে একটা আলোর তারা নাচতে নাচতে আসছে, তাহলে কি তুমি এখানে বসে আমার সাথে কথা বলতে, না দৌড় মারতে, অ্যাঁ ?”

না, যুক্তিটা মন্দ বলেনি। ভূতের রাজা হোক ছাই না হোক বুদ্ধি আছে। সোমনাথ এবার একটু মুচকি হেসে ফেলে, বলে,

-“বেশ, বুঝলাম, আপনিই না হয় ভূতের রাজা। কিন্তু আমার কাছে কি প্রয়োজনে আসা মহারাজ?”

-“আমার আর কি প্রয়োজন? প্রয়োজন তো তোর। রেজাল্ট তো খারাপ করেছিস। এখন?”

আচ্ছা মুশকিল! সোমনাথের রেজাল্ট খারাপ হয়েছে, এ জানল কি করে? অবশ্য হতে পারে! ভূতের রাজা তো? হয়তো অন্তর্যামী! সোমনাথ মনে মনে হেসে বলল,

-“এখন আর কি? পটাপট তিনটে বর দিয়ে ফেলুন, তাহলেই তো আমার আর খাওয়া পড়ার চিন্তা থাকে না। ওই যে, কি যেন, ‘যা চাই পড়তে খাইতে পারি, যেখানে খুশি যাইতে পারি’ গানটা মোটামুটি গাইতে পারি, ওটার বদলে বরং অন্যকিছু দিয়ে দেবেন।”

-“তুমি মাইরি, এক নম্বরের গাড়োল। ফিজিক্সের কিসসু বোঝো না। কি যেন বলে, ‘ভরের নিত্যতা সুত্র’ পড়িসনি? গোটা ব্রম্ভান্ডে যদি ভরের পরিমাণ সবসময় এক হয়, তাহলে, হাওয়া থেকে খাবার কি করে তৈরী করা যাবে শুনি? তাতে তাপগতিবিদ্যার মেরুদন্ড ভেঙ্গে যাবে না?”

সোমনাথ এবার চোখ গোলগোল করে অবাক গলায় বলল,

-“বাব্বা! রাজামশাইয়ের বিজ্ঞানের জ্ঞান তো বেশ টনটনে দেখছি! কিন্তু একটা ভূত হওয়া মানেই তো ফিজিক্সের নিয়ম ভাঙা, তাই না?”

-“তোমার মুন্ডু। বলি কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়িসনি? ওয়েভ ফাংশান কাকে বলে? মরা মানে কি? মরা মানে ওয়েভ ফাংশান-এর একটা আমুল পরিবর্তন। অর্থাৎ তখন আর সেটা সময়ের ওপর নির্ভর করে না। চিরন্তন হয়ে যায়। মানে যাকে বলে ‘টাইম ইন্ডিপেনডেন্ট’।”

সোমনাথ এবার বেশ অবাক হল। কারণ শক্তির নিত্যতা সূত্র ক্লাস নাইন-টেনের বাচ্চাও জানে। তা বলে কোয়ান্টাম মেকানিক্স? সে তো এলেবেলের কর্ম নয়। তাই লোকটার প্রতি বেশ উৎসাহিত হয়ে পড়ল সোমনাথ। হাসি হাসি মুখে বলে উঠল,

-“আরিব্বাস! রাজামশাই তো দেখছি ফিজিক্স গুলে খেয়েছেন একেবারে! তা রাজামশাই, কোথা থেকে এত জ্ঞানের ভান্ডার হলেন?”

লোকটি এবার হেসে বলল,

-“আমার জ্ঞান কই রে? এ তো তোরই জ্ঞান। ভেবে দেখ তো, তোর জ্ঞানের বাইরে কিছু বলেছি কি আমি?”

সোমনাথ এবার ইচ্ছে করে, নীজের মুখটা গোমড়া করে বলল,

-“তাহলে বলুন আমাকে বর টর দেওয়ার কোনও ইচ্ছাই আপনার নেই। খালি কথার প্যাঁচ কষছেন সেইজন্য।”

-“তুই ছোকরা বড্ড হ্যাংলা দেখছি। কথা নেই, বার্তা নেই খালি বর দাও, বর দাও। আরে এ কি ছেলেখেলা নাকি? যাকে তাকে কি আর বর দেওয়া যায়? আগে তোকে একটু বাজিয়ে টাজিয়ে দেখি, তবে হ্যাঁ, যা মাগ্যির বাজার চলছে, বেশি চাসনে বাবা, একটা বর তোকে দিতে পারি। ও তিনটে বড় অনেক খরচার ব্যাপার।”

-“খরচা? কিসের খরচা?”

-“ওমা, খরচা না? গুপি বাঘাকে তো যা চাই পরতে খাইতে পারি বলে দিলাম, কিন্তু, মুশকিল দেখ। ফিজিক্সের নিয়ম তো ভাঙতে পারবো না, তাই ট্যাঁকের পয়সা খরচা করে খাবারের যোগান দিতে হয়েছে ছেলেদুটোকে। সে কি কম ঝক্কি?”

-“ওওওওওও! তাহলে আপনার অনেক টাকা, বলুন।”

লোকটা এবার এক হাতে চুল আর অন্য হাতে শার্টের কলার ঠিক করতে করতে বেশ ডাঁটের সুরে বলল,

-“রাজা কি আর এমনি এমনি হওয়া যার রে পাগলা, ট্যাঁকের জোর থাকতে হয়।”

তারপর হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একরকম আঁতকে উঠে বলল,

-“উরিব্বাস! ভোর হয়ে এল রে। আমি উঠি রে, সকালে গিয়ে দরবারে বসতে হবে। আজ আবার মামদোর সাথে মিটিং আছে। চলি রে। কাল দেখা হবে।”

এই বলে লোকটা তড়াক করে লাফিয়ে উঠে, প্যান্টের পেছনটা ঝেড়ে, বাঁশবনের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। সোমনাথ আরও একটু সন্ধ্যে হওয়া পর্যন্ত বাঁশবনের ধারে বসে রইল, আর একটু আগের ঘটনার কথাগুলো ভাবতে ভাবতে, মুচকি মুচকি হাসতে থাকল।

সেদিন রাতে বিছানায় যাওয়ার আগে পর্যন্ত সোমনাথ লোকটার কথা ভাবতে থাকল, আর হাসিই পেল তার। কে লোকটা? ভূত সেজে কতক্ষণ ধরে গাঁজাখুরি বকে গেল? পাগল, না অন্য কিছু? যাই হোক। লোকটার সাথে সাথে আরও একটা কথা বার বার মনে পড়ে ওর। কোয়ান্টাম মেকানিক্স। কি মনে হতে বইটা খুলে পড়তেও বসে। আর পড়তে পড়তে কি ভাবে যে গোটা রাতটা কেটে যায়, জানতেও পারে না সোমনাথ।

-“ভূতের রাজা??? সে তো তুই নিজেই!” হাসতে হাসতে বলে ওঠে তিতলি।

সোমনাথও হাসতে জবাব দেয়,

-“আর তুই তো একটা পেত্নি।”

-“কেন, শাঁকচুন্নি হলে বেশি খুশি হতিস?”

-“হতামই তো। শাঁকচুন্নি হতে গেলে তোকে আগে আমায় বিয়ে…”

কথাটা শেষ না করতে দিয়েই তিতলি খালি মুড়ির বাটিটা হাতে নিয়ে তাড়া করল সোমনাথ কে।

-“দাঁড়া তোকে মজা দেখাচ্ছি!”

গ্রামে থাকলে এইভাবেই দিনরাত খুনসুটি চলে দুজনের। তিতলির তাড়া খেয়ে মাঠের আল বেয়ে ছুটতে থাকে সোমনাথ, তিতলিও তার পিছু ছাড়ে না। দুজনে অভ্যস্ত পায়ে তীরবেগে ছুটতে থাকে, পেছনে পড়ে থাকে সময়ের ভারে জরাজীর্ণ তাদের গ্রাম। একটা রোগগ্রস্ত নুব্জ বৃদ্ধের মত। যেন পেছনে ফেলে আসা অন্ধকারে হারিয়ে যায়। যেন কোনও উজ্জ্বল আলোর দিকে ছুটে চলে দুজনে। বড়রাস্তার প্রায় কাছাকাছি এসে, হাঁপাতে হাঁপাতে দু’জনে আলের ধারে বসে পরে। তিতলি হাতের বাটিটা দিয়ে দু’ঘা বসিয়ে দেয় সোমনাথের পিঠে।

-“ছেলের সখ কত! বিয়ে করবে! যা গিয়ে পড়তে বস। নাহলে ভূতের রাজা বর দেবে না।”

আবার হেসে ওঠে দু’জনে। আবার শুরু হয় হাতাহাতি মারামারি। একটু বাদে দু’জনে বাড়ি ফেরে। তিতলির কলেজ চলছে তখনো, তাই সোমনাথ বাড়ি ফিরে, কি মনে হতে বই নিয়ে বসে। সারা দুপুর আবার কেটে যায় বই নিয়ে। বিকেলে অদ্ভূতভাবে আবার তার মনে পরে যায় ভূতের রাজার কথা। আর এক অদ্ভূত আকর্ষনে সে হাজির হয় সেই বাঁশঝাড়ের সামনে। কারোর দেখা নেই। অভ্যেসমত বাঁশঝারের সামনে জুত করে বসতে না বসতেই, বাঁশঝাড়ের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসে গতকালের সেই লোকটা। সাজপোশাক একই, মুখে লেগে আছে একটা দুষ্টুমি মেশানো হাসি।

-“কি রে? কাল থেকে খুব পড়ছিস মনে হচ্ছে? কোয়ান্টাম মেকানিক্স?”

সোমনাথ মনে মনে একটু অবাক হলেও, মুখে সেটা প্রকাশ না করেই বলল,

-“আপনি ভূতের রাজা হয়ে আমার সামনে ফিজিক্স কপচাবেন, আর আমি ফিজিক্স পড়লেই দোষ?”

-“না না না না! দোষ কেন? দোষ একেবারেই নয়। পড়া তো ভালো, ৬ দিন বাদে যে পরীক্ষা?”

সোমনাথ এবারে বেশ অবাক হয়ে গেল।

-“পরীক্ষা? কিসের পরীক্ষা? আমার পরীক্ষা তো হয়ে গেছে, রেজাল্ট…”

কথাটা তাকে শেষ না করতে দিয়েই লোকটা বলে উঠল,

-“তোর বি.এস.সি. পরীক্ষা যে হয়ে গেছে, সে কি আর আমি জানি না? আমি বলছি আই.আর.আই এর কথা। সে পরীক্ষা তো ৪ তারিখ?”

এবার সোমনাথ বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। হ্যাঁ, ৬ দিন বাদে সত্যিই ইন্ডিয়ান রিসার্চ ইন্সটিট্যুট-এর এন্ট্রান্স। এম.এস.সি.-এর জন্য। ভুলেই গেছিল সোমনাথ। কিন্তু লোকটা জানল কি করে? সোমনাথ বেশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,

-“সেটা জানলেন কি করে?”

লোকটা সে প্রশ্নের উত্তরটা দিলে একটু ঘুরিয়ে,

-“আপনি আপনি বন্ধ কর দিকি। আমাকে না হয় রাজা দা বলে ডাকিস। কতই আর বড় হব তোর চেয়ে? খুব বেশী হলে দু-আড়াইশো বছর। আর জানিস না, ভূতের রাজা অন্তর্যামী?”

সোমনাথ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় লোকটা বলে ওঠে,

-“আইনস্তাইনের আপেক্ষিকতাবাদে, সময়ের ধারণাটা ফ্রেমের ওপর নির্ভর করে কেন রে?”

আচমকা এই প্রশ্নে সোমনাথ কি প্রশ্ন করবে ভুলে গিয়ে, এই প্রশ্নের উত্তরটাই দিতে শুরু করে। আর কখন যে সে ফিজিক্সের জগতে ঢুকে পড়ে আবার, নিজেও বুঝতে পারে না।

পরীক্ষা এগিয়ে আসতে থাকে। আই.আর.আই ভারতের অন্যতম বিখ্যাত একটা প্রতিষ্ঠান, সেখানে কোনোরকমে এম.এস.সি. পেয়ে গেলে, সেটা অত্যন্ত ভাগ্যের ব্যাপার হবে। অদ্ভূতভাবে, রোজই ভূতের রাজা কিছু না কিছু বলে তার পড়ার ইচ্ছাটাকে বার বার উস্কে দিচ্ছে।

হ্যাঁ, “ভূতের রাজা”। যার কাছে যাওয়াটা এখন সোমনাথের কাছে নেশা হয়ে গেছে প্রায়। বর পাওয়ার কথা সে ভাবছে না, কারণ সে ভূত, ভগবান বা অতিপ্রাকৃতিক কোনও বিষয়ে বিশ্বাস করে না, আর পাঁচটা শিক্ষিত ছেলের মতই। আসলে লোকটার সঙ্গে কথা বলতে তার বড্ড ভালো লাগে। ফিজিক্সে জ্ঞান যথেষ্ট। হয়তো পড়াশোনা করেছে অনেক। যাই হোক, রোজ বিকেল হলে তাই লোকটার কাছে না গিয়ে থাকতে পারে না। এক এক করে এগিয়ে এল পরীক্ষার দিন। পরীক্ষার আগের দিনই কোলকাতা রওনা হয়ে গেল সোমনাথ। পরীক্ষা দিতে গিয়ে তার মনে হল, শেষ ক’দিন যে পড়াটা পড়েছে, সেটা না হলে এ পরীক্ষা কোনোভাবেই দিতে পারত না সে। বাড়ি ফিরল সেদিনই বিকেলবেলা। তড়িঘড়ি ছুটল বাঁশবনের ধারে। আজ আর অপেক্ষা করতে হল না, সে দেখল রাস্তার ধারে তার জন্যি অপেক্ষা করছে তার রাজা দা। তাকে দেখেই, সেই চিরপরিচিত হাসি হাসি মুখ করে বলল,

-“বাব্বা! ফাটিয়ে দিয়েছিস তো! ইন্টারভিউ কবে?”

-“কি যে বল! আরও কত ছেলেও তো পরীক্ষা দিল, কত কত পারসেন্টেজ! আমার চেয়ে ভালো কত লোক পরীক্ষা দিয়েছে…”

-“সে হোক। ইন্টারভিউ তে তুই ডাক পাবিই। দেখে নিস।”

-“ও হ্যাঁ! ভুলেই তো গেছিলাম! রাজামশাই তো ত্রিকালদর্শী!”

ভূতের রাজার কথা সত্যি প্রমাণ করল, ৩ দিন বাদে অনীশের ফোন। এন্ট্রান্সে সোমনাথ ফিফথ হয়েছে। দু’দিন বাদে ইন্টারভিউ। ভূতের রাজা সে কথা শুনে বলল,

-“আশীর্বাদ করি, তোর জীহ্বায় যেন আইনস্তাইন অধিষ্টান করেন।”

সেই আশীর্বাদের জোরেই কিনা কে জানে, দু’দিন বাদে ইন্টারভিউতে আই.আর.এস.-এর তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীদের অবাক করে দিয়ে, সোমনাথ আই.আর.এস.-এ ফিজিক্সে এম.এস.সি. পেয়ে গেল। তার পরেরদিন, বাড়ি থেকে বিছানাপত্র গুছিয়ে আবার কোলকাতা আসার আগে, ভূতের রাজা দরবারে আবার হাজির হল সোমনাথ। ভূতের রাজাকে মুখ না খুলতে দিয়েই, সে বলল,

-“অনেকদিন তো ভূতগিরি হল, এবার বল দেখি রাজা দা, তুমি কে?”

একথা শুনে বেশ অনেকক্ষণ হাসার পর, সোমনাথের দিকে তাকিয়ে মুখ খুলল সে,

-“আমার না স্বপ্নময় দস্তিদার। আমার বাবার নাম তন্ময় দস্তিদার। আমি পাশের গ্রামে থাকি। আমার বাবা তোর বাবার বিশেষ বন্ধু। ওঁর মুখেই শুনি, যে তোর রেজাল্ট খারাপ হয়েছে। আসলে আমিও ফিজিক্স নিয়ে পড়েছিলাম, আর আমার রেজাল্টও একেবারেই ভালো হয়নি। এম.এস.সি. পেলাম না, গ্রামে ফিরে এসে কিছুদিন বাবার গলগ্রহ হয়ে তারপর একটা মুদির দোকান খুলি। তোর কথা শুনে ভাবলাম, আমার তো হল না, দেখি তোর যদি কোনরকমে হওয়ানো যায়। ফিজিক্সের খবর টবর রাখি এখনো, শখের খাতিরে, তাই তোর পরীক্ষার কথাটাও জানতে পারি।”

সোমনাথ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে স্বপ্নময় আবার বলল,

-“দাঁড়া, দাঁড়া। কথা শেষ হয়নি। তোর বরটা এখনো দেওয়া বাকি আছে।”

এই বলে সোমনাথের মাথা হাত রেখে, “ভূতের রাজা” বলে,

-“এম.এস.সি. তে খুব ভাল রেজাল্ট হবে। আসি রে। বাড়ি গিয়ে আবার দোকান খুলতে হবে।”

সোমনাথ আর কিছু বলার আগেই, স্বপ্নময় রাস্তা থেকে ধানক্ষেতে নেমে, ‘ভূতের রাজা দিল বর’-এর সুরটা গুনগুন করে ভাঁজতে ভাঁজতে, রোজকার মতই, অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

দু’চোখ জলে ছলছল করছে, তবু মুখের হাসি যেন বাঁধ মানছে না। সোমনাথ পাথরের মূর্তির কত অনেকক্ষণ রাস্তার দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মন্থরগতিতে হাঁটা দিল বাড়ির দিকে।

স্টেশনে বাবা এসেছিলেন সোমনাথ কে ট্রেনে তুলতে। তখনই সোমনাথের খেয়াল পড়ল।

-“বাবা, পাশের গ্রামের তন্ময় দস্তিদার, তোমার বন্ধু তো?”

-“হ্যাঁ, কেন বলতো ?”

-“আরে, ওনার ছেলেকে একটু মিস্টি খাইয়ে দিতে পারবে? আর বোলো না…”

এই বলে সোমনাথ ভূতের রাজার বর দেওয়ার ঘটনা বৃত্তান্ত বাবাকে বলতে থাকে। কিছুদুর শোনার পরই, সোমনাথের বাবার ভ্রু কুঁচকে যায়, মুখ গম্ভীর হয়ে যায়। আর কোনও কথা শোনার মত অবস্থায় তিনি থাকেন না। তাঁর মনে পড়ে যায়, তাঁর বন্ধু তন্ময় দস্তিদার আজ মানসিক ভারসাম্যহীন; কারণ তার একমাত্র ছেলে স্বপ্নময় দস্তিদার, আজ থেকে প্রায় ছ’বছর আগেই ট্রেন দূর্ঘটনায় মারা গেছে।

মতামত, গালাগালি, কমেন্ট বক্স, ফেসবুক বা হোয়াটস্যাপ খোলা রইল।

শান্তির আশায়…

নীল…

Ghost Stories (?)

Spoiler Warning !!!
..
..
..
..
Spoiler Warning !!!
..
..
..
..
Spoiler Warning !!!
..
..
..
..

Stepping into the new decade, the first release that Netflix India saw was the Joint Directorial venture of Anurag Kashyap, Dibakar Banerjee, Zoya Akhtar and Karan Johar.

Now, I could say I’ve been hearing ‘mixed opinions’ about the said movie, but most of them are bashing Ghost Stories about how bad it was. Now, if it was bad-bad, I won’t be spending time writing about it, because as people already know, I never wrote a review for a Salman Khan movie to explain actually how bad it is.

Now, before we delve into the stories presented by these esteemed directors, let’s take a look back to the traditional horror movies that we’ve seen till now.

‘The Exorcist (1973)’, ‘Evil Dead (1981)’ are two cult classics of horror genre. But in between these two, there was Stanley Kubrick’s The Shining (1980), which was bashed by people for not understanding it completely, even by the author of the book Stephen King himself. The movie features a Steller performance delivered by Jack Nicholson. But horror fans and movie buffs hold The Shining for a very high regard today.

In the last decade (He He) was saw some great horror films The Conjuring (2013), Annabelle Creation (2017), The Ring (1 and 2) (2002), Light’s Out (2016), Get Out (2017) and Cabin In The Woods (2011).

If we go further back, there are movies like Rosemary’s Baby (1968), Psycho (1960), Carrie (1976), Nightmare on Elm Street (1984), Halloween (1978).

But, in between, if we take a look, there are movies which we missed, or the audience hated. Movies like Hereditary (2018), The Witch (2015), The Babadook (2015), It Follows (2014) and even Midsommer (2019).

If you take a look how these movies evolved over time, you will see a pattern. Older movies were more and horrors of cosmic kind, and recent are mostly dark, psychological ones. Because previously people materialized their fears into something big, bad terrible and in times unconquerable

But thing is we stop looking for monsters under our bed, once we realize they live inside us. And that’s what modern horror is about. But unfortunately for us, there is no genre for ‘weird’, ‘dark’ or ‘cerebral’ movies. So, we stuck with ‘horror’ we stuck with the name ‘Ghost Stories’.

This Netflix Original ‘Ghost Stories’ has four stories ‘Nurse’, ’Bird’, ’Monster’ and ‘Granny’.

I’ll start chronologically, and save my overall verdict for later.

I was never ‘impressed’ with Zoya Akhtar. ‘Zindegi Na Milegi Dobaara’ and ‘Dil Dhadaakne Do’ seemed like the same film with different premises to me. I even found the shorts for ‘Bombay Talkies’ and ‘Lust Stories’ lackluster (no pun intended). But with ‘Nurse’, things are quite different. With creepy long camera movements and cerebral performance by Surekha Sikri, Nurse is indeed a ‘goosebumps inducing’ traditional horror story. With Janhvi Kapoor doing her best, and delivering a commendable performance. The Mumbai rains and the set pieces play quite the role to set up the atmosphere and with zero jump scare, the slow burn of the fear is really enjoyable.

‘Nurse’ with Surekha Sikri

Next comes ‘Bird’ by Mr. Kashyap. Now, I must admit, I’m a die hard Kashyap fan. So, this review might sound a little biased. First of all, this is also a one woman show. And Sobhita Dhulipala shines as the lead woman. And I think Anurag’s ‘Bird’ is the leap which signifies the paradigm shifts in unnatural movies. The new ‘horror’ genre in Hollywood (and other countries) has been dealing with inner demons, inner horror, and human behavior itself as an element of horror. And here Mr. Kashyap doesn’t disappoint. A woman suffering from mental illness, with a traumatized childhood, a series of miscarriages, and maybe, a female feticide. While exploring the psyche of this troubled woman, Anurag touches on voodoo, obsession all while creating a creepy atmosphere with the washed out and mostly, monochrome color tones. Not a traditional horror and most definitely not a ghost story. But since we do not have a genre names ‘weird’, this most definitely qualify as a modern horror.

Sobhita the Showstopper…

Next comes Dibakar Banerjee, with ‘Monster’. And Banerjee used this opportunity to put the current scenario of our country, and turn it into a horror story (as if we didn’t know!). While brushing up on very traditional horror elements like Cannibalism, Lycanthropy and Zombie Apocalypse. Actually, the premise of his story can be traced back to Norse Mythology (Volsunga Saga). His intents are clear when the little kid (the gen that is Aditya Shetty) explains the rules of survival, ‘those who move gets eaten’, ‘those who speak gets eaten’, ‘those who eat survives’… Brilliant!!!

Aditya Shetty is Love

Gulshan Devaiah was unrecognizable under that heavy prosthetic, and we can only recognize him i in the climax. Actually, if you see closely, the before and after of transformations, you will see, people with less and less humanity turns more grotesque (may not be his intent, just an observation). But the story has an open ending (also my thought). You can interpret your own endings and the inner layer that lies.

Last comes the great Karan Johar. And I could wrap up his segment in one sentence ‘he did not even try’. The Poor man’s Bhansali, Mr. Johar built a ‘K3G’esque set piece, and Put in a Beautiful Woman (Mrunal Thakur) with great dressing sense, her dirty talking BFF (Kusha Kapila), added a song, a ‘Sagai’ and a Wedding and then the Ghost of Granny comes with a climax that left me high and dry.

Now with the verdict. If you like the Dibakar Banerjee segment, you’re definitely against fascists and know how too much power corrupts people. It was brilliant, great and awe-inspiring. But that still was not enough to beat the cinematic brilliance of Anurag Kashyap. Call me crazy, call me biased, but like always, Mr. Kashyap once again brought the winds of much needed change in Indian horror scene. And I hope, it will inspire people to take more leaps of faith creating mind-boggling and goosebumps inducing yet disgusting films, that paves the way for modern horror (read weird, dark). Zoya Akhtar was great with her piece, and I hope to see more and more of her works in this genre. And what to write about Karan? Yes, he recently changed a lot. But the soon he could break out his comfort zone and try something new, the better.

So, the Order is 1. Bird, 2. Monster, 3. Nurse and 4. Granny.

I know most of you won’t agree with me, but I’d like t hear your opinion too. But I think it’s high time we stop looking for logic in supernatural stories and focus on the broader sense of horror. Because the world we live in, has soooo many scarier things than a few dead guys coming back.

              

Peace…

Neel…

Anarchy !!!

Well, one might say that’s not a very nice word to start the year…

But we are way past nice. Don’t you think? Let’s recap what happened in the last few weeks of the last ‘decade’ apparently.

1. The Controversial Citizenship Amendment Bill was brought into the parliament, and materialized as ‘Citizenship Amendment Act, 2019.

2. Many ‘Enlightened’ People (including me), deemed this Act to be Islamophobic, and violates the preamble of Indian Constitution.  

3. Protests broke out in Assam, reports of violence and Police Brutality, and then Assam was cut off from the world with Government Ordered Internet Shutdown.

4. Protest Broke Out in West Bengal, Muslim heavy areas such as Barasat, Budge Budge, Murshidabad, Dhulagarh and Sankrail.

5. Violent Mobs Hurled stones towards train, burnt down buses and train stations.

6. Internet was Shut Down in affected areas of West Bengal.

7. Protest Broke out In Aligarh Muslim University and Jamia Milia Islamia University, reports of Police Brutality, death of a student circulated in social media. A Video allegedly showing ‘Delhi Police Burning Buses’ was shown.

8. Delhi Police debunked the Myth of Student death. As well as burning bus, both were hoaxes.

In West Bengal, nobody was arrested for destruction of Public Property, although the State Government blamed RSS and BJP. Our beloved chief minister organized a rally, which turned into a laugh riot (CAA CAA CHHI CHHI and more…) , meanwhile Indian railway suffered a loss or about 15 Crore in Indian Rupees. Railway Tracks were destroyed and trains were canceled. Our CM deemed this as another ‘insignificant incident’ and blamed railway.

So, let’s see what happened in a Nutshell. The central government in order to whip up more and more Hindu votes, created this façade named CAA. And when riot did break out, the state government of West Bengal stood and watched in order to save the minority votes.

In a single word, it’s a Clusterfuck…

Image Credits : Warner Bros. Entertainment Inc.

In a matter of days after the riots, I’ve seen people convert to BJP, because, everyone loves their own skin the most. Definitely more than the country.

Now, as the Government that destroyed the country’s Economy, and with the reincarnate of Mary Antoinette on charge of the finance ministry, the people need bigger and bigger distractions from the issue. So, a nationwide riot.

Now, as the government that destroyed the state I live in, is running out of ideas to keep us occupied. After several government officials were linked to the Sarada and Rose Valley scams, we saw an exponential rise in the number of Melas in the state. With the ‘Inspiration’ of her majesty, of course. But now the Melas are not even cutting it. And the CAA-inspired-riot, once again, brought the uselessness of our state government out in the open.

People who know me, know, I hate the state and the central government equally. And as the new decade dawns on us, we are in the brink of an Anarchy. People of Making Fun of ‘Superpower by 2020’. But, if I remember correctly, it was Dr. APJ Abdul Kalam’s vision. Such a fine treatment of that man’s memory.

‘A Clown Kills two Wall Street Guys in a Subway, and the Chain of Events Results in Gotham City delving into absolute chaos.’ – That’s the premise of Todd Philips’ Joker. But the thing is, with Clowns in the Street, in the Parliament, and a very offended clown in the Governor’s House, someone will topple the first domino, which will lead to anarchy, and chaos. BE VERY, VERY AFRAID…

Here’s to a new year, and may we survive it… before the domino falls…


Peace (?!@#$%^&*???????)

Neel…      

প্রতিবিম্ব

শীতে জমে গেছি, টাইপ করতে পারছি না, গোছের কিছু লেখা যায়। তার ওপর যখন গত সপ্তাহে ভেবে রাখা দু-দুটো লেখার একটাও শেষ করতে পারলাম না, তখন এ সপ্তাহেও লেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু, কপাল ভালো হাবিজাবি লেখা আমার জমে থাকে সবসময়ই। আজও তারই একটা ছেড়ে দিলুম। ভূতের গপ্পো নয় ঠিকই, কিন্তু এই শীতে গায়ে একটু শিরশির ভাব, লেপটা আর একটু আঁকড়ে ধরে থাকার ইচ্ছে জাগানো একটা লেখা আরকি। পড়ে দেখুন, আশাকরি ভালো লাগবে।

ওপারে…

বাড়ির দরজার ঠিক উল্টোদিকে, দূর্বোধ্য ভাষায় লেখা বিজ্ঞাপনটাকে দেখে, বেশ অবাক হয়ে গেল অমরেশ। সেই একই, মাথার মহাগুনসম্পন্ন তেলের বিজ্ঞাপন। কিন্তু ভাষাটা বোঝা যাচ্ছে না, কন্নড় বা তামিল হবে হয়ত। আশ্চর্য্য! সকালে অফিস বেরোনোর সময় অবধি তো বিজ্ঞাপনটা বাংলাতেই লেখা ছিল। মাত্র ৮ ঘন্টায় এরকম আমূল পরিবর্তন? যাই হোক, ঠোঁটে একটা কটাক্ষের হাসি চলে আসে আপনাআপনি, আর বিড়বিড় করে “বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক” কথাটা বলে, চাবিটাকে তালার গর্তে ধুকিয়ে, ডানদিকে মৃদু একটা মোচড় দিল। তাতে চাবিটা ঘুরল না দেখে, বেশ অবাক হয়ে গেল অমরেশ। প্রায় নতুন ইয়েল-লক, কদিন আগেই অয়েলিং ও করা হয়েছে, তার মধ্যেই এই? এবার মোচড়টা একটু জোরেই দেয় অমরেশ। কি বিপদ! দরজা বা তালার কোনো হেলদোল নেই! এবার বেশ জোরে দুবার মোচড় দিতে গিয়ে, একবার ভুল করে, বাঁদিকে মোচড় পড়ে যায়। অমনি, ‘কট’ শব্দে খুলে যায় তালা, আর মৃদু ঠেলা দিতেই, ক্যাঁচ শব্দে খুলে যায় জানদিকের পাল্লা। বেশ অসন্তুষ্ট ও অবাক হয় অমরেশ। এ আবার কি? খোলার তো কথা বাঁদিকের পাল্লাটা। ডানদিকের টা তো ছিটকিনি দিয়ে আটকানো। ভেতরে ঢুকে দরজাটা টেনে বন্ধ করে বেশ অবাক হয় অমরেশ। নাহ! বাঁদিকের পাল্লাটাতো ছিটকিনি দিয়ে আটকানো। ডানদিকের টা তো নয়! তাহলে নিশ্চয় মিনু, মানে মৃণালিনী, বেরোনোর আগে ভুল করে উল্টোদিকের পাল্লায় ছিটকিনি দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ইয়েল লকটাই বা সমস্যা করছে কেন? উল্টো মোচড়ে খুলছে, দরজাও উল্টো করে লাগানো। কে জানে! তারপরই, সমরেশ এর মনে হয়, কে জানে! হয়তো দরজাটা ওইরকমই। তার নীজের যা ভুলো মন!

দোতলায় নীজের ঘরে ঢুকে, কাঁধের ব্যাগটাকে খাটে ফেলে, হাতঘড়িটাকে রাখার জন্য,  টেবলের ডানদিকের ড্রয়ারটা খুলে এবার বেশ বিরক্তই হল অমরেশ। ড্রয়ারে যত জঞ্জাল আর যন্ত্রপাতি। এটাতো বাঁদিকের ড্রয়ারটা! এ কাজ অবধারিত টিঙ্কুর। সে প্রায়শই ডানদিকের ড্রয়ারটা খুলে বাঁদিকে লাগিয়ে দেয় বাবার সাথে মজা করার জন্য। অমরেশ ড্রয়ার দুটোকে আবার অদল বদল করে দেয়। তারপর বাঁ হাত দিয়ে বুক পকেট থেকে পেনটা বের করতে গিয়ে, আবার ধাক্কা খেল সে। তার বুকের বাঁদিকে কোনও পকেটই নেই! পেন সমেত পকেটটা কি করে তার বুকের ডানদিকে গেল, সেটা ভেবে, অবাক হওয়ার সাথে সাথে এই প্রথম, অমরেশের শিড়দাঁড়ায় একটা হালকা সুড়সুড়ি খেলা করে যায়। সে, একটু যেন ভয় পায়। ডানপকেট থেকে পেনটা বের করার সময় হাতটা একটু যেন কেঁপে ওঠে। কিন্তু বিজ্ঞানের ছাত্র অমরেশ, নীজেই নীজের মনকে ধমক দেয়। হতেই পারে এই শার্টটার পকেট ডানদিকে! তার তো ওরকম দু’একটা শার্ট আছে। হয়তো ভুল করে সেরকম শার্টই পড়ে গেছে অফিসে। আবার, মনের মধ্যে কে যেন বলে ওঠে, আজ বড্ড বেশীই ভুল হচ্ছে তার। ড্রয়ারটা বন্ধ করে, মুখটা সোজা তুলে, এবার যা দেখল অমরেশ, তাতে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল এক সেকেন্ডে। সামনের দেয়ালে ঝোলানো ছিল তার বাবা-মায়ের ছবি। মানে আজ সকাল অবধি ছিল, কিন্তু এখন আর নেই। শুধু তাই নয়, দেয়ালে ছবি ঝোলানোর পেরেকের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। বিদ্যুতবেগে উল্টোদিকে ঘুরে সে দেখল, তার মা বাবার ছবি, আচমকাই দেয়াল বদল করে নিয়েছে। আর, ছবিতে মা আর বাবাও বদল করেছে নীজের জায়গা। মা বরাবরের মত বাঁদিক ছেড়ে বাবার ডানদিকে। অমরেশ দুচোখ কচলে নেই একবার, হাতে চিমটিও কাটে। ব্যাথায় হাতটা সাড়া দিলেও, চোখের দৃশ্য বদল হয় না। নীজের হৃদপিন্ডের শব্দ শুনতে পাচ্ছে অমরেশ। হৃদপিন্ড! তাই তো! বুকে হাত দিয়ে, একটু হলেও আশ্বস্ত হয় অমরেশ। হৃদপিন্ডটা বুকের বাঁদিকেই আছে, আর সেটা প্রাণপনে চেষ্টা করছে, রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে, কর্তার মাথা ঠান্ডা করতে। অমরেশ স্থবিরের মত দাঁড়িয়ে আছে ঘরে মাঝখানে। হাত পা কাঁপছে অল্প অল্প। ঘরের আলোটা যেন সড়ে গেল একদিক থেকে অন্যদিকে। অমরেশ বুঝতে পারল, ঘরের জানলাটাও দেয়াল বদল করে ফেলেছে। সবকিছু যেন অসহ্য হয়ে উঠেছে! অমরেশ যেন একটা অদ্ভূত স্বপ্নের মধ্যে আটকা পড়েছে, যেখান থেকে হাজার চেষ্টা করেও বেরোনো সম্ভব হচ্ছে না। অমরেশ দৌড়ে বাথরুমে গেল। বেসিনটা যথারীতি ডানদিকের বদলে বাঁদিকে, আর বেসিনে রাখা সাবানটাও ঠাঁই বদল করেছে। কলটা খুলতে গিয়ে নাজেহাল হয়ে, অমরেশের মনে পড়ল, ডানদিকে নয়, বাঁদিকে ঘোরালে কলটা খুলবে। মুখে ছপ ছপ করে জল দেওয়ার পড়, আবার নীজের ঘরে ফিরে আসে অমরেশ। নাহ! মুখে মগ মগ জল দেওয়ার পড়েও, সে এখনো সেই দুঃস্বপ্নের জগতেই বাস করছে। অমরেশ এবার মরিয়া হয়ে ওঠে। সে সবকিছু আবার আগের মত করে ছাড়বে। বাঁদিকের ড্রয়ার টা খোলে হাতুড়ি বের করবে বলে। কিন্তু সে দেখল, ড্রয়ার দুটো আবার জায়গা বদল করেছে। রাগে দুটো ড্রয়ারই খুলে, মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিল অমরেশ। জিনিসপত্র সব মাটিতে ছড়িয়ে যায়।  তারপর দেয়ালে একটা পেরেক পুঁততে শুরু করে সে। আর উল্টোদিকে দেয়াল থেকে বাবা মায়ের ছবিটা খুলে, আবার ঘুরতেই দেখে দেয়ালে সদ্য পোঁতা পেরেকের চিহ্নমাত্র নেই। আবার উল্টোদিকে ঘুরে দেখে, তার বাবা মায়ের ছবি দেয়ালে ফিরে গেছে, আর সে খালি হাতে দাঁড়িয়ে। অমরেশ আবার ছবিটা খুলে নেয়, কিন্তু উল্টোদিকে দেয়ালে পৌছোনোর আগেই, সেটা বার বার অদৃশ্য হয় তার হাত থেকে, আর ‘নীজের’ জায়গায় ফিরে যায়। অমরশের আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করতে ইচ্ছে করে। সে উন্মাদের মত গোটা ঘরের জিনিসপত্র তচনছ করতে শুরু করে। ইচ্ছে করে এই দুনিয়ে ছেড়ে পালাতে। এমন সময় বাইরের দরজার লক খোলার, এবং তারপর দরজা খোলার শব্দ হয়। একটি পরিচিত নারীকন্ঠ বলে ওঠে,

-“তুমি কি ফিরেছ?”

গলাটা, অমরেশের স্ত্রী মৃণালিনীর। সে আবার বলে ওঠে,

-“টিঙ্কু কে আনতে গেছিলাম।”

অমরেশের তখন বাহ্যজ্ঞান নেই। ওরা কারা ? কারা পায়ে পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসছে? মিনু আর টিঙ্কু? নাকি তাদের প্রতিবিম্ব? গোটা পৃথিবীটাই কি তাহলে আজ প্রতিবিম্ব? একমাত্র সে ছাড়া? আবার নীজের বুকে হাত রাখে অমরেশ। নাহ! হৃদপিন্ডটা এখনো বাঁদিকেই আছে।

-“একী! এ কি অবস্থা তোমার ঘরের?” – ঘরে দরজায় দাঁড়ানো মৃণালিনী প্রশ্ন করে।

অমরেশ মুখ তুলে তাকালো। আর দেখল, মৃণালিনীর বাঁ গালের তিলটা এখন ডানগালে। অমরেশ থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে প্রায় ফুঁপিয়ে উঠল। মৃণালিনী ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আরো অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,

-“কি হয়েছে তোমার ?”

অমরেশ এক লাফে উঠে, মৃণালিনী আর টিঙ্কু কে টপকে দুড়দাড় শব্দে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামল। পেছন থেকে শুনতে পেল,

-“কোথায় যাচ্ছ? কথা শোনো। কি হল?”

দরজা খুলে রাস্তায় বেরোতেই আর একটা জিনিস বুঝতে পারল অমরেশ। রাস্তার সাইনবোর্ডের লেখাটা বাংলায়। মানে বাংলা লেখা আয়নায় দেখলে যেরকম হয়, ঠিক সেরকম। রাস্তায় গাড়ি বাঁদিকের বদলে ডানদিকে দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু অমরেশ কোনো কথা না ভেবে, কোনো কিচ্ছু না দেখে দৌড়োতে শুরু করল। কিসের থেকে পালাচ্ছে, কেন পালাচ্ছে, সে নিজেই জানে না। কিন্তু থামতে সে পারছে না।, কারণ তাহলেই চোখে পড়বে, আরো কত কি জিনিস, নীজের প্রতিবিম্ব হয়ে গেছে। কতক্ষণ বা কতটা ছুটেছিল জানে না অমরেশ, হঠাৎ বিরাট কিছু সাথে ধাক্কা লেগে সে ছিটকে পড়ল, আর তারপর তার আর কিছু মনে নেই।

যখন জ্ঞান ফিরল, তখন সারা গায়ে, হাতে, পায়ে, মাথায় ব্যান্ডেজ করে হাসপাতালের বেড এ শুয়ে আছে সে। শিয়রের কাছে বসে মৃণালিনী। আর তিলটা? না, বাঁ গালেই। জীবনে এত খুশি আর আস্বস্ত বোধহয় আর কোনোদিনও হয়নি অমরেশ।

-“তোমার কি হয়েছিল কি বলতো?”

মৃণালিনী উদ্বেগ এবং ধমকের সুরে প্রশ্ন করে। মৃদু হেসে, অমরেশ উত্তর দেয়,

-“আজ ক্যান্টিনের খাবার খেয়ে গ্যাস হয়ে গেছিল বোধহয়। আবোল তাবোল জিনিসপত্র দেখছিলাম।”

মৃণালিনী আর কথা বারাবার আগেই, রাউন্ড আপে বেরোনো ডাক্তারবাবু সমরেশ এর কেবিনে হাজির হন। তিনি বেশ হাসি হাসি মুখ করে বলে ওঠেন,

-“এই তো ! Welcome Back to the land of the living! কি বিপদটাই বাধিয়েছিলেন বলুন তো? আপনার হয়েছিল কি ?”

অমরেশ আশ্বস্তির সুরে বলল,

-“কিছু না! আসলে গ্যাস মত হয়ে গিয়ে হ্যালুসিনেট করছিলাম বলে মনে হচ্ছে।”

-“That better be! আপনার CT বা MRI তে তো কোনো দোষ পেলাম না, Apart from the mild concussion. এরকম সমস্যা persist করলে, I’d recommend a psychiatrist.”

-“I don’t think that would be necessary! মানে আমার ফ্যামিলি তে তো কোনো মেন্টাল ইলনেস এর হিস্ট্রি নেই!’

-“Ya, right, talking about medical history, আগে কিরকম ডাক্তার দেখাতেন মশাই! অত বড় মেডিকাল হিস্ট্রি দিয়েছে, But he failed to Mention an important thing!”

-“কি জিনিস? কি Important thing?”

-“আপনার Desxtrocardia আছে! মানে অন্যান্য লোকের মত, আপনার হার্ট, আপনার পাঁজরের বাঁদিকে নয়, ডানদিকে।”

আবার, মতামত জানার অপেক্ষায় রইলাম। কমেন্ট, ফেসবুক বা ই-মেইল এ…

শান্তির আশায়…

নীল…

লেখা হল না…

হ্যাঁ, মশাই… এই প্রথম নয় যে, কথা দিয়ে কথা রাখতে পারিনি। সে হলিউডি কায়দায় ‘Boulevard of Broken Dreams’-ই বলুন, বা পাতি কথার খেলাপ করা, মাইরি বলছি, আমার জেবনের শতকরা ৯০ ভাগ ওই জিনিসেই ভর্তি। রাইটার যদিও আমি নই, কিন্তু অনেক ভেবেও যখন মনোসংযোগ করে লেখা যায় না, তখন সেটাকে রাকিটার্স ব্লক বলেই আখ্যা দেওয়া যায় বটে।

কার্যকরীভাবে এখনো বেকার বলেই হাজার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, তাই লোককে ওই অজুহাতটা দেওয়া খুব সহজ, বলতেই পারতাম, কাল রাতে বাড়িতে ছিলাম না বলে লিখতে পারিনি; কিন্তু যেখানে ছিলাম, সেখানে লেখার সরঞ্জাম সবই ছিল; কিন্তু ব্যাগ থেকে ল্যাপটপটা বের করার ইচ্ছাও হয়নি একবারও।

তাই আজ হয়তো আবার, পোষ্টের নামে একবিঘত লম্বা একটা অজুহাত লিখে সবার সময় নষ্ট করার প্রতিজ্ঞা করেছি।

আমি ছেলেটা জানেন, জীবন থেকে খুব সাধারন এক্সপেক্টেশন নিয়ে চলি। বেশী কিছু চাইনি কোনোদিনই। হ্যাঁ, মনে হতেই পারে, ছেলেটা আজ বলছে সিনেমা তৈরী করছি, কাল বলছে ফটোগ্রাফি করব, আর এখন বুজরুকী করে দাবী করছে ‘কিচ্ছু চাইনি আমি আজীবন…’

ব্যাপারটা কিন্তু আদতে তাই। মানুন বা না মানুন, পৃথিবীতে ওই একটাই কারেন্সি আছে, যেটার কোনো বিকল্প নেই, কোনো কনভার্সান রেট নেই। আর ওই অর্থে সম্পন্ন হলে আর কোনো ধন-দৌলতের দরকার নেই (অন্তত আমার তাই মনে হয়)। তা সেই কারেন্সি যৎকিঞ্চিত আমদানী করেছি বলেই আমার মনে হয়। কিন্তু মাঝে মাঝে সেই হিসাবেই গোলমাল হয়ে যায়। যাদের ভালোবাসী, তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি, গোঁ, জেদ এসবের প্রকোপ পড়লে, আমার পৃথিবীটা তো থরথর করে কাঁপতে থাকে। সবসময় মনে হয় বুঝি সব ভেঙে পড়ল। সব শেষ হয়ে গেল, সব হারালাম। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করার শক্তি হারাই, অবুঝ, অনভিজ্ঞের মতো বোকার মত কাজ করে হিতে-বিপরীত করে ফেলি। তখন কেঁদে কূল পাওয়াও দায় হয়ে ওঠে।

যাঁরা আমায় চেনেন, তাঁরা জানেন। হয়তো মুখে সবসময় যৌক্তিকতার ফোয়ারা ছোটানো আমি, খুব ভীতু, খুব অসহায়, খুব ক্ষুদ্র একটা লোক। খুব হঠকারী একটা লোক। কারোর ওপর রাগ করে থাকতে পারি না, আর হাল ছেড়ে দিতে পারি সহজে। আমি সেই লোকটা, যে অমাবস্যার রাতে গোটা শহরে লোড-শেডিং হয়ে গেলে চিৎকার করে গেয়ে উঠবে ‘আলো আমার আলো ওগো আলোয় ভূবন ভরা…’

প্যানডোরা-এর বাক্সে, শুধু ‘আশা’ পরেছিল। আর ঐ জিনিসটা ত্যাগ করতে কোনোদিন পারিনি, পারব না। তাই আমি জানি যত অন্ধকার, যত লম্বাই রাত হোক না কেন, সেটা শেষ করে ভোরের আলো ফুটবেই। আর রোদের ওম, সকালের প্রথম আলোয় মুখ ধুয়ে আবার বাঁচব আমি… আবার আশা করব, আবার ভালোবাসব, আবার আবার আবার নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করে এক পা এক পা করে এগিয়ে যাব আর একটা দিন যাপন করতে, জীবনের উৎসবে সামিল হতে, সবাইকে নিয়ে, সবার মনের কালো মুছে দিয়ে…

শান্তির আশায়…

নীল…

খেলো…

১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট। কি হয়েছিল, সবাই জানে; আর তার আগের ঘটনা তো অনেক বেশী করেই জানে, নেতাজী, বাঘাযতীন, মাস্টারদা সূর্য্য সেন… দেশের জন্য প্রাণ বলিদান করা সেইসব মানুষদের কথা, আমরা বহুবার শুনেছি, পড়েছি, দেখছি (রূপোলি পর্দায়)। এখন কথা হল, ব্রিটিশরা দেশ ছাড়ার পড়, ১৯৫০-এ সংবিধান প্রতিষ্ঠার পর, দেশের প্রকৃত আইন-কানুন হল, রাষ্ট্র স্বীকৃত পতাকা, সংগীত, গান, সবই হল, এবং বলা হল, রাষ্ট্রের প্রতিক হিসাবে এগুলির মর্যাদা করা জরুরী। আরো অনেক গুলো কথা বলা হল, ‘ধর্মনিরপেক্ষ’, ‘সার্বভৌম্য’ রাষ্ট্রের কথা, চোখবাঁধা আইনের দেবীর দাঁড়িপাল্লার কথা। যেখানে নিক্তি ওজনে সাক্ষ্যপ্রমাণ ওজন করে শাস্তিবিধান করা হয়।

এই সংবিধানই বলে, অপরাধী, ‘ইনোসেন্ট, আনটিল প্রুভেন গিল্টি’। এবং সে যত জঘন্য অপরাধেই অভিযুক্ত হোক না কেন, সংবিধান তাকে আইনি সেবা প্রদান করার অঙ্গীকার করে। তাই মানবতার নিক্তি ওজন যাই বলুক না কেন, কোনো আইনজীবিই যদি কোনো এক অপরাধীকে আইনি সেবা দিতে অগ্রাহ্য করে, তাহলে সেটা হয়তো মানবিকতার খাতিরে ঠিক, কিন্তু সংবিধান অবমাননা নয় কি ? যাক গে যাক, ওসব কথা থাক। আবার ফিরে আসি সেই মোটা বইটার কথাতেই।

 সংবিধান লেখা হয়েছিল, বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য আনার চেষ্টায়। গোটা দেশবাসীর যেখানে ভাষা, ধর্ম, আচার, ব্যবহার সবই আলাদা, তখন তাদের একত্রিত করার একমাত্র সুতো ছিল ওই কন্সটিউশান।

এখন পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা আমাদের এই স্বাধীনতা, আমাদের কারোর কারোর দাদু ঠাকুরদা হয়তো আনতে সাহায্য করেছেন, আমার দেশে আমি বাস করি, যতদূর জানি, ভালোবাসা, মানে সেটা দেশের প্রতিই হোক, বা অন্য কারোর প্রতি, সেটা কিভাবে প্রকাশ করব সেটাও আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখন আমি তো আর ভালোবেসে দেশকে বারবিকিউ নেশনে বুফে খাওয়াতে নিয়ে যেতে পারি না, বা জন্মদিন (মানে স্বাধীনতা দিবসে) শরদিন্দুর বইও উপহার দিতে পারি না। তা তবুও, দেশের প্রতি ভালোবাসা ব্যক্ত করার অনেক উপায়ই আছে, কিন্তু, ওই যে বললাম, সেটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার।

এবার, আমাদের সংবিধান একটি মন্ত্রীসভার দাবী জানায়। এখন আমাদের কপাল হল, আমাদেরই আঙুলের চাপে, যারা সেই মন্ত্রীসভার গদিতে বসে দু’বেলা পাদছেন, তার এমনই মাল, যে আজ ব্রিটিশ আমল হলে, গোটা ইংরেজ সরকারের জুতো ওনারা জিভ দিয়েই চেটে পরিস্কার করে দিতেন। কিন্ত ‘কোথা অযোধ্যা, কোথা সেই রাম ?’ কিন্তু, এ হেন লোকেদের মনে প্রশ্নই উঠতে পারে,

“আমি কি সত্যিই দেশকে ভালোবাসী ?”

এখন, বদ লোকেদের একটা অদ্ভূত বৈশিষ্ট্য আছে, জানেন ? তারা নিজেদের মনে ওঠা প্রশ্নগুলিকে সবসময় অন্যের ওপরে নিক্ষেপ করে নিজের অক্ষমতাটাকে চাপা দিতে চায়। তাই এখানেই ব্যাপার হল তাই। এই লম্বা জীভধারী ব্যক্তিবৃন্দ, প্রশ্নটা নিক্ষেপ করলেন, আমার আপনার ওপর। প্রশ্ন উঠল,

“আপনি কি সত্যিই দেশকে ভালোবাসেন ?”

যখন আপনি-আমি উত্তর দিলাম ‘হ্যাঁ’ তখনই পালটা দাবী এল,

“প্রমাণ করুন”

কিভাবে ?

“আপনি নিজের ট্যাঁকের পয়সা খরচ করে, নিজের হাল্কা চালে গা এলিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে যখনই ছায়াছবি দেখতে যাবেন, আমি আপনার সামনে ‘ন্যাশানাল অ্যান্থেম’ চালিয়ে দেব, আর স্ক্রীনে লিখে দেব ‘প্লিজ রাইজ’ আর আপনাকে গদি থেকে পোঁদ তুলে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করতে হবে, আপনি একজন সাচ্চা দেশপ্রেমিক, আমার মত নকলি নন…”

বিশ্বাস করুন, ১৫ই আগস্ট ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে যখন স্কুলের প্রেয়ার লাইনে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে সবার সাথে যখন জন গন মন তে গলা মেলাতাম না, গায়ে কাঁটা দিত। চোখের সামনে এক এক করে ভেসে উঠত নেতাজি, ভগত সিং, বাঘাযতীনের মুখগুলো। রাস্তায় কোথাও সুরটা শুনতে পেলে সিধে হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তুম।

কিন্তু শেষ কয়েক বছরে এর পরিবর্তন ঘটেছে। যখন একটা সিনেমা হলে ঢুকে, সিনেমা শুরুর আগে প্রেমিকার সাথে ঝগড়া করছি, হাফটাইমে ক্যারামেল পপকর্ণ কিনব, না সল্টেড, বেজে উঠল সেই অতি পরিচিত সুর। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াতে হবে, আর সত্যি বলছি, গায়ে একটুও কাঁটা দেয় না, উলটে মনে হয় ‘দুশশালা… কখন যে শেষ হবে’।  

কিন্তু না দাঁড়ালেও বিপদ। কারণ হলের বাকী লোকেরা গনপিটুনিটা যে অসংবিধানিক সেটা জানেন না, কিন্তু জাতীয় সঙ্গীতের ‘অসম্মান (?)’ যে অসংবিধানিক, সেটা বিলক্ষণ যানেন। তাঁরা যদি মনে করেন, পিটিয়ে আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দেশপ্রেম ঢোকাবেন, তাহলে আমার কিছুই করার থাকবে না।

এ প্রসঙ্গে সাইমন এবং গারফাঙ্কেলের একটা গানের একটা লাইন মনে পড়ছে। গানের নাম, ‘The Boxer’, এবং লাইনটি হল

“…Still a man hears what he wants to hear And disregards the rest…”

তা সংবিধান হল এমন একটা মজার বই, যেটা আসলে এক লাইন জেনে, পরের লাইনটা না পড়লে, সেটা মারাত্মক। তাই আমরা সমানাধিকারের কথা শিখিনি, আমরা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা শিখিনি, আমরা শিখেছি, জাতীয় সঙ্গীত বাজলে দাঁড়াতে হয়, যে দাঁড়াবে না, তাকে পিটিয়ে পাঁপড় করে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দাও…

তাই অন্যের কথায় আমার দেশপ্রেম প্রমাণের চক্করে ‘পাঞ্জাব-সিন্ধু-গুজরাট-মারাঠা-দ্রাবিড়-উৎকল-বঙ্গ’ “খেলো” হয়ে গেল। জাতীয় সঙ্গীত ‘নির্যাতিত সঙ্গীত’ হয়ে গেল।

ক্ষী জ্বালা !!!

শান্তির আশায়,

নীল…

কিউরিও

বলাই বাহুল্য, এই গল্পের সমস্ত চরিত্র কাল্পনিক, কোন কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দেওয়া, বা কোনো মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। তাই আগেভাগেই ক্ষমা চেয়ে নিলুম, যদি মনের অজান্তে এরকম কিছু করে ফেলি।

সিদ্ধার্থ কফির কাপে চুমুক দিয়ে একটা সিগারেট ধরানোর প্রস্তুতি নিল। অভিষেক দেশলাইটা বের করে একটা কাঠি জ্বালিয়ে ধরল তার জন্য।

-“নাহ… এ বৃষ্টি ছাড়ার কোনও নাম নিচ্ছে না। বাপের জন্মে দেখেছিস; মিড ডিসেম্বরে এরকম ধুন্ধুমার বৃষ্টি পড়তে ?”

কথাটা বলে সুনীল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তার কথায় সায় দিতে মাথা নেড়ে রফিক বলে ওঠে;

-“আমাদের ছোটবেলায় এত নিম্নচাপ হত বলে তো মনে হয় না।“

সবাই মৃদু হেসে ওঠে। সিদ্ধার্থর বাড়িতে তাদের ফি-মাসের এই সান্ধ্য আড্ডাটা আজ জমজমাট হওয়ার মত পরিবেশ ছিল পুরোপুরিই। এবারে ঠান্ডাটা পড়েছে বেশ, আর তার ওপর গত দু’দিন ধরে বেদম বৃষ্টি। কিন্তু তাদের আড্ডার পঞ্চম সদস্য এখনো অনুপস্থিত, তাই ষোলকলাটা পূর্ণ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। পাঁচ স্কুলের বন্ধুর এই আড্ডা তাদের একঘেয়ে চাকরিক্ষেত্রের বাইরে একটা বিরাট স্বাধীনতার জায়গা। সেই স্কুলের প্রগল্ভতা, হাসিঠাট্টা সবই যেন এক এক করে ফিরে আসে এই কয়েক ঘন্টায়।

কিন্তু আজ সমরেশ বড্ড দেরী করছে। সবাই ৬ টার মধ্যে এসে গেছে, বৃষ্টি মাথায় করেও; কিন্তু ঘড়ির কাঁটা আটটার ঘরে উঁকি দিলেও, সমরেশ এর পাত্তা নেই।

-“না, ভাই, আমাকে এবার উঠতে হচ্ছে। একটু আগে বেরোলে বৃষ্টিটা এড়াতে পারব। ওলা-উবের তো দূষ্প্রাপ্য এবং দূর্মূল্য, দুটোই হয়ে উঠেছে…”

অভিষেক একটি বাংলা দৈনিক সংবাদপত্রের সিনিয়র জার্নালিস্ট, আর বন্ধুমহলে তার ডাকনাম হচ্ছে রাতজাগা তারা। আজ বৃষ্টির দিনে সে বাইক বের করেনি।

-“তোকে কতবার বলেছি, একটা গাড়ি কেন এবার। আর কতদিন এভাবে চালাবি ?”

-“আরে ভাই। কোথায় থাকি দেখ ! ত্রিসীমানায় কোনো চারচাকা রাখার জায়গা নেই। যাও বা পাওয়া যাচ্ছে, তার থেকে আমার গাড়ির ই এম আই কম পড়বে।”

সরকারী চাকুরে রফিক এবার বলে ওঠে।

-“আরে বাবা, ওসব থাক। কিন্তু সমরেশ আসবে বলেছিল তো ? ওকে ফোন কর না সিধু…”

-“ফোন তো বাবুর সুইচড ওফ। ইটালি গেছিল না ? ওখান থেকে তো আজই ফিরল। আমাকে হোয়াটস্যাপ এ বলল, এয়ারপোর্ট থেকে নেমে বাড়ি গিয়ে লাগেজ রেখেই চলে আসবে।”

-“একবার তনয়াকে ট্রাই করে দেখ না…” -সুনীল উপদেশ দেয়। এবং কথাটা যথাযথ মনে হওয়ায়, সিদ্ধার্থ টেবল থেকে ফোনটা তুলে সমরেশের স্ত্রী তনয়ার নাম্বারে ডায়াল করে।

ওপাশ থেকে সাড়া আসার পর জানা যায় সমরেশ নাকি বাড়ি এসেই হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে গেছে। প্রায় আধঘন্টা আগে।

-“তার মানে বৃষ্টিতে ফেঁসেছে… আজ আর আসতে পারবে বলে তো মনে হয় না… আমি উঠি ভাই…”

এই বলে অভিষেক ওঠার তোড়জোড় করে। সে ফোনটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে অবিন্যস্ত জামাকাপড় ঠিক করার প্রস্তুতি নিতেই কর্কশ শব্দে কলিংবেল-এর আওয়াজে সবার চোখ পড়ে দরজার দিকে;

-“ওই এসেছে…” -এই বলে সিদ্ধার্থ দরজা খুলতেই, দেখল দাঁড়িয়ে সমরেশ।

-“বলছি স্যার, ভেতরে আসব ?”

-“আর ন্যাকামো করতে হবে না, আয়…”

 হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে এল সমরেশ। কাঁধে ব্যাগ, মুখে একটা হাসি।

-“বুওনা সেরাআমিচি মিয়েই…” -বলে সে অদৃশ্য টুপি খোলার ভঙ্গি করে সোফার খালি জায়গাটায় বসে পড়ে।

রফিক একটু ঝাঁঝিয়েই ওঠে…

-“শালা এতো দেরী করে এসে আবার ইতালিয়ান কপচানো হচ্ছে ???”

-“চোটো না বন্ধু, চোটো না… প্লেন ল্যান্ড করা মাত্র ব্যাগভর্তি লাগেজ আর জেটল্যাগ নিয়েও এখানে এসেছি ছুটে। এসে আবার দেখি অভি হারামজাদা যাচ্ছে উঠে…”

-“আবার কাব্যি করছিস ? তোকে…” অভিষেককে কথাটা শেষ না করতে দিয়েই দু’হাত তুলে সমরেশ বলে ওঠে,

-“ক্ষমা ! ক্ষমা বন্ধু, ক্ষমা ক্ষমা ক্ষমা… কিন্তু উঠে গেলে বিরাট একটা জিনিস মিস করতে… মানে বাসী হয়ে যেত।”

কৌতুহলী হয়ে অভিষেক বসে পড়ে। শুধু সে নয়, কৌতুহলটা সবার চোখেই দেখা যায়।

-“তোকে একটু কফি দিই ?” – প্রশ্ন করে সিদ্ধার্থ। জোরে জোরে মাথা নেড়ে নিষেধ করে সমরেশ বলতে শুরু করে…

-“দেখ ভাই, যতবারই কোম্পানির কাজে দেশের বাইরে গেছি, ততবারই তোদের জন্য কিছু না কিছু এনেছি। তা, এবারের একটা জিনিস কিন্তু একেবারেই অভিনব…”

-“জিনিসটা কি ?”

একটা দুষ্টুমি মেশানো হাসি হেসে, সমরেশ তার ভুরুটা নাচিয়ে বলল,

-“ভূতের গপ্পো…”

-“ভূতের গপ্পো ? ইতালিতে গিয়ে ভূত দেখে এলি নাকি ভাই ?” – অবাক গলায় প্রশ্ন করে সুনীল।

-“কতকটা তাই ধরতে পারিস…”

-“কতকটা মানে ? পুরোটা না ?”

-“রোসো…”

এই বলে সমরেশ ব্যাগের চেইনটা খুলে একটা কাপড়ের বড়সড় মোড়ক বের করল, আর সেটা কফি টেবলে রেখে খুলতে বেরিয়ে পড়ল একটা চামড়ায় বাঁধানো মোটা বই। তার ওপর কতগুলো অদ্ভূত ধরনের চিহ্ন। আর ওপরে অজানা ভাষায় লেখা একটা নাম।

-“চেচিদিত লিব্রো… ল্যাটিন… যেটার ইংরেজী তর্জমা করলে দাঁড়ায় ‘Book of the Fallen’ “

-“তা এটা কি সেই ভূতের গল্পের বই, নাকি ? দাঁড়া দাঁড়া… তুই আজকাল ভূতের গল্পের বই, কিউরিও ভেবে কিনছিস নাকি ?”

এবার বেশ শব্দ করে হেসে ওঠে সমরেশ। তার কিউরিও সংগ্রহের শখের জন্য, তাকে প্রায়শই বন্ধুদের টিটকিরি শুনতে হয়। মাঝে মাঝেই হিন্দি শব্দ বলে ফেলা রফিক তার নাম দিয়েছে ‘কাবারীওয়ালা’। হাসি থামিয়ে সে আবার বলল,

-“না ভাই না, বইটা কিউরিও হিসাবেই কিনেছিলাম। কিন্তু এটা পড়ার পর যা বুঝলাম, সেটাতে চক্ষু চরকগাছ হয়ে গেল। মানে বইটি দাবী করছে, এতে কিছু আসল ঘটনার উল্লেখ আছে, কিন্তু এরকম ঘটনা আমি কখনো কোত্থাও শুনিনি।“

-“তা সেটা ঝেড়ে কাশলে হয় না ?” -অভিষেক বলে।

-“হ্যাঁ, সেটাই বলছি। আগে বলুন তো, রফিক সাহেব, ‘লামিয়া’ বা ‘স্ট্রিগোই’ কথার অর্থ কি ?”

রফিকের ভ্রু কুঁচকে যায়। সে কয়েক সেকেন্ড ভাবার জন্য চুপ করামাত্রই, হঠাৎ সুনীল বেশ উত্তেজিত হয়ে লাফিয়ে উঠে বলে;

-“আমি এটা জানি… আরে এ দু’টো শব্দের অর্থ তো এক, ভ্যাম্পায়ার !”

-“ইচেলেন্তে ! আমার পরের প্রশ্ন কিন্তু অধ্যাপক মশাই, আপনার জন্যেই… একটু বলুন তো, হোলি গ্রেইল কি, আর জুডাস কে ?”

-“এ তো খুবই সোজা প্রশ্ন। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের ইন্ডিয়ানা জোন্স অ্যান্ড দ্যা লাস্ট ক্রুসেড এবং তারপর ড্যান ব্রাউনের ডা ভিঞ্চি কোডের পর, হোলি গ্রেইল শব্দটা তো বহুল প্রচারিত। মানে বলা হয় যীশুখ্রিষ্টের লাস্ট সাপার-এ ব্যবহূত পানপাত্র, যাতে তিনি ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর তাঁর রক্ত ধরে রাখা হয়, তাই হল হোলি গ্রেইল। এবার সেটা নিয়ে নানান মিথ প্রচারিত, যেমন সেটাতে জল পান করলে অনন্ত যৌবন লাভ করা যায়, ইত্যাদি ইত্যাদি।“

-“আর জুডাস ?”

-“লাস্ট সাপারের ১৩ নম্বর অংশগ্রহনকারী। ১৩ সংখ্যাটাকে সভ্যতার ইতিহাসে কালিমালিপ্ত করা জুডাস ইসক্যারিওট, যিনি কিনা ১৩ টুকরো রূপো, মানে 13 pieces of Silver এর জন্য যীশুর বিশ্বাসঘাতকতা করেন। কিন্তু যীশু ধরা পড়লে নাকি তার প্রচন্ড বিবেকদংশন হয়, আর তিনি যীশুকে বাঁচানোর চেষ্টা করে, না পেরে শেষে গলায় দড়ি আত্মহত্যা করেন।”

-“ব্রাভো…”

-“আসলে আমার বইটা শুরু হয় ঠিক ক্রুশিফিক্সনের আগের রাত থেকে। বইতে বলা হয় জুডাস ছিল প্রচন্ড ধূর্ত এবং ক্ষমতালোভী। তবে রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়, তার জীবনের লক্ষ্য ছিল একটাই। অমরত্ব।”

-“বটে ! এ কথা লিখেছে নাকি ?” -বলে ওঠে সুনীল।

-“একবার পড়ে দেখবি নাকি ?”

-“মাফ কর ভাই, ইতিহাস পড়াই বলে কি তোমার মত ১২টা ভাষায় ব্যুৎপত্তি হবে আমার ? তুমি বল, আমরা শুনছি।”

একটু হেসে উঠে, আবার শুরু করে সমরেশ।

-“তা ক্রুশিফিক্সনের আগের দিন, এ হেন জুডাসের সাথে দেখা হয় এক সীয়র, মানে জ্যোতিষীর। সে বলে ভগবানের সন্তান, মানে যীশুর ক্রুশে মৃত্যু হলে, এবং তাঁরই পানপাত্রে যদি কেউ তার রক্ত পান করে, তাহলেই তাঁর অমরত্ব প্রাপ্তি হবে। এরপরও, ‘কিন্তু’ বলে সেই জ্যোতিষী কিছু বলতে যায়, কিন্তু আহ্লাদে আটখানা জুডাস সে খবর না শুনেই, প্রায় নাচতে নাচতে ছোটে গভর্নর পন্টিয়াসের কাছে। তার পরের ঘটনা মোটামুটি সবার জানা; মানে যীশুকে ভীড়ের মধ্যে চুমু খেয়ে রোমানদের কাছে কিভাবে ধরিয়ে দেয় জুডাস।”

-“তাহলে আলাদাটা কি হল ?”

-“আলাদাটা এটাই হল, যখন যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়, জুডাস হোলি গ্রেইলটি সংগ্রহ করে এবং, যীশুর রক্ত পান করে। সঙ্গে সঙ্গে তার প্রচন্ড তৃষ্ণা পায়। কোমরের ১৩টি রূপোর মুদ্রা এবং সূর্য্যের আলো তার চামড়া পুড়িয়ে দিতে থাকে। সেই বুকফাটা পিপাসা নিবারণ সে জল, সুরা, কিছু দিয়েই করতে পারে না। শেষে সে তার এক প্রতিবেশীকে হত্যা করে এবং তার রক্ত পান করে। সে হয়ে ওঠে পৃথিবীর প্রথম ‘লামিয়া’।

-“মানে জুডাস, পৃথিবীর প্রথম ভ্যাম্পায়ার ? কিন্তু তারপর ? তারপর কি হয় ?”  -এবার কৌতুহলী রফিক।

-“তারপর ? তারপর অনেক লোকমৃত্যুর পর, রোমানরা জুডাসকে ধরে, তাকে টুকরো টুকরো করে কেটে রূপোর বাক্সে বন্দি করে কোনো এক গোপন স্থানে পুঁতে ফেলে। তবে…”

-“তবে কি ?”

-“তবে, এই বই অনুযায়ী, জুডাসের আত্মার কোনো মৃত্যু নেই। হোলি গ্রেলের সাথেই তার যোগ। হোলি গ্রেইল থেকে কেউ ভুলেও কিছু পান করলে, তার দেহেই প্রবেশ করবে জুডাসের আত্মা। সেটা কোনো রোমানিয়ান কাউন্ট হতে পারে, বা কোনো রাশিয়ান এরিস্টোক্র্যাট। আর তার স্মৃতির ভান্ডারে যোগ হবে, জুডাসের সব ধারিত দেহের স্মৃতি। সেই খৃষ্টজন্মের পরের থেকে।”

-“আর সে দেহ ধবংস হয়ে গেলে ?”

-“আত্মা তো বিদেহী। তাঁকে মারার উপায় তো নেই। তবে, এক্ষেত্রে আছে একটা। আবার প্রশ্ন, ‘স্পীয়ার অফ লঞ্জাইনাস’ কি বস্তু ?”

গল্পের নেশায় মগ্ন সুনীল উত্তর দেয়;

-“আরে বাবা, ওই তো, যে বর্শা দিয়ে ক্রুশবিদ্ধ যীশুকে আঘাত করা হয়, এর আরো নাম আছে, যেমন হোলি ল্যান্স বা স্পীয়ার ওফ ডেসটিনি।”

-“দেহধারী জুডাসের বুকে ওই বর্শা প্রবেশ করালে, তবেই তার মুক্তি।”

-“তার মানে, ভ্যাম্পায়ার একজনই ?”

-“উঁহু… জুডাস চাইলে, অনেককেই নীজের আজ্ঞাবহ রক্তপায়ী পিশাচে রূপান্তরিত করতে পারে। কিন্তু আত্মা একজনেরই। বাকী সবাই তার ইশারায় নাচা রক্তমাংসের পুতুল।”

-“মানে হাইভ-মাইন্ডেড বিয়িংস…” এবার গম্ভীর গলায় বলে ওঠে রফিক।

-“এজাতামেইন্তে !!!”

-“বাহ ! আরে ভাই এ তো একেবারে আনকোরা অরিজিন স্টোরী ! ভালো করে লিখতে পারলে তো পাবলিশিং হাউসগুলো লুফে নেবে। কিন্তু একটা জরুরী প্রশ্ন, বইটা লেখা কার ?” – প্রশ্ন করে সিদ্ধার্থ।

-“অগাস্টাস ভ্যান হেলাডিয়াস…”

-“এ নামটাও তো দেখি কেমন আব্রাহাম ভ্যান হেলসিং-এর মত শুনতে !”

কিছু না বলে মুচকি হাসল আবার সমরেশ।

-“যাক, বেশ অন্য ধরনের একটা কিউরিও তোর কপালে জুটল তাহলে…” – অভিষেক মুখ খোলে।

-“না ভাই, এটা ঠিক কিউরিও নয়… সেটা আর একটা জিনিস…”

-“আর একটা জিনিস মানে ? আবার কি এনেছিস…”

এ কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ব্যাগ থেকে একটা মখমলের ছোট থলি বের করে আনে সমরেশ। আর সেটার থেকে একটা পুরোনো পানপাত্র বের করে রাখে টেবলে। চার বন্ধু সেদিনে অবাক হয়ে চেয়ে দেখে।

প্রায় দশ মিনিট পর, দরজা খুলে বেরোয় সমরেশ। অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। ভালো। পড়া ভালো। জামার বুকে লেগে থাকা চাপ চাপ রক্তটা ধুয়ে যাবে তাতে। নীজের স্ত্রীর রক্ত পান করার আগেই এসেছিল ফোনটা। তার কথা মত মিথ্যে বলে তনয়া ফোনটা রাখার পর তার স্বামীর অদ্ভূত ব্যবহারের কারণ জিজ্ঞাসা করার জন্য উল্টোদিকে ঘুরতেও পারেনি। নিজের বাড়ির চৌকাঠ পেরোনোর আগে স্ত্রীর আনুমতি নিতে হয়েছিল। কারণ নিমন্ত্রন ছাড়া জুডাসের মত বিশ্বাসঘাতককে কেউ বাড়িতে ডাকে না। বৃষ্টির তোড়ে ভিজে যাচ্ছে সবকিছু। ভিজে যাচ্ছে পিঠের ব্যাগ, ব্যাগে রাখা চেচিদিত লিব্রে। ভিজুক। গত দু’হাজার বছরে যে বই কেউ ধ্বংস করতে পারেনি, সামান্য বৃষ্টিতে তার কিছু হবে না। আর কাউকে ভয় পায় না সমরেশ। স্পীয়ার অফ ডেস্টিনি রয়েছে ভিয়েনার জাদুঘরে। তার অবধি সেটা পৌছোনোর কোনো সম্ভাবনাই নেই। শুধু আছে তার দেহ, আর যুগ যুগ ধরে তৃষ্ণার্ত জুডাসের আত্মা।   

ভাল লাগল ? নাকি তারাহুড়োতে একটা খাজা গল্প শোনালাম। কমেন্ট-এ জানান। মেইল করুন, পায়রা পাঠান। আপনাদের মতামতের অপেক্ষায় রইলাম।

ইতি,

নীল…

বাপি

আজ হঠাৎই, মনে হল অনেকদিন আগে লেখা একটা গল্প, শোনাই। গল্পটি আমার মৌলিক লেখা নয়, মূল গল্পটি কার, সেটা জানতে গেলে শেষ অবধি পড়তে হবে। এ জন্মে এই গল্প অন্য কোথাও ছাপানোর আশা করি না; তাই এখানেই দিলাম। কমেন্টে জানাবেন, আপনাদের মতামত।

ছেলেটাকে অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিল মন্মথ। বছরতিনেক বয়স হবে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক চাইছে, কাউকে খোঁজার ভঙ্গিতে। দু-চার পা এদিক ওদিক হেঁটে আশেপাশে দেখার চেষ্টা করল। লোক চারধারে প্রচুর। কিন্তু যাকে খুঁজছে তাকে যে পেল না, সেটা মুখের ভঙ্গি দেখেই বোঝা যায়। এবার ছেলেটা দাঁড়িয়ে পড়েছে। চুপ করে। মুখটা নীচু। বোঝা যাচ্ছে, ফোঁপাচ্ছে। এক্ষুণি কেঁদে ফেলবে হয়তো। এবার এদিক ওদিক ভালো করে দেখে নেয় মন্মথ। হতচ্ছাড়া সিকিওরিটি গার্ডগুলোর কেউ আশেপাশে টহল দিচ্ছে না তো? চারদিক দেখে শুনে, আস্তে আস্তে ছেলেটার দিকে এগোয় মন্মথ।

প্রথম যেদিন একটা বাচ্চাকে এনে বিটুবাবুর সামনে হাজির করেছিল মন্মথ, সেদিন নিজেকে বড় অপরাধী বলে মনে হয়েছিল। হাজার হোক একটা বাপ-মায়ের কোল খালি করে দিল তো? এটা চলেছিল অনেকদিন। অনেক পরে সে বুঝেছে সত্যিটা কি। বা নিজের মনকে সেরকম-ই বুঝিয়েছে। একটা ছেলেমেয়ের মূল্য, তার বাপ-মায়ের কাছে অনেক। তা বাপু সে ছেলেকে সাবধানে রাখতে পারো নে কেন? ছেলেধরাকে সুযোগটা দাও কেন? তাই আজকাল মনে সে অপরাধ বোধটা আর কাজ করে না। একটা ছেলেকে বিটুবাবুর কাছে দেওয়া মানে আজ কারোর কোল খালি হওয়া নয়, তার মানে তার পকেটে আসছে কড়কড়ে দশটি হাজার টাকা। বিটুবাবুও খুশি! মন্মথ যদি দশহাজার পায়, তাহলে বিটুবাবুর পকেটে দশ লাখ আসাও আশ্চর্য কিছু না।

-“কি খোকা? কাকে খুঁজছ?”

কোমরে দুটো হাত দিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে ছেলেটাকে প্রশ্নটা করে মন্মথ। ছেলেটা একটু চমকে উঠে তার মুখের তাকায়। চোখ থেকে দুটো জলের সরু ধারা নেমে এসেছে গালে। এখনো সমানে ফুঁপিয়ে চলেছে।

-“বাপি! আমার বাপি কোথায় গেল?”

-“বাপি কোথায় ছেড়ে গেল তোমায়? বাথরুমে?”

-“হ্যাঁ। আমার তেষ্টা পেয়েছিল। বাপি আমাকে বলল এখুনি আসবে, বলে ওইদিকে চলে গেল।”

এই বলে ছেলেটা আঙ্গুল দিয়ে মলের একটা জনবহুল অংশের দিকে দেখিয়ে দিল।

-“ও! তোমার বাপি কি পড়েছিল গো? কালো…”

কথাটা পুরো শেষও করতে পারে না মন্মথ। ছেলেটা উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠে,

-“তুমি বাপিকে দেখেছ? কোথায় আছে বাপি?”

মন্মথ দেখল, সোনায় সোহাগা! সে বলল,

-“হ্যাঁ, দেখেছি তো! তোমার বাপি তো ওইদিকের দরজা দিয়ে বাইরে গেল দেখলাম। তুমি যাবে, বাপির কাছে?”

-“হ্যাঁঅ্যাঅ্যা! তুমি নিয়ে যাবে আমায়?”

দ্রুত এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে নেয় মন্মথ। নাহ! কোনও সিকিওরিটি গার্ড-এর চিহ্ন পর্যন্ত নেই। তাই মুচকি হেসে সে মৃদু গলায় বলে ওঠে,

-“এস! চল তোমায় বাপির কাছে নিয়ে যাই।”

ছেলেটা অম্লান বদনে মন্মথর হাত ধরে তার সাথে হাঁটা লাগায়। দরজার দিকে। এই দরজার বাইরেই পার্কিং লট, আর তার বাইরে একটা যত সম্ভব অন্ধকার কোণে রাখা আছে মন্মথর গাড়ি। অভ্যাস! তাই অন্ধকার কোন না পেলে গাড়ি রাখতে পারে না মন্মথ।

কথায় বলে না, ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে’; মন্মথর হয়েছে সেই দশা। শেষ মাসে বিটুবাবু পকেট টাকায় টাকায় ভর্তি করে দিয়েছিল মন্মথ। তারই ফলস্বরূপ বিটুবাবু কিছু ‘বোনাস’ দিয়েছিল মন্মথকে। সেই টাকাটার সদগতি করতে বা বলে উচিত স্রেফ ওড়াতে সাউথ সিটি এসেছিল মন্মথ। আর সেখানেও একলা বাচ্চা। এ সুযোগ কেউ ছাড়ে?

-“কৈ? বাপি কৈ?”

মন্মথ এবার একটু অবাক হওয়ার ভান করে বলে,

-“হ্যাঁ, তাইতো! এদিকেই তো আসতে দেখলাম! আবার গেল কোথায়!”

এদিক ওদিক দেখে সে বলে,

-“আচ্ছা, একটা কাজ করি, আমার গাড়িটায় ওঠো, তারপর দুজনে চারধারে একবার চক্কর দিয়ে দেখি, বাপি কোথায় গেল।”

ছেলেটা একমুহুর্ত কি যেন ভাবে। তারপর বলে, আচ্ছা, চল।

মন্মথ ছেলেটাকে নিজের গাড়ির কাছে নিয়ে আসে। কালো রঙের মারুতি ভ্যান। বিটুবাবু কিনে দিয়েছেন গতবছর। আগে তাঁরই একটা অ্যাম্বাস্যাডর চালাতো মন্মথ। পিছনের দরজাটা টেনে খোলে মন্মথ। ছেলেটা উঠে পড়ে। ব্যাস! এবার তুমি আমার জিম্মায়, খোকা! গাড়ির ড্রাইভারের সীটে উঠে ড্যাসবোর্ডটা খুলে, তার বহু পরিচিত হাতকড়াটা বের করে পেছন দিকে মুখ ঘুরিয়ে মন্মথ বলে,

-“তোমার মাথার কাছে আলোর সুইচটা আছে। একটু জ্বালিয়ে দেবে, খোকা?”

ছেলেটা হাত তুলতেই, সীটের ওপর দিকের একটা লোহার মজবুত রডের সাথে ছেলেটার হাত অভ্যস্ত হাতে হাতকড়া দিয়ে লাগিয়ে দিল মন্মথ। বাপরে বাপ! কি চিল চিৎকার করল ছেলেটা! এটা পার্কিং লটের ভেতর হলে এক্ষুনি হাজারটা লোক ছুটে আসতো। মন্মথ হাতটা আবার ফেরত আনার সময় ছেলেটা জোরে কামড়ে দিল মন্মথর হাতে। কি তার দাঁতের জোর! যন্ত্রনায় আঃ বলে এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিল মন্মথ। বাইরের আবছা আলোয় দেখতে পেল হাত দিয়ে রক্ত পড়ছে। পকেট থেকে রুমাল বের করে কোনরকমে হাতে বেঁধে, গাড়িতে স্টার্ট দিল মন্মথ। ওদিকে ছেলেটা হাতকড়াটা খোলার বৃথা চেষ্টা করছে, ঝড়াং ঝড়াং শব্দে সেটা ধরে টানাটানি করে। কোনও কথা না বলে আগে ঠান্ডা মাথায় গাড়িটাকে বের করল বড় রাস্তায়, সাউথ সিটির গ্যাঞ্জাম থেকে দূরে। সোজা বিটুবাবুর গুদামে যাবে। তারপর নিজের হাতের দিকে মন দিতে হবে। বড় যন্ত্রনা হচ্ছে। ওদিকে কানের কাছে একটানা শব্দ হয়েই চলেছে। এবার পেছনে ঘোরে মন্মথ। কড়া চোখে তাকিয়ে বলে,

-“অ্যাই ছোকরা! এ শব্দ বন্ধ করবি?”

ছেলেটা কান্নাভরা, রাগমেশানো এক অদ্ভূত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

-“না, করব না! কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমায়? বাপি তোমায় মারবে কিন্তু। বাপির গায়ে খুব জোর।”

মন্মথ এ কথার কোনও উত্তর দেয় না। শব্দও থামে না। সে এবার ড্যাসবোর্ডটা খুলে বহু পুরোনো হাইপোডার্মিক সিরিঞ্জটা বের করল। বেশ কিছু বেয়াড়া বাচ্চাকে এটা দিয়ে ঘুম পাড়াতে হয়েছে। তবে বেশিরভাগ সময় এটা দেখালেই কাজ হয়। সেটাকে এগিয়ে ধরে মন্মথ বলল,

-“অ্যাই! এটা দেখেছিস তো? ফুটিয়ে দেব, ভালো হবে? তাহলে চুপ করে বোস।”

ছেলেটা এবার সত্যিই ভয় পেল। হাতকড়া ধরে টানাটানি বন্ধ করে দিল। কিন্তু মুখটা আবার সামনে ঘোরানোর আগে একটা জিনিস দেখে বেশ চমকে উঠল মন্মথ। লোহার যে রডে হাতকড়া দিয়ে আটকানো আছে ছেলেটার হাতটা, সেটা একটু বেঁকে গেছে। কি করে হয়ে সেটা? একটা বাচ্চা ছেলে যতই টানাটানি করুক, অত মোটা সলিড লোহার রড কি করে বেঁকে যেতে পারে? আর তাছাড়া, এ গাড়িতে অনেক বাচ্চাকে ওইভাবে নিয়ে গেছে মন্মথ। যে যা খুশি করুক না কেন, রড তো আজ অবধি বেঁকাতে পারেনি! তাহলে? একটু চিন্তিত হয় মন্মথ। এ ছেলের গায়ে অত জোর কি করে আসে? তারপরই ব্যাপারটা বুঝে নিজের মনেই হেসে ওঠে মন্মথ। সেই যে একদিন, ডিসকভারি চ্যানেলে দেখিয়েছিল, কি যেন বলে? এড্রিনালিন রাস না কি যেন একটা? ভয় পেলে লোকজনের শক্তি বেড়ে যায়। সেই হয়েছে। ছেলেটা বড় বেশী ভয় পেয়েছে আসলে। এভাবে মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, পরক্ষণেই মনে হয়, ঢের ঢের ছেলে দেখেছে সে, কেউ কেউ ভয় পেয়ে অজ্ঞান পর্যন্ত হয়ে গেছে, কিন্তু আজ অবধি কাউকে রড বেঁকাতে দেখেনি সে। ব্যাপারটা মনে কেমন খচ্ খচ্ করতে থাকে তার। কিন্তু সেসব ভাবনা আপাতত ধামাচাপা দিয়ে আবার গাড়ি চালানোয় মন দেয়। বিটুবাবুর গুদামে পৌঁছতে আরও ঘন্টা খানেক। বাঁহাত দিয়ে চেপে স্টেয়ারিংটাও ধরা যাচ্ছে না। আর গীয়ার বদলাতে তো রীতিমত কষ্ট হচ্ছে।

-“বাপি কিন্তু আমার গায়ের গন্ধ পায়।”

মন্মথর বেশ হাসি পেয়ে গেল। গায়ের গন্ধ! তাও আবার তিন মাইল দূর থেকে? মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে পেছনে না তাকিয়েই মন্মথ বলল,

-“বটে? তোর গায়ের গন্ধ পায়?”

ছেলেটা তার কোনও উত্তর দিল না। মন্মথও আবার গাড়ি চালানোয় মন দিল। হঠাৎ একবার গীয়ার দিতে গিয়ে হাতে বাঁধা রুমালটা খুলে গাড়ির পাদানিতে পরে গেল। মুখে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে সেটা তুলতে যাবে এমন সময় হাতের ক্ষতটার দিকে চোখ পড়ল তার। পাশাপাশি দু’টো গভীর ফুটো। সে দুটোর মধ্যে দূরত্ব মোটামুটি ছেলেটার চোয়ালের দৈর্ঘ্যের। ছেলেটার কি আর দাঁত নেই নাকি? নাকি ধারের ওই দাঁতদু’টো, ওই যে, ইংরেজীতে ক্যানাইন না কি যেন একটা বলে, সে দুটো কি বড়? রিয়ার ভিউ মিরর দিয়ে সেটা দেখার চেষ্টা করে মন্মথ। সত্যিই তাই বলে মনে হয়। ছেলেটার ঠোঁটের দুধার থেকে উঁকি মারতে চাইছে দু’টো দাঁত। মন্মথ-এর মাথা গুলিয়ে যায়। এরকম জিনিস সে ইংরেজী বইতে ছাড়া দেখেনি কোনদিন। একটু ভয়ও পেয়ে যায়, একটু রাগও হয় তার।

-“বাপি কিন্তু উড়তে পারে।”

এবার মেজাজটা বেদম খিঁচড়ে যায় মন্মথর। তখন থেকে বাপি বাপি… ওফফফফ এবার ধমক দিয়ে বলে,

-“অ্যাই! তোর চিল্লামিল্লি থামাবি এবার? নাহলে ধরে ঠেঙ্গাবো।”

ছেলেটা আবার চুপ করে যায়। কিন্তু মন্মথর মনটা বড় অশান্ত হয়ে পড়ে। লোহার রড বেঁকে গেল! মুখের দুধারের দু’টো দাঁত বড়। এ কাকে তুলেছে সে তার গাড়িতে? এসব ভাবতে ভাবতে অস্থির হয়ে উঠল সে। ফাঁকা রাস্তা, গাড়ি ছুটছে বেশ জোরে। হঠাৎ প্রচন্ড জোরে দড়াম করে একটা শব্দ হয় গাড়ির ছাদের ওপর। আর সমস্ত গাড়িটা কেঁপে ওঠে তাতে। মন্মথর মনে হয় কিছু ভারী জিনিস বোধহয় তার গাড়ির ছাদে পড়েছে। এমন সময় ছেলেটা দু’হাতে হাততালি দিতে দিতে আনন্দে চেঁচিয়ে ওঠে,

-“বাপি এসে গেছে! বাপি এসে গেছে!”

মন্মথ কি করবে ভাবার আগেই, দেখতে পায় একটা বিরাট বড় কালো রঙের ডানার মত জিনিস তার গাড়ির সামনের কাঁচটাকে প্রায় পুরোটাই ঢেকে ফেলেছে। বাধ্য হয়ে জোরে ব্রেক কশে মন্মথ। গাড়িটা পুরোপুরি থামার একটু আগে, তার ডানপাশের জানলার কাঁচ ভেঙ্গে একটা মজবুত হাত ভেতরে ঢুকে আসে। সেটা তার কলারটা চেপে ধরে। তারপর অমানুষিক শক্তিতে তার ডানদিকের দরজাটাকে ভেঙ্গে দরজা সমেত মন্মথকে রাস্তার উল্টোদিকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। রাস্তায় জোরে আছড়ে পড়া মন্মথ। দরজা আর রাস্তার সঙ্গে ধাক্কা লেগে সে সাংঘাতিক ভাবে জখম হয়। কোনরকমে উঠে বসতে চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না, কোমরের নীচ থেকে কোনও সাড় নেই দেহে। একটা চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছে না, বোধহয় ভাঙা কাঁচ ঢুকে গেছে। ডানহাতটা ভেঙ্গে হাড় বেরিয়ে আছে। সারা গা, হাত, পা, রক্তে ভেসে যাচ্ছে তার। সেই অবস্থায়ই সে দেখতে পেল, ‘বাপিকে’। একটা কালো, লম্বা ঝুলের কোট পড়া লোক, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির থেকে বাচ্চাটাকে নামাল। ছেলেটার হাতে হাতকড়া আর নেই। কি বাপি এবার মন্মথর দিকে ফেরে। লম্বা ঝুলের কালো কোট পড়া। চোখদু’টো টকটকে লাল। আর মুখের দুধার দিয়ে বেরিয়ে আছে দুটো বড় বড় দাঁত। যন্ত্রনায় শরীর ভেঙ্গে যাচ্ছে, তবু, কোলকাতায় এসে প্রথম দিকে দেখা একটা ইংরেজী বই-এর কথা মনে পড়ে যায় মন্মথর। ড্রাকুলা। মানুষরূপী রক্তচোষা। ভ্যাম্পায়ার!

-“বাপি দেখো, এই লোকটা আমাকে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিল।”

বেশ রাগী রাগী মুখে মন্মথর দিকে তাকিয়ে একটা আঙ্গুল দেখাচ্ছিল ছেলেটা। বাপি এগিয়ে এসে অবলীলাক্রমে একটিমাত্র হাতে মন্মথর গলা চেপে ধরে তাকে বেড়ালছানার মত শূন্যে তুলে ফেলল। তারপর তার চোখে চোখ রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,

-“ছেলেটা একটা খেলনা চেয়েছিল, তাই নিয়ে এসেছিলাম মলে। সহ্য হল না সেটা? কেন আর লোক পেলি না?”

মন্মথর জবাব দেওয়ার কোনও ক্ষমতা নেই। কোমরের নীচে শরীরের কোনও অংশ আছে বলে মন হচ্ছে না। ডানহাতটা ভেঙ্গে ঝুলছে, আর ধারালো পাঁচটা নখ তার গলায় ছুরির মত কেটে বসেছে। তার মুখ দিয়ে গোঙানিটাও বেরোচ্ছে না ঠিক মত। আবার মন্মথকে মাটিতে আছড়ে ফেলে বাপি। শরীরের ব্যাথা সহ্য করার কোনও ক্ষমতাই আর নেই। মন্মথ দেখতে পায়, ছেলেটা এগিয়ে এসে তার মাথার কাছে বসল।

জ্ঞান আর প্রাণ হারাবার আগে সে শুনতে পেল বাপি তার ছেলেকে বলছে,

-“কি রে? তোর তেষ্টা পেয়েছে তো?”
..


..

..

..

..

স্টীফেন কিং-এর ‘পপসি’ গল্প অবলম্বনে রচিত                     

সামনের পথ…

সবাই এতদিনে জেনে গেছে, যে মাথায় কিছু না এলে, আমি দায়সারা কবিতা লিখে সবাইকে বোর করে থাকি। সবাই মানে আমার সীমিত বা অতিসীমিত পাঠককূলকে। তা আজও যখন কিছুই মাথায় এল না, আর সক্কাল সক্কাল একটা ঢপের সিনেমা দেখে মেজাজটা যারপরনাই খিঁচড়ে গেল, তখন মনের দুঃখকে রীতিমত নিমন্ত্রন করে এনে একখানা কবিতা লিখে এই শনিবারের মত দায়িত্ব সারলুম। এবার বাকি আপনাদের হাতে…

হয়তো, থমকে যাবে পা, হয়তো চেনা গন্ধ লাগবে নাকে…

হয়তো ফিরে তাকাব একবার, অব্যক্ত নীরব পিছুডাকে।

হয়তো শহর ছাড়ার আগে, চেনা পথে পা নিথর হবে;

আর ভেজা চোখ মনে করিয়ে দেবে, শেষ একা হেঁটেছি কবে-

পড়ন্ত বিকেলের রোদ; চুপিসারে, গাল দেবে ছুঁয়ে;

বিদায় জানাবে যেন, আমার কাঁধেই পড়ে নুয়ে।

অনেক স্মৃতির বোঝা হয়তো বাড়াবে ভার পথে-

অনেক ভালোবাসা জড়িয়ে থাকবে গায়ে, হাতে…

তবু রাস্তা যে একমুখি, ফেরার পথ সোজা নয়,

অচেনার অনেক ভীড়ে, অনেক দুঃসাহসীরও লাগে ভয়।

তবু এই পথ চলা, একা, লক্ষ্যটাও হয়তো স্থির আজ-

আর সেই পথে স্থির থেকে, সামনে যাওয়াটাই শুধু কাজ।

তবু চোখে ধাঁধা লাগে, পায়ে পা জড়ায়…

মনের সাম্পান যেন আটকেছে সোহাগের চড়ায়।

চোখে ফের জল আসে, ফের পিছে ডাকে পিছুটান-

কানে কানে বেজে ওঠে ভুলেও না ভোলা সেই গান;

তবু চলে যেতে হয়, সব ফেলে; সব ছড়িয়ে ফেলে আসা পথে;

খামখেয়ালীর পথ, ধরা পড়ে শেকলে, বাঁধা গতে।

শান্তির আশায়…

নীল…

পুনশ্চ : ভাববেন না, “অপ-ঘটনা” নামের সিরিজের কথা আমি ভুলে গেছি। একদমই ভুলিনি। ফর্মটির থেকে বেশ কিছু ঘটনার ব্যাপারে জানতে পারলাম আসতে আসতে আপনারাও জানতে পারবেন। তবে ওই সিরিজের লেখা আগে থেকে ঢাকঢোল পিটিয়ে আসবে না; যখন আসবে, আসবে হঠাৎই… মানে অনেকটা ভূতের মত…

চোপ শা*…

“ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রী এখানে থেমোনা
এ বালুচরে আশার তরণী তোমার যেন বেঁধোনা…”

সলিল চৌধুরী

আচ্ছা, আপনার কি মনে হয়, আপনি এই মূহুর্তে এশিয়ার বৃহত্তম গনতান্ত্রিক, সার্বভৌম, স্বাধীন, সমাজতান্ত্রিক দেশে বসবাস করছন ? তাহলে প্লিজ, আর পড়বেন না। কারণ এরপর আর এগোলে আপনার গাত্রদাহ শুরু হবে, আর আপনি অচিরেই আমাকে খিস্তি করে দেশদ্রোহী মার্কা লাগিয়ে দেবেন। তাই বলছি, মানে মানে কেটে পড়ুন।

যাননি ? আছেন এখনো ? বেশ… তাহলে শুনুন।

আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন টিভিতে একটা কার্টুন দেখতে খুবই ভালোবাসতাম। ডিজনীর ‘ডাক টেইলস’। তো গত বছর, সেই ডাক টেইলস-এর পূনঃসূচনা করা হয়েছে, এবং আংকেল স্ক্রুজের কন্ঠদান করেছেন ডেভিড টেনান্ট স্বয়ং। তা এ হেন সিরিজের রিবুট আমি মিস করব, এত বড় পাষন্ডও আমি হয়ে যাইনি। তা কাল যখন সেটা খুলে দেখতে বসেছি। একটা জিনিস দেখে বেদম মাথা গরম হয়ে গেল। যারা ‘ডাক টেইলস’ আগে দেখেছেন, তারা ‘ওয়েবিগেল’ কে খুব ভালো করেই চেনেন। তা এইখানে ওয়েবিগেল-এর মুখে একটা ডায়ালগ আছে;

I’m going to eat a Hamburger…

বললে বিশ্বাস করবেন না, কে বা কারা ‘Ham’ শব্দটাকে ব্লিপ করে দিয়েছে! মানে দশচক্রে ভগবান ভূত হয়, আর এই কুলোপানা চক্করে হ্যাম খিস্তি হয়ে গেল। মানে, কেন ? কারণ হ্যাম কথাটা কি দোষ করল ?

আমি বলছি কি দোষ করল। ধরুন আপনার খুকি বা খোকা, হ্যামবার্গার কথাটা শুনে সেটা খাওয়ার বায়না ধরল। এবার আপনি তাকে গোমাংশ ভক্ষণ করাবেন না করাবেন না, সেটা একান্তই আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার হওয়া উচিত, তাই না ? কিন্তু এখানে কি হল ? সেই সিদ্ধান্তটা আপনার হয়ে অন্য কেউ নিয়ে নিল।

আপনি ভাবলেন, তাতে কি আর এল গেল… একটা কার্টুনের একটা ডায়ালগে একটা শব্দ যদি বাদই পড়ল, তাহলে কি আর এল গেল ?

নিশ্চয়ই। কিছুই যাওয়া আসার কথা নয়। কিন্তু তারপর কি হল বলুন তো ? সদ্য মুক্তি পাওয়া ‘ফোর্ড ভার্সাস ফেরারী’ ছবিতে যত মদের গ্লাস ছিল সব ব্লার করে দেওয়া হল। কেন ? সিনেমাটিতো ঠিক ‘চিল্ড্রেন্স ফিল্ম’ বলে আখ্যা পেয়েছে বলে আমার জানা নেই। আর যারা সেই সিনেমা দেখতে যাচ্ছে, তাদের মাথায় এইটুকু বুদ্ধি আছে আমি আশা করি, যে লোকে ডিনার করতে করবে কপিল মুনীর ভাঙের শরবত বা প্যারামাউন্টের ডাব মালাই খাবে না।

এর অন্য মানে বের করবেন না; আমি মদ্যপান করি না, কারোর মদ্যপান করা সমর্থনও করি না। মানে, আমি মনে করি মদ খেলে লিভার খারাপ হয়, চরিত্র না। কিন্তু তা বলে কেউ মদ খেলে রাম নাম করে চোখ বুজি না, বা তার নামে খাপ পঞ্চায়েত ও বসাই না। আমি মনে করি, যে যার পয়সায়, স্বেচ্ছায় যা খাচ্ছে, খাক… আমার পরিচিত কেউ খেলে, আমি বারণ করব, বুঝিয়ে বলব। সে আসক্ত হয়ে গেলে দরকার হলে নেশামুক্তি কেন্দ্রেও নিয়ে যাব। কিন্তু গোটা দেশের কোটি কোটি লোক মদ্যপান করল কি করল না, সেটার নির্ধারণ করার আমি কেউ না, যে একদল অশিক্ষিত, মূর্খ, গাধার দল পার্লামেন্টে বসে দেশ চালানোর নামে সাট্টা খেলছে, তারা তো নিশ্চিতভাবে না।

নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রন আইন লাগু হয় ১৮৭৬ সালে। গ্রেট ন্যাশানাল থিয়েটারের অনেক নাটককে ‘অশ্লীল’ এবং ‘দেশদ্রোহী’ ঘোষণা করে গিরিশ ঘোষ সহ অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়। হিটলারের কথায় যাচ্ছি না, এই ঘটনা ঘটেছিল খোদ আমাদের শহরে। নাটকের ভয়ে ব্রিটিশ সরকার কলাকুশলীদের মুখ বন্ধ করতে চায়।

এটা যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে, মানে কেউ মুখ খুললেই আগে মুখ বন্ধ কর। মারধর কর। হোস্টেলের ফি বাড়ানোর প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ মিছিল, তার ওপর আলো নিভিয়ে লাঠি চালাও। নকল ভিডিও তৈরী করে ছাত্রনেতাকে জেলে ভরো, তার বক্তব্যের সততার ওপর প্রশ্ন তোলো। কিন্তু ব্যাপার হল, আমরা এখন যে ‘জেনারেশন’-এর ছেলেপুলে, আমরা ইন্টারেনেট স্পীড কম হলে সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড করিয়ে দিই, তো বার বার আমাদের ‘চুপ কর’ ‘চুপ কর’ বলে শাসন করা যাবে বলে কার মনে হয় ? মুখ বন্ধ করা যদি অতই সহজ হত, তাহলে তো আজও ভারত ইংল্যান্ডের কলোনীই হয়ে থাকত, তাই না ?

দেশের যাবতীয় দূর্দশার হাল যুবসমাজের ঘাড়ে চাপিয়ে, হাত ধুয়ে ফেলা ব্যাপারটাও আজকের নয়। যুগে যুগে হয়ে এসেছে। চুল না পাকলে কথার ওজন বাড়ে না, কথায় আমল দেয় না কেউ। আজও তাই হচ্ছে, স্বয়ং অর্থমন্ত্রী যখন প্রেস কনফারেন্স ডেকে বলতে পারেন, অটোমোবাইল সেক্টরে মন্দা এসেছে যুবসমাজের জন্য; তখন বুঝতেই হবে যে অন্য সব অজুহাত ফুরিয়ে গেছে। যুবসমাজ নাকি ভেপিং বা ইলেক্ট্রনিক সিগারেটের দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে ধূমপায়ী হয়ে পড়ছে; তাই ভেপিং মেশিন বা ই-সিগারেট ব্যান হল। কেন ‘যূবসমাজ’ কি পনেরো টাকা দিয়ে গোল্ডফ্লেক কিনে খেতে পারে না ? সেটা তো যতদুর জানি ভেপিং মেশিনের থেকে সস্তা ! কিন্তু না…    সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুললেই ‘দেশদ্রোহী’, ‘আর্বান নক্সাল’ ইত্যাদি ডিগ্রী গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে; আর আজ তো শুনলাম হোম মিনিস্টার নাকি সি আর পি এফ কে আর্বান নক্সাল দমনের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তা একটু ভেবে দেখুন, এই আর্বান নক্সাল কে বা কারা হবে ?

এই, আমি… বা আমার মতো ছেলেমেয়েরা, যারা চুপ থাকতে পারে না, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক বন্ধ হয়ে গেলে যাদের গায়ে লাগে, ভারত পেট্রোলিয়াম বিক্রী হয়ে গেলে যারা সরকারের অপদার্থতার দিকে আঙুল তোলে। পতনশীল জিডিপি-এর জন্য যারা সরকারী নীতির সমালোচনা করে। কাল যে একজন জওয়ান এসে আমার পশ্চাতদেশে বেয়োনেট ঢুকিয়ে দেবে না, তার কি নিশ্চয়তা আছে ?

এবার আসি শেষ কথায়। প্রায় ২০১৫ সাল থেকে ইউটিউবে কদর্যভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে চলেছে শ্রী রোদ্দুর রায়। মাঝে মাঝে তাঁর দু-একটা গান চর্চায় আশে। এবং তার মধ্যে হালে যেটা এসেছে, সেটা হয় ‘সেদিন দু’জনে দুলেছিনু বনে’। গানটির ভিডিওতে তিনি গেয়েছেন

‘শালা চাঁদ উঠেছিল গগনে, বাঁড়া চাঁদ উঠেছিল গগনে, বাঞ্চোদ চাঁদ উঠেছিল গগনে…’

এখন প্রচুর লোকের গোপনাঙ্গের কেশ-এ যাকে বলে ‘স্পন্টেনিয়াশ কমবাশান’ শুরু হয়ে গেছে এই গান শুনে। কেউ বলছেন রাস্তায় ফেলে পেটাও কেউ বলছে গায়ে ল্যাংটো বাংলা পক্ষ ছেড়ে দাও। আর কেউ ‘ধুর ও পাগল’ বলে হেসে উড়িয়ে দিচ্ছে।

এখন কথা হল, রবীন্দ্রনাথের কপিরাইট যখন নেই, তখন এত গায়ে লাগছে কেন ? জানি উত্তরগুলো, ‘উনি বিশ্বকবি’, ‘উনি বাঙালির ইমোশান’, ইত্যাদি ইত্যাদি… তা দাদা/দিদিরা, রবীন্দ্রনাথের গানের যখন আপনারা এতবড়ই বোদ্ধা, তাহলে যখন নচিকেতা-অঞ্জন দত্ত ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’ গানটাকে দাদরার বদলে কাহারবা তালে গাইলেন তখন আপনাদের গা কি জ্বলনাঙ্কে পৌছোয় নি ? যখন লোকে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে আরো হাজারগন্ডা ছ্যাঁচড়ামো করেছে, তখন কি হয়েছিল আপনাদের ? না কেন, ওরা দু’টো খিস্তি ঢুকিয়ে দেয়নি বলে ? মানে খিস্তিটাই মূল, তাইতো ? ওসব অবমাননা, ইমোশন ওগুলো শুধু কথার কথা ?

তা এবার আমি একটা খিস্তি খাওয়ার মত কথা বলি ? বলছি, দাদা/দিদি, আর কতদিন ? শুধু সংস্কৃতির নামে অতীত আঁকড়ে ধরে থাকলে কি লাভ হবে ? আমি সিনেমার কথা আগেও বলেছি। গানের রিমিক্স, রিমেক করে, বাংলা গানে খুচরো এবং পাইকারি দরে অন্য শব্দ ঢুকিয়ে, আর ২৫শে বৈশাখে কবিগুরুর ছবিতে মালা দিয়ে এখনো গোটা ভারতীয় সংস্কৃতির পৃষ্ঠদেশে পোষকতা করছি, বললে হবে ?

ভাবুন, দাদা/দিদি, ভাবুন। রোদ্দুর রায়কে খিস্তি করার আগে ভেবে দেখুন, রবীন্দ্রনাথকে আপনি কতটা সম্মান দিয়েছেন সারাজীবনে ? যে লোকটা সাহিত্যে নোবেল (যেটা এই দেশে আর কেউ পাননি) পেয়েছিলেন, তাঁর সম্পর্কে আপনি ঠিক কতটা জেনেছেন, কতটা শ্রদ্ধাশীল। বেসুরে, নোট চেঞ্জ করে গান গাওয়া পাবলিকদের কিন্তু আপনি অ্যাভয়েড করেন, পেটাবো ভাবেন না। দাঁড়িপাল্লাটাকে সমান করতে শিখুন। এখানেও কিন্তু একটা বাক-স্বাধীনতার (এবং আপনার যোগ্যতার) কথা ঢুকে বসে আছে।  

শান্তির আশায়…

নীল…   

পুনশ্চ : প্রথম লাইন দুটো আমার সামান্য শ্রদ্ধাঞ্জলী, তাঁর প্রতি, যিনি আজও আমাদের মাঠঘাট-বন পেড়িয়ে আশা আহ্বান শোনার সাহস জোগান। আজ যিনি বেঁচে থাকলে হয়তো আমারও অনেক আগে ‘আর্বান নক্সাল’ বলে খ্যাত হতেন।

‘অপ’-ঘটনা – প্রথম পর্ব

ভূত মানে ‘অপদেবতা ‘ আছে না নেই, সেই বিষয়ে আমার মতামত অনেকটাই মহেশ মিত্তিরের মতো, অর্থাৎ ইশ্বর = ০, আত্মা = ভূত = √০। কিন্ত, আমি মনে করি মহেশ মিত্তিরের সাথে আমার যদি একটাই তফাত থেকে থাকে, সেটা হল আমি মুক্ত মনের (মানে Open Minded)  মানে আমি অন্তত সেটাই বিশ্বাস করে থাকি। এবার ভূত বা ভগবানের পাল্লায় পড়ার সৌভাগ্য (বা দূর্ভাগ্য) আমার হয়নি। তবে লোকে জানে, আমি ভূতের গল্পের পোকা, এবং অনেকে দাবী করেন ‘ভূত ভূত’ করতে করতে অচিরেই আমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে, বা ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে।

এখন চারপাশে এরকম অনেক লোকই দেখতে পাবেন, যাঁরা হলফ করে বলতে পারেন তাঁরা অশরীরীর পাল্লায় পড়েছেন। এবার এখানে দুটো জিনিস সবার আগে মনে করতে হবে। এক হল চোখের ভুল, আর দুই হল গল্প বলার সময় আর্টের খাতিরে রঙ মেশানো। যেটা স্বয়ং তারিণী বাঁড়ুজ্জ্যেও করে এসেছেন। তা এই দু’টো জিনিসকে হিসেবের মধ্যে ধরলে হয়তো অনেক ভূতুড়ে ঘটনার অত্যন্ত সহজ সরল ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

কিন্তু এখানে মনে রাখার মত জিনিস হল আগের বাক্যের মধ্যের ওই এক বিঘত লম্বা হয়তো। এই হয়তো কথাটা বড্ড ছলনাময়ী। হয়তো কালক্রমে হ্যাঁ, না, নিশ্চিত, সবরকমই হতে পারে। তাই ওই হয়তো কথাটা নিয়ে দুনিয়ায় অনেক অনেক তর্ক। ওই হয়তো কথাটার জন্যই এত ভূতের গল্প, এত ভূতের সিনেমা। বাজি ধরে শ্মশানে আর কবরস্থানে রাত কাটানো।

তা ব্যাপার হল, এইরকম অতিপ্রাকৃত ঘটনা আমার পরিচিত অনেকের জীবনেই ঘটেছে আর তাই নিয়েই এই সিরিজ। তবে এটা প্রতি সপ্তাহে সপ্তাহে চলবে না। কারণ এরকম ঘটনা তো আর অফুরন্ত নয়; তবে যাদের থেকে শুনেছি, তাদের নাম গোপন রেখে, মাঝে মাঝে একটা দু’টো ‘অপ’-ঘটনার বিবরণ পেয়ে যাবেন এখানে।

ছবিস্বত্ত – Luke Price

রাতটা ছিল সব-এ-বরাত এর। তা এই সব-এ-বরাত ব্যাপারটা হল অনেকটা হিন্দুদের তর্পণের মত। মানেই ওই দিন ইসলাম ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিরা তাঁদের পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যের উপঢৌকণ নিবেদন করে থাকেন, তাঁদের কবরে গিয়ে। তা সেদিন একটু অ্যাডভেঞ্চারের নেশাতেই বশিরের সাথে গিয়েছিল সুমিত। দু’টো বাইক, একটায় সুমিত আর দেবব্রত অন্যটায় বশির আর ওর ভাই।

দু’ধারে কবরস্থান আর মাঝখান দিয়ে সরু চলাচলের রাস্তা। সেখান দিয়েই আগে বাইক নিয়ে যাচ্ছিল দেবব্রত, সুমিত ওর পিছনে। কিছুদুর চলতে চলতে, হঠাৎ একটু নড়ে চড়ে বসে একটু বিরক্ত হয়ে সুমিতকে ধমক দেয় দেবব্রত;

-“অ্যাই সুমিত ! এভাবে পা ধরে টানছিস কেন ?”

সুমিত বেশ অবাক হয়েই উত্তর দেয়,

-“আমি মরতে তোর পেছনে বসে পা ধরে টানবো কি ভাবে ?”

-“তাহলে কে টানছে ? আজব ব্যাপার তো ?

দেবব্রত আর সুমিতের তর্কাতর্কি আর বাইকের টলমল গতি দেখে পেছন থেকে বাইক ছুটিয়ে, তাদের ওভারটেক করে আসে বশির।

-“কি হয়েছে ?”

-“দেব বলছে, ওর পা ধরে কে টানছে…” -উত্তর দেয় সুমিত।

কথাটা শুনে বশিরের মুখের চেহারাটা একটু বদলে যায় যেন। সে বলে ওঠে;

-“সোজা বাইক টান, কোথাও দাঁড়াবি না, বড় রাস্তায় ওঠার আগে।”

তারপর রাতের অন্ধকারে গর্জে ওঠে দু’টো বাইক। বড়রাস্তায় উঠে গাড়ি থামায় দু’জনেই। দেবব্রত থেমে প্যান্ট গুটোতে গুটোতে বলে

-“পা টা জ্বলছে ভাই…”

মোজাটা নামাতে দেখা গেল, পায়ের গোঁড়ালির একটু ওপর দিকে পড়েছে চারটে আঁচড়ের দাগ। দেবব্রত, সুমিত, দু’জনেই হতভম্ব। সেটা দেখে শুধু বশির বলে,

-“বাড়ি গিয়ে ডেটল লাগিয়ে নিস ভাই… লেটস নট টক অ্যাবাউট দিস টুনাইট…”

কি মনে হল ? স্রেফ গাঁজা ? নাকি সরু রাস্তায় কাঁটাগাছ লেগে ছড়ে গেছে সব ? হতেই পারে, আমারও তাই মনে হয়েছিল। কিন্তু সেই ক্লীশে লাইনটা আছে না, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু…” তাই আমার কাজ জানানো, আমি জানিয়ে দিলাম। আপনারা আসুন, জানান আপনার মতামত, আর যদি মনে হয় ঘটনাটা বড্ড ছোট হয়ে গেল, তাহলে চিন্তা করবেন না, লম্বা লম্বা ঘটনাও আছে, আমার কাছে।

শান্তির আশায়…

নীল…

পুনশ্চ : আপনার জীবনেও যদি কোনও ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে জানান আমাকে, যদি ইচ্ছে হয় নিচের লিংক ব্যবহার করে

https://forms.gle/uoFPbptDHCEpWsMy7

নিমঝোল এবং স্বেচ্ছাচারিতা…

আমি ‘Cherry Bomb’ বা হালে ‘প্রতুলের ডায়েরী ‘ছাড়া, লিবারিশে গল্প লিখিনি। আসলে গল্প লেখার মাধ্যম হিসাবে লিবারিশটাকে ব্যবহার করব ভাবিনি। কিন্তু ছাপা বই কালচারটা যেভাবে দিন দিন কমে যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে আপনা হাত জগন্নাথ করাটাই ভবিষ্যত-প্রামাণ্য। তাই মাঝে মাঝে এখন থেকে দু একটা গপ্পো এখানে পাবেন, আজ থেকেই তার শুরু…

আর কিছু না, নিম ঝোল। শুধুমাত্র নিম ঝোল নিয়ে যে এরকম একটা মহাভারত হয়ে যেতে পারে, সেটা সন্দীপ স্বপ্নেও আন্দাজ করতে পারেনি। নিম ঝোল কথাটা শুনে পাঠকদের যাদের মনে কৌতূহল উদ্রেক হয়েছে, তাদের জন্য বলি, নিম ঝোল জিনিসটা ঠিক কি; আসলে, এটা শুক্তোর একটা উন্নততর সংস্করণ, যেখানে সমস্ত আনাজের সাথে মানে, কাঁচকলা, রাঙ্গালু, পেঁপে-এর সাথে নিমপাতা দেওয়া হয়, আর এখানে নিমপাতাই হল তিক্ত স্বাদের একমাত্র উৎস।

যাকগে, নিম ঝোলকে তো না হয় সংজ্ঞায়িত করা গেল; এবার নিম ঝোলের সাথে স্বেচ্ছাচারিতার কি সম্পর্ক, সেই কথাতেই আসি।

সন্দীপের বয়স নেহাত কম হল না, মানে কলেজ শেষ করে এখন ইউনিভার্সিটি। আর যেদিনটার কথা বলছি, সেদিন সন্দীপের ডিপার্টমেন্ট এ সেমিনার ছিল। স্যার বলে দিয়েছেন,

-“ওইদিন সকাল ১০টার মধ্যে আমার ঘরে হাজিরা চাই, নইলে ক্ষমা নাই।”

তাই বাড়ি ফিরেই সন্দীপ মা কে জানিয়ে দিয়েছে

-“কাল সকাল ৯টার মধ্যে আমি বেরোবো, দুপুরে খাব না, সকালে জলখাবারটা একটু ভারী করে দিয়ে দিও।”

আর তারপর নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে পড়েছে। সকালে উঠে ঠিক পৌনে ৯টায় গিয়ে খাবার টেবিলে বসেও পড়েছে। কিন্তু ঝামেলাটা বাধল তারপরেই। জলখাবার তৈরী; আর জলখাবার বলতে একথালা ফল, একবাটি কর্ণফ্লেস্ক, চারপিস পাঁউরুটি। এ পর্যন্ত কোনও সমস্যাই ছিল না, কিন্তু সন্দীপ কলাতে কামড়টা ঠিক করে বসিয়েছে কি বসায়নি, মা একটা ভারী কাঁসার বাটি এনে সামনে বসিয়ে দিয়ে বললেন,

-“এই নে। দুপুরে ভাত খাবি না বললি, একটু নিম ঝোল খেয়ে যা।”

এই কথাটা শুনে সন্দীপের মুখটা এতবড় হাঁ হয়ে গেল, যে আধকামড়ানো কলাটা বুকে দাঁতালো অত্যাচারের দাগ নিয়ে টপ করে মুখ থেকে প্লেটের ওপর ঝরে পড়ল। ব্যাপারটা ঠিক করে বোঝার পর, সন্দীপ কোনোরকমে বলে উঠল,

-“মানে ? আমি জলখাবারে নিম ঝোল খাব ? পাগল ঠাওরেছো নাকি ?”

-“খেয়ে নে বাবা, লক্ষ্মী ছেলে আমার। দুদিন বাদেই আর নিম খাওয়া যাবে না, ফাল্গুন মাস শেষ হয়ে যাবে কিনা”

-“দেখ মা, ভাতের সাথে দিলে তো সোনামুখ করে খেয়ে নি। কিন্তু তা বলে জলখাবারে ? ইম্পসিবল !”

-“অত না বকে খেয়ে নে। দেরী হয়ে যাচ্ছে না তোর।”

-“হ্যাঁ, খাচ্ছি, কিন্তু নিমঝোল খাব না।”

-“তুই আজকাল বড় অবাধ্য হয়ে গেছিস।”

সন্দীপ চুপ করে গিয়ে আহত কলাটাকে গলাধঃকরন করে। মা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় সন্দীপের ভাইপো ঘরে ঢোকে ঝরের বেগে।

-“দিদা খেতে দাও। জলখাবার খেয়ে বেরোবো।”

মা কিছু বলার আগেই, সন্দীপ বলে ওঠে,

-“ও জলখাবার খাবি ? এ নে, মুড়ি দিয়ে নিম ঝোল খা।”

-“নিম ঝোল ? ইসসস ! আমি তো ব্রেড অ্যান্ড বাটার খাব।”

সন্দীপ ইঙ্গিতপূর্ণ চোখে মায়ের দিকে তাকায়। মা কোনও কথা না বলে সোজা রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। তারপর সেখান থেকে চেঁচিয়ে বলে,

-“ভাল চাস তো খেয়ে নে, নাহলে বাবা কে ডাকব বলে দিলাম।”

সন্দীপ মনে মনে ভাবে, সে তুমি যাকেই ডাক না কেন, আমার পক্ষে সকালবেলা নিম ঝোল খাওয়া সম্ভব নয়। সন্দীপ তার খাবার শেষ করার দিকে মন দেয়। খাবারের মধ্যপথে ঘরে একসাথে ঢোকে মা আর দিদি। আবার সুযোগ পেয়ে সন্দীপ বলে ওঠে,

-“দিদি, এই নে, বেরোনোর আগে একটু নিম ঝোল খেয়ে যা।”

এর উত্তরে দিদি কোনো কথা না বলে শুধু নাক সিঁটকায়। ব্যাপারটা দেখে মায়ের সমস্ত রাগটা গিয়ে পড়ল সন্দীপের ওপর।

-“বাবু, নিম ঝোলটা না খেলে বুঝব তুই আমাকে একটুও ভালবাসিস না”

বটে ? ইমোশানাল ব্ল্যাকমেল ? সন্দীপও বেশ রেগে মেগে বলে ওঠে;

-“ওসব ইমোশানাল ব্ল্যাকমেল করে আমায় কিছু হবে না! আমি এখন নিম ঝোল খেতে পারব না, ব্যাস! মাঝে মাঝে না, তুমি একেবারে দাবীর গাছ হয়ে ওঠো! মানে নাড়া দিলে দাবী ঝড়ে ঝড়ে পড়ে।”

-“আর তোরও স্বেচ্ছাচারিতার কোনো শেষ নেই ! তুই তো স্বেচ্ছাচারিতার মহীরুহ!”

সন্দীপ চোখ ছানাবড়া করে কি একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় পেছন থেকে একটা গুরুগম্ভীর গলা শোনা গেল।

-“সক্কালবেলা মা ছেলেতে কি আরম্ভ করলে বল দেখি ? গোটা বাড়ি মাথায় তুলেছ ?”

গলাটা বাবার! সন্দীপ মনে মনে ভাবল ‘হয়ে গেল’।

বাবা ঘরে ঢুকতেই সব চুপ। বাবার হাতে একটা কাপ, সেটার মধ্যে চামচ নেড়ে নেড়ে কিছু গুলছেন। সন্দীপের মনে পড়ল, আজ তো সোমবার! আর বাবা কোন এক আয়ূর্বেদিক বই পড়ার পর থেকে, গত এক মাস তাকে দুধে গুলে হলুদগুঁড়ো আর কি সব যেন খাওয়াচ্ছেন তাকে প্রতি সোমবার করে। কাপটা সন্দীপের সামনে বসিয়ে দিয়ে বাবা বললেন,

-“নে, খেয়ে ফেল, শেষ চুমুক দেওয়ার আগে ভাল করে গুলে নিবি, শেষের কাঁথ টা যেন বাদ না যায়।”

কিন্তু তারপরই বাবার চোখে পড়ে নিমঝোলের বাটির দিকে! বাবা বেশ রাগত স্বরে বলে ওঠেন,

-“এ কি ! তুমি ওকে এখন নিম ঝোল দিয়েছ? জানো না, হলুদ খাওয়ার পর তেতো খেতে নেই, গুন নাশ হয় ?”

-“কে বলেছে, মোটেও না!”

-“কে বলেছে? আমি পরিস্কার দেখলাম অমুক বইতে লেখা আছে!”

এটা বাবার মূদ্রাদোষ; প্রয়োজনীয় কথা প্রায়শই ভুলে যান, আর সেখানে অমুক জুড়ে দেন, অঙ্কের ‘এক্স’ এর মত।

-“না! হতেই পারে না, তুমি ভুল দেখেছ; নিম ঝোলে কি হলুদ পড়ে না? গুন কেন নষ্ট হবে ?”

সন্দীপ বলতে যাচ্ছিল, গুন নাশ হোক আর ছাই না হোক, সকালবেলা এক কাপ হলুদ মেশানো দুধ খাওয়া গেলেও, এক বাটি নিম ঝোল খাওয়া অসম্ভব। কিন্তু সে মুখ খোলার সুযোগও পেল না, মা আর বাবার নিম এবং হলুদ নিয়ে দাম্পত্য কলহ বেধে গেল ধুন্ধুমার। সন্দীপের মনে পড়ল, ঘড়িতে বাজছে ন’টা কুড়ি, তাই সে অবশিষ্ট খাবার আর হলদে দুধ শেষ করছে, এমন সময় শুনতে পেল, বাবা বলছেন,

তারিখ পে তারিখ পে নিম পে ঝোল…

-“না না, তা বলে তুমি আমাকে না জিজ্ঞাসা করে সন্তুকে সকালবেলা অমুক ঝোল দেবে ? তোমার স্বেচ্ছাচারিতার তো দেখছি কোনও অন্ত নেই…”

সন্দীপ বুঝল, এক্ষুণি না বেরোলে, কে কতটা স্বেচ্ছাচারী, এই নিয়ে একটা অঘোষিত তর্কসভায় তাকে যোগদান করতে হবে, আর তার ডিপার্টমেন্টাল সেমিনার ছড়িয়ে ছিটিয়ে মাঠ-ময়দান হয়ে যাবে। দিদি বেগতিক বুঝে আগে ভাগেই পালিয়েছে। এই ভেবে, যেই না উঠতে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে ঘরে তৃতীয় কন্ঠের আবির্ভাব ঘটল। কন্ঠের মালিক, থুড়ি, মালকিন সন্দীপের ঠাকুমা মানদাসুন্দরী দেবী।

-“বৌমা! জিতু! কি আরম্ভ করেছিস তোরা ? আমাকে শান্তিতে একটু জপটাও করতে দিবি না ?”

বাবা আর মা দুজনেই বিপন্ন ভাবে অনেক কিছু ঠাকুরমাকে বোঝাতে গেলেন, কিন্তু দুজনের কথার মধ্যে ঠিক দুটো শব্দই শোনা গেল। এক “নিম ঝোল” দুই “হলুদ”। আর তাই শুনেই ঠাকুমা আর্তনাদ করে উঠলেন।

-“নিম ঝোল ! গতকাল ফাল্গুন মাস শেষ হয়ে গেল, আর আজ তোমরা সন্তুকে নিম ঝোল খাওয়াচ্ছো ? ছেলেটাকে কি তোমরা মেরেই ফেলবে ?”

এই মেরেছে রে ! এবার ব্যাপারটা অন্য দিকে গড়াচ্ছে, ওদিকে ঘড়িতে ৯টা ৩৫, এখন না বেরোলে কেলেঙ্কারি! এই ভেবেই সন্দীপ চেয়ার ছেড়ে উঠতে যায়। কিন্তু তৎক্ষণাৎ বাবা তার কাঁধে হাত দিয়ে চেপে চেয়ারে বসিয়ে দেন।

-“বস। কথাটার আগে মিমাংসা হোক।”

-“কিন্তু বাবা, আমার সেমিনার!”

এবার ঠাকুমা ধমক দিয়ে বলেন,

-“সন্তু, চুপ করে বস, বড়রা কথা বলছে দেখছ না?”

আর তারপর বাবা আর মায়ের দিকে মুখ তুলে ঠাকুরমা একই রকম স্বরে বলে ওঠেন,

-“তোমদের স্বেচ্ছাচারিতা দেখলে আমি অবাক হয়ে যাই বৌমা!”

-“না মা, আমি পাঁজিতে দেখেছি, ফাল্গুন মাস কাল শেষ হবে।”

কিন্তু ঠাকুমা মানতে নারাজ, সুতরাং পাঁজি লে আও।

অতঃপর, প্রায় পনেরো মিনিট পঞ্জিকার পাতা ওলটানো, সন্দীপের কানে অনেক দিকশূল, গতেঃ, মঘা, অশ্লেষ্মা, ইত্যাদি ঢুকল। তারপর হঠাৎ ঠাকুমা বললেন,

-“দেখেছ, বলেছিলাম, আজ ভোরেই ফাল্গুন মাস ছেড়ে গেছে।”

বাবা যেন তৈরীই ছিলেন, তিনি বলে উঠলেন,

-“কিন্তু মা, আজ ভোরে ফাল্গুন মাস শেষ হলেও, আমি তো নিমপাতা গুলো পরশু, মানে অমুকবার এনেছি; নিয়মটা তো ফাল্গুন মাসের পর বাড়িতে নিম পাতা ঢোকা নিষেধ, তাই না?”

ঠাকুমা প্রতিবাদ করে বলে উঠলেন,

-“কে বলেছে ? নাহ! হতেই পারে না। নিমপাতা খাওয়া নিষেধ।”

-“না মা, ভালো করে মনে কর, বাড়িতে ঢোকা নিশেধ।”

এই নিয়েও বেশ কিছুক্ষণ বাকবিতন্ডা চলল, আর মা বার বার করে ঠাকুরমাকে বলতে থাকলেন,

-“মা, আমি দেখেছি, ফাল্গুন মাস এখনো শেষ হয়নি।”     

 তাই শেষে ঠাকুমা বললেন,

-“গুপ্তপ্রেস দিন দিন যাচ্ছেতাই হয়ে যাচ্ছে! জিতু, আমার ঘর থেকে বেনীমাধব শীলটা নিয়ে আয় তো!”

এবং বেনীমাধব শীল যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হলেন। সন্দীপের ঘড়ির দিকে তাকাতেই ভয় করছিল। তার ইচ্ছে করছিল হাঁউমাউ করে কাঁদতে। আরো পনেরো মিনিট ঠাকুমা এবং বেনীমাধব শীলের যুদ্ধ চলল। শেষে বিজয়ীর হাসি হেসে ঠাকুমা বললেন,

-“নাহ, বৌমা, ঠিকই বলেছিলে। আজ সন্ধ্যে অবধি ফাল্গুন মাস আছে। নে সন্তু, চট করে নিম ঝোলটা খেয়ে ফেল দেখি?”

ঠাকুমার আদেশ, সুতরাং নো আপত্তি। তাছাড়া সেই মূহুর্তে যদি একঢোক সায়ানাইড খেলেও রাস্তায় বেরোনো যেত, তাই খেত সন্দীপ। তাই পাঁচন গেলার মত মুখ করে নিমঝোল খেয়ে, রাস্তায় বেরিয়ে দৌড় লাগালো সন্দীপ। কোলকাতার একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে যেতে গেলে যতগুলো সিগন্যালে আটকানো যায়, সবকটায় আটকে, এবং মোবাইলে ২৮টা মিসড কল নিয়ে যখন ডিপার্টমেন্ট এ ঢুকল সে, তখন স্যার অগ্নীশর্মা হয়ে বারান্দার এদিক থেকে ওদিক পায়চারি করছেন, আর তাকে দেখেই ধমক দিয়ে বলে উঠলেন, -“এই যে, সন্দীপ! কখন তোমার আসার কথা, আর কখন তুমি আসছ! না, মানে, তোমার সাহস আর স্বেচ্ছাচারিতা দেখে আমি হতবাক হয়ে যাই।”

আশা করছি ভালো লাগল, আর শেষে আগের সপ্তাহের পূজা সংক্রান্ত অনুপস্থিতির ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি…

শান্তির আশায়…

নীল…