Somewhere In the Jungle of North Bengal… Part XI

Seasons change with the scenery

Weaving time in a tapestry

Won’t you stop and remember me

At any convenient time?

Paul Simon and Art Garfunkel

||১১||

সর্বেশ্বর বটব্যাল শেষবারের মতো ‘বনলক্ষ্মী টিম্বার ওয়ার্ক্স’-এর বন্ধ দরজাটার দিকে তাকিয়ে দেখে নিলেন। কাল রেজিস্ট্রি, আর তার পরেই পাকাপোক্তভাবে তালা ঝুলে যাবে বনলক্ষ্মীর দরজায়। আর তার ক’দিন পরেই এই ছোট্ট কাঠ চেরাই কলের কোনও চিহ্নই থাকবে না এখানে; বিলাসবহুল রিসর্ট উঠবে, অনেক ট্যুরিস্ট-এ গমগম করবে চারদিক। আর বনলক্ষ্মীর ভাঙা পাঁজরের ওপর গড়ে ওঠা সেই রিসর্টে কেউ মনে রাখবে না একজনের মরে যাওয়া স্বপ্নের কথা। একদল শ্রমিকের কথা, যারা রোজ হাসিমুখে সকাল থেকে সন্ধ্যে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তিল তিল করে একটা সুন্দর জীবন গড়ে তোলার কথা ভাবত।

মালিক হিসাবে কখনো গা জোয়ারির আশ্রয় নিতে হয়নি সর্বেশ্বরকে; তিনি এখানকার ভূমিপুত্র না হলেও, এখানকার সরল সাদাসিধে লোকগুলোকে ভালবেসে, তাদের সাথে মানিয়ে নিয়ে নিজেও স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। শ্রমিকেরা তাঁকে বড়দা বলেই ডাকত। অকৃতদার সর্বেশ্বরও তাদের সাথে মিশে গেছিলেন, পালপার্বনে নিমন্ত্রনরক্ষা করতে যেতেন। লোকগুলোকে বড় ভালোবেসে ফেলেছিলেন। প্রথমে ভেবেছিলেন বনলক্ষ্মী বিক্রি হয়ে গেলে আশেপাশে কোথাও একটু জায়গা কিনেই থেকে যাবেন; কিন্তু যতবার মনে হচ্ছে চোখের সামনে একদল লোক এসে টুকরো টুকরো করে তার সাধের কারখানাটা ভেঙে ফেলবে, ততই আর এখানে থাকার ইচ্ছেটা চলে যাচ্ছে।

-“এত্তো কি সোচ করছেন, সারবো বাবু ?”

পাশ থেকে উদয় হলেন লাহোটি রিয়াল এস্টেটের সঞ্জয় লাহোটি। বাবার হোটেল ব্যবসার উত্তরাধিকারী, এবং বাবার কথামতো সেই কোম্পানির হয়ে সর্বেশ্বরের সাথে কথা বলতে এসেছে সোজা মুম্বই থেকে। জোয়ান ছেলে, কিন্তু মুখ দেখলে খুব ধূর্ত এবং কুটিল মনে হয়; আসলে সব ব্যবসাদার তো আর সর্বেশ্বরের মতো নয়; কারোর কাছে টাকা, প্রফিটের গুরুত্ব অনেক বেশী হয়।

-“না, কিছু না, আসলে লাহোটি জি, মায়া পড়ে গেছে বড্ড…”

-“মায়া পড়ে গেলে ফায়দা হোবে কেমুন কোড়ে ? আরে সোচিয়ে, আপ কা স-মিল কা তো কল্যাণ হো চুকা হ্যায়; ও ইউনিয়ন এমুন ঘোটালা করেছে, এখুন তালা খুললে জেল আপকো জানা পড়েগা…”

-“সে তো বুঝছি…”

-“দেখেন, হো সাকতা হ্যায় কি ইউনিয়ন কা ইয়ে ঘোটালেকে পিছে কোই দো-চার আদমী হ্যায়; জো পার্টির প্যায়সা লিয়ে সব চক্কর চালাচ্ছে; লেকিন উস লিয়ে জিতনা পেটি খিলানা পড়েগা; সে তো আপনি পারবেন না; অর ইয়ে ভি দেখুন, ডিউটি আওয়ার্সে একটা ছেলের মওত ভি হোয়ে গেছে…”

মৃদু মাথা নেড়ে সর্বেশ্বর চুপ করে যায়। লোক কে বিশ্বাস করার ফল এটাই হয়। বিশু যখন তার বড় ছেলে মনীলাল কে এনে কারখানায় ঢোকাতে চায়, তখন প্রথম দেখেই সর্বেশ্বরের সন্দেহ হয়েছিল;

-“হ্যাঁ রে, তো ছেলের বয়েস কত ? ১৮ পার করেছে তো ?”

-“হ্যাঁ বড়দা, এই ২ মাস আগে ১৮ পার করল…”

লোকটার মুখের কথায়, আর তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা জেনে কাজে রেখে দিয়েছিল সর্বেশ্বর। পাহাড়ে লোকের বয়স বোঝা একটু মুশকিল। কিন্তু কাজে ঢোকার দু’মাসের মাথায় যে সে ছেলে স-মিলের মধ্যেই দুর্ঘটনায় মারা যাবে, এবং তখন জানা যাবে ছেলেটির বয়স ১৬, এটা আন্দাজও করতে পারেনি সর্বেশ্বর।

শ্রমিকদের মধ্যে ১০০ শতাংশই মালিককে দেবতার চোখে দেখত না; কিছু কিছু সুযোগসন্ধানী সবসময়ই ছিল। এখন লেবার ইউনিয়নের সে রকমই কিছু লোক এই ঘটনার পরে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার মদতে জলঘোলা করতে শুরু করে; এবং মনীলালের বাবাকে একটা ভালোরকম অর্থ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, শ্রমিক অসন্তোষ চরমে ওঠে, এবং কারখানার দরজায় তালা ঝোলে; এ হেন অবস্থায় লেবার ইউনিয়নের এক জনদরদী নেতাই একদিন পরামর্শ দিয়ে এলাকার ‘দাদা’র সাথে সর্বেশ্বরের দেখা করায়; তিনি আকারে ইঙ্গিতে বোঝান, তার ঝুলিতে মোটা মোটা কয়েকটা বান্ডিল ফেললে তিনি ব্যাপারটাকে সামলে নিতে পারেন। না হলে কারখানা তো খুলবেই না, উলটে থানা-পুলিস-আদালত এমনকি জেল অবধি গড়াতে পারে ঘটনাটা।

স্থানীয় থানার অফিসারের সাথে বিশেষ সখ্যতা ছিল সর্বেশ্বরের। তিনি বেশ দুঃখের সঙ্গে জানালেন এখন রুলিং পার্টি তার হাত-পা বেঁধে রেখেছে। দিন দিন সমস্যা বাড়তে থাকল; সর্বেশ্বর বুঝে গেলেন, যে পরিমাণ উপঢৌকন চাওয়া হচ্ছে, তা যদি কোনওভাবে জোগারও করে ফেলা যায়, তারপর আর এই স-মিল খুলে রাখা তার পক্ষে সম্ভব হবে না; আর তখনই রিসর্ট তৈরীর প্রস্তাব সহ লাহোটি রিয়াল এস্টেটের আবির্ভাব।

হয়তো সর্বেশ্বরের আড়ালেই রফা হয়ে গেছে; কিন্তু সে ভেবে আর লাভ কি ? এখন সাধের বনলক্ষ্মী স-মিল হাতছাড়া না করে রেহাই নেই সর্বেশ্বরের। এসব ভাবতে ভাবতেই, বনলক্ষ্মীর সীমানা ছেড়ে নিজের আপাত বাসস্থানের দিকে রওনা হয় সর্বেশ্বর। বনলক্ষ্মীর সীমানার মধ্যেই তার ছোট্ট একটা বাংলো ছিল; কিন্তু মালিকানা হাতবদলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরপরই সব জিনিসপত্র, খাটবিছানা গাড়িতে তুলে কলকাতা পাঠিয়ে দিয়েছে সে। এখন আছে তার বন্ধু বিনয়ব্রতর বাড়িতে। বিনয়ব্রতর কলকাতায় একটা ফ্ল্যাট আছে, আর সেখানেই আপাতত এক মাসের জন্য ভাড়া নিয়ে থাকার বন্দোবস্ত করেছে; বিনয়ব্রত বংশানুক্রমে চা বাগানের মালিক; টাকা জীবনে অনেক দেখলেও অর্থপিশাচ হতে পারেনি, আর সেইজন্যই বোধহয় দু’জনের এত মিল।

বিনয়ের বাড়ির রাস্তায় যেতে যেতে হঠাৎ একটা কাজ মনে পড়ে যায় সর্বেশ্বরের। আর রাস্তা বদলে সে কুলিবস্তির দিকে চলতে শুরু করে। এখানে সে এসেছে বহুবার; কখনো এর বাড়ি, কখনো ওর বাড়ি। কুলিবস্তির ভেতরে একটা সংকীর্ণ কোণে; টিনের একটা দরজায় গিয়ে টোকা দেয় সর্বেশ্বর।

-“বিশু আছিস নাকি রে ? বিশ্বনাথ ?”

দু’ একবার টোকা মারার পর, বিশ্বনাথের বৌ দরজা খুলে দেয়। সর্বেশ্বরকে দেখে ঘরে ঢোকায় সে। বিশ্বনাথ তার ছোট ছেলেটার সাথে বসেছিল; উঠে এসে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে একটা টুল এগিয়ে দিল, আর নিজে উবু হয়ে বসল সর্বেশ্বরের পায়ের কাছে।

-“কাল লেখাপড়া হয়ে যাচ্ছে রে, বিশু…”

কথাটা বলতে গিয়ে গলাটা কেঁপে যায় সর্বেশ্বরের। বিশুর চোখটাও ছলছল করে ওঠে।

-“আমি সামনের মাসে চলে যাচ্ছি…”

এবার বিশু হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে;

-“বড়দা… আমি জানতুম না এরম হবে বড়দা… আমার ছেলেটা, কাঠকল, আপনি… সব চলে গেল বড়দা।”

অনেক চেষ্টা করে চোখের জল আটকায় সর্বেশ্বর।

-“কাঁদিস না রে, কাঁদিস না… সবই অদৃষ্ট, নাহলে ওরকম জোয়ান ছেলে…”

বলতে বলতে কাঁধের ঝোলাটা নামিয়ে সেটায় হাত ঢুকিয়ে দু’টো মোটা মোটা টাকার বান্ডিল বের করে বিশুর দিকে এগিয়ে দেয় সর্বেশ্বর। বিশু কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়তে থাকে, কোনো উত্তর দেয় না। একটু ধমকের সুরেই বলে ওঠে সর্বেশ্বর।

-“শোন, পাগলামো করিস না; বড়দা বলে ডেকেছিস যখন, তখন ছোট ছেলেটার কথা ভেবে এগুলো রেখে দে, কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, খাবি কি তাহলে ?”

বিশু বাচ্চা ছেলের মতো ফোঁপাতে ফোঁপাতে টাকাটা হাতে নেয়।

-“আমি চলি; যার কাছে বিক্রি হচ্ছে, আমি তাকে বলে দিয়ে যাব যাতে হোটেল চালু হলে তুই একটা কাজ পাস ওখানে; তবে সেই ভরসায় বসে না থেকে অন্য কাজের চেষ্টাও করিস। বৌমা আর ছেলেটার খেয়াল রাখিস। কি নাম যেন ওর ?”

-“রতন, বড়দা… বড়টা মণি, আর ছোটটা রতন…”

এই বলে আবার কেঁদে ফেলে বিশু। সর্বেশ্বর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিশুর কাঁধে একটা মৃদু চাপড় মেরে উঠে পড়ে।

মণিলাল আর রতনলাল। চোখের সামনে মনির ভয়ঙ্কর মৃত্যু দেখেছে তার বাবা; এখন কত বিনীদ্র রজনী যে কাটাবে সে, কেউ জানে না। বড় গাছের গুঁড়ি ইলেক্ট্রিক স এক ওপর বসাতে গিয়ে, টাল সামলাতে না পেড়ে মণিলাল স-এর ব্লেডের ওপরই পড়ে যায়। তারপরের দৃশ্যটা হলিউডি সস্তার হরর ছবিও অত ভালোভাবে দেখাতে পারে না, যেটা সেদিন ঘটেছিল। সে দিনের কথা ভাবলে এখনো আতঙ্কে শিউরে ওঠে সর্বেশ্বর মাঝে মাঝে।

রাতে খাওয়া দাওয়ার পর, বিনয়ের সাথে কথা হচ্ছিল বসে বসে,

-“কোলকাতায় গিয়ে মানাতে পারবি তো তুই ? শেষ ২২টা বছর এই জঙ্গলে কাটালি; আর এখন হঠাৎ একেবারে শহরে…”

-“প্রথম প্রথম হয়তো অসুবিধা হবে; রাতে ঘন্টিপোকার বদলে বাস আর গাড়ির হর্ণ; আর জানলা দিয়ে জোরালো আলোর তেজ… ঘুমের অসুবিধা তো প্রথম প্রথম হবেই। তারপর, দেখা যাবে…”

-“থেকে যেতে পারতিস; এখানে লিভিং কস্ট অনেক কম, এত ভালো পরিবেশ, দূষণও কম…”

-“ভেবেছিলাম, কিন্তু পারব না, ভাই; চোখের সামনে বনলক্ষ্মীকে নষ্ট হতে দেখতে… হতে পারে চেরাই কল, হতে পারে গাছ কাটতাম, কিন্তু কতগুলো লোকের জীবন জড়িয়ে ছিল বল তো ? আর এখন স্বার্থপরের মত নিজের আখের গুছিয়ে নিয়ে কেটে পড়ছি।”

-“তা নয়ত কি করতিস ? সব টাকা দান খয়রাত করে নিজে ভিক্ষে করে মরতিস ? বি প্র্যাকটিকাল, সাবু… বিশ্বনাথের ফ্যামিলিকে দিয়েছিস, দে ডিজার্ভ দ্যাট। কিন্তু বাকি যে নির্লজ্জ লোকগুলো তোর মত মালিক পেয়েও কারখানা বন্ধ করার পরিকল্পনাটা করল, দে ডোন্ট ডিজার্ভ ইয়োর জেনেরসিটি।”

সর্বেশ্বর চুপ করে যায়। বিনয় বুঝতে পারে, তার বন্ধু শুধু একটা চেরাই কল নয়, জীবনের একটা বড় অংশকে কাল টাকার অঙ্কে মেপে বিসর্জন দিতে চলেছে। এ দুঃখ কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়।

ঠিক চারদিন বাদে সর্বেশ্বর কোলকাতা রওনা হয়, আর সাতদিনের মাথায় একগাদা বুলডোজার এসে বনলক্ষ্মী টিম্বার ওয়ার্কস-কে নিশ্চিহ্ন করে দেয় উত্তরবঙ্গের বুক থেকে। হয় নতুন রিসর্টের শিলান্যাস; কাজ শুরু হয় আর চলতে থাকে পুরোদমে। আরো দেড় বছরের মাথায় একটা ঝাঁ চক চকে রিসর্টের উদ্বোধন হয়। খুলে যায় ‘লেপার্ডস নেস্ট রিসর্ট অ্যান্ড লিজার – অ্যা প্রোজেক্ট অফ লাহোটি রিয়াল এস্টেট’। লোক সমাগম শুরু হয়, টুরিস্ট থেকে কর্পোরেট রিট্রিট, সবেতেই উত্তরবঙ্গের অন্যতম সেরা রিসর্ট হয়ে ওঠে ‘লেপার্ডস নেস্ট’।

মালিক সঞ্জয় লাহোটি জীবনের প্রথম প্রজেক্টের মায়া ছাড়তে পারে নি; বাবার মৃত্যুর পর, বড় ভাই-এর সাথে কোম্পানি সামলাতে সামলাতে গোটা ভারতে আরও অনেক নতুন প্রোজেক্ট করার পরও, মাঝে মাঝেই লেপার্ডস নেস্ট-এ কয়েকটা দিন কাটিয়ে যেত সে; তখন প্রতি রাতে স্কচের ফোয়ারা ছুটত, এস্কোর্ট-এরও আনাগোনা লেগে থাকত। কিন্তু এর মধ্যেই একটা ঘটনা ঘটে গেল; সেবারও সঞ্জয় অনেকদিন পরে এসেছে, রাতে পার্টি করার পর, সকালে থানায় অভিযোগ যায় এইরকম, যে স্থানীয় দু’টি মেয়ে লেপার্ডস নেস্ট-এ রুম সার্ভিসের কাজ করত। রোজ রাত দশটায় ডিউটি শেষ করে তারা বাড়ি ফিরত, কাল তারা রাতে বাড়ি ফেরেই নি।

ও সি নিরঞ্জন লাহা এনকোয়ারি শুরু করলেন। রিসর্ট-এ সবাইকে জেরা করা হল, লাহোটি সহ। কথায় বোঝা গেল রাতে লাহোটির ঘরে স্থানীয় তিন চার জন লোক ছিল, এবং খাবার ও পানীয় ওই মেয়েদু’টিই নিয়ে যায়। সঞ্জয় লাহোটি গভীর জলের মাছ, উকিল এবং আইনের মারপ্যাঁচে পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরেই রইল। কিন্তু বাকী তিনজনের পকেটের জোর না থাকায়, লাহা দারোগার হাতে বেধরক ঠ্যাঙ্গানি খাওয়ার পর তারা স্বীকার করল, সেদিন রাতে আকন্ঠ মদ্যপানের পর, লাহোটি সহ তারা চারজনের মেয়েদুটিকে ধর্ষণ এবং খুন  করে লেপার্ডস নেস্টেরই বাউন্ডারী ওয়ালের পেছনে পুঁতে দিয়েছে। কথামত লাশদু’টোও পাওয়া গেল। নিরঞ্জন বাবু কেস সাজালেন, এবং যথারীতি আইনের গোলকধাঁধার প্যাঁচে লাহোটি জরিমানা দিয়েই খালাশ হলেন, যেখানে বাকী তিন মূর্তিমান জেলে গেল। এদের মধ্যে একজন বনলক্ষ্মীর লেবার ইউনিয়নের লীডারও ছিল।

সঞ্জয় লাহোটি বেঁচে গেলেও, বাঁচল না লেপার্ডস নেস্ট; এরকম ঘটনা ছড়ানোর পর লোক আসা কমতে লাগল, এমনকি জমির দামও পড়ে গেল। তাই শুরু হওয়ার চার বছরের মধ্যেই বন্ধ হয়ে গেল লেপার্ডস নেস্ট। লাহোটি রিয়াল এস্টেটের বড়কর্তা অজয় লাহোটি ব্যাপারটিকে ব্যাড ইনভেস্টমেন্ট বুঝে এবং কোম্পানির গুডউইল ফেরানোর জন্য, নামমাত্র খরচে ৯৯৯ বছরের জন্য গোটা লেপার্ডস নেস্ট বনদপ্তরের কাছে লীজ দিয়ে ঝাড়া হাত পা হয়ে গেলেন।

মাত্র ছ’ বছর। তারমধ্যেই সব ভোজবাজীর মতো পাল্টে গেল চোখের সামনে দিয়ে। এককালের রম রম করে চলা স মিল প্রথমে ভেঙে রিসর্ট, আর তারপর সেই রিসর্টের চাকচিক্য মুছে গিয়ে এখন একটা আধা ধ্বংসস্তুপ হয়ে উত্তরবঙ্গের জঙ্গলের কোথাও একটা জলজ্যান্ত কলঙ্কের মত রয়ে গেল লেপার্ডস লেস্ট। সর্বেশ্বর কোলকাতা থেকে অনেকদিন পর যখন এলেন, আর একদিন বেশ রাতে যখন লেপার্ডস নেস্টের পাশ দিয়ে ফিরছিলেন, তখন জায়গাটার অবস্থা দেখে চোখে জল এল। এককালে যেখানে তার কটেজটা ছিল, সে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। সামনের বহুদিনের পরিচিত জঙ্গলটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হল, এখনো যেন জঙ্গলের ভেতর থেকে কাঠ চেরাইয়ের শব্দ ভেসে আসছে।   

কি মনে হচ্ছে ? কিছু আন্দাজ করা যাচ্ছে কি ? ভাবুন, ভাবুন… অনেক সময় আছে…

Somewhere In the Jungle of North Bengal… Part X

বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর…

||১০||

ভোররাতে বৃষ্টি শুরুর সাথে সাথে ঘুম ভেঙে গেল সক্কলের। জালনা গুলো বন্ধ করতে করতে ওরা বুঝতে পারল, প্ল্যানমাফিক সকালে লেপচাখা যাওয়াটা বোধহয় হবে না। কারণ, এই বৃষ্টিতে ওই রাস্তা ট্রেক করে ওঠা অসম্ভব। জানলা বন্ধ করে শোওয়ার সময় অসীমাভ লক্ষ্য করল, এত হট্টগোলের মধ্যেও মৈনাক চুপ চাপ ফোন মুখে ধরে বসে আছে; যেখানে শ্বেতাংশু এমনকি আকমল পর্য্যন্ত উঠে এসেছে জানলা বন্ধ করতে, সেখানে মৈনাক নির্বীকার; তার মুখ দেখ বোঝা যাচ্ছে, যতক্ষণ বাকীরা ঘুমোচ্ছিল, মৈনাক জেগে বসেছিল।

-“অ্যাই মই, ঘুমাবি না ????”

-“হ্যাঁ, এই তো, শুয়ে পড়ছি।”

আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ে অসীমাভ। তার নিজের প্রবল ঘুম পাচ্ছে।

সকালে যখন সবার ঘুম ভাঙল, তখনও বৃষ্টির কোনো বিরাম হয়নি। স্যারের কাছে ছাতা নেই, তাই তিনি আসতে পারেননি; রতন একটা কেটলি ভর্তি চা আর একগাদা চা-এর গ্লাস দিয়ে গেল। রতন চা দিয়ে যাওয়ার পরই, অনুপ্রিয়া, পল্লবী আর সমীরা এসে হাজির হল। সবাই মিলে বসে চা খাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, তখনও মৈনাক কিন্তু ঘুমিয়ে চলেছে অঘোরে। শ্বেতাংশুই তাকে টেনে তুলল। মৈনাক উঠে বসে চায়ে চুমুক দিল। তার চোখ মুখ বলে দিচ্ছে, অনেক রাতে শুয়েছে সে, এবং প্রচন্ড ক্লান্ত। চা পান শেষ করে মুখ হাত ধুয়ে সবাই আবার এসে বসল, কারণ এই বৃষ্টিতে আর কিছুই করার নেই, তখন অসীমাভ আবার দেখল, মৈনাক ফোনে ফিরে গেছে।

মৈণকের সেদিকে খেয়াল নেই; কাল রাতে তিয়াসার একটা মেসেজের উত্তরে একটা রিপ্লাই, আর একটা রিপ্লাই, আর একটা রিপ্লাই, এই করে করে গোটা রাত কাটিয়ে দিয়েছে সে; ভোর সাড়ে চারটের সময় যখন তিয়াসা ওকে গুডনাইট বলেছে, তখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে ঘুমের দেশে চলে গেছে, আর শ্বেতাংশু ডেকে তোলার আগে অবধি অঘোরে ঘুমিয়েছে।

আসলে ‘কেমন আছিস ?’ এটা আমার মতে পৃথিবীর সবথেকে কঠিন প্রশ্ন। হ্যাঁ, এই প্রশ্ন আমাদের প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১০০ বার হয়তো শুনতে হয়, কিন্তু প্রতিটা ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের পেছনের আবেগ, গুরুত্ব সবই আলাদা হয়। পাড়ার যে কাকু রোজ সকালে কান এঁটো করা হাসি হেসে রোজ একই কথা জিজ্ঞাসা করে, তাকে দেওয়া উত্তর আর অনেক দিনের পুরোনো বন্ধুর সাথে বহুদিন পড়ে দেখা হলে সে যখন বুকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে ‘কেমন আছি’; তখন তাকে দেওয়া উত্তর একেবারেই আলাদা হয়। আর যখন প্রাক্তন প্রেমিকা প্রায় দু-তিন সপ্তাহ পড়ে আবার কেমন আছিস জিজ্ঞেস করে, তখন…

অনেক লোকে অনেক রকম উত্তর দেয়, বা দিতে পারে; আর কাল রাতে তিয়াসার এই মেসেজের উত্তরে ‘none of your business’ লিখে, পাঠাতে গিয়েও মুছে ফেলে উত্তর দেয় মৈনাক, ‘ekhono beche achi…’।

তারপর সারারাত কেটে যায় অনেক ভনিতায়, অনেক রাগ, অনেক জমে থাকা কষ্টের হিসেব মেলাতে মেলাতে; রাত পেড়িয়ে সকাল হওয়ামাত্র, আবার অনেক দিনের পুরোনো অভ্যাসের বশে তিয়াসাকে মেসেজ করে মৈনাক ‘good morning’।

-“তোর কি হয়েছে বল তো ? কাল রাত থেকে দেখছি ফোন থেকে মুখ তুলছিস না একেবারে ?”

-“অ্যাঁ ? না না… এই তো… আরে গে-গেম খেলছিলাম…”

এই বলে কোনোরকমে ফোনটা রেখে দিয়ে গল্পে অংশগ্রহন করতে বাধ্য হল মৈনাক। গল্পে গল্পে বেলা বাড়ল, বৃষ্টিটাও পড়ে এল অনেকটা। সবাই উঠে পড়ল স্নান সারবে বলে।

সবার স্নান টান সারা হলে দেখা গেল, বৃষ্টি থেমে গেলেও, আকাশের মুখ ভার। স্যার ঘরে আসতে পেরেছেন এতক্ষণে।

-“আজকের দিনটা পুরোটাই বরবাদ হয়ে গেল রে! আসলে, এমনই শাঁখের করাত এই সার্ভে; বর্ষাকাল ছাড়া ডেটও পড়ে না, আর বৃষ্টিতে দিন নষ্ট হবেই। যাক গে যাক; আজ ভালো করে ল্যাদ খেয়ে নে, রাতে আর বৃষ্টি না হলে কাল লেপচাখা যাওয়া যাবে।”

মধ্যাহ্নভোজনের সময় দিলীপবাবু এসে হাজির হলেন। কাল রাতে বৃষ্টি শুরু হওয়ার সাথে সাথে ওনাদের জঙ্গলে টহল দেওয়া বন্ধ করতে হয়; তবে তার আগে অবধি জঙ্গলে কোনও শব্দই শুনতে পাননি ওনারা।

-“তবে সম্ভব, সবই সম্ভব… হয়তো বৃষ্টির কথা আন্দাজ করে ব্যাটাচ্ছেলেরা আসেনি কাল।”

দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর, মৈনাককে তখনো ফোনে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে দেখে, এবার অসীমাভ বেশ রেগেই যায়…

-“অ্যাই ! তখন থেকে কি করছিস বলত ফোন নিয়ে ?”

-“ওই তো… গেম খেলছি…”

-“গেম খেলছিস ? মিথ্যে কথা বলার জায়গা পাসনি ? দেখি কি গেম খেলছিস ?”

-“আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে, রেখে দিচ্ছি ?”

-“রেখে দিচ্ছি মানে ? তুই কাল রাত থেকে ফোনে মুখ গুঁজে করছিস টা কি শুনি ?”

-“আরে ভাই, রেখে দিচ্ছি বললাম তো…”

-“না, না, তুই বল, কি করছিলি ? তিয়াসা মেসেজ করছিল ?”

মৈনাক চুপ।

-“ও, তার মানে তিয়াসাই মেসেজ করছিল… তোর লজ্জা করে না রে ? দু’দিন আগে যে তোকে মেসেজ করে তিন বছরের সম্পর্ক ভেঙে দিল, সে মেসেজ করে চলেছে, আর তুই তাকে রিপ্লাইও দিয়ে চলেছিস… বাহ !”

-“ভাই, ছেড়ে দে, সরি… জানিস তো, এই দু’সপ্তাহেই কি সব ভুলে যাব ? তাই…”

-“তাই হাঁক দিলেই কুকুরের মত জিভ বার করে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে ছুটে যাবি, এই তো ?”

-“ভাই, থাম না, হয়ে গেছে মিটে গেছে… আর আমার পার্সোনাল ম্যাটার…”

-“আচ্ছা, এখন পার্সোনাল ম্যাটার হয়ে গেল, তাই তো ? যখন সার্ভে টিমে না থাকা সত্ত্বেও, স্যারকে রাজী করিয়ে আর হেডুকে ঝেলে এতদুর নিয়ে আসলাম, তখন তো বারোয়ারী ম্যাটার ছিল…”

এবার মৈণাকের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে;

-“মানে ? আমি কি তোকে বলেছিলাম, ভাই, আমাকে নিয়ে চল ? বলেছিলাম ?”

-“সে তো এখন বলবিই রে, অকৃতজ্ঞ কোথাকার; একটা মেয়ে যে রিলেশনশিপটাকে সিরিয়াসলি নিতে পারে না, লোকের কথায় কান দিয়ে এখন তো তার হয়ে ঝোল টেনে কথাই বলবি…”

-“তুই ভাট বকাটা থামাবি ? আমি কখন ঝোল টেনে কথা বললাম ? আমাকে মেসেজ করেছে, আমি রিল্পাই দিয়েছি, দ্যাটস ইট ! আমি রিকন্সাইল করতে যাচ্ছিও না… আর সবচেয়ে বড় কথা, ইউ আর দ্য লাস্ট পারসন টু গিভ মি রিলেশনশিপ অ্যাডভাইস… জীবনে ক’টা রিলেশনশিপ দেখেছিস তুই ?”

এবার অসীমাভ মুখ খোলার আগে শ্বেতাংশু তাড়াতাড়ি বলে উঠল,

-“ঠিক আছে… হয়েছে… শান্তি… আর…” -কিন্তু তাকে শেষ না করতে দিয়েই মৈনাক আবার বলে ওঠে;

-“চ্যাটরুমে মুখ অবধি না দেখে কোন এক আজানা, অচেনা মেয়েকে হৃদয় দান করে বসে আছেন বাবু, আর দাবী হল আমি ‘স্যাপিওসেক্সুয়াল’।

এবার রাগে ফেটে পড়ে অসীমাভ।

-“হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ অনেক ভালো… চেনা জানা, তিন বছরের ‘রিয়েল’ প্রেমিকা যাকে ‘ইটস নট ওয়ার্কিং আউট’ বলে যাকে রাস্তায় বসিয়ে দেয় , তার মুখে এই কথাগুলো শোভা পায় না; নিজেকে কোন প্রেমের সিভিল সার্জেন ভাবিস তুই ? দেখগে যা, কার হাত ধরে দু’সপ্তাহ ঘুরেছে আর এখন সেটা ঝুল কেস দেখে আবার এ ঘাটে নৌকা বাঁধতে এসেছে…”

এ কথার পর, অনেক কিছুই হতে পারত, কিন্তু মৈনাক সিধে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ঘরের পরিবেশ থমথমে, অসীমাভ মুখ গোমড়া করে বসে আছে; শ্বেতাংশু অসীমাভর মেজাজটা চেনে বলে আর ঘাঁটাল না তাকে। অসীমাভ কিছুক্ষণ বসে রইল, তারপর সিধে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

মৈনাক বাইরে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কান গরম হয়ে গেছে তার। অসীমাভ তার খুবই ভালো বন্ধু, কিন্তু মাঝে মাঝে তার মাতব্বরিটা সীমা ছাড়িয়ে যায়। মেসেজই তো করেছে; আর কি ? মামুলি কথাই হয়েছে, সে একবারও মুখ ফুটে বলেনি তার মনের কথা, তিয়াসা আকারে ইঙ্গিতে জিজ্ঞেস করা সত্ত্বেও। আর অসীমাভ অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই কথা শুনিয়ে দিল তাকে; মৈনাক তো আর মেশিন নয়; যে ব্রেক আপের পড়ের দিনই তিয়াসা নামক ‘ফোলডার’-এর সমস্তা ফাইল ডিলিট করে এক্কেবারে চাঙ্গা হয়ে যাবে ? এসব ভাবতে ভাবতে পকেটে হাত দিয়ে বুঝতে পারে, ঘরে ফোনটা ফেলে এসেছে সে; একবার পা থেমে গেলেও, শেষমেশ ঘরে যায়, আর গিয়ে দেখে অসীমাভ, শ্বেতাংশু সবাই শুয়ে পড়েছে, চোখ বন্ধ। ফোনটা বিছানার ওপর পড়েছিল। সেটা তুলে নিয়ে ঘাঁটতে ঘাঁটতে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে, রাতের ঘুমের কোটা পূরণ না হওয়ার ফল; তাই শুয়ে ঘুমিয়েই পড়ে সে।

সন্ধ্যের অন্ধকার নেমে যাওয়ার অনেক পড়ে ঘুম ভাঙে তার। গোটা ঘর ফাঁকা, দুপুরের এই টানা ঘুমটার পড়, নিজেকে অনেক চাঙ্গা মনে হচ্ছে। এখানে আসার পর থেকে, সেই দুঃস্বপ্নটা একদিনই দেখেছিল সে, তারপর থেকে আর না। কিন্তু খালি চোখেই যা যা দেখেছে এর মধ্যে, তারপর ওই আধা দুঃস্বপ্নের কোনো প্রয়োজন আছে কি আর ?

ঘরে কেউ নেই, সেও ঘর থেকে বেরিয়ে দেখতে পেল, বাইরে সবাই জটলা করেছে; স্যার তাকে দেখে বলে উঠলেন-

-“উঠলি ? শ্বেতাংশু বলল তোর নাকি রাতে ঘুম হয়নি বৃষ্টির পর থেকে, তাই তোকে আর ঘাঁটাই নি; এখন চাঙ্গা তো ?”

মৈনাক হেসে সম্মতি দেয়। অসীমাভ তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না এখন। একটু মাখন তাকেই লাগাতে হবে বোঝাই যাচ্ছে, কিন্তু এখন নয়; পড়ে। দুপুর থেকে আর বৃষ্টি হয়নি, আকাশ মোটামুটি পরিষ্কার, আর তাই আগামীকাল লেপচাখা যাওয়াটা একরকম স্থিরই হয়ে আছে।

-“স্যার, আজ কি দিলীপবাবু আবার রাতে জঙ্গলে পাহারা বসাবেন ?”

-“না না, আজ না। একটু আগে এসেছিলেন, তখন কথা হল। কাল বৃষ্টির পরে আজই যদি পাহারা বসে, তাহলে তাহলে চোরেরা সতর্ক হয়ে যেতে পারে; উনি আবার দু’দিন পড়ে সার্চ পার্টি বের করবেন।“

সন্ধ্যেটা একটু মামুলি গল্প করেই কেটে যায়; মৈনাক জোর করে সবার সাথে কথা বললেও অসীমাভ মুখ গোমড়া করে চুপচাপ বসেই কাটিয়ে দায়।

স্যারের কথামত সবাইকে তাড়াতাড়ি নৈশাহার সেরে শুতে যেতে হয়। কিন্তু অসীমাভ যা গোঁয়ার, তাতে এত সহজে মৈনাক নিস্কৃতি পাবে বলে তো মনে হয় না। এবং হয়ও তাই। ঘরে যেতেই একরকম পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া শুরু করে সে।

-“এই আকমল, তুই শ্বেতাংশুর পাশে যা, আমি ওই চিটিংবাজের থেকে যতটা পারা যায় দূরত্ব বজায় রাখব।”

মৈনাকের হাসিই পায় এ কথায়;

-“ভাই, প্লিজ… হয়ে গেছে, মিটে গেছে… আমারই ভুল, আমার কথা বলা উচিৎ হয়নি মেনে নিচ্ছি… ড্রপ ইট, প্লিজ…”

অসীমাভ নাছোড়বান্দা;

-“শ্বেতাংশু, ওকে জিজ্ঞাসা কর; শেষ দু’সপ্তাহ যে আমি আর তুই, ফোনের ব্যালেন্স পুড়িয়ে, রাত তিনটে অবধি জেগে জেগে ছেলের ‘মুড’ ভালো রাখছিলাম, এই কি তার প্রতিদান ?”

শ্বেতাংশু নাটুকে ভঙ্গিতে বলে ওঠে, ‘এই কি তার প্রতিদান ?”

-“না না, জিজ্ঞাসা কর ওকে; এই যে এত কাঠ খড় পুড়িয়ে ডুয়ার্স অবধি নিয়ে এলাম, তার পড়ে এই বেইমানিটার কি কোনো প্রয়োজন ছিল ?”

-“এর কি কোনো প্রয়োজন ছিল ?”

মৈনাকের বিরক্তও লাগছিল, হাসিও পাচ্ছিল, কিন্তু সে মুখ খোলার আগেই একের পর এক প্রশ্নবাণ ছুঁড়ে দিচ্ছিল অসীমাভ।

-“না, না, ও বলুক, আমাদের বন্ধুত্বের থেকে ওর কাছে একটা থার্ড ক্লাস মেয়ের নাটক আর লোক দেখানোই বেশী বড় হল…”

মৈনাকের মুখের চেহারা পাল্টে যায় এই শেষ কথাটায়। সে তবু চুপ করে থাকে। অসীমাভ এবার এগিয়ে আসে,

-“কি রে ? ওরকম গুম মেরে গেলি কেন ? উত্তরটা দে ? বল ? কি রে বল ?”

সকালে মৈনাকের ধৈর্য্যের বাঁধে একটু ফুটো হয়েছিল মাত্র, কিন্তু এবার সেটা হুড়মুড় করে ভেঙ্গেই পড়ল।

-“হ্যাঁ, ওই মেয়েটার সাথে কথা বলেছি। বেশ করেছি। হতে পারে লোক দেখানো, কিন্তু… কিন্তু আমি তো ভালো নেই, নেই ভালো… কিচ্ছু ঠিকঠাক চলছে না, আর এখানে আসা থেকে একের পর এক আজগুবি ঘটনা ঘটে চলেছে, নাথিং ইস নর্ম্যাল… কিচ্ছু না… তার মধ্যে শুধু একটা, একটা জিনিস আছে যেটা আমাকে একটু নর্ম্যালসির আভাস দেয়, সেটা নিয়ে তুই ফালতু একটা ইস্যু তৈরী করছিস।”

-“কিছু নর্ম্যাল নেই, থাকতেও হবে না, তুই তোর ফোনের মধ্যে নর্ম্যাল খোঁজ, আমি পারছি না তোর সাথে একঘরে থাকতে।“

এই বলে অসীমাভ সিধে দরজা খুলে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল। শ্বেতাংশু তাকে আটকাবার জন্য পেছন পেছন ছুটল, আর মৈনাক দু’হাতে মাথার চুল খামচে ধরে বিছানায় বসে পড়ল। তার প্রচন্ড ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে।

ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে অসীমাভ কোনো দিকে না তাকিয়ে বাঁ দিকে ধরে এগিয়ে গেল কারণ ডানদিক বা সোজা গেলে স্যারের ঘরের দৃষ্টিপথে আসতে হবে; তার পেছন পেছন শ্বেতাংশু।

-“অ্যাই অসীম… থাম… কি পাগলামো করছিস রাত্তিরবেলা ? আরে বাবা রিসর্ট থেকে বেরোস না…”

-“তুই যা তো, ঘরে যা, তোকে ভাবতে হবে না…”

এই বলে হন হন করে রিসর্টের সীমানা ছাড়িয়ে বেরিয়ে যায় অসীমাভ। বন্ধুকৃত্যের টানে শ্বেতাংশুকেও যেতে হয় তার পেছন পেছন।

-“এই অসীম… কি ছেলেমানুষী করছিস মাইরি ! এই আর যাস না… স্যার দেখতে পেলে দু’জনেরই পিঠের ছাল তুলে নেবে… এই আর যাস না। থাম না রে ভাই… আরে থাম রে…”

অসীমাভ এবার কিছু না বলে, পাশে শোয়ানো একটা গুঁড়ির ওপর বসে পড়ে।

-“একটা মেয়ে, একটা জলজ্যান্ত ছেলেকে ফুল পাগল করে দিল… মানে বদ্ধ উন্মাদ। ভাব, ছেলে সত্যি সত্যি ভূত দেখছে… তোর খেয়াল আছে, পরশু রাতে ইনিয়ে বিনিয়ে ভূতের গল্প করছিল ? মানে এমনই মানসিক অবস্থা, ছেলে হ্যালুসিনেট করছে। ভাবতে পারিস ?”

শ্বেতাংশু হাঁপাতে হাঁপাতে তার পাশে বসে পড়ে।

-“সবই বুঝলাম ভাই; কিন্তু ওকে একটু সময় তো দিতে হবে ? লোকে বলে তিন বছরের রিলেশনের জের কাটতে বছরখানেক তো লাগবেই। সে তো আর রাতারাতি হয়ে যাবে না!”

-“হ্যাঁ, তাই সার্ভেতে এসে এখন দিনরাত এস এম এস করে নিজের মাথা খাবে, আর আমাদেরও মুড নষ্ট করবে।”

-“আচ্ছা, ঠিক আছে। মানছি ওর দোষ, কিন্তু এখন ফেরত চল। এখানে থাকবি নাকি সারারাত ?”

-“হ্যাঁ, না থাকার কি আছে ? ওপরে আকাশ, নিচে ঘাস…”

-“স্যার উঠে এলে কিন্তু পুরো বাঁশ ভাই… ঘরে চল, প্লিজ। জেদ করিস না…”

-“দাঁড়া, যাচ্ছি, আগে একটু হাওয়া খেয়ে নি…”

কথাটা বলে থামে দু’জনেই। কাল রাত থেকে বৃষ্টি হওয়ার পর থেকে সারাদিন, এমনকি খেয়ে ঘরে যাওয়ার সময় পর্য্যন্ত ফুরফুরে ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছিল। কিন্তু এখন সেটা আর নেই। কোনো হাওয়া নেই, আকাশের তারাগুলোকেও কোনফাঁকে একঝাঁক মেঘ এসে ঢেকে ফেলেছে যেন। বাতাস নেই, তাই বাতাসের শব্দও নেই, শুধু তাই নয়, এবার দু’জনে খেয়াল করল, চারপাশে প্রকৃতপক্ষেই পিন ড্রপ সাইলেন্স। ঘন্টিপোকা ডাকছে না, রাতচরা পাখি, কোনো জন্তু, এমনকি সামান্য পাতানড়ার শব্দও নেই। কেমন গা শিরশিরে নীরবতা চারদিকে।

যেখানে ওরা বসেছিল, সেখান থেকে একটু দুরেই, সামনে দূর্ভেদ্য জঙ্গল। সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল দু’জনের। মনে হল, সামনের জঙ্গলটা যেন এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। তাও আস্তে নয়, যেন প্রচন্ড বেগে গোটা জঙ্গলটা এগিয়ে এসে পিষে দিতে চাইছে ওদের দু’জনকে। সেই অনুভূতি বলে বোঝানোর নয়। অসীমাভ মুখটা আকাশের দিকে তুলছিল আস্তে আস্তে। কিন্তু তার মনে হল, ওপরে তাকালে দেখবে, গোটা আকাশটা যেন নেমে আসতে চাইছে ওদের দু’জনের মাথার ওপর। অসীমাভ হাতড়ে শ্বেতাংশুর হাতটা খুঁজে সেটা ধরে বুঝতে পারল শ্বেতাংশু কাঁপছে।

এত ভয় অসীমাভও পায়নি জীবনে কোনোদিন। সে সামনের দিকে তাকাল, আর জঙ্গলের ঠিক মাঝখানে দেখতে পেল দু’টো জ্বলন্ত চোখ। কোন জন্তু ওটা ? আলো ফেললে বোঝা যেত হয়তো… কিন্তু আলো ফেলার দরকার হয়না; একটুখানি তাকিয়ে থাকার পরই পরিষ্কার বোঝা যায়, ওই চোখদুটোর মালিক মনুষ্যাকৃতি কোনো প্রানী। অসীমাভ আর সহ্য করতে পারে না, শ্বেতাংশুর হাতটা খামচে ধরে ছিলই, এবার সে চোখ বন্ধ করে ফেলল, কিন্তু বন্ধ চোখ যেন মনের ভয়টাকে আরো অনেকগুন বাড়িয়ে দেয়। আর চোখ খুলেই সে দেখতে পায়;

জঙ্গল জঙ্গলের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে। জ্বলন্ত চোখদু’টোও আর নেই। বাতাসে পাতা নড়ার ঝিরঝির শব্দকে যোগ্য সঙ্গত করছে ঘন্টিপোকার কানে তালা ধরানো শব্দ। কোন আতঙ্ক, কোনো অতিপ্রাকৃতের লেশমাত্র নেই সেখানে। শুধু সবকিছু ছাপিয়ে দামামার মতো বাজছে তাদের দু’জনের হৃৎপিন্ড।         

<<———————- Read Previous Installment

Somewhere In the Jungle of North Bengal… Part IX

||৯||

ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে বরাদ্দ করা তিনটে হুডখোলা জীপের মধ্যে সবথেকে বড়টা নিয়ে যাওয়াই সাব্যস্ত হল। কারণ তারা দা এবং দিলীপ বাবু দু’জনেই বললেন, স্পেশাল পারমিশানের ফলে একটার বেশী গাড়ি নিয়ে যাওয়াটা বিড়ম্বনার পর্যায়েই চলে যাবে, আর একটা জীপে যখন সবাই ধরেই যাবে, তখন চিন্তার কোনও কারণই নেই।

সারাদিনের কাজকর্মের মধ্যে, আজ বার বার মৈণাকের রাতের ঘটনা মনে পড়ে যেতে লাগল। কাল রাতের ঘটনাটা খুলে কাউকে বলতে পারেনি সে। কারণ স্যার হেসে উড়িয়ে না দিলেও, উনি হ্যালুসিনেশন বা কালচারাল শক-এর মতই কিছু বলবেন বলে মনে হয়। সেটাতে কতটা মানসিক শান্তি পাওয়া যাবে ? কিন্তু যে ভাবে বার বার, একই ধরণের জিনিস ঘুরে ফিরে দেখছে সে, তাতে মাঝে মাঝে সত্যিই মনে হচ্ছে একটা কিছু অলৌকিক, অপ্রাকৃত ঘটনা ঘটে চলেছে তার চারপাশে। সবই তার মনের ভুল নয়, হতে পারে না। দুপুরে রোদ পড়তে শুরু করার সাথে সাথেই চারপাশের পরিবেশের একটা অস্বস্তি কেমন যেন জমাট বাঁধতে শুরু করল আবার। মৈনাকের খালি মনে হতে থাকল, অন্ধকার নামার সাথেই যেন আবার ওই পায়ের শব্দটা তাকে ধাওয়া করে আসবে পেছন পেছন। দিলীপ বাবু আজ জঙ্গলে যাবেন সার্চ পার্টি নিয়ে। তাহলে কি বেয়াইনি কাঠ চোরেরা ধরা পড়বে আজ ? সেটা হলে মনে একটু শান্তি পাওয়া যাবে বলে মনে হয়।

কাজকর্ম শেষ করে দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পড় একটু বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু সবাই এতই উত্তেজিত, যে ঘুম কারোরই হল না; সবচেয়ে বেশী উত্তেজিত হল অসীমাভ। সে গোটা দুপুর ক্যামেরার ব্যাটারি চার্জ করে, আর লেন্স পরিস্কার করে কাটিয়ে দিল। মৈনাকের মনেও একটা চাপা উত্তেজনা, রাতে জঙ্গলে ঘোরার অভিজ্ঞতা হওয়াটা একটা বিরাট বড় ভাগ্যের ব্যাপার। দলের মেয়েদের মধ্যেও একটা চাপা উত্তেজনা খেলা করে চলেছে অনুপ্রিয়া যদিও বলে চলেছে ‘ইটস নট সেফ… ইটস এগেইন্সট দ্য প্রোটোকলস… উই শুড কল দিস অফ…’। কিন্তু সে কথা শুনছে কে ? সমীরা যদিও মুখে কিছু বলছে না, কিন্তু মুখটা একটু শুকনো বলেই মনে হচ্ছে। পল্লবীর সেসব চিন্তা নেই, সে-ও সমান উত্তেজিত।

বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ, তারা দা এসে হাজির হল। সঙ্গে দিলীপ বাবুও এলেন। ড্রাইভার রাম দা কে সব বুঝিয়ে, তারা দার কাছে পারমিশানের কাগজ দিয়ে তিনি ‘গুড লাক’ বলে চলে গেলেন, আজ তো আবার তাঁকে দলবল নিয়ে জঙ্গলে তদন্তে বেরোতে হবে।

সন্ধ্যের অন্ধকার সবে সবে নামতে শুরু করেছে। বিকেল থেকে আকাশে একটু একটু মেঘ জমেছে, তবুও বৃষ্টি হবে বলে মনে হয় না। লেপার্ডস নেস্ট থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের মধ্যের রাস্তা ধরে মন্থরগতীতে চলতে শুরু করল জীপটা। ড্রাইভারের পাশে স্যার, পেছনে সবার সাথে তার দা। সরু রাস্তার বুক চিরে হেডলাইটের আলো আর সেই আলোতে দু’দিকের জঙ্গল কিছুটা দৃশ্যমান হয়েই আবার জীপের পেছনে মিলিয়ে যাচ্ছে। এই রাস্তায় তারা আগেও গেছে, কিন্তু দিনের বেলা। তবে রাতে এ যেন এক অপার্থিব অনুভূতি। ঘন্টিপোকার ডাকে মিলিয়ে গেছে জীপের ইঞ্জিনের আওয়াজ। সবাই হাঁ করে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে; একটা বাঁক ঘুরতে হঠাৎ হেডলাইটের আলোয় একটা জন্তু দেখা গেল, রাস্তার ধার দিয়ে দুলকিচালে চলেছে হেঁটে হেঁটে, আর সেটা দেখে প্রায় আর্তনাদ করে উঠল সমীরা

-“হায় দইয়া ! বাইসন !!”

সবাই চমকে উঠলেও, স্যার একটু ভালো করে দেখে উত্তর দিলেন,

-“ভালো করে দেখ মা, ওটা বাইসন নয়, গাইসন…”

কাছাকাছি যেতে দেখা গেল সত্যিই সেটা নিরীহ বাদামী রঙের একটা গরু।

-“না স্যার, আমার মনে হচ্ছে বাইসনের বাচ্চা…” -হাসতে হাসতে বলে ওঠে শ্বেতাংশু।

“হাতির বাচ্চা হলেও বা আটকাচ্ছে কে ?” – ফোড়ন কাটে অসীমাভ।

সমীরা মুখটা গোঁজ করে সেই যে বসে পড়ে, আর সীট থেকে ওঠে না। প্রায় পৌনে একঘন্টা পর, তারা পিচের রাস্তা ছেড়ে সন্তর্পণে জঙ্গলের ভেতরে ঢোকে। একটু ভেতরে ঢোকার পরই হেডলাইটের আলোয় একটা ছোট আকারের জন্তু, যেটা রাস্তা পেরোচ্ছিল, সেটা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। সেদিকে তাকিয়ে বিরস বদনে সমীরা বলে ওঠে,

-“হাঁ, ইস জঙ্গলমে গাই অর বকরী কে সিবাহ কুছ নহী মিলনে ওয়ালা…”

কিন্তু এ দাবী নস্যাত করে দিয়ে তারা দা চেনাল, হেডলাইট দেখে থমকে দাঁড়ানো বস্তুটা মোটেও ছাগল নয়, আসলে ‘বার্কিং ডীয়ার’।

এরপর সমীরার মুখের চেহারা কি হয়েছিল, সেটা না বলাই ভালো। জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে একটু দুর চলার পরই তারাদা বলে উঠল,

-“এই আমরা খুনিয়ার এলাকায় ঢুকে পরেছি…”

এ কথাটা শোনামাত্র সবার বুক যে একটু কেঁপে ওঠেনি, সেটা বললে মিথ্যে কথা বলা হবে। রাস্তা খুবই খারাপ, আসলে রাস্তাও ঠিক বলা যায় না, গাছের মধ্যে দিয়ে মানুষ এবং গাড়ি চলাচলের ফলে একটা পথ তৈরী হয়েছে, এবং সেটা প্রচন্ড এবড়োখেবড়ো। তাই ঝরঝর শব্দ করতে করতে চলেছে জীপটা। এবং সেই শব্দে, জঙ্গলে গাছ ছাড়াও যা কিছু নড়েচড়ে এদিক ওদিক সড়ে যাচ্ছে, সেটা বোঝা গেলেও, সে গুলো যে ঠিক কি জন্তু, সেটা বোঝা যাচ্ছে না মোটেই।

ছবি ঋণ – “অসীমাভ”

বোঝা গেল একটু পড়েই, যখন জীপের গা ঘেষে হুড়মুড় করে দৌড়ে পালালো গোটা দু’য়েক স্পটেড ডীয়ার। ঘন জঙ্গল যেন আরও ঘন হয়ে আসছে ক্রমশ। আর কিছুক্ষণ চলার পর, রাস্তা এসে মিশল একটা ফাঁকা চওড়া জায়গায়। এবার থামানো হল জীপ। তারা দা জীপ থেকে নামল। দেখাদেখি অসীমাভও নামতে যাচ্ছিল, কিন্তু স্যার তাকে হাত ধরে টেনে আটকে দিলেন। তারা দাও মাথা নেড়ে বারণ করল তাকে নামতে। ঝিরঝিরে ঠান্ডা হাওয়া চলছে, আর জঙ্গলের এ ভেতরে পাতা নড়ার শব্দও হয়ে উঠেছে প্রবল।  তারা দা চারপাশ একবার ঘুরে নিয়ে এসে বলব,

-“একটা জিনিস দেখবে ?”

সবাই বেশ কৌতুহলী হয়ে সমস্বরে ইতিবাচক শব্দ করতে না করতেই, তারা দার ইশারায়, রাম দা গাড়ির হেডলাইট নিভিয়ে দিল। অনুপ্রিয়া প্রথমে একবার একটা মৃদু আর্তনাদ করলেও, পল্লবী তাকে একটু ধমক দিয়ে থামিয়ে দিল; আর তারপর আবার তারাদার গলা শোনা গেল।

-“কেউ কোনও শব্দ করবে না, এক্কেবারে চুপ। চারপাশে কি শুনতে পাচ্ছ, আর কি দেখতে পাচ্ছ, ভালো করে খেয়াল কর।“

প্রথমে যেটাকে ঘুটঘুটে, নিশ্ছিদ্র অন্ধকার মনে হয়েছিল, সেটা কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখে সয়ে গেল। আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ। আর সেটার ফাঁক দিয়ে অগুনতি তারা, আর চাঁদের আলো, জঙ্গলের গাছের ফাঁক দিয়ে একটু একটু করে ভেতরে ঢুকছিল। সেটা পারিপার্শিক পরিষ্কার করে দেখার পক্ষে যথেষ্ট নয় ঠিকই, কিন্তু গাছের বহিরাকৃতি, এবং সামনে যে কত বড় বড় গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। তবে সেটাতে নিজের আশেপাশের লোকের মুখগুলোও ঠিক পরিষ্কার বোঝা যায় না। সবার মাঝে, একটা জীপের মধ্যে বসে থেকেই, নিজেকে বড্ড একা মনে হচ্ছিল তখন মৈনাকের। জীপের শব্দ অনেকক্ষণ বন্ধ হয়েছে, এখন ওই অন্ধকারের মধ্যে পাতার আওয়াজ, ঘন্টিপোকার আওয়াজ সব মিলিয়ে যে কোরাসটা তৈরী করেছে, সেটা রোজ রাতেই শোনা যায়, কিন্তু এখন শব্দটা অনেক অনেক জোরে। জঙ্গলের অ্যাম্ফিথিয়েটারে এই কোরাসের জলসায় প্রথম সারির সীটে যেন বসে আছে ওরা।

-“ওয়াও !!!”

অনুপ্রিয়ার মত অতবড় বেরসিকের মুখেও প্রশংসা শোনা গেল। স্যারও বোধহয় কিছু একটা বললেন, কিন্তু মৈনাকের কান সেদিকে ছিল না, সে একমনে এই অদ্ভূত সৌন্দর্য্যটাকে অনুভব করছিল। সেই মুহূর্তে কোনও ভয়, দ্বিধা মনে আসার কোনও প্রশ্নই ছিল না। কেমন যেন মনে হচ্ছিল পারলে বাকীজীবনটা এখানেই বসে কাটিয়ে দিলে মন্দ হয় না। কারোর সাথে সম্পর্ক নেই, কাউকে দু’বেলা ফোন করা নেই, কারোর কথা ভেবে রাতে বালিশ ভেজানো নেই…

-“রাম, এবার গাড়িটা ঘুরিয়ে নে, বেশীক্ষণ আর থেকে লাভ নেই…”

এই বলে জীপে চেপে বসল তারা দা। রাম দা জীপের হেডলাইটটা জ্বালাতেই এবার যে দৃশ্যটা দেখা গেল, সেটা দেখে সমীরা চিৎকার করেই দিত, কিন্তু অসীমাভ অসম্ভব ক্ষীপ্রতায় তার মুখ চেপে ধরল। বাকিরা কেউ শব্দ না করলেও, তাদের আত্মারাম যে খাঁচার দরজায় প্রবল ধাক্কা মারা শুরু করেছে, সেটা বোঝাই যাচ্ছিল। জীপের সোজাসুজি, গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল একটা বিরাট আকারের ভারতীয় গাওড় বা বাইসন। চোখে আলো পড়ায় একটু বিরক্ত হয়েই এক দু পা পেছিয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু তারা দা আগেই বলেছিল, গাওড়দের মত মাথাগরম এবং অনিশ্চিত মানসিকতার প্রাণী আর দু’টো হয় না, কয়েক বছর আগেই একবার টুরিস্টদের একটা গাড়ি চার্জ করে উলটে দিয়েছিল একটি গাওড়।

-“আলো নেভা, ক্ষেপে যাবে… আস্তে আস্তে গাড়ি পেছো। তোমরা পেছনে দু-তিনটে ফ্লাডলাইট জ্বালাও…” -ফিসফিসে, কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বলে উঠল তারাদা।

শ্বেতাংশু জীপের ঠিক মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে একটা ফ্লাডলাইট জ্বালিয়ে জীপের ঠিক পেছন দিকে মুখ করে ধরল। বাকি ডাইলে আর বাঁয়ে দু’টো আলো জ্বালিয়ে ধরল অসীমাভ আর মৈণাক।

-“পাশে আলো ফেলো, সামনে হেডলাইট জ্বালানো যাবে না এখন।”

তারাদার কথা অনুযায়ী খুব সন্তর্পণে গাড়ি পিছিয়ে, তারপর ঘোরানো হল। কপাল খুবই ভালো বলতে হবে, কারণ এর মধ্যেও গাওড়টা একচুলও নড়েনি। এবার আবার তারাদার গলে শোনা গেল;

-“রাম, টান গাড়ি, সোজা…”

জঙ্গলের ওই এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় জোরে জীপ চালানো, এবং সেই জীপে বসে একদিকে আলো ধরে থাকা যে কতটা কষ্টকর, সেটা প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়া কারোর বোঝার কথা ন্য; আর তাই এই ব্যাথাতুর ঘটনা কল্পনা করার হাত থেকে আমি পাঠকদের অব্যাহতি দিলাম। গাওড়টা যে দাঁড়িয়ে রইল, এবং তেড়ে এল না, সেটা সৈভাগ্য ছাড়া আর কিছু তো বলা যায় না; তবে গাওড়টার এই অতিরিক্ত শান্ত ব্যবহারের কারণটা জঙ্গল ছেড়ে বেরোনোর সময় বুঝতে পারল মৈণাক। পাশের জঙ্গলে আলো পড়তে, সে দেখতে পেল, আর একটা গাওড়, এবং তার সাথে দু’টো বাচ্চা। সক্কলে মিলে খুনিয়ার জঙ্গলে ফ্যামিলি পিকনিকে এসেছিল বোধহয়। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পড়ার পর, একটু থামল ওরা। ঘড়িতে সময় তখন প্রায় ৯টা। একটু ধাতস্থ হয়ে আবার রওনা দিল লেপার্ডস নেস্টের উদ্দেশ্যে। ফেরার পথে, আবার গা টা যেন একটু শিরশির করে উঠছিল মৈনাকের। লেপার্ডস নেস্ট-এ ঢোকার পর, কিন্তু অতটাও অস্বস্তি লাগল না। দিলীপ বাবুর এবং আর একটা অচেনা জীপ দাঁড়িয়ে তাদের রিসর্টের মধ্যে। মানে জঙ্গলে টহলদারি চলছে জোর। আজকের পরিবেশ কিন্তু স্বাভাবিক। জঙ্গলের শব্দ শোনা যাচ্ছে, ঘ্যাষঘ্যাষে শব্দটা আপাতত আর নেই, হাওয়াও দিচ্ছে বেশ।

ঘরের জানলা থেকে বাইরের জঙ্গলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল মৈনাক। শ্বেতাংশু গান ধরেছিল…

“ছায়া ঘনাইছে বনে বনে… গগনে গগনে ডাকে দেয়া…”

মৈনাক চুপ করে অপেক্ষা করছিল, কখন আবার সেই শব্দটা পাওয়া যাবে, আজ সে আর কিচ্ছু লুকোবে না, তাহলে শ্বেতাংশু আর অসীমাভকে ডেকে নিয়ে গিয়ে দেখাবে সব। শব্দ শুরু হল না, শ্বেতাংশুর গানের সুরেই হয়তো, মেঘ ডেকে উঠল। এক ঝলক বাজের আলোয়, জঙ্গলটা একবার দৃশ্যমান হয়েই, আবার রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। অন্য কোনও অপ্রাকৃতের চিহ্নই নেই সেখানে। তাহলে কি সত্যিই, সব ভুল ?

এবার অন্য একটা শব্দ পাওয়া গেল। ‘টুং’ শব্দে একটা এস এম এস ঢুকল মৈনাকের ফোনে; তিয়াসা লিখেছে

“kmn achs ?”’

<<——- Read Previous Installment

ইয়ে, সরি, এই কিস্তিটা লিখতে বড় দেরী হয়ে গেল… আসলে আমার মত টোটোকোম্পানি ঘরে বাঁধা পড়লে যা হয় আর কি… তবে চিন্তা নেই, ঘরে আছি যখন, লেখা এখন এগোবে, আর পেয়েও যাবে শিগগির শিগগির…

Sorry !!!

কথা দিয়েছিলুম হোলি স্পেশাল এপিসোড আসবে “Somewhere, in the Jungle of North Bengal”-এর। তা হোলির দিন লিখতে তো পারিই নি, বদ্ধপরিকর ছিলাম কাল বা আজ লিখব বলে; কিন্তু জ্বর এবং মাথা যন্ত্রণার কারণে আজ ও লেখা সম্ভবপর হল না। সুস্থ হয়ে উঠেই বাকিটা পরের কিস্তি লিখব। কথার খেলাপ করার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী…

Somewhere In the Jungle of North Bengal… Part VIII

“আলোও নয়, অমাও নয়, যায় যে দেখা

আজও নয়, কালও নয়, ভাগ্যে লেখা…”

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

||৮||

যদি পারত, তাহলে নিজের স্নায়ুর পিঠ চাপড়ে একবার বাহবা দিত মৈনাক। কিন্তু এই কাজটা করতে সে অপারক। এখন ভরসার কথা হল, ঘ্যাসঘ্যাসে শব্দটার সাথে সাথে, বাতাবরণের বাকি শব্দগুলোও ফেরত এসেছে, আর একটু আগের ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পড়েও, ঘাড়ে চেপে বসা অস্বস্তিটা যেন নেমে গেছে।

-“শব্দটা কোনদিক থেকে আসছে, বুঝতে পারছিস ?”

পেছন থেকে অসীমাভর গলার স্বরে চমকে ওঠে সে, আর চমকে ওঠাটা দেখে অসীমাভ বলে ফেলে,

-“অমন করছিস কেন ? ভূত দেখলি নাকি ?”

-“অ্যাঁ ! না না, আরে; হঠাৎ ডাকলি, তাই চমকে গেলাম… ঠিক বুঝতে পারছি না, রে… মনে হচ্ছে ওইখানে।”

এই বলে সে জঙ্গলের একটা জায়গা নির্দেশ করে দেয় আন্দাজে।

সে দিকে তাকিয়ে একটু দেখে অসীমাভ, কি যেন একটা ভাবে। তারপর বলে,

-“দাঁড়া, স্যারকে তুলি; শ্বেতাংশুকেও ডাকি।”

-“চল, আমিও যাচ্ছি, স্যার বাইরে দেখলে আবার…”

এই বলে অসীমাভর সাথে মৈনাকও উঠে চলে যায় ভেতরের দিকে, হাতদুটো এখনো কাঁপছে সেটা লোকানোর যথাসম্ভব চেষ্টা করে। কটেজের দিকে ফিরেই লক্ষ্য করে মৈনাক, কালো কুকুরটা উধাও; আর একটু আগে ভয়ে কাঁপতে থাকা কুকুরগুলো দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেন কিছুই হয়নি এতক্ষণ। মৈনাক তখনো একটা ঘোরের মধ্যে আছে। কি হল একটু আগে ? কি দেখল সে, একটু আগে ? সবই কি দৃষ্টিবিভ্রম ? সত্যিই কি নগরসভ্যতা থেকে এত দুরে এসে তার মস্তিষ্ক তার সাথে একটা নোংরা রসিকতা করছে ? এগুলো মাথার মধ্যে চলতে চলতেই দু’জনে স্যারের ঘরের দরজায় এসে পড়ল। কলিং বেল একটা থাকলেও সেটা অকেজো, আর তাই দরজায় টোকা দিয়ে, স্যারকে ডাকল অসীমাভ। স্যারের ঘুম বেশ পাতলা, তাই দ্বিতীয় টোকা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্যার উঠে এসে দরজা খুললেন।

-“কি হল রে ?”

-“শব্দটা আবার পাওয়া যাচ্ছে, স্যার। সেই করাত ঘষার মতো শব্দটা…”

স্যার একটু মন দিয়ে কিছু শুনলেন, এবং শব্দটা যে পেলেন, সেটা বোঝা গেল ওনার কথায়।

-“হুম। দাঁড়া, চশমাটা পড়ে আসি।”

এই বলে স্যার ঘরে ফেরত গিয়ে চশমা আর দিলীপ বাবুর দেওয়া একটা টর্চ নিয়ে বেরিয়ে এলেন। তিনজনে হাঁটতে হাঁটতে সেই পাথরটার দিকে যাচ্ছিল, এমন সময় ঘর থেকে বেরিয়ে এল শ্বেতাংশু।

-“স্যার, পেলেন শব্দটা ?”

-“হ্যাঁ, চলতো দেখি…”

পাথরের কাছে গিয়ে অনেকক্ষণ জঙ্গলে আলো ফেলে সবাই মিলে পর্যবেক্ষণ করেও শব্দের কোনো উৎস পাওয়া গেল না। কানের আন্দাজ যেখানে বলছে, আলো সেখানে দেখাচ্ছে শুধুই দুর্ভেদ্য জঙ্গল। বেশ কিছুক্ষণ তবু দেখার চেষ্টা করে স্যার বললেন,

-“নাহ, কিছুই দেখা যাচ্ছে না এই অন্ধকারে। চল চল শুয়ে পড়ি; কাল দিলীপবাবু কে বলি, দেখি উনি কি বলেন…”

-“কিসের শব্দ হতে পারে ওটা, স্যার ?”

-“সে আমি কি করে বলব ? তবে যা মনে হচ্ছে, এখানে তো চোরাগোপ্তা গাছ কাটা হয়ে থাকে, হয়তো সেরকমই কিছু হচ্ছে…”

-“একবার একটু জঙ্গলের ভেতরে গিয়ে দেখলে হয় না ?”

-“দেখ অসীম, সাহস আর বোকামীর পার্থক্যটা তুই এখনো শিখলি না; মাতব্বরীটা একটু কম কর, আর গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে দয়া করে আমাকে উদ্ধার কর তোরা…”

এ কথায় অসীম আর কোনো উত্তর দেওয়ার সাহস পায় না। ঘরে ফিরে গিয়ে দেখে আকমল রীতিমত নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে, আর পল্লবী একমনে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে। ওদের ঘরে ঢুকতে দেখে বলল,

-“যাক, এলি ? আমি শুতে গেলাম। অসীম, এখানে ডেটাশিটটা রইল। শুধু কো-অর্ডিনেট বসানো বাকি আছে, কাল সকালে বসাতে হবে। আর স্যাম্পলগুলো অ্যারেঞ্জ করতে হবে সেইমত। স্যার কি বললেন ?”

ব্যাপারটা এবার মৈনাকই বুঝিয়ে বলে। তার উত্তরে পল্লবী বলে ওঠে,

-“হ্যাঁ দিলীপবাবুকে বলাটাই বেটার। উনি জানবেন এসব কিভাবে হ্যান্ডল করতে হয়।”

পল্লবী মেয়েদের ঘরে চলে গেলে ল্যাপটপ আর যন্ত্রপাতি গুছিয়ে অসীমাভ আকমলের ব্যাগ হাতড়ে মদের বোতলটা বের করে। আর প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে,

-“মানে, লোকে কতবড় চামার হলে এত সস্তার হুইস্কি কিনে খেতে পারে ?”

শ্বেতাংশু বিদ্রুপ করে বলে ওঠে,

-“সবাই কি আর তোর মত ‘অকেশনালি’ সিঙ্গেল মল্ট খায় রে ?”

-“তুই থাম ভাই। আমাদের বাড়ির পাশের রিক্সাওয়ালাগুলো এর থেকে দামী খায়… ইসসস এবার সারারাত ওর পাশে শুয়ে আমাকে কাটাতে হবে। মালটা বডি স্প্রেও বোধহয় আনেনি।”

মুখটা বিকৃত করে আকমলের পাশে শুয়ে পড়ে অসীমাভ। তার পাশে শ্বেতাংশু আর সবার শেষে মৈনাক। আজ বেশ ঠান্ডা আছে, তাই পাতলা কম্বলগুলো গায়ে টেনে নেয় সবাই। গলা অবধি কম্বল টেনে নিয়ে শুয়ে পড়ে, মৈনাক বলে ওঠে,

-“ভাই…”

-“বলে ফেল…” -অসীমাভ উত্তর দেয়।

-“তোরা কেউ ভূতে দেখেছিস ? মানে ভূতে বিশ্বাস করিস ?”

-“ভূত দেখা আর বিশ্বাস করাটা কি আলাদা জিনিস নয় ?” – শ্বেতাংশু বলে ওঠে।

-“ইউ গেট মাই পয়েন্ট। বল না, ভূতে বিশ্বাস করিস ?”

-“না…” উত্তরটা দিয়ে অসীমাভ উল্টো পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে।

-“দেখিনি, তাই বিশ্বাস করিনা ভাই… দেখিনি বলে ভগবান, ভূত কিছুই মানি না, দেখতে পেলে সবই মানব…” – বলে ওঠে শ্বেতাংশু।

-“হুম…” বলে চুপ করে যায় মৈনাক। কিছুক্ষণ এই নীরবতা থাকার পর, হঠাৎ অসীম লাফিয়ে উঠে বসে পড়ে।

-“ওয়েট আ মিনিট… হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন ? এই মই…”

-“না কিছু না…”

-“কিছু না মানে ? তারাদা আর রামদার মুখে ভূতের গপ্পো শুনে, তুই কি ভূতে বিশ্বাস করতে শুরু করলি নাকি ?”

-“আরে না রে… মানে চারপাশের যা পরিবেশ, তাতে বেশ ভূতের গল্প জমে কিনা… তাই আরকি।”

-“কথা ঘোরাস না… কি হয়েছে বলবি ?”

শ্বেতাংশু এতক্ষণ চুপ ছিল সেও আস্তে আস্তে উঠে বসে বলে উঠল,

-“দাঁড়া, দাঁড়া… তুই কি ভূত দেখলি নাকি ভাই ?”

-“জানি না… আশপাশের পরিবেশটা বড্ড… মানে হন্টিং… রাত্রিবেলা কেমন অস্বস্তি লাগে… কেমন যেন মনে হয় চারপাশ থেকে কে যেন দেখছে… নজর রাখছে, আড়াল থেকে…”

-“দেখ জঙ্গল তো, কোলকাতা শহর তো নয়… এখন দিনরাত গাড়ির চ্যাঁ ভ্যাঁ আর ‘নিয়ন আলোয় আলোকিত যত রেস্তরাঁ’ ছেড়ে এলে, নিজেকে আউট অফ প্লেস তো মনেই হবে, তাই না ?”

অসীমাভর কথার উত্তরে শ্বেতাংশু বলে ওঠে,

-“আহা ! কেয়াবাৎ, কেয়াবাৎ…” আর তারপরই সে সুর করে গান ধরে,

“কি আছে আর… গভীর রাতের নিয়ন আলোয় আলোকিত যত রেস্তরাঁ…

সব থেকে উঁচু ফ্ল্যাটবাড়িটার, সব থেক উঁচু ছাদ…

তোমায় দিলাম আজ…”

এর উত্তরে, মৈনাকও একটু না হেসে পারে না…

তারপরই অন্ধকার ঘরের ভেতর থেকে বেসুরো অসীমাভ, আধাসুরো মৈনাক আর সুরেলা শ্বেতাংশুর একত্রে তার সপ্তকে চিৎকার শোনা যায়,

“তোমায় দিলাম… তোমায় দিলাম… তোমায় দিলাম…”

সে স্বরের দাপটে, পাশের ঘর থেকে ততধিক জোরে একবার ‘হায় দাইয়া’ শোনা যায়, আর অনুপ্রিয়া উঠে এসে ‘দিস ইজ টুমাচ গাইজ’ বলে আবার দুম দুম করে পা ফেলে ঘরে ফিরে যায়। কিন্তু এত হট্টগোলের মধ্যেও, আকমল অবিচল। অনুপ্রিয়া চলে যাওয়ার পড়, বেশ কিছুক্ষণ হাসাহাসি করতে করতে তিন স্যাঙাতে ঘুমিয়ে পড়ে।

সকালে ওদের ঘুম থেকে উঠতে আজ বেশ দেরী হয় ওদের। আজ সার্ভের কাজ নেই, কিন্তু অন্য কাজ আছে; প্রথমত আগের দিনের ডেটাগুলোর কাজ শেষ করা আর স্যার আবার লেপচাখা কবে, কিভাবে যাওয়া হবে, আর কোথায় যাওয়া হবে, সেসব প্ল্যান তৈরী করা। ঘুম থেকে উঠে দেখে, বাইরে বসে দিলীপবাবু আর স্যার গম্ভীর মুখে কিছু আলোচনা করছেন।

-“খুবই সম্ভব। পোচার আর এই বেআইনি লাম্বার… এই নিয়েই তো দিন কাটে মশাই। তা আমি একটা ওয়াচ পার্টি তৈরী করছি; আজই রাত থেকে শুরু করতে হবে…”
আলোচনা কি নিয়ে হচ্ছিল, বোঝা যায়। অসীমাভদের আসতে দেখে, দিলীপবাবু একগাল হেসে বলে ওঠেন

-“এই যে, গুড স্যামারিটান্স… ঘুম হল ? ব্যাপারটা রিপোর্ট করতে আমার সুবিধা হল… পাহারা বসাতে পারব। যাক গে, তোমরা বস, আমি উঠি… তারা একটু পড়েই আসছে…”

ভদ্রলোক বেরিয়ে যান। প্রাতরাশ করতে করতেই তারাশঙ্কর এসে হাজির হয়। লেপচাখার কাজ শেষ করতে আরো তিনদিন লাগবে, তাই কাল আবার লেপচাখা যাওয়া হবে বলে ঠিক হয়। এ ছাড়া, সাখামের দিকে কিছু সার্ভে এবং এক্সক্যাভেশন করতে যেতে হবে বলে ঠিক হয়। এসব কথা শেষ হলে অসীমাভ বলে ওঠে,

-“তারা দা, আজ তো আমরা সন্ধ্যের দিকে খালি। একটু কোথাও ঘুরতে গেলে হয় না ?”

-“কোথায় যাবে বল ? জঙ্গলে ঘুরতে ?”

-“হ্যাঁ, যদি সম্ভব হয়…”

এবার একটু রহস্যময় হাসি হেসে তারাশঙ্কর বলে ওঠে,

-“খুনিয়ার জঙ্গলে যাবে নাকি ?”

অসীমাভ সমেত সবাই চমকে ওঠে…

-“যাওয়া যায় নাকি ?”

-“কেন যাবে না ? চল… আজ তো আর পূর্ণিমা নয়, তাছাড়া, আমি সঙ্গে থাকব, জীপে করে যাব, চিন্তার কোনো কারণই নেই। স্যার যাবেন তো ?”

-“ব্যাপারটা কি সেফ হবে ?”

-“আরে বাবা, আমি গ্যারান্টি নিচ্ছি তো… এরা আমার ছোট ছোট ভাইবোনের মতো; আপনি চন্তা করছেন কেন ?”

-“না না, চিন্তা করিনি… আর আমি তো যাবই; দায়িত্ব নিয়ে এসেছি যখন, বাচ্চা বাচ্চা ছেলেপুলেগুলোকে কি একা ছেড়ে দেব নাকি ? বেশ, তুমি যখন বলছ, তখন তাই হোক…”

অনুপ্রিয়া একটু আপত্তি করছিল, কিন্তু পল্লবী ওকে থামিয়ে দেয়। স্যার এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে বলেন,

-“বেশ, হাতের কাজকর্ম শেষ করে ফেল সারাদিনে, অরণ্যের দিন যখন দেখা হল, এবার রাত্রিটাও দেখে আসি…”     

কাল লিখতে না পারার জন্য দুঃখিত। আজ অষ্টম আর কাল দোলযাত্রা এবং হোলিকা দহন উপলক্ষ্যে নবম পর্ব প্রকাশিত হবে…

Somewhere In the Jungle of North Bengal… Part VII

“…যাবে তো যাও নীলপাহাড়ী,

সেথায় নড়ে সবুজ দাড়ি।

সেইখানেতে ঝাউ বাংলায়

(লেখা নেইকো বুড়ো আংলায়)

গান ধরেছে হাঁড়িচাঁচায়,

কুন্ডুমশাই মুন্ডু নাচায়।”

শ্রী ঝুমুরলাল চৌবে চক্রবর্তী

||৭||

-“খুব সোজা উত্তর… কালচারাল শক…”
-“কালচারাল শক ?”
-“তুই এর আগে, কখনো এরকম জঙ্গলে এসে রাত কাটিয়েছিস ? এত সমস্যার মধ্যে ?”

-“না স্যার…”

-“আসলে আমাদের মত শহুরে ভূতেরা সভ্যতার ছোঁয়ার বাইরে এলে অনেক সময়ই অপ্রাকৃতিক জিনিসপত্রের সম্মুখীন হয়ে থাকে… সেটাই কালচারাল শক। এ ব্যাপারটা আমি আগেও অনেকের মধ্যে দেখেছি; মনে হয় সব উল্টোপাল্টা হচ্ছে… দ্যাট ইনক্লুডস ভূত দেখা, এমনকি জঙ্গলে জন্তু জানোয়ার দেখা। তুই এখানে এসেছিস একটা অত্যন্ত ইমোশনালি ভালনারেবল স্টেট নিয়ে, তারপর লাগাতার ভূতের গল্প শোনা, আর এরকম একটা সুন্দর অথচ অবস্কিওর জায়গায় হঠাৎই রাত কাটানো… সব মিলিয়ে মনের মধ্যে একটা জগাখিচুড়ি তৈরী হচ্ছে তোর। তবে হ্যাঁ, জঙ্গলে কি একটা শব্দ পাচ্ছিলি বললি, সেটা আজ রাতে পেলে আমায় ডাকিস, শুনব।”

এ কথাটার কোনো উত্তর দিল না মৈনাক। ট্রেকার্স হাট-এর সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে এবং স্যার দু’জনে উদীয়মান সূর্য্যটার অপেক্ষা করছিল। আভাটা দেখা যাচ্ছে, শুধু সূয্যিমামার দেখা পাওয়ার দেরী। আস্তে আস্তে আলো ফুটছে, আর তার সাথে সাথে মনের কোণে দানা বাঁধতে থাকা সন্দেহ আর চাপা ভয়টা একটু একটু করে কর্পূরের মতই উবে যাচ্ছে যেন। ত্রৈলোক্যনাথ তো লিখেই গেছেন “জল জমিয়া যেমন বরফ হয়, তেমনি অন্ধকার জমিয়া ভূত হয়…” সারারাত সবাই একসাথে হাসিঠাট্টা, গান-বাজনা করার সময়ও সেই চেহারাটা ভাসছিল মৈনাকের চোখের সামনে; এক এক করে সবাই নিদ্রাদেবীর আরাধনায় মত্ত হলেও মৈনাক সারারাত হেডফোন লাগিয়ে গান শুনে কাটিয়েছে।  সকালে স্যার ঘুম থেকে ওঠামাত্রই কথাটা বলা একদম ঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।  স্যারের বদলে অসীমাভ বা শ্বেতাংশুকে বললে হয়তো হাসির খোরাক হতে হত। স্যারকে বলতেও একটু দোনামোনা হচ্ছিল, কিন্তু শেষমেষ বলে ফেলে আর স্যারের উত্তরে মনের মেঘটা কাটতে থাকে সহজেই।

-“আমাকে ডাকলি না কেন রে ?”
আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে এসে প্রশ্ন করে অসীমাভ। এর উত্তর স্যার বা মৈনাক দেওয়ার আগেই অসীমাভ সামনের দিকে তাকিয়ে দেখে, তারপরই দৌড়ে ভেতরে ঢুকে যায় এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যামেরা নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে আসে। অসীমাভর ক্যামেরাতে খচ খচ করে শব্দ হতে শুরু করে। এক এক করে সবাই বেরিয়ে আসে। সূর্য্যোদয় দেখে, এবং চা পানের পর আবার রওনা হওয়া হয় লেপচাখা। রাতের ঘুম কারোর ভালো করে হয়নি ঠিকই, কিন্তু হাতের কাজটা সেরে ফেলে ঝাড়া হাত পা হওয়ার তাগিদে সবাই খুব তাড়াতাড়িই অনেকটা কাজ শেষ করে ফেলে। একদিনের কাজ নয়, তা ছাড়া লেপচাখা ছাড়াও ওদের অন্যদিকে যেতে হবে, জয়ন্তীর দিকেও কিছু জায়গা স্যার দেখিয়ে দিয়েছেন ম্যাপ-এ…

তারা দা ঠিকই বলেছিল, ওঠার চেয়ে নামতে সময় অনেকটাই কম লাগে। শুধু ফেরার পথে একবার ট্রেকার্স হাট-এ থামতে হয়েছিল আকমল আর চাপতে পারছিল না বলে। দুপুর দেড়টা নাগাদ ওরা সান্তালবাড়ি এসে হাজির হয়, জীপগুলো রাতে ফিরে গেলেও, সকালে ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল, তাই লেপার্ডস নেস্ট-এ ফেরত যেতে সময় খুব একটা লাগে না। তারা দা সেদিনের মতো বিদায় নেয়। রতন কাঁদো কাঁদো মুখে এসে জানায়, একা হাতে চারটে কুকুর সামলানো তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না, ‘পরের বার যেন দাদা-দিদিরা কুত্তাগুলোকে লিয়ে যান’। আসলে তারাদাই বলে ওপরে কুকুর নিয়ে যাওয়াটা বিড়ম্বনা, তাই কুকুরগুলোকে রতনের জিম্মায় রেখে যাওয়া হয়েছিল।  স্নান খাওয়া দাওয়ার পর অসীমাভ আর পল্লবীর খুব ইচ্ছা ছিল মেজারমেন্ট এর ডেটা নিয়ে বসার। এবং ল্যাপটপ খুলে দু’জনে বসেও ছিল; কিন্তু ক্লান্তি বাধ মানল না, বাকিদের মতো ওরা দুজনেও ঘুমিয়ে পড়ল।

বিকেলের মুখে আবার স্যার ডেকে তুললেন ওদের। আবার আগের দিনের মতো জোনাকি দর্শন করতে যাওয়া হল। এই দৃশ্যটা এমনই যে দিনের পর দিন, ঘন্টার পর ঘন্টা দেখলেও আশ মেটে না, একঘেয়েও লাগে না। সন্ধ্যের মুখে সবার একটু ইচ্ছে হয়েছিল আশেপাশে ঘুরে আসতে, কিন্তু স্যার এককথায় সেটা নাকচ করে দিলেন। তাই রিসর্টের এককালের লনে বসে তাস পিটিয়ে খাওয়া দাওয়া করে রাত ৯টা নাগাদ ঘরে গেল সবাই। দুপুরে ঘুমিয়ে পড়ার ফলে অসীমাভ এবার ডেটার কাজ নিয়ে বসতে বদ্ধ পরিকর। সে আর পল্লবী বিছানায় বসেছে ল্যাপটপ, মেজারমেন্ট চার্ট আর জিপিএস খুলে। শ্বেতাংশু আর মৈনাক পাশেই বসে ছিল, একটু দুরে বসে আকমল তার ব্যাগ হাঁতড়াচ্ছিল, আর দু-একবার মৃদু স্বরে ‘মুশকিল হল’ বলার পর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে চুপ করে গেল। একটু বাদে একটা ঝাঁঝালো গন্ধের আবির্ভাবে বোঝা গেল, আকমল সুযোগ বুঝে কারনে মন দিয়েছে।

ঘড়িতে তখন ঠিক সাড়ে ন’টা; বাইরে জমাট অন্ধকার। কাজ করতে করতে বাইরের দিকে তাকাল মৈনাক। আজ কিসের যেন একটা অভাব মনে হচ্ছে বাইরে। কেমন একটা চাপা অস্বস্তি আবার যেন দানা বেঁধেছে মনের ভেতর। উঠে জানলার কাছে গেল মৈনাক। বাইরে তাকাল। একটা অদ্ভূত নিস্তব্ধতা চারদিকে। অন্যদিন কানে তালা ধরিয়ে দেওয়া ঘন্টিপোকাগুলো আজ একেবারে চুপ। হাওয়ার অভাবে জঙ্গলের, এমনকি রিসর্টের সীমানার মধ্যের গাছগুলোর পাতাও নিশ্চল। মৈনাক বাইরে যাওয়ার দরজার দিকে এগিয়ে গেল। আর দরজাটা খুলল। অসীমাভ আর শ্বেতাংশু সঙ্গে সঙ্গে মুখ তুলল;

-“কোথায় যাচ্ছিস ?”

-“একটু… পাঁচ মিনিট বাইরে থেকে ঘুরে আসছি…”

-“এখন ? বাইরে থেকে ?”

-“চিন্তা করিস না, রিসর্টের বাইরে যাব না, তাছাড়া চার চারটে গাব্দা কুকুর আছে বাইরে…”

অসীমাভ একটু আস্বস্ত হল বলে মনে হল।

-“তোরা বস, আমি ঘুরে আসছি, দরজাটা ভেজিয়ে গেলাম।”

দরজার থেকে বেরিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দু’পা এগিয়ে গেল মৈনাক। স্যারের ঘরে আলো নেভানো, মানে স্যার ঘুমিয়ে পড়েছেন। নিশ্চিন্ত হয়ে দু-তিনপা এগিয়ে তাদের কটেজের সীমানাটা পেরোনোর পরই সে থমকে গেল একটা জিনিস দেখে। একটা কুচকুচে কালো কুকুর। আকারে সাধারণ ভারতীয় কুকুরের থেকে একটু বড়ই, গায়ে ঘন অপরিচ্ছন্ন লোম ভর্তি। তাদের কুকুর গুলো কোথায় ? আর দু-এক পা এগোতে, বোধহয় পায়ের শব্দ পেয়েই কুকুরটা মুখ ফিরিয়ে তাকাল মৈনাকের দিকে। চোখদু’টো জ্বলজ্বল করছে আর জ্বলন্ত সেই চোখের পেছনে যেন একরাশ জীঘাংসা। মুখটা খোলা, শ্বদন্ত দুটো বেরিয়ে আছে। মৈনাকের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল, এক পা পিছিয়ে গেল সে; কুকুরটা কিন্তু তার জায়গা থেকে নড়ল না, মুখটা ফিরিয়ে নিয়ে আবার চুপ করে বসে রইল। মৈনাক যেন বুকে বল পেল একটু। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনেই নিজেকে বোঝাল,

“কিছু না… ওসব কিছু না… কালচারাল শক… আর কিছু না… জংলী কুকুর, তাই ওরকম বদখৎ দেখতে।”

চুপ করে আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগিয়ে গেল, সত্যিই, কোনো হাওয়া নেই, কোনো শব্দ নেই, জঙ্গলের রাতের যে শব্দ সে গত তিনদিন ধরে শুনে এসেছে, সেটাকে কোনো অদৃশ্য বোতাম টিপে কে যেন মিউট করে দিয়েছে বেমালুম। দুটো জীপ যেখানে পার্ক করা আছে, সেখানে এগিয়ে যায় মৈনাক, আর এবার আর একটা অদ্ভূত দৃশ্য দেখতে পায়। দুটো জীপের মাঝখানের জায়গাটাতে একসাথে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে চারটে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট-এর ট্রেনিং পাওয়া কুকুর যাদের মধ্যে একটি নাকি একবার দিলীপবাবুকে লেপার্ডের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। চারটে কুকুর পাতার মত কাঁপছে, থরথর করে, আর গলা থেকে একটা মৃদু ‘কুঁই কুঁই’ শব্দ বের করছে। মৈনাক পেছনে ঘুরে দেখল, কালো কুকুরটা এখনো পাথরের মূর্তির মতোই স্থির হয়ে বসে আছে। অজান্তেই মৈনাকের পা টা একটু কেঁপে গেল যেন…

কুকুরগুলো ওরকম করছে কেন ? কিসে ভয় পেয়েছে ?

এক পা এক পা করে জীপদুটো পেরিয়ে রিসর্টের সীমানার কাছে একটা উঁচু পাথরের ওপর বসল মৈনাক। খুব ঠাহর করে জঙ্গলের শব্দ শোনার চেষ্টা করল। কিন্তু না, সত্যিই… ঝিঁঝি, বাদুর, হাওয়া, গাছের পাতা… একটাও শব্দ নেই আজ। অন্ধকারের সাথে সাথে গোটা জঙ্গলটাকে কে যেন নিশ্তব্ধতার চাদরে মুড়ে ফেলেছে ।

মৈনাক যে পাথরটার ওপর বসে ছিল, সেটার ঠিক পাশেই একটা মরা গাছ… মানে এখনো মরেনি, কিন্তু একটা একটা করে পাতা খসিয়ে একটু একটু করে রসকষহীন একটা কংকালে পরিণত হওয়ার দিকে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। গাছটার ডালগুলোর দিকে তাকিয়ে মৈনাক একটা অদ্ভূত জিনিস উপলব্ধি করল, তার মনে হল গোটা আকাশটা যেন একটু একটু করে তার মাথার ওপর নেমে আসছে। একটা অকল্পনীয় অনুভূতি আকাশ, বা আকাশের মতন বৃহদাকার একটা অজানা বস্তু যেন নেমে আসতে চাইছে তার মাথার ওপর, পিঠের ওপর। মৈনাক দ্রুত চোখ বন্ধ করে ফেলে, আর মুখটা নামিয়ে ফেলে, মাথা নাড়তে জোরে জোরেই বলতে থাকে,

“না না… কালচারাল শক… না না… এসব কিছু হচ্ছে না… সব মনের ভূল… সব মনের ভূল… আমি স্ট্রেসড বলে সব কল্পনা করছি… সবটাই অলীক…”

আরও হয়তো কয়েকবার কথাটা বলত সে, কিন্তু হঠাৎ সমস্ত নিস্তব্ধতা খান খান করে ভেঙে দিয়ে একটা শব্দ শোনা যায়। একটা পায়ের শব্দ। মৈনাক চুপ করে যায়, চোখ খোলে আর শুনতে পায় একটা ভারী পায়ের শব্দ, তার পেছন দিক থেকে এগিয়ে আসছে। একটু একটু করে। মৈনাক ভয়ে পাথর হয়ে গেছে, তার পেছনে দেখার মতো সাহসটুকুও নেই… পায়ের শব্দটা খুব কাছে এসে পড়ল, একদম কাছে, এবার মৈনাকের হাতদূটোও একটু একটু কাঁপছে… কি হতে চলেছে এবার ?

যেটা হল, সেটাকে অনেক চেষ্টা করেও মৈনাক ভুলতে পারেনি। পায়ের শব্দটা তাকে পেরিয়ে সামনে চলে এল, আর তারপরই একটা ‘মচ’ শব্দে মৈনাকের সামনে পড়ে থাকা একরাশ পাতা গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিয়ে একটা অদৃশ্য পায়ের  পাতা সমেত শব্দটা রিসর্টের সীমান পেড়িয়ে সামনের জঙ্গলে মিলিয়ে গেল, আর তারপরই জঙ্গলের ভেতর থেকে শুরু হল ঘ্যাঁষঘ্যাঁষে বিরক্তিকর সেই করাত ঘষার মত শব্দ।

কালচারাল শক ? বটে ?     

<<—- Read Previous Installment  

Somewhere In the Jungle of North Bengal… Part VI

সেই মুহূর্তে অদূরে সংকীর্ণ রাস্তার ওপারে একটি ভগ্নস্তূপ বলে যা মনে হয়েছিল তারই একটি জানালায় একটি আলোর ক্ষীণ রেখা আপনি হয়তো দেখতে পাবেন। সেই আলোর রেখা আড়াল করে একটি রহস্যময় ছায়ামূর্তি সেখানে এসে দাঁড়াবে। গভীর নিশীথ রাতে কে যে এই বাতায়নবর্তিনী, কেন যে তার চোখে ঘুম নেই আপনি ভাববার চেষ্টা করবেন, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারবেন না। খানিক বাদে মনে হবে সবই বুঝি আপনার চোখের ভ্রম। বাতায়ন থেকে সে-ছায়া সরে গেছে, আলোর ক্ষীণ রেখা গেছে মুছে। মনে হবে এই ধ্বংসপুরীর অতল নিদ্রা থেকে একটি স্বপ্নের বুদবুদ ক্ষণিকের জন্য জীবনের জগতে ভেসে উঠে আবার মিলিয়ে গেছে।

প্রেমেন্দ্র মিত্র

||৬||

প্রেমেন মিত্তির লিখে গেছেন, শনি ও মঙ্গলের যোগাযোগ ঘটলে, যে কোনো ব্যক্তিই তেলেনাপোতা আবিস্কার করে ফেলতে পারে। এখন ভাবলে, সেই বারটা শনি বা মঙ্গল ছিল কিনা, মনে পড়ে না মৈনাকের, কিন্তু সেদিন একটা কালো ফটক যেটার ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে ‘বক্সা ফোর্ট’ সেটার সামনে দাঁড়িয়ে, মনে হয়েছিল বোধহয় সেই গপ্পোটার মধ্যেই ঢুকে পড়েছে সে।

ব্রিটিশ আমল থেকে ব্যবহার হওয়া ‘জেলখানা’-র অবস্থা এখন শোচনীয়। এক কালের নির্মম কয়েদঘর গুলো আজ জানলা-দরজাহীন গর্তগুলো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে; যেন নিজেই মুক্তির আনন্দে মত্ত। গায়ে ভরে ওঠা ছোটবড় ফাটল আর সেই ফাটলে বাসা বাঁধা বটগাছগুলোও যেন একটুও মনোবল ভাঙতে পারেনি তার। প্রধান ফটকের পরেই একটা স্মৃতিসৌধ, কিন্তু সেটার জরাজীর্ণ দশা দেখে মনে হচ্ছে হয়তো কিছুদিন পর, সেটার স্মৃতিতেই আর একটা সৌধ রচনা করতে হবে।

সুভাষ মুখোপাধ্যায় তো লিখেই গেছেন ‘মেঘের গায়ে জেলখানা’… আর চারদিকে পাথর আর জঙ্গলে ঘেরা কেল্লাটার একটা আশ্চর্য্য সৌন্দর্য্য আছে, আর আস্তে আস্তে প্রকৃতি তার বেদখল সম্পত্তির অধিকার ফেরত নিচ্ছে একটু একটু করে, আর কয়েক বছর পড় হয়তো শুধু সবুজে ঢেকে যাবে এই গোটা এলাকা।

-“এখানে একটু বসে জিরিয়ে নাও। তবে যেখানেই বস বা দাঁড়াও, সাবধানে… বর্ষাকাল, সব জায়গায় জোঁক ভর্তি।”

কথাটা বলে তারাদা একটা উঁচু পাথরের চারপাশ ভালো করে দেখেশুনে, সেটার ওপর বসে আয়েসে আড়মোড়া ভেঙে একটা বিড়ি ধরালো।

পল্লবী এই ফাঁকে ম্যাপটা বের করে কিছু দেখে নিয়ে আবার সেটা গুছিয়ে রেখে অসীমের দিকে এগিয়ে গিয়ে কিএকটা বলছিল, মৈনাক দুরে থাকায় ঠিক শুনতে পেল না। সে গুটি গুটি পায়ে তারাশঙ্করের দিকে এগিয়ে গেল।

-“তুমি কি এখানে রোজ আসো, তারা দা ?”

-“রোজ ? না না, তবে প্রায়শই আসি। এমনি টুরিস্ট তো থাকেই, তা ছাড়া…”

-“তা ছাড়া ?” -আবার প্রশ্ন করে মৈনাক।

-“তা ছাড়া… এখানে এসে আমার বসে থাকতে খুব ভালো লাগে… এই পাথরটার ওপর বসে থাকি অনেকক্ষণ ধরে… চুপ করে। আস্তে আস্তে অন্য সব শব্দ কানে সয়ে যায়, তখন চোখে লেগে থাকে এই সবুজ, এই পাহাড়… আর কানে শুধুই… পিন ড্রপ সাইলেন্স… তখন জানো তো, নিজের মনের শব্দ শুনতে পাওয়া যায়… সেই শব্দ যেন এই বক্সা ফোর্ট-এর ভাঙ্গা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে… মানে, রেসোনেন্স তৈরী করে… ”

তারা দার পাশের একটা ছোট্ট পাথরে বসে পড়ে মৈনাক। মনে হয়, সে ও যদি তারাদার মতো রোজ রোজ এখানে এসে বসে থাকতে পারত…

-“বলছি, স্যার কি এখানে বসেই সন্ন্যাস নেবেন, না আমাদের একটু মেজারমেন্ট নিতে সাহায্য করে লেপচাখা রওনা দেওয়ার কাজটা তাড়াতাড়ি করবেন ?”

কোমরে দু’হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে প্রশ্নকর্তা অসীমাভ; পাশে কাঁচুমাচু মুখে আকমল।

-“না না, এই তো… যাচ্ছি…” বলে হন্তদন্ত হয়ে উঠে পড়ে মৈনাক। তারাশঙ্কর এবার বড় পাথরটার ওপর লম্বা হয়ে শোয়।

-“হ্যাঁ, বেশী দেরী কোর না… ফেরার সময় আলো থাকতে থাকতে ফোর্ট পেরোতে হবে… জায়গাটা ভালো না…”

-“কেন এখানে আবার কি আছে ?”

-“লেপার্ড আছে… আর ভূত…”

-“আবার ভূত ? তোমাদের এখানে তো চায়ের চেয়ে ভূত বেশী চাষ হয় দেখছি !!!”

-“আরে বাবা, পুরোনো ভাঙ্গা কেল্লা, তারপর ব্রিটিশ আমল থেকে কত লোক আটক থাকত… এখানে ভূত থাকবে না তো কোথায় ? ক’দিন তো থাকছ; জেনে যাবে কত ভ্যারাইটির ভূত আছে আশেপাশে…”

-“তাহলে তো বড় মুশকিল হল !!!”

এতক্ষণ অসীমাভ কথা বলছিল তারার সাথে, শেষ উত্তরটা দিল আকমল। সেটা শুনে অসীমাভ আকমলের দিকে এমন করে তাকাল, যেন ভষ্মই করে দেবে আকমলও ভরকে গিয়ে, ‘ইয়ে, সরি ভাই…’ বলে মুখ নীচু করে ফেলে, যেন কত অপরাধ করে ফেলেছে। মৈনাক সেটা দেখে হেসে ফেলে, আর ওদের দু’জনের কাঁধে হাত দিয়ে ‘চল, কাজ শেষ করি’ গোছের একটা কথা বলে এগিয়ে যায়।

লেপচাখা পৌছোতে বেজে যায় প্রায় দুপুর তিনটে। ভূটান সীমান্তের কাছে, ছবির মতো এই ছোট্ট গ্রাম। ‘ডুয়ার্সের রাণী’ কথাটা যে অত্যুক্তি নয়, সেটা পাহাড়ের ওপর থেকে দুরে রুপোলী সাপের মতো এঁকেবেঁকে যাওয়া নদীগুলো দেখলেই মনে হয়। ভূটানে শেকড় গাঁথা ‘দ্রুকপা’ উপজাতির লোকেরাই এখানের বাসিন্দা। বক্সা ফোর্ট ছাড়ার পর থেকেই আকাশে কালো মেঘ একটু একটু করে জমাট বাঁধছিল; আর লেপচাখা পৌঁছোনোর পরপরই স্যার আশঙ্কিত চোখে তারাদা কে প্রশ্ন করেন

-“তারা, বৃষ্টি নামলে কি হবে ?”

-“চিন্তা করবেন না, স্যার। বৃষ্টি পড়লে তো সান্তালাবাড়ি ফেরা যাবে না, কিন্তু ফোর্ট পেরোতে হবে; ফোর্ট পেরিয়ে একটু গেলেই আমার খুড়তুতো ভাইয়ের হোম স্টে; ওর সাথে কথা বলাই আছে আমার। দরকার পড়লে রাত ওখানেই কাটানো যাবে।”

লেপচাখা পৌঁছেই যে তারাদার কথাটা সত্যি হয়ে যাবে, সেটা ভাবা যায়নি। যন্ত্রপাতি সাজিয়ে গুছিয়ে বসেছে কি বসেনি, আকাশের মেঘ গর্জন করে উঠল গম্ভীর স্বরে।

-“আরে তাড়াতাড়ি সব গুটাও… নিচে নামতে হবে, ফাস্ট, ফাস্ট…”

তারা দার কথায় সবাই দ্রুত সমস্ত জিনিসপত্র গোছানোর কাজে হাত লাগায়। যন্ত্রপাতি গুছিয়ে বক্সা ফোর্ট অবধি এসেই বৃষ্টির প্রথম ফোঁটাটা গায়ে পড়ে, খাড়াই রাস্তায় সাবধানে নামতে হচ্ছিল এমনিতেও, তবু, শেষরক্ষাটা হয়েই যায়। ট্রেকার্স হাট-এর বারান্দায় পৌঁছোনোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঝমঝম করে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমে আসে।

ট্রেকার্স হাট নামক এই হোম স্টের মালিক ইন্দ্রনাথ থাপা। তারাশঙ্করের ছোটকাকার ছেলে। হাসিখুশি লোকটি নিজে হাতেই মালপত্র তুলে ওদের ঘরে পৌছে দেয়। কাঠের ছোট্ট বাড়িটার দোতলার ঘরে মালপত্র রেখে, সেখানেই বসতে হয় ওদের। বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখার ইচ্ছে থাকলেও, তার দাপটের সামনে শরীরের একটা কণাও শুকনো থাকবে না; তাই ঘরে বসে হাবিজাবি কিছু কথা বলে বলেই ঘন্টাদুয়েক কাটাতে হয়। তারপর বৃষ্টিটা ইলশেগুড়ির পর্যায় এলে, সবাই বেরিয়ে দাঁড়ায় বাইরের বারান্দায়। বেশ ঠান্ডা পড়েছে বাইরে। গরম জামাগুলো আবার গায়ে চাপাতে হয়ই। সন্ধ্যের অন্ধকার নেমেছে তখন। ঘন্টিপোকার দল তাদের সম্মিলিত কোরাস শুরু করেছে কিছুক্ষণ। ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে ঠিক ৬-১৫। আজ নিচে নামার আশা ত্যাগ করে এখানেই কাটাতে হবে রাতটা।

সারাদিনের ক্লান্তির পর তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়াটাই যুক্তিযুক্ত; তাই ৮টা বাজতে না বাজতেই, একতলায় চারদিক খোলা, মাথায় ছাদ দেওয়া একটা কাঠের টেবলে খেতে বসে সবাই। আর তার সাথেই বৃষ্টির পুনরাগমন ঘটে। টিমটিমে সোলার আলোর নিচে বসে রুটি আর কষা মাংস গলাধঃকরণ চলছিল; একটু পরে বসবে বলে বাইরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল শ্বেতাংশু আর মৈনাক। শ্বেতাংশু গান ধরেছিল;

“আমিও একাকি, তুমিও একাকি… আজি এ বাদল রাতে…”

গানের সুরে আবার একটু একটু করে মৈনাকের চোখের কোলটা ভিজে উঠছিল। সেটা লুকোতেই,  একবার হাই তোলার ভান করে চোখটা বুজে, আবার খুলে ফেলল সে। তারপর সামনের দিকে তাকিয়ে, আবার সে দেখতে পেল, আবছা আলোয় একটা মানুষের অবয়ব, আর জ্বলন্ত দুটো চোখ…

“কাঁদিছে রজনী তোমার লাগিয়া, স্বজনী তোমার জাগিয়া…”

মৈনাক চোখের পাতা ফেলারও সাহস পাচ্ছে না… দুরে এক বাজ পড়ল… আর সেটার হালকা আলোয় আবার স্পষ্ট হয়ে উঠল একটা মানুষের বহিরাকৃতি। জ্বলন্ত চোখদুটোও নড়ছে না, যেন মৈনাকের দিকেই স্থির হয়ে আছে… লোকটাও যেন পাথরের মত স্থির…

“এ জীবন-ভার, হয়েছে অবহ- সঁপিব তোমার হাতে…”

কড়কড় শব্দে প্রচন্ড জোরে কাছেই কোথাও একটা বাজ পড়ল। পেছন থেকে একটা সম্মিলিত মেয়েলি গলায় আতঙ্কের আভাষ শোনা গেল। এক মূহুর্তের জন্য চোখ বন্ধ করেছিল মৈনাক। চোখ খুলেই দেখল, সামনে জমাট অন্ধকার ছাড়া কিছুই নেই; নেই কোন জ্বলন্ত চোখ, নেই কোনো ছায়ামূর্তি…

“বঁধূয়া… নীদ নাহি আঁখি পাতে…”

আজ সত্যিই, একফোঁটা ঘুম আসবে না, মৈনাকের চোখে…

কি মনে হচ্ছে ? মৈনাক কি বার বার ভুল দেখছে ? নাকি সত্যিই এর পেছনে আছে কোনো অশুভ শক্তি ? ফলবে মশাই, ফলবে… মেওয়া ঠিকই ফলবে…

শান্তির আশায়…

নীল…

<<——— Read Previous Installment

Somewhere, In the Jungle of North Bengal… Part V

“There are events in one’s life which, no matter how remote, never fade from memory”

Jim Corbett

||৫||

-“কাঠে করাত ঘষার শব্দ বলছিস ? তুই শিওর তো ?” – প্রশ্ন করেন স্যার।

-“হ্যাঁ স্যার… আমি বেশ কিছুক্ষণ শোনার পর তবে তো শ্বেত আর অসীমকে ঘুম থেকে তুললাম, ওদেরও সেরকমই মনে হয়েছে।“ – মৈনাকের কথায় মাথা নেড়ে সায় দেয় বাকী দুজন।

-“ঠিক আছে, আজ আমিও রাতে একটু অবজার্ভ করি, তারপর নাহয় বেগতিক বুঝলে দিলীপ বাবুকে বলা যাবে… এখনি ওনাকে ব্যতিব্যস্ত করার দরকার আছে বলে তো মনে হয় না।”

ওরা মাথা নেড়ে সায় দিয়ে জিনিসপত্র গুছিয়ে তৈরী হতে যায়। ভোর পাঁচটা থেকে উঠে সার্ভে এবং ট্রেক-এর জন্য প্রস্তুতি চলছিল, আর তারই মাঝে ফাঁক পেয়ে মৈনাক রাত্রের ঘটনার কথা স্যার কে জানায়। পল্লবী ম্যাপের কাজ ইতিমধ্যেই সেরে ফেলেছে, তার ব্যাগও রাত থেকেই গোছানো শেষ। সে সক্কাল সক্কাল উঠে স্নানাদি সেরে সমীরা এবং অনুপ্রিয়ার পেছনে পড়ে রয়েছে তাদের তুলে তৈরী করার জন্য।

মৈনাকরা শুয়েছে বেশ রাত্রে। শ্বেতাংশু আর অসীমাভকে ঘুম থেকে তোলার পর, তারা অনেকক্ষণ জঙ্গলের শব্দটা শুনেছে, অসীমাভর ইচ্ছে করছিল একবার বাইরে বেরিয়ে দেখে আসে, কিন্তু শ্বেতাংশু আর মৈনাক দু’জনেই তাকে মানা করে। তাই একটু বিরক্ত হয়েই সে শুয়ে পড়ে, এবং ঘুমিয়েও পড়ে। একটু বাদে তার সঙ্গী হয় বাকী দুই জন। অজানা জায়গায় এলে, মৈনাকের ঘুম তাড়াতাড়ি ভেঙে যায়। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সে ভোরবেলা উঠে আবার বাকী দু’জনকে ওঠায় এবং সবাই তৈরী হয়ে তবেই কুম্ভকর্ণের অবতার আকমলকে টেনে তোলে।

আকমল ছাড়া সবাই তৈরী হয়ে গেছে, ঘড়িতে বাজছে ঠিক সওয়া সাতটা। তখনই জীপে করে এসে হাজীর হয় তারাশঙ্কর। তারাশঙ্কর এলেই, পল্লবী তার বিশাল ম্যাপটা খুলে এগিয়ে আসে।

-“তারা দা, লেপচাখা অবধি আমাদের যেতে হবে। তার মাঝে রাস্তায় স্পট কিছু আমরা দেখে নেব, কিন্তু আজ লেপচাখা পৌছোতে পারলে অনেকটা কাজ একধাপে এগিয়ে যাবে…”

-“দেখো বোন, লেপচাখা এমন কিছু কঠিন ট্রেক নয়। তোমরা যদি একটু পেস ধরে চলতে পার; তো খুব বেশী হলে চার ঘন্টায় লেপচাখা পৌছে যাওয়া কোনো ব্যাপার নয়। এবার বাকী তোমাদের কাজের ওপর নির্ভর করছে।”

-“মানে যাতায়াতে আট ঘন্টা। তাহলে তো সন্ধ্যের মধ্যে ফিরে আসা যাবে বলে মনে হয়…”

-“নামার সময় তো কম টাইম লাগবে… তোমরা আগে ওঠো তো… তারপর দায়িত্ব আমার।”

পল্লবী হাসিমুখে ম্যাপ গুটিয়ে জীপে উঠে বসে। সঙ্গে ওঠে অনুপ্রিয়া আর সমীরা আর স্যার। আর একটা জীপে উঠবে চারটি ছেলে। কিন্তু তাদের সারাশব্দ না পেয়ে স্যার একবার মৈনাকের নাম ধরে হাঁক দিতে অসীমাভ ঘরের দিক থেকে উত্তর দেয় ‘যাই স্যার !’ আর তার প্রায় ১০ মিনিট পড়ে তিনজনের আকমল কে একরকম টেনে হিঁচড়ে এনে জীপে তোলে। আকমলও প্রতিবাদ জানিয়ে বলতে থাকে;

-“কি মুশকিল ! আরে সকাল সকাল না হলে আমার সারাদিন খুব মুশকিল হয়, ভাই…”

-“মুশকিল হলে তখন দেখা যাবে… টানা দু’ঘন্টা ধরে হেগেই চলেছে, হেগেই চলেছে যেন চৈত্র সেল লেগেছে…”

কথাটা শুনে স্যার, আর তারাদা বেশ জোরে হেসে ফেলেন। পল্লবী মুখ টিপে হাসে, আর অনুপ্রিয়া মুখটা ব্যাজার করে ঘুরিয়ে নেয়। দুটো জীপ ওদের সান্তালাবাড়ির নির্দিষ্ট স্থানে ছেড়ে আসে, যেখান থেকে বক্সা দুয়ার/লেপচাখা যাওয়ার রাস্তা শুরু হচ্ছে। জীপগুলো ওদের জন্যই অপেক্ষা করবে; আকাশ একটু মেঘলা, তাই বৃষ্টি শুরু হলে ওরা অগত্যা আবার লেপার্ডস নেস্ট-এই ফিরে যাবে। ওপর থেকে তো আর ফোন পাওয়া যাবে না।  

এবার পায়ে হাঁটা রাস্তা ধরে ওরা চলা শুরু করে। সান্তালাবাড়ি থেকে বক্সা দুয়ারের জনপদ প্রায় দু থেকে আড়াই ঘন্টার রাস্তা। সেখান থেকে বক্সা ফোর্ট হয়ে যেতে হয় লেপচাখা। ব্রিটিশ আমলে, আন্দামান-এর পর, বক্সা ফোর্টই ছিল বহুল ব্যবহূত একটি জেলখানা। তবে এখন শুধু সরকারী দেখভালের অভাবেই, সেই দূর্গ ভেঙ্গেচুরে একাক্কার হয়ে পড়ে আছে। রাস্তা লম্বা, কিন্তু অনেকাংশই বাঁধানো, তাই দু’দিন আগের বৃষ্টির পড়েও সেরকম পেছল নয়। সবার সামনে চলেছে তারাশঙ্কর, তারপর বাকী সাতজন জটলা করতে করতে, আর সবার পেছনে স্যার।

-“আচ্ছা তারা দা, নাম তো বক্সা টাইগার রিজার্ভ; আদৌ বাঘ আছে ?” প্রশ্ন করে মৈনাক।

-“বাঘ, মানে বেঙ্গল টাইগার ? সরকারী হিসেব তো বলছে আছে, কিন্তু আমি শেষ চোখে দেখেছি পাঁচ বছর আগে। তবে লেপার্ড আছে বিলক্ষণ; ভূরি ভূরি আছে। আমি তো দিন চারেক আগে ওই বক্সা ফোর্টেই লেপার্ড দেখেছি…”

এমন সময় পেছন থেকে একটা ঝগড়ার শব্দ শোনা যায়; সেদিকে তাকিয়ে এগিয়ে যায় সবাই। অনুপ্রিয়া বেশ বিরক্ত মুখে কিছু একটা বলছে, আর বার বার মাথা নাড়ছে;

-“না না না, আমার এখানেই একটা পিট স্টপ দরকার… একটানা ১ ঘন্টা হেঁটেছি আমি… এত খাড়াই… দিস ইস টু মাচ…”

পল্লবী অবাক হয়ে বলে ওঠে,

-“এক ঘন্টা ? ১০ মিনিটও তো হয়নি এখনো… ওই দেখ নিচের দিকে তাকালে জিপগুলো দেখা যাচ্ছে…”

-“দেখ পলু, সোজা রাস্তা আর পাহাড়ের রাস্তার অনেক তফাত, ও কে ? আর আমার হিমোগ্লোবিন কম, সহজেই হাইপক্সিয়া হয়ে যায়।”

-“লক্ষ্মী ভাই আমার আর একটু চল, এত সহজে আর এত ব্রেক নিলে প্রচুর সময় নষ্ট হয়ে যাবে…”

-“আমি পারছি না, ও কে ? এখানেই যদি সব এনার্জি শেষ হয়ে যায়, তাহলে ওপরে সার্ভের সময় আই’ল বি এক্সজস্টেড… আমি একটু বসছি…”

এই বলে অনুপ্রিয়া পথের ধারের একটা পাথরের ওপর বসতে গেল, তারা দা রে রে করে তেড়ে এসেও, অনুপ্রিয়াকে বসার থেকে নিরস্ত করতে পারল না; আর তারপরই, পাথরটা ভেঙে রাস্তার ধারে হাত পা ছড়িয়ে চিৎপাত হল সে। আর তারপরই তারাদার কথাটা সে সহ সকলের বোধগম্য হল…

-“বোসো না বোন, বোসো না… ওটা পাথর নয়, উই ঢিবি !!!”

কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে, অনুপ্রিয়াকে তাড়াতাড়ি টেনে তুলেছে পল্লবী, আর আর তার জিন্স-এ ভর্তি হয়ে রয়েছে ভেজা কাদামাটি আর থিক থিক করছে উই।

-“ওয়াক ! ইস… ও মা গো !!!”

অনুপ্রিয়া হাত পা ছুঁড়ে লাফাতে থাকে, শ্বেতাংশু আর অসীমাভ হাসতে হাসতে এ ওর গায়ে ঢলে পড়ে; মৈনাক, তারা, পল্লবী আর স্যার অনুপ্রিয়া কে ঠান্ডা করে, ঝেড়ে, একগাদা টিস্যুর শ্রাদ্ধ করে একটা ভদ্র অবস্থায় নিয়ে আসে… এমন সময় শ্বেতাংশু আবার বলে ওঠে,

-“এই অসীম, বাল্মিকীর স্ত্রীলিঙ্গ কি রে ?”

এই কথা শুনে এবার সবাই আবার বেদম হাসতে শুরু করে, এক অনুপ্রিয়া ছাড়া, সে বেশ কাঁদো কাঁদো মুখে রাগত স্বরে বলে ওঠে,

-“দিস ইজ নট ফানি, গাইজ… নট এট অল…”

অসীমাভ গম্ভীর মুখে বলে ওঠে,

-“একদম না… তুই অতগুলো বেচারা উইকে বাস্তুহারা করে দিলি, সেটা মোটাও ফানি না… এখন ওরা মামলা করলে সামলাবে কে ?”

অনুপ্রিয়া এর উত্তরে রেগেমেগে গট গট করে হাঁটতে থাকে, এবার সবাই তার পিছু নেয়, তখনো সবার মুখে লেগে রয়েছে হাসি।

আকাশে মেঘ বাড়ছে, না ওপরে ওঠার দরুন সবাই মেঘের কাছাকাছি চলে আসছে, সেটা অনভিজ্ঞ চোখকে ধোঁকা দিতেই পারে; কিন্তু একটু একটু করে যে আকাশে মেঘ বাড়ছে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই একেবারেই। বক্সার রাস্তায় যাঁরা গেছেন, তাঁরা জানেন, এই জনপদে এখনো নগরসভ্যতা পৌছোয় নি, আর তাই ছোট ছোট কাঠের বাড়ি, আর হোম স্টে-ই যাত্রীদের থাকার একমাত্র উপায়। ট্রেকের রাস্তাটা বেশী খাড়াই ও না,  এবং দৃশ্যপট অত্যন্ত উপভোগ্য। মেঘের চাদর সরিয়ে একটু একটু করে রঙ্গমঞ্চের সজ্জার মতোই বক্সা দুয়ার নিজেকে মেলে ধরছিল। রাস্তার পাশে, নীচের ঘন জঙ্গল থেকে ধোঁয়ার একটা কুন্ডলী আস্তে আস্তে উঠে মেঘের মধ্যে মিশে গেছে।

-“ভাই… বড় মুশকিল হল… বলছি এখানে সাইডে কোথাও বসা যাবে ?” কাঁচুমাচু মুখে প্রশ্ন করল আকমল।

-“না, এখানে হবে না, ওপরে উঠে…”

-“না ভাই… মুশকিল হয়ে যাবে… কাপড় চোপড়ে একাক্কার হয়ে যাবে পুরো…”

শ্বেতাংশু হেসে ফেলে, অসীমাভ বেশ বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে;

-“এ তো শালা আচ্ছা জ্বালা হল… একজন পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর বসতে চায়, একজনের ঘন্টায় ঘন্টায় হাগা পায়… এদের নিয়ে কোন ভদ্দরলোকে সার্ভেতে আসে ?”

-“আমি সক্কালবেলাতেই বলেছিলাম, আমায় এখন শান্তিতে করতে না দিলে পরে মুশকিল হবে; তখন তো শুনলি না…”

অসীমাভ আর কথা না বাড়িয়ে তারাশঙ্কর কে হাঁক দেয়…

-“ও তারা দা… এখানে একটা ঝোপঝাড়ের আবডাল হবে ?”

তারা দা ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে আসে, আর বোঝানোর চেষ্টা করে আর আধঘন্টাটাক হাঁটলেই লোকালয়, সেই টুকু সময় একটু সংযমরক্ষাই শ্রেয়। কিন্তু আকমল নাছোড়বান্দা, অগত্যা পাথর আর গাছের একটা আড়ালে একটা জায়গা দেখিয়ে দিল তারা দা, আর আকমল সেখানে ‘হালকা’ হতে গেল। তাই বাকিদের একটু অপেক্ষা করতেই হল। প্রায় পাঁচ দশ মিনিট পর, পাথরের আড়াল থেকে শোনা গেল,

-“ভাই, বড় মুশকিল হল… জলের একটা বোতল দিবি ? আনতে ভুলে গেছি…”

অসীমাভ এবং মৈনাক মুখ ঘোরাচ্ছে দেখে, বলির পাঁঠাটা শ্বেতাংশুকেই হতে হল; সে হাত বাড়িয়ে জলের বোতল আর সোপ পেপার দিয়ে আসার আরো ৫ মিনিট পর, হাসিমুখে পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল আকমল।

-“ব্যাস, আর কোন চিন্তা নেই… এবার চল…”

এই বলেই একটা পা বাড়িয়ে সে দড়াম করে আছাড় খেল।

-“কচুপোড়া খেলে যা !!!” -বলে অসীম আর মৈনাক তাকে টেনে তোলার পর সে বলল,

-“আসলে মুশকিল হয়েছে কি…”
-“আর হতে হবে না… আজকের মতো তোর মুশকিলের কোটা শেষ… এবার আর একটাও মুশকিল আমি শুনছি না…”

আকমল ব্যাজার মুখে চলতে শুরু করে দেয়…

আরও আধঘন্টা পর, মেঘের আস্তরণ ফেটে একটু একটু করে রোদ ঢুকতে শুরু করে… পাহাড়ের একটা ছোট বাঁক পেরোতেই চোখে পড়ে একটা ছোট জনপদ। পাথরের রাস্তার একধারে ছোট ছোট কাঠের একতলা-দোতলা বাড়ি, ঠিক বিদেশী রূপকথার ছবির মতো আঁকা। আকাশে মেঘের চিহ্নমাত্র নেই, ঝলমলে রোদ পড়েছে সামনের ভেজা রাস্তায়, বাড়ির গায়ে, ছাদে… বাড়ির দু’পাশে ছোট ছোট ফুলের গাছ, তাতে রংবেরঙের ফুল ভর্তি, আর ঝাঁকে ঝাঁকে প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে চারদিকে। রাস্তার ধারে অনেকগুলো বাচ্চা ছেলেপুলে, যাদের মুখে মঙ্গোলীয় ছাপ স্পষ্ট, তারা হাসিমুখে লক্ষ করছিল একদল ওদের।

দৃশ্যটা এরকমই, যে সবার মুখে হাসি ফুটতে বাধ্য… এবং ফুটলও তাই, এমনকি এতক্ষণ চুপ করে মুখ গোমড়া করে থাকা অনুপ্রিয়া পর্য্যন্ত হাসিমুখ দেখাতে বাধ্য হল। মৈনাক ভাবছিল, এইসব জায়গায় বসে কবিতা লেখা যায়, আর তারপরই মনে পড়ল শেষ কবিতা সে লিখেছে দু’মাস আগে, তিয়াসার জন্য। আর ট্রেনে ওঠার পর, এই প্রথম বার, দু’চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে তার, আনেক চেষ্টা করেও আটকাতে পারে না…    

খুব বেশী লম্বা মনে হচ্ছে কি ? হলে আমি দুঃখিত… আসলে লেখাটা আর আমি, পরস্পরকে খুব ভালোবেসে ফেলেছি… তাই এত সহজে কাউ কাউকে ছাড়ব বলে মনে হয় না, তাই অনুরোধ, একটু ধৈর্য্য ধরে পড়ুন, আশা করছি, ভালো লাগবে…

শান্তির আশায়…

নীল…

<a rel="noreferrer noopener" aria-label="<— Read Previous Installments…

Somewhere, In the Jungle of North Bengal… Part IV

হেথা দিনেতে অন্ধকার,

হেথা নিঃঝুম চারিধার…

হেথা ঊর্দ্ধে উঁচায়ে মাথা দিল ঘুম,

যত আদিম মহাদ্রুম !

-সত্যজিৎ রায়

||৪||

-“এই যে লাইন দেখছো, এখন পড়ে থেকে থেকে নষ্ট হচ্ছে, এককালে চা এবং লাম্বার বওয়ার কাজে প্রচুর ব্যবহার হত। এই লাইন লেপার্ড’স নেস্ট-এর পেছন দিয়ে চলে গেছে রাজাভাতখাওয়ার জঙ্গল হয়ে গরুমারার দিকে, আর তার মাঝেই এটা ঢুকেছে খুনিয়ার জঙ্গলে; গভীরে নয়, কিন্তু জঙ্গলের ভেতরে নিশ্চয়ই। এবার এই খুনিয়ার নামটা এসেছে একটা কারণেই; সেটা হল হাতির উপদ্রব। গোটা ডুয়ার্সের ৮০ পারসেন্ট হাতিজনিত মৃত্যু ঘটে থাকে এই খুনিয়া বা তার আশেপাশের অঞ্চলেই। আর তার সাথে যোগ হয়েছে ভূতের গপ্পো…”

এই টুকু বলেই তারাদা একটা বিড়ি ধরানোর জন্য ব্রেক নিল। রাতে দিলীপবাবু আবার আসেন, এবং তারা দা কে সঙ্গে করে নিয়ে, এসে তার যে পরিচয় দিলেন, তাতে স্যার সহ সকলেরই চোখ কপালে উঠে যায়। তারা দা, মানে তারাশঙ্কর থাপা, এই অঞ্চলের সবচেয়ে অভীজ্ঞ গাইড। জঙ্গল ‘নখদর্পণে’ বললে বরং কমই বলা হয় ওনার সম্পর্কে। স্থানীয় উপজাতির দু-তিনিটে ভাষা ছাড়াও তিনি চোস্ত ইংরাজি, হিন্দি, বাংলা, ফ্রেঞ্চ এবং রাশিয়ান বলতে পারেন। গোটা ট্যুরে মৈণাকদের সর্বত্র পথপ্রদর্শকের কাজটা তিনিই করবেন। তারা দার কিঞ্চিৎ রাজনৈতিক কার্যকলাপও আছে, তাই এখানে প্রভাব এবং প্রতিপত্তি, কোনোটারই অভাব নেই।

দিলীপ বাবুর কথাবার্তার মধ্যেই স্যার সেই খগেন নামক ব্যক্তির কথা জিজ্ঞাসা করেন, যে নাকি খুনিয়ার জঙ্গলে ঢুকে পড়েছিল শুনে দিলীপবাবু হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে যান। সে কথায় একটু বিরক্তির সুরেই দিলীপবাবু এবং তারাদা দু’জনেই বলে, যে খগেন নামক ব্যক্তিটির এটা একটা নিত্তনৈমিত্তিক কাজ। মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন অবাঞ্ছিত জায়গায় ঢুকে পড়ে; সে খুনিয়ার জঙ্গলই হোক, বা রাজাভাতখাওয়ার কোর এরিয়া। কিন্তু আশ্চর্য্যের ব্যাপার হল, এত জায়গায় দুমদাম ঢুকে পরার পড়েও, তার গায়ে আজপর্যন্ত একটু আঁচড়ও লাগেনি। দিলীপবাবু চলে যাওয়ার পর, মৈণাকরা ঘিরে ধরল তারাদা কে, আর কথায় কথায় উঠে এল খুনিয়ার কথা, আর তখনই একটা রহস্যময় হাসি হেসে, গুছিয়ে গপ্পো বলতে বসে তারাশঙ্কর থাপা।

বিড়ি ধরানোর পর তাকে মুখ খোলার সুযোগ না দিয়েই অসীমাভ বলে উঠল,

-“আচ্ছা, হাতির উপদ্রব যে বলছ, সেটা ঠিক কিরকম ? আর খুনিয়া নিয়ে ভূতের গপ্পোটাই বা কি ?”

-“হাতির উপদ্রব কিরকম ? ধরে নাও, রাতে হাতির দল একটা গ্রামের মধ্যে দিয়ে গেল, সকালে সেটার শ্মশানের চেয়েও খারাপ অবস্থা হয়। বাড়িঘর আস্ত তো থাকেই না, উপরন্তু লোকও কটা আস্ত থাকে, বলা মুশকিল। পা দিয়ে পিশে, কাউকে আছাড় মেরে… দাঁড়াও, এ ব্যাপারে আমার থেকে ভালো বলতে পারবে রাম।”

এটা বলেই, তারাদা দু’বার রামলাল ; রামলাল; বলে হাঁক দিলেন। একটা জীপের ড্রাইভার, যে তারাদাকে নিয়ে যাবে বলে বসেছিল, সে এগিয়ে এল। তারাদা তাকে স্থানীয় কোনো ভাষায় কিছু একটা বলতে, সে মৃদু হেসে, বুকে জ্যাকেটের চেইন খুলে, বুকের বাঁদিকের পাঁজরের কাছে একটা বিরাট বড় ক্ষতস্থান দেখাল। তারপর জামা ঠিক করতে করতে বলতে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় বলতে শুরু করল,

-“তাও প্রায় দেড় বছর হতে চলল। একদিন রাতে উপায়ান্তর না দেখে খুনিয়ার পাশ দিয়েই ফিরছিলাম। কপালটাই এমন, সাইকেলের চেইন গেল পড়ে। চেইনটা ঠিক করতে করতে দেখতে পেলাম, জঙ্গল থেকে বেরিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে ‘লস্কর’, তামাম ডুয়ার্সের সবচেয়ে খুনে দাঁতাল। আর তখন আমার সামনে সাইকেল, পেছনে একটা মোটা গাছ, কোথাও পালাবার পথ নেই। তবে, কপালটা একটু ভালো বলতে হবে; কারণ শুঁড়ের একটা হালকা বাড়ি মেরেই ছেড়ে দিয়েছিল সেদিন। তবে তাতেই বুকের দু’টো পাঁজর ভেঙে গেছিল…”

কথাটা শুনে সমীরা বেশ জোরেই ‘হায় দাইয়া !’ বলে চেঁচিয়ে উঠল। অসীমাভ সেটা মুখটা একটু ব্যাজার করল সমীরার আর্তনাদে। শ্বেতাংশু বলে উঠল;

-“আর ভূত ?”

তারাদা আবার একটু হেসে রামলালের দিকে তাকাল আবার। রামলাল আর একটু গম্ভীর হয়ে আবার বলতে শুরু করল,

-“খুনিয়া এলাকাটা আমরা, যারা গাড়ি চালাই, রাতে একটু এড়িয়ে চলতেই ভালোবাসি। আর বিশেষ করে পূর্ণিমার রাতে। যদি একান্ত যেতেই হয়, তাহলে বাঁদিকে তাকাই না, আর রিয়ার ভিউ মিররও বন্ধ করে চলি।“

-“কেন ?”

-“পরী বলব, না পিশাচ বলব ? অনেকেই দেখেছে একটা সুন্দরী মেয়ে… দাঁড়িয়ে আছে গায়ে সাদা কাপড়, গায়ের রং, আর কাপড় সব থেকে যেন জ্যোৎস্নাই ঠিকরে বেড়োচ্ছে। কিন্তু সেই রূপে ভুলে কেউ যদি গাড়ি থামায়, বা গাড়ি থেকে নামে তো সেই মূর্তি তাকে ডেকে নিয়ে যায় গভীর জঙ্গলে, আর তার পরের দিন হাতির প্রভাবে মৃত্যুর নিদর্শন সমেত তার লাশ পাওয়া যায় জঙ্গলে…”

-“এই পরী, মানে এই মেয়েটিকে তুমি নিজের চোখে দেখেছ ?”

-“দেখিনি, কিন্তু অনুভব করেছি… আমার এক মামাতো ভাই; বন্ধুদের সাথে বাজি ধরেছিল, পূর্ণিমার রাতে বাইক নিয়ে ওই খুনিয়ার জঙ্গলের পাশ দিয়ে ঘুরে আসবে। প্রচন্ড জেদী ছেলে, কারোর কথা শোনে না, শেষমেশ অনেক বোঝাতে একা না গিয়ে আমাকে সঙ্গে নেয়। সেদিন খুব জ্যোৎস্না ছিল, মানে আকাশে মেঘ নেই, গোল চাঁদ ঝলমল করছে। ওর বাইকের পিছনে বসে প্রায় খুনিয়ার সীমানা পার হয়ে গেছি, এমন সময় দেখলাম, ও রিয়ার ভিউ মিররের দিকে তাকাল, আর তারপরই, কেমন বেকায়দায় আমাকে আর বাইক নিয়ে সজোরে পড়ে গেল রাস্তায়। মাথায় হেলমেট ছিল দুজনেরই, তাই মাথা বেঁচে গেল। দেখলাম, আমার ভাই মাটিতে পড়েই, উঠে উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করল, কলের পুতুলের মতন। আমি ডাকলাম, শুনল না। আমার পায়ে খুব জোরে লেগেছিল পড়ে দিয়ে, আমি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ওর সামনে কোনোরকমে গিয়ে ওর পথ আটকালাম। বললাম,

-“কি রে ? পড়ে গেলি কেন ? ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস ?”

সেটার উত্তরে বিড়বিড় করে আমাকে বলল,

_”ও… আমায় ডাকছে… আমায় ডাকছে…”

আমি পেছনে ফিরে কাউকে দেখতে পেলাম না, কিন্তু ভাই তখন কোনো কথাই শুনছে না… খালি একি কথা বলছে, আর এগোচ্ছে… গায়ে যেন দানবের শক্তি; আমি আমার সর্বশক্তি দিয়েও তাকে আটকাতে পাচ্ছি না। কিছুক্ষণ এরকম চলার পড়, আমি ওর দু’গালে দু’টো ঠাস ঠাস করে চড় মারলাম আর উপায় না দেখে। ও কেমন হকচকিয়ে থমকে গেল… বাকি রাস্তা ওকে পেছনে বসিয়ে আমিই বাইক চালিয়ে বাড়ি নিয়ে এলাম…”

এটা শোনার পর একটা অদ্ভূত নীরবতা নেমে এল গল্পের আসরে। এমনকি সমীরা ‘হায় দাইয়া’ অবধি বলতে ভুলে গেল। এবার হঠাৎ মৈনাকই মুখ খোলে,

-“তারা দা, তোমার খুনিয়ার জঙ্গলে কোনো অভিজ্ঞতা নেই ?”

এবার আকাশ ফাটানো একটা অট্টহাসি হাসে তারাশঙ্কর। হাসি থামলে বলে,

-“বুঝলে ছোটভাই, আমি ৯ বছর বয়স থেকে অনাথ, জলে-জঙ্গলে বনে-বাদাড়ে হেন জায়গা নেই যেখানে ঘুরিনি। যা দেখেছি, তা মুখ ফুটে স্বীকার করি, কিন্তু বানিয়ে গপ্পো এই তারা থাপা বলে না। তাই সৌভাগ্যই বল, বা দূর্ভাগ্যই বল, খুনিয়ার জঙ্গলে রাতের বেলা কোনো সুন্দরী মেয়ের পাল্লায় আমি পড়িনি আজ অবধি। আরে দূর, সেরকম সুন্দরী মেয়ে পচ্ছন্দ হল না বলে বিয়েই করলাম না আজ পর্যন্ত !!!”

এবার একটা মৃদু হাসির গুঞ্জন ওঠে। এবার স্যার বলেন,

-“আমি অবশ্য এই পূর্ণিমার রাতের ব্যাপারটা জানতাম না… আমি ভাবতাম, খুনিয়ার জঙ্গল মানেই বিপদ…”

-“সে তো স্যার বিপদ অবশ্যই, হাতির ভয় সব সময়ই আছে, কিন্তু তা বলে কি আর লোকে কাজকর্ম সব শিকেয় তুলে দেবে ? কাজের জন্য তো লোকে যাতায়াত করেই থাকে তবে খগেনদার ব্যাপার আলাদা, একে তো বয়সের গাছপাথর নেই, কত কেউ জানে না, যারা আন্দাজ করতে পারে, তারা বলে ১০০-র ওপর। ও যেন ইচ্ছে করেই জঙ্গলেই বিপদসঙ্কুল জায়গাগুলোয় ঢোকে…”

কথাটা বলতে বলতে ঘড়ি দেখে তারাশঙ্কর, আর তারপর লাফিয়ে ওঠে,

-“ওরেব্বাবা ! সাড়ে ন’টা !! সব্বোনাশ করেছে… আমি উঠলাম স্যার, উঠলাম, ফ্রেন্ডস… কাল দেখা হবে; অনেক রাস্তা ট্রেক করতে হবে কাল… তখন আবার গল্প করা যাবে, চলি… গুড নাইট।”

এই বলেই একরকম হন্তদন্ত হয়েই তারাশঙ্কর বেরিয়ে যায়।

রাতে অনেক জল্পনা কল্পনা হয় এই খুনিয়া নিয়ে; শ্বেতাংশু স্বীকার করে, ‘নিশির ডাক’-এর কথা শুনলেও এরকম নিশি-কাম-হাতির ডাকের কথা সে শোনেনি আগে। তারপর এক এক করে সবাই শুয়ে পড়লেও, মৈনাক চুপ করে জেগে বসে থাকে, একা একা জানলার দিকে তাকিয়ে। স্যার বলেছিলেম রাত হলে জঙ্গলের রূপ পালটে যায়। দূর থেকে কালো ঝাপসা একটা জমাট বাঁধা জিনিসটা যে আদপে গাছের তৈরী, সেটা বুঝতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল ওর। একটা বিকট ঝিঁঝিঁর ডাক, পরে জেনেছিল ওটাকে ‘ঘন্টিপোকা’ বলে; তার সাথে মাঝে মাঝে পেঁচার ডাক, বাদুরের ডানা ঝাপটানোর শব্দ, আর জঙ্গলের পাতার ফাঁক দিয়ে ঝিরঝির করে বয়ে চলা বাতাসের একটানা সীম্ফনী… সবমিলিয়ে মনটা কেমন উদাস হয়ে যায় যেন… আকাশে চাঁদটা বেশ বড় আজ… অনেক তারার মাঝে চাঁদটা যেন বসে আছে বিরাট বড় একটা ফ্লাডলাইটের মত…

আচ্ছা আজ কি পূর্ণিমা ? খুনিয়ার জঙ্গলের কাছে আজ গেলে কি সে দেখতে পাবে সেই নারীকে ? রূপ-যৌবনের টোপ দিয়ে যে একের পর এক মানুষকে নিশ্চিৎ মৃত্যুর দিকে টেনে আনে ? আজ কেউ কি সেই রাস্তায় চলছে ? তাকে কেউ সাবধান করেছে তো ? এইসব ভাবনার মধ্যেই হঠাৎ তার চটকা ভাঙ্গে, জঙ্গল থেকে আর একটা শব্দের আমদানীতে; খুব জোরেও নয়, খুব আস্তেও নয়… কিন্তু একটানা মৃদু, বিরক্তিকর ঘ্যাস ঘ্যাস ঘ্যাস ঘ্যাস আওয়াজ, অনেকটা কাঠের ওপর করাত চালালে যেরকম হয়, সেরকম। জঙ্গল থেকে শব্দটা আসছে, অনেক গভীর থেকে। অনেক টাহর করেও কিছু দেখতে পেল না।

কি আপদ… এটা আবার কিসের উপদ্রব শুরু হল !!!                 

<a rel="noreferrer noopener" aria-label="<——- Read Previous Installment…

Somewhere, In the Jungle of North Bengal… Part – III

এখানে আকাশ নীল-নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল

ফুটে থাকে হিম সাদা-রং তার আশ্বিনের আলোর মতন

জীবনানন্দ দাশ

|| ৩ ||

সারারাত ট্রেনে কাটাবার পর, দুপুরে ঘুমটা বেশ দরকারী ছিল, আর স্নানের পর, গরম ভাত আর মূর্গীর ঝোলের কল্যাণে সেটা এসেও গেল চট করে। যদিও মৈনাক বইটা মুখে ধরেই শুয়েছিল, কিন্তু ঘুমের ঘোরে কখন যে হাত থেকে বইটা খসে সে ঘুমের দেশে চলে গেছে, নিজেও বুঝতে পারেনি। ঘুমের মধ্যে আবার স্বপ্ন দেখল সে… দেখতে পেল, সে একটু একটু করে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকছে, আর জঙ্গলও ঘন হচ্ছে ক্রমশ… আর সেই জঙ্গলের মধ্যে কিছু একটাকে ধাওয়া করে সামনে চলেছে সে। একটা পায়ের শব্দ… শুকনো পাতার ওপর মচ মচ মচ মচ… তার সামনে সামনে এগিয়ে চলেছে কোন এক অজানা দ্বিতীয় ব্যক্তি… একটা হালকা পায়ের শব্দ, অর্থাৎ এই পায়ের ছাপের মালিকের বয়স বেশী নয়। সেই পায়ের শব্দের পেছনে পা ফেলে এগিয়ে চলেছে মৈনাক। পায়ের শব্দই পাচ্ছে, কিন্তু দেখতে পাচ্ছে না এই পায়ের মালিককে; অনেকটা শব্দভেদী বাণের মতই আন্দাজে আন্দাজে এগিয়ে চলেছে সে। হঠাৎ আর একটা ভারী পায়ের শব্দ শুনতে পেল সে পেছন দিকে, এবার তার পেছনে এক তৃতীয় ব্যক্তির আবির্ভাব হয়েছে।  এরকম একটা শব্দই সে এখানে আসার তিনদিন আগেই সে স্বপ্নে শুনেছিল না ? আবার পেছনের দিকে ঘুরতে যেতেই, স্বপ্নের জগতের মায়া কেটে বেরিয়ে এল মৈনাক। ধড়মড় করে উঠে বসে দেখল, অসীমাভ, আকমল আর শ্বেতাংশু স্যারের ডাকে উঠে বসে আড়মোড়া ভাঙছে; ঘরের আলোটা জ্বলে উঠেছে, এবং সেটাই সন্ধ্যের অন্ধকারটাকে ঘর দখল করতে বাধা দিচ্ছে…

-“মুখটা ধুয়ে বাইরে আয়… এ জিনিস আর এ জন্মে দেখতে পাবি না…”

কথাটা বলে স্যার আস্তে আস্তে ঘরে থেকে বেরিয়ে গেলেন। মেয়েদের ঘরের দরজায় টোকা দিতে। স্যারের অনেকক্ষণের প্রচেষ্টার ফলে প্রায় পনেরো মিনিট পড়ে সাতজনই ঘর থেকে বেরোল। বাইরে বেশ ঠান্ডা পড়েছে। রিসর্টের যেদিকে জঙ্গল, অর্থাৎ মূল প্রবেশদ্বারের দিকে, সেদিকে না গিয়ে স্যার চললেন রিসর্টের পেছনের দিকে। রিসর্টের সীমানা যেখানে শেষ হচ্ছে, সেখান থেকে জমি ঢালু হয়ে একটা উঁচু টিলার মত চেহারা নিয়েছে, আর সেই টিলার ওপর বরাবর চলে গিয়েছে ছোট গেজের বহু পুরোনো পরিত্যক্ত রেল লাইন। সেই ঢিবির অপর পারে আছে প্রশস্ত চা বাগান। স্যারের কথামতো, সেই ঢিবির ওপর উঠে যে দৃশ্যটা ওরা সবাই দেখতে পেল, সেটা দেখার পর প্রায় ৫ মিনিট মুখ হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল সবাই।

প্রশস্ত চা বাগানের চা গাছগুলোর ওপর উড়ে বেড়াচ্ছিল লাখ লাখ, কোটি কোটি জোনাকি। উদ্দেশ্যহীন ভাবে, গোটা চা বাগানের সব গাছগুলোর ওপর আলো ছড়িয়ে। আর একটু ওপরে তাকালে দেখা যাচ্ছিল আকাশ। দু’দিন আগে একটু বৃষ্টি হয়ে এখন পরিস্কার আকাশ, আর আকাশে তারা আর মাটিতে জোনাকি এই নিয়ে এক অকল্পনীয়, স্বর্গীয় দৃশ্য ওদের চোখের সামনে। সবার প্রথমে মুখ খুলল অসীমাভই।

-“আমি ক্যামেরাটা নিয়ে আসি…”

-“আরে থামো হে ছোকরা…” আপত্তি জানালেন স্যার।

-“গোটা দুনিয়ার সবকিছুই যদি স্ন্যাপশট বানিয়ে ফেললে, তাহলে তোমার চোখের জন্য বাকি কি রইল হে ? এমনিতেও তো সারাদিন স্মার্টফোন মুখে গুঁজে রেখে চোখগুলোর বারোটা বাজিয়েছো…”

অসীমাভ একটু হেসে দাঁড়িয়ে গেল। ক্যামেরা আনতে আর গেল না। সমীরা একবার বিড়বিড় করে ‘হায় দাইয়া’ বলে উঠল…

এসবের মধ্যে, চা বাগানের দিকে তাকিয়ে জোনাকির ঝাঁক দেখতে দেখতে একটা জিনিস চোখে পড়ল মৈনাকের। চা বাগানের মাঝখানে, যেখানে জোনাকির সংখ্যা সবচেয়ে বেশী, সেখানে জোনাকির আলোয় একটা অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমশ। সেটা মানুষের মতই। জোনাকিগুলো যেন সেটাকেই প্রদক্ষিণ করে চলেছে। ঘন চা বনের ফাঁকে অন্ধকারের মধ্যে, কে ওটা ? জোনাকির প্রচুর আলো, কিন্তু তার মধ্যে দুটো জোনাকি যেন স্থির। মৈনাকের মনে হল, ওইদু’টো জোনাকি নয়; লোকটার দু’তো জ্বলন্ত চোখ। এবার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল মৈনাকের। এমন সময় পেছন থেকে একটা কুকুরের ডাক শুনে চমকে পিছনে তাকালো মৈনাক সহ সক্কলে। দেখা গেল, বীট অফিসার দিলীপ বাবু দু’হাতে চারটে কুকুরের দড়ি ধরে উপস্থিত হয়েছেন।

-“যাক! তাহলে অ্যাম্ফিথিয়েটারের সন্ধান পেয়ে গেছেন ?”

স্যার হেসে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, সেদিকে মন না দিয়ে আবার সামনের দিকে তাকায় মৈনাক, কিন্তু অনেক ঠাহড় করেও সেই অবয়বটাকে আর দেখতে পায় না সে। চোখের ভুল ? সবাই ঢিবির থেকে নেমে কথা বলতে বলতে রিসর্টের দিকে চলতে শুরু করেছে। মৈনাকও নেমে পড়ে; কিন্তু সকলের সমবেত গুঞ্জনের দিকে কান থাকে না তার। সে ভাবতে থাকে, ওই দুটো স্বপ্ন, তারপর আজকের এই ছায়ামূর্তি… সবই কি স্বাভাবিক ? সত্যিই চোখের ভুল ? কাকতালীয় ?

-“অ্যাই মৈ…” -হাঁকটা দিয়েই শ্বেতাংশু একটা হাত কাঁধে রাখে মৈনাকের…

-“তুই আবার তিয়াসার কথা ভাবছিস ?”

-“না রে ভাই…”

-“আর ন্যাকামো করিস না… ঘুম ভেঙে কিভাবে উঠে বসেছিলি, দেখেছি আমি…”

-“না… মানে…”

-“দেখ ভাই, আমি, অসীমাভ অনেক খাটা-খাটনি করে তোর আসার ব্যবস্থা করেছি… এখন প্লিজ, এই মনমরা ফেজ টা থেকে বেরো, তোর পায়ে ধরি।”

হঠাৎ মৈনাকের মনে পড়ে যায়, স্যারের সাথে সকালের কথোপকথন।

-“হ্যাঁ, ভালো কথা, আমার ব্রেক-আপ যে হয়েছে, এটা স্যারকে কে বলেছে রে ? তুই না অসীম ?”

-“আমি ? না না…”

-“তার মানে অসীম ?”

-“না… মানে ওটা একটা যৌথ প্রচেষ্টা বলতে পারিস…”

-“সিরিয়াসলি ? ভাই, নিজের কলেজের ফেভারিট টিচারের সাথে ব্রেক-আপ নিয়ে ডিসকাস করা কতটা এমব্যারাসিং বুঝতে পারিস ?”

-“আরে ভাই… চাপ নিস কেন ? কৌশিক স্যার ইজ কুল…”

-“আরে ভাই… যতই কুল হোক… আমার কেমন একটা লাগে…”

-“ঠিক আছে, তোর আর ব্রেক আপ হলে স্যারকে বলব না, ঠিক আছে ?”

-“তুই একটা ইডিয়েট…”

-“বাবাও রোজ তাই বলে রে…”

এবার হেসে ফেলে মৈনাক, হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে সবাই মিলে পৌছোয় রিসর্টের বসার জায়গাতে, দিলীপবাবু একটা ছোটখাটো ভাষণ দিলেন, আর সেটার বক্তব্য ছিল এই, যে এই এলাকায় অন্যান্য জানোয়ারের সাথে হাতির খুব উপদ্রব, সুতরাং রাতে এদিক ওদিক যাওয়া এক্কেবারে মানা, বাঘ নেই ঠিকই, কিন্তু লেপার্ড আছে বিলক্ষণ, তাই রাতে খুব দরকারে বেরোতে হলে দল বেঁধে, আর সঙ্গে যেন একটা অন্তত কুকুর থাকে; তাই এই চার সারমেয়র আগমন।  এছাড়াও, বনদপ্তর থেকে তিনি দু’টো জীপের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, ড্রাইভাররা সারাদিন মজুত থাকবে, তবে রাতে জীপ লাগলে, আগে থেকে বলতে হবে, আর জঙ্গলে চলাফেরা করার পারমিটও দরকার মতো তিনিই ব্যবস্থা করে দেবেন।

সকালে রান্না করেছিল স্থানীয় একটি ছেলে, নাম রতন। বয়স বেশী নয়, কিন্তু বেশ হাসিখুশি চটপটে ছেলে। ছেলেটিও সারারাত থাকবে, ওর জন্যও একটা স্টাফ কোয়ার্টারের ঘর এবং লাগোয়া রান্নাঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া আর একটি লোক সকালে একবার এসে ঘর-দোর পরিস্কার করে দিয়ে যাবে। এসব কথা হলে, দিলীপ বাবু, আটজনের জন্য আটটা বড় টর্চ আর আটখানা সোলার লাইট দিয়ে গেলেন। তার সাথে তিনি বলে গেলেন,

-“এমন সময় এসেছেন, বর্ষা এল বলে, জঙ্গল তো বন্ধ; এর মধ্যে আপনারা দুয়ারে যাবেন কাজে, ওপরে ওঠার পড় বৃষ্টি নামলেই চিত্তির! তখন এই আলোগুলো কাজে লেগে যাবে; তাছাড়া কি বলুন তো, এখানকার ইলেক্ট্রিসিটিও তো টেম্পোরারি ব্যবস্থা করা, কোনোদিন দূর্যোগে বা কোনোকারণে নিভে গেলে, আমি অফিসে এসে মিস্ত্রি পাঠানো আগে জ্বলবে এ আশাও করবেন না… এইসব সময়ের জন্যই আরকি, এগুলো আগাম দিয়ে রাখা।”

কথাগুলো শেষ করে, দিলীপবাবু বোঝাচ্ছিলেন, টর্চের আলো কোন প্রানীর চোখে পড়লে কি ভাবে জ্বলে, আর বাঘ বা হাতি কাছাকাছি এলে কুকুরগুলোই বা কিভাবে জানান দেয়, এমন সময়, মোটরসাইকেলে এক শীর্ণকায় বনকর্মী হন্তদন্ত হয়ে হাজির হয়ে বলল,

-“স্যার, খগেন খুনিয়ার জঙ্গলে ঢুকেছে…”


কথাটা শুনে দিলীপবাবুর মুখের চেহারাই পালটে গেল! তিনি রাগে আরক্ত মুখে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলেন

-“তোরা কি করছিলি ? একটা লোককে সামলে রাখতে পারিস না ? গাধার দল যতসব…”

এ’টা বলে তিনি হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে গেলেন, এবং তিনি বেড়িয়ে যাওয়ার পরই, শ্বেতাংশু বলে উঠল,

-“স্যার, খুনিয়া কি ?”

-“কি নয়, কোথায়… এখানকার একটা জঙ্গলের অংশের নাম খুনিয়া, স্থানীয় লোকের বিশ্বাস, সেই জঙ্গলে একদল খুনে হাতি বাস করে, দিনে হোক বা রাতে; একবার ঐ জঙ্গলে ঢুকলে, কোনো মানুষের আর নিস্তার নেই…”

-“এসব কি সত্যি ?”

-“জানি না রে… তবে তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চলে হাতিকে স্থানীয়রা ভয়ে ভক্তি করে কিনা, তাই-ই হয়তো এইসব ‘লেজেন্ড’-এর আমদানী…”

কি ? এবার একটু একটু গা ছম ছম হচ্ছে তো ? কিন্তু, এ তো কলির সন্ধ্যে… জঙ্গলের আতঙ্কের এই তো সূচনা…

< —- আগের কিস্তি পড়ুন…

শান্তির আশায়…

নীল…

Somewhere, In the Jungle of North Bengal… Part – II

‘Gar firdaus bar-rue zamin ast, hami asto, hamin asto, hamin ast’

-Amir Khusroo

|| 2 ||

ট্রেনে ওঠার পর অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে মৈনাক। সকলের হৈ চৈ আনন্দ করার মাঝে, নিজের দুঃখের পসরা সাজাতে তার ইচ্ছে করে না… ট্রেনের মজা, হাসি খুনসুটি এসব নিয়ে মেতে উঠে প্রেম ভেঙে যাওয়ার দুঃখটা ভুলেই গেছিল সে। এখন গন্তব্য নিয়ে আলোচনা করতেই ব্যস্ত সবাই। নিউ আলিপুরদুয়ারে নেমে সেখান থেকে সান্তালাবাড়ি গাড়িতে, তারপর পদব্রজে বক্সা দুয়ার। আর সেখান থেকেই কাজ শুরু ওদের। ফেরার সময় সুযোগ পেলে জয়ন্তী আর রাজাভাতখাওয়া বুড়ি ছুঁয়ে আসার ইচ্ছে আছে সবারই।

সারারাত ট্রেনেই কাটবে। সবাই লাগেজ গুছোতে, এবং একরাতের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। স্লীপার ক্লাসের আপার বার্থ-এ শুয়েছে অসীমাভ, তার হাতে খোলা রয়েছে ‘এ ফীস্ট ফর ক্রোজ’* তার ঠিক উল্টোদিকের বার্থে শুয়ে শ্বেতাংশু, তার কানে লাগানো আইপড। মিডল বার্থে মৈনাক, তার বুকে খোলা ‘মিস্টার মার্সেডিজ’* উল্টোদিকে আকমল। নীচের দুটো বার্থে অনুপ্রিয়া আর সমীরা, তারমধ্যে সমীরার কানেও একটি হেডফোন আর অনুপ্রিয়া ট্রেনে ওঠার একটু পর থেকেই ঘুমের দেশে। সাইড লোয়ারে বসে পল্লবী পড়ছিল ‘দ্যা গার্ল হু প্লেইড উইথ ফায়ার’ এবং আপার বার্থ-এ স্যার পড়ছিলেন একটা জার্নাল। সবাই শুয়ে পড়লেও, ঘুমের সময় কারোরই হয়নি। এমন সময় আকমল অস্বস্তিসূচক একটা শব্দ করে অসীমাভ কে বলল,

-“ভাই, বড় মুশকিল হল… আমার এক পাটি চটি চোরে নিয়ে গেছে…”

-“এক পাটি ? তাহলে চোর নয়, খচ্চর…” – মৈনাকের এই মন্তব্যে স্যার সমেত সবাই-ই হেসে ওঠে।

যাই হোক, একটু খোঁজাখুঁজি করার পর একপাটি চটি ঠিকই পাওয়া গেল, কিন্তু একটু বাদে আবার আকমল বলে উঠল,

-“ভাই… বড় মুশকিল হল… কালই সুটকেশটা কিনেছি… লকটা জ্যাম হয়ে গেছে… মানে কম্বিনেশানটা কি দিয়েছিলাম ভুলে গেছি, আর এখন ডায়ালগুলো ঘুরছেও না…”

মুখ ব্যাজার করে অসিমাভ ওপর থেকে নেমে এল… অনেক ধস্তাধস্তির পরও সে তালা খোলা গেল না… তাই অসীমাভ তার ব্যাগ থেকে পাথর ভাঙ্গার ছোট ছেনি হাতুড়ি দিয়ে সেটা ভেঙ্গেই দিল। আর হুমকিও দিয়ে গেল

-“আর একবার আমাকে ডাকলে তোর মাথা ভাঙব…”

-“এরকম বলছিস ভাই ?”

-“ভালার মরঘুলিস…”

-“কি গুলব ?”

-“তোর মাথা… শুয়ে পড়…”

বাকী রাতটা নির্বীঘ্নেই কাটল। ট্রেনও যথাসময়ে স্টেশনে পৌছে গেল।  সমস্যাটা শুরু হল সান্তালাবাড়ির বীট অফিসারের কাছে গিয়ে। মৈনাকরা ভেবে এসেছিল যে ওরা থাকবে বক্সা দুয়ারেই, কিন্তু ব্যাপার হল, সেখানে ইলেক্ট্রিসিটির অভাব থাকায় তাদের সমস্ত যন্ত্রপাতি নিয়ে ওপরে গিয়ে কাজ করা সম্ভব না, তার ওপর ফোনের নেটওয়ার্কও থাকে না, বলাই বাহুল্য। তাই তাদের থাকতে হবে সান্তালবাড়িতেই। আর কাজের দরকারে জিনিসপত্র নিয়ে ট্রেক করে করে কাজকর্ম করতে হবে। ব্যাপারটা বড্ড পরিশ্রমসাপেক্ষ, কিন্তু অগত্যা… কিছু করার নেই। সান্তালাবাড়ির কাছে একটা রিসর্ট ছিল, যেটার নাম লেপার্ডস নেস্ট। রিসর্টটা যেকোনো কারণেই হোক, বেশীদিন চলেনি। তার ঘরগুলোকেই সাফসুতরো করে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন দিলীপ বাবু, মানে ওখানকার বীট অফিসার। আলাদা করে ইলেকট্রিসিটির কানেকশন টেনে, অচল হোটেলকে সচল করেছেন, ওরা সবাই জিনিস গুছিয়ে নিচ্ছিল, আর তখনই মৈনাক শুনল, দিলীপবাবু স্যার কে বলছেন

-“এই জায়গাটায়, কিছুই আর টিকল না। আগে একটা স-মিল ছিল… বেশ চলত, তারপর কি একটা কারণে শ্রমিক অসন্তোষ হয়ে উঠে গেল, আর তারপর কোন এক মাড়োয়ারি কিনে এই রিসর্ট করল। তাও খুব বেশী হলে ছ’মাস… তারপর এই দশা। এখন ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট-এ আওতায় আছে, তাই মাঝে মাঝে আমাদের কাজে লেগে যায়…”

গোটা জায়গাটা ভালো করে ঘুরে দেখে মৈনাক… ছোট ছোট বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি, তার মধ্যে একটা বড় গোছের বাংলোয় ওদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, পাশের একটা ছোট বাংলোয় স্যারের। ওদের বাংলোটার মূল দরজা দিয়ে ঢুকে যে বড় ডাইনিং স্পেশ গোছের জিনিসটা আছে, সেটা সেটাতেই টানা বিছানা করে ওদের চারটে ছেলের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, আর ভেতরের মাস্টার বেডরুমে ঠাঁই পেয়েছে তিন ললনা।   

পুরো কমপ্লেক্সটা ঘুরে দেখার পর, কমপ্লেক্স থেকে বেরিয়ে, সবুজ ঘাসের জমি ধরে উদ্দেশ্যহীনের মতো হাঁটতে থাকে মৈনাক। হাঁটতে হাটতে একটা দু’টো গাছ পেরোতে পেরোতে জঙ্গলের একটু ভেতরে ঢুকে পড়েছিল, হঠাৎ পেছন থেকে একটা পরিচিত গলায় আওয়াজ পেয়ে চমকে পিছন ফিরে তাকাল সে।

-“আর ভেতরে যাস না… জঙ্গল গভীর হচ্ছে।”

কখন যে স্যার লুকিয়ে তার পিছু নিয়েছেন, খেয়াল করেছি মৈনাক। সবে সবে সিগারেট এ আগুন ধরিয়ে একটা লম্বা সুখটান দিয়ে স্যার বললেন।

-“মন খারাপ বুঝতে পারছি, কিন্তু একা একা অত ভেতরে যাস না…”

মৈনাক বেশ অপ্রস্তুত হয়ে বলে,

-“না স্যার, মন খারাপ আর কিসের ?”

-“মন খারাপ কিসের মানে ? তোর ব্রেক-আপ হয়েছে, তো মন তোর খারাপ হবে না তো কি আমার হবে না কি ?”

এ কথাটার উত্তরে বড়ই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে মৈনাক। স্যার এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রেখে বলেন,

-“খোকা, তুমি কি ভাবছ, তোমার জীবনেই একমাত্র ব্যর্থ প্রেম আছে ? ওটা একটা করে সবার জীবনেই থাকে। সময় লাগবে, মনে হবে আর কেউ নেই, কিছু নেই… কোনোদিন কাউকেই বিশ্বাস করতে পারব না… কিন্তু পারবি, আবার প্রেম হবে। এত সহজে যদি লোকের সবার ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে যেত, তাহলে কি আর দেশের জনসংখ্যা এই হারে বাড়ত ?”

এবার হেসে ফেলে মৈনাক। স্যারের ইশারায়, স্যারের পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করে সে। স্যারও মাঝে মাঝে সিগারেটে একটা করে টান দিতে দিতে বলতে থাকেন।

-“প্রতি বছর এই সার্ভের জন্যই অপেক্ষা করি, জানিস তো… আমাদের নগরসভ্যতার থেকে দুরে, জঙ্গলের এত কাছে, এই যে প্রকৃতিকে নিবীড় করে পাওয়া; এ অনেক বড় পাওয়া রে। এই যে কুড়িটা দিন এখানে কাটাবি, দেখবি জঙ্গলের প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা গন্ধ কলকাতায় ফিরে কত আপনার মনে হবে, আর কতটা মিস করবি… আমার কাছে তো এটাই স্বর্গ রে… আর রাতটা হলে দেখবি… উফফফফ…”

-“রাতে কি স্যার ?”

-“এই জঙ্গলের চেহারাই পাল্টে যায় রে ! একটা আদিম, উদ্দাম, অথচ চিরসবুজ জিনিস চোখের সামনে, কত শব্দ। রাতে জঙ্গলের শব্দ শুনলে গায়ে কাঁটা দেবে, মনটা উদাস হয়ে যাবে, চাঁদনী রাতে মনে হবে কত রহস্যের ভান্ডার যেন অপেক্ষা করছে সামনে… শুধু একটু খুঁজে নিলেই হল। সে একটা ভয়ঙ্কর সুন্দর জিনিস !!!”

জঙ্গলের পথে চলতে চলতে সহসা স্যারের এই দার্শনিক হয়ে ওঠাটায় বেশ মজাই পায় মৈনাক। এতক্ষণ স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল, এবার সামনের দিকে তাকিয়ে, একটু থমকে যায়। হাঁটতে হাঁটতে ওরা অনেকটা দুরে চলে এসেছিল সামনে মুখ তুলতেই চোখে পড়ে লেপার্ডস নেস্ট। জায়গাটা বড্ড চেনা চেনা লাগছে তার… এটাই সে দেখেছিল না স্বপ্নে, তিনদিন আগে ?

বলছি, কেমন হচ্ছে ? জানাবেন কিন্তু… লেখাটে এত সহজে শেষ হবে না, আর ভূত ? মেওয়া ফলতে এখনো দেরী আছে, দাদা…

<— আগের কিস্তি পড়ুন…

শান্তির আশায়…
নীল…

Somewhere, In the Jungle of North Bengal… Part – I

বড় দেরী হয়ে গেল, কিন্তু আমার আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আমি বলতে পারি, আমি সময় চেয়েইছিলাম। তবে, এই লেখাটি এত সহজে আমার পিছু ছাড়বে বলে মনে হয় না। তবে, আগেরটার মতই, এটিও কিন্তু নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া সত্য ঘটনা অবলম্বনে। তাই, সত্যের অপলাপ না করেই, শুরু করা যাক, ‘অপ-ঘটনা’ সিরিজের দ্বিতীয় গল্পের প্রথম কিস্তি।

“We’re everywhere, out there, among you”

― C.J. Morrow, The Finder

।। ১।।

এস এম এস টা আর একবার পড়ল, মৈনাক। মানে দু দুটো মেসেজ প্যাক শেষ হয়ে যাওয়ার পরের মেসেজটা হল “Its not wrkng out, Moinaak. I think lets call it… ar amk msg kre br br dstrb Kris na… smne exm ache…”

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। হাতটা থরথর করে কাঁপছে।  তিন বছরের সম্পর্ক… আর কথাটা সামনে এসে বলারও প্রয়োজন মনে করল না তিয়াসা… অনেক কথাকাটাকাটি, অনেক বিনিদ্র রজনীর পর, আজ সব ভেঙে পড়ল।

কে দায়ী এর জন্য ? সে ? তিয়াসা ? নাকি তাদের মাঝের ২০০ কিলোমিটার দুরত্ব ? নাকি সেইসব বন্ধু, যারা অকারণেই তাদের সম্পর্কের মাঝখানে নাক গলিয়ে ব্যাপারটাকে আরো জটিল করে তুলেছিল ? ভাবতে ভাবতে চোখটা আপনা আপনিই জলে ভিজে উঠল, চারদিক ঝাপসা লাগছে। পেছনে চলা ক্যান্টিনের নিরর্থক কোলাহল তার কানে রেডিওর একটানা ঘ্যাষঘ্যাসে বিরক্তিকর শব্দের মতই মনে হচ্ছিল। উঠে পড়ল মৈনাক। প্লেটে পড়ে থাকে দেড়খানা ফিশ চপ । ব্যাপারটা আর কেউ লক্ষ্য না করলেও অসীমাভ দেখে। সে ইশারায় শ্বেতাংশুকে ডেকে উঠে পড়ে ।

ক্যান্টিন থেকে বেড়িয়ে বেশিদূর যেতে হয় না, ক্যান্টিনের পাশের ছোট গলিতে, নর্দমার পাশে বসেছিল মৈনাক, চোখদুটো দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে।

-“হরি হে ! মাছের চপ ফেলে নর্দমার ধারে বসে অশ্রুবিসর্জন ? এ তোমার কোন রূপ দেখাচ্ছ, ঠাকুর ?”

মৈনাক ইশারায় হাত তুলে শ্বেতাংশুকে থামায়। তার চোখের জল, নিমেশে একটু পালটে দেয় বাকী দু’জনের মুখের অভিব্যক্তি। তারা দু’জনেই জানত, যে তিয়াসার সাথে একটা টানাপোড়েন ক’দিন ধরে চলছে মৈনাকের। দু’জনে গিয়ে দু’পাশে গিয়ে বসে পড়ে। মৈনাক একরকম অসীমাভকে জড়িয়ে ধরেই কাঁদতে থাকে।

-“আরে ভাই, অনেস্টলি বলছি, তোর হাবভাব দেখে আমার মনে হচ্ছিল, এটাই হতে চলেছে… কাম ডাউন…”

কিন্তু মৈনাক অত সহজে থামবার নয়। দুই বন্ধুর বেশ কিছুটা কাঠখড় পোড়ানোর পর, মৈনাক একটু সোজা হয়।

-“খুব ভালোবাসতাম রে…”

-“সে তো সবাই জানে… কিন্তু বার বার করে বারণ করেছিলাম, লং ডিস্টেন্সে আছিস, দয়া করে থার্ড পারসন মাঝে ঢোকাস না। শুনলি ? না, এর থেকে খবর নিচ্ছি, ওর থেকে খবর নিচ্ছি… কি লাভ হল ? গুছিয়ে তোরটাই তো মারা গেল ?”

আবার একটু কেঁদে ফেলে মৈনাক।

-“বুঝতে পারিনি ভাই…”

-“ছাড় তো এখন ওসব কথা… আপাতত সামনের কথাটা ভাব। সামনে ট্যুর আছে…”

-“ট্যুর ? কিসের ট্যুর ? আমি তো সার্ভে টিমে নেই ? আমার তো…”

তাকে কথাটা শেষ না করতে দিয়েই অসীমাভ বলে ওঠে,

-“নেই মানে? এখন নেই… থাকতে কতক্ষণ ? এমনিতেও অত বড় এরিয়া সার্ভে করার জন্য, ৩ জনের টিম বড়ই ছোট।”

-“তিনজন কই রে ? ছ’জন তো…”  -অবাক হয়ে প্রশ্ন করে শ্বেতাংশু।

-“তুই না ভাই, সিরিয়াসলি। সকালেই খেয়েছিস নাকি, গাঁজা ? ছ’জন ? আমি, তুই, পল্লবী বাদ দিলে, আর কে আছে যে কাজ করবে ? আকমল ? যে সন্ধ্যে হলে বোতল পুরাণ পাঠ করতে বসে, নাকি অনুপ্রিয়া, যে দোতলা থেকে একতলা লিফট ছাড়া নামতে পারে না। নাকি সমীরা, না সরি সামিরাআআ যে এখনো কথায় কথায় ভোজপুরী হিরোইনের মতো গালে হাত দিয়ে ‘হায় দাইয়া’ বলে চোখ কপালে তোলে?”

(C) Neelotpal Sinharoy, 2012

শ্বেতাংশু হেসে ফেলে। একটা হাসির আভা মৈনাকের মুখেও দেখা দেয়।

-“কিন্তু এখন, ম্যানেজ হবে ? পরের সপ্তাহেই যাওয়া, থাকা খাওয়া তো সমস্যা নয়, আসল সমস্যা ট্রেনের টিকিট। কি করে পারবি ?”

-“আরে ভাই, এই অসীমাভ মুখুজ্জে থাকতে তোর আবার টিকিটের চিন্তা ? মামাকে একটা ফোন লাগাবো, আর সিধে ভি আই পি কোটা।”

-“কিন্তু, স্যার ম্যানেজ হবে ?” -আবার সন্দেহ প্রকাশ করে শ্বেতাংশু।

-“হুঃ… স্যার আবার ম্যানেজ হবে না… আমাদের ওমন মাইডিয়ার লোক, সে কিনা তার প্রিয় ছাত্রের যাওয়াতে মানা করবে…”

মৈনাক কিছু বলার সুযোগও পেল না। তবে সে আপত্তি করতে চাইছিলও না। কারণ কলেজে জিওলজি নিয়ে পড়া ইস্তক তার সার্ভেতে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল প্রবল, কিন্তু কপালদোষে সেমিস্টারের প্রথম সার্ভে থেকেই তার নাম বাদ পড়ে। ব্রেক আপের দৌলতে হোক, বা যে ভাবেই হোক, এখন এই ঘিঞ্জি শহরটা ছেড়ে বেরোতে পারলেই মনটা হয়তো ভালো হবে। এমনিতেও জঙ্গল তার ভালো লাগে, আর ডুয়ার্স সে আগে যায়নি, তার ওপর বাড়িতে মন টিকছে না।

 রাতে খেয়েদেয়ে, ঘরের আলোটা নেভাতেই মনে হল, ঘরের জমাট বাঁধা অন্ধকার যেন তাকে গিলে খেতে আসছে। আলোটা জ্বালিয়েই শুল। ডাইনিং রুমের গ্র্যান্ডফাদার ক্লকে ঢং ঢং করে ১২টা বাজলে, সে বুঝতে পারল, টানা তিনঘন্টা বিছানায় ছটফট করে, চোখের জ্বলে বালিশ ভিজিয়ে আর যাই হোক, ঘুম আসবে না। বিছানা ছেড়ে উঠে স্টাডি টেবলে বসল মৈনাক। ফোনটা সাইলেন্ট করা ছিল, দেখল একগাদা মেসেজ জমে আছে । তবে ফোনটা ফেলে দিয়ে রিডিং ল্যাম্পটা জ্বালল। সামনে পড়ে থাকা খাতাটা টেনে, কিছু একটা লিখবে বলে অনেকক্ষণ হিজিবিজি কাটতে কাটতে, সেই খাতার ওপরই মাথা রেখে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেই জানে না। যখন ঘুম ভাঙল, তখন সে একটা সবুজ ঘাসজমির ওপর শুয়ে, ওপরে আকাশ, একটা পাহাড়ের সারি দেখা যাচ্ছে…

উঠে বসে সামনে তাকায় সে। একটা ছোট কারখানার মত কি যেন একটু দুরেই। আর তার পড়েই একটা ঘন জঙ্গল। উঠে দু’পা হাঁটতে থাকে সে। সামনের দিকে একটু এগোতেই, পেছনে একটা ভারী পায়ের শব্দ পায়। পিছন ফিরে তাকাতে যেতেই, কে যেন তাকে প্রচন্ড জোরে একটা ধাক্কা মারে, আর চমকে জেগে ওঠে সে। এবার তার ঘরে, পিঠের কাছে দাঁড়ানো মা বেশ রাগের গলায় বলে ওঠেন,

-“তোর ঘরের সবক’টা বালব আমি যদি আজ খুলে না নিই, দেখ…”

জানলা দিয়ে আসা রোদে ঘর ভেসে যাচ্ছে তখন।

-“শিগগির নিচে নাম, জলখাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে…”

মা এই বলে ঘর থেকে চলে যান। মৈনাক ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে দেখে সতেরোটা মিসড কল, তার মধ্যে বারোটা অসীমাভর। তাকে ফোন করতে সে বেশ ঝাঁঝের গলায় বলে ওঠে,

-“শালা, কখন থেকে ফোন করে যাচ্ছি, কোথায় গুঁজে রেখেছিলি ফোনটাকে ?”

-“এই তো… বল…”

-“তাড়াতাড়ি কলেজ ঢোক, স্যার ডেকেছেন তোকে, আর্জেন্ট। আর বাই দ্য ওয়ে, তোর টিকিট কনফার্মড।”

কি ভাবছেন ? ভূত কই ? আর মশাই, আসবে, আসবে… ধৈর্য্য ধরুন… সবুরে মেওয়ার সাথে সাথে দু-একটা ভূতও পেয়ে যাবেন। চিন্তা নেই।

শান্তির আশায়…

নীল…