“The possession of knowledge does not kill the sense of wonder and mystery. There is always more mystery.”

Anais Nin

||১২||

মুখটা প্রথম শ্বেতাংশুই খোলে,

-“ভাই, আমরা কি বেঁচে আছি ?”

অসীমাভ তখনো ধাতস্থ হতে পারেনি, হাত পা কাঁপছে তখনো, জীবনে এত ভয় সে কখনো পায়নি। শ্বেতাংশুর দিকে মুখ ঘুরিয়ে একটা ঢোক গেলার চেষ্টা করে বুঝতে পারে, গলাটা এতটাই শুকিয়ে গেছে যে ঢোক গেলার ক্ষমতাও নেই সেই মুহূর্তে।  শ্বেতাংশুর দিকে ঘুরে কোনরকমে ইশারায় তাকে উঠতে বলে, আর তারপর কোনও দিকে না তাকিয়ে সোজা লেপার্ডস নেস্টের দিকে দৌড় লাগায়। ঘরের দরজার কাছাকাছি পৌছে দেখে মৈনাক ঘর থেকে বেরোচ্ছে, তাকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়েই একরকম ধাক্কা মেরে তাকে সমেতই ঘরের মধ্যে ঢুকে যায় ওরা। ঘরে ঢুকেই ধপ করে বসে পড়ে শ্বেতাংশু। অসীমাভ তখনো পুরোপুরি প্রকৃতিস্থ হয়নি। তার মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে, মৈনাক বলল,

-“তোরা কি কিছু দেখলি বাইরে ?”

শ্বেতাংশু চোখ বন্ধ করে দু’টো হাত কপালে দিয়ে বসে আছে; সে নড়ল না, কথাটা শুনে অসীমাভ কিছু চমকে উঠল,

-“কি ক্কি দেখার কথা বলছিস তুই ?”

-“না তাহলে ওরকম করছিস কেন ? তোর হাত পা তো কাঁপছে দেখতে পাচ্ছি…”

-“জানি না… জানি না বাইরে কি হল একটু আগে… মনে হলে যেন…”

অসীমাভ চুপ করে যায়, এক দু মুহূর্তের নিশ্তব্ধতা; তারপরই শ্বেতাংশু মুখ খোলে…

-“ঠিক… ঠিক করে বোঝাতে পারব না, ভাই… মনে হল সামনের জঙ্গলের দিক থেকে, মানে জঙ্গলটাই… বা জঙ্গলের…

-“…মতো বিরাট বড় কিছু এগিয়ে আসছে ? আর গোটা আকাশটাই যেন মাথার ওপর নেমে আসছে ?”

-“তুই… তুই কি করে…”

এবার মৈনাকও ধপ করে বসে পড়ে, কিন্তু তার মুখে একটা অদ্ভূত প্রশান্তি;

-“তার মানে স্যার ঠিক বলেন নি… তার মানে আমি এতদিন ভুল দেখিনি… তার মানে…”

-“এতদিন মানে ? কতদিন ?” শ্বেতাংশু প্রশ্ন করে।

-“এখানে আসা থেকেই… প্রায়শই…”      

 -“আমাদের বলিসনি কেন ?” -এখনো কাঁপতে থাকা গলায় অসীমাভ জিজ্ঞাসা করে

-“বললে কি হত ? তোর মতো গাম্বাট কে কিছু বোঝানো সম্ভব নাকি ?”

অসীমাভ এর উত্তরে রেগে মেগে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু শ্বেতাংশু তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,

-“কি দেখেছিস তুই ? বলবি ?”

-“দেখিনি… শুনেছি… একটা পায়ের শব্দ… কিন্তু সেই পায়ের চাপে শুকনো পাতা গুঁড়িয়ে যেতে দেখেছি। দেখেছি বাঘা বাঘা কুকুরগুলো কুণ্ডলী পাকিয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে…”

-“এসব কি হচ্ছে ভাই !”

-“জানিনা… আমার কোনো ধারণাই নেই…”

মৈনাক এবার উঠে যায়, জানলার ধারে।

-“শুধু আমি জানি, ওই জঙ্গলে কিছু আছে; সেটা কি জানি না, কি তার উদ্দেশ্য, সেটাও জানি না; শুধু জানি এখন রাত হলেই মনে হয় একদিন দু’দিন ফীল করেছি, এখন রাত হলেই কেমন অস্বস্তি লাগে সবসময়… তোদের বলিনি তোরা বিশ্বাস করবি না বলে; দু’দিন আগে একবার রাতে বলার চেষ্টাও করেছিলাম; কিন্তু শেষে আর সাহস হল না…”

আবার বসে পড়ে মৈনাক…

-“সরি ভাই… এই পরিবেশে তিয়াসার মেসেজটা পেয়ে নিজেকে সামলাতে পারিনি… সরি… তোরা বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার পরই আমি ওকে মেসেজ করে দিয়েছি… তোমার রাস্তা তুমি দেখ…”

অসীমাভ আর শ্বেতাংশু মৈনাকের দিকে এগিয়ে আসে; অসীমাভ এখন অনেকটাই প্রকৃতিস্থ, এবার সে মুখ খোলে

-“ব্যাপারটা আমাদের তিনজনের মধ্যে থাকাই ভাল; তুই স্যারকে বলেছিলি না ?”

-“হ্যাঁ, স্যার বলেছেন কালচারাল শক থেকে হচ্ছে…”

-“হতে পারত… তাহলে এক জিনিস তিনজনে দেখতাম না… আরে বাবা কালচারাল শকে সমীরার পায়খানা বন্ধ হয়েছে মানা গেল, তা বলে এক ঘটনা তিনজনে দেখব ?”

-“ওসব ভেবে লাভ নেই, কাল আবার লেপচাখা যাওয়ার আছে, চল শুয়ে পড়ি… আর আজকের পর, রাতে কেউ একা একা ঘরের বাইরে যাব না…” -শ্বেতাংশু বলে।

তিনজনে শুয়ে পড়ে। মৈনাক ফোনটা বন্ধ করে দেয়। তিনজনেই শুয়ে শুয়ে শুনতে পায়, জঙ্গলের ভেতর থেকে করাত চালানোর আওয়াজ, ঘ্যাঁষ ঘ্যাঁষ ঘ্যাঁষ ঘ্যাঁষ…

রাতে ভালো করে ঘুম না হলেও সকালে উঠে পড়তে হয় সবাইকে, কারণ রাতে বৃষ্টি না হওয়ায় আজ লেপচাখা পৌছে সার্ভের কাজ বেশ কিছুটা এগিয়ে রাখা প্রয়োজন।  যা কাজ আছে, সেটা আজ শেষ হলেও হয়ে যেতে পারে, কিন্তু না হলে আর একদিনে তো নিশ্চয়ই শেষ হয়ে যাবে।

আজ সকালে আবহাওয়া একেবারেই অন্যরকম; ঝলমলে রোদ উঠেছে, লেপচাখার রাস্তায় ট্রেক করতে করতে নানারকম পাখির ডাকও শুনতে পেল ওরা। লেপচাখার রাস্তায় উঠতে উঠতে, মনেই হচ্ছিল না, যে কাল রাতে জঙ্গলটাকে অত ভয়াবহ চেহারা নিয়েছিল। চারপাশের পরিবেশে একটা চাঞ্চল্য, একটা আনন্দের সাড়া; তাতে মনে হচ্ছিল, কাল রাতের ঘটনাটাকে চোখের বা মনের ভুলের খাতায় ফেলে দেওয়াই যেতে পারে। একদিনের বৃষ্টির পর রাস্তা পেছল ঠিকই, কিন্তু আগের দিনের পর আজ যেন রাস্তাটা একটু হলেও চেনা লাগছে, আর তাই ওঠাটা কার্য্যত অনেকটাই সোজা মনে হচ্ছে। আজ আকমলের ‘বেগ’ পেল না, তাই কাজের বেগটাও অনেকটাই বেশী হয়ে গেল। কাজের মাঝে একসময় তিনজনে একসাথে একটা জায়গার মাপ নিচ্ছিল, নিতে নিতে  অসীমাভ হঠাৎ বলল,

-“আচ্ছা, আমাদের কাউকে না বলে যদি এই ঘটনার ব্যাপারে তারা দা কে জিজ্ঞাসা করা যায় ? তারা দা নিশ্চয় কিছু না কিছু জানবে।”

-“দেখ, প্রথম দিন খুনিয়ার গল্প বলার সময়ই তারা দা বলেছিল সে ভূত দেখেনি, তো আমাদের কথা শুনলে তারা দাও খুব একটা গুরুত্ব দেবে বলে তো মনে হয় না…”

-“আচ্ছা, ভূতের কথা না হয় বাদ দিলাম, লেপার্ডস নেস্ট-এর ব্যাপারে কিছু তো জিজ্ঞেস করতে পারি; নাকি ? প্রথমদিন দিলীপ বাবু বলছিলেন, ওই জায়গাটায় নাকি আগে কাঠচেরাই কল ছিল, সেটা বন্ধ হয়ে কেন রিসর্ট হল, আর রিসর্টটাই বা কেন বন্ধ হল ?”

-“হ্যাঁ সেটা জিজ্ঞাসা করাই যায়… হাতের কাজটা গুছিয়ে নিই আগে; তারপর…”

হাতের কাজ গোছাতে গোছাতে নিচে নামার সময় হয়ে যায়। আর সামান্যই কাজ বাকী আছে; সেটা আর একদিন আসলেই হয়ে যাবে।

দল বেঁধে নিচে নামার সময় ওরা তিনজনে চেষ্টা করল যতটা পারা যায় তারাশঙ্করকে অন্যদের থেকে একটু তফাতে রাখতে। ব্যবধানটা যখন বেশ খানিকটা, তখন অসীমাভই প্রশ্ন করল,

-“ইয়ে, তারা দা… দিলীপ বাবুর মুখে শুনেছিলাম লেপার্ডস নেস্টের জায়গায় নাকি আগে কাঠচেরাই কল ছিল ?”

-“হুঁ… বনলক্ষ্মী টিম্বার ওয়ার্কস… সর্বেশ্বরবাবু মালিক ছিলেন… একেবারে মাটির মানুষ…”

-“তা সেটা বন্ধ হয়ে গেল কেন ?”

-“আর বোলো না… এই সর্বেশ্বর বাবু, লোকের ভালো করতে করতেই ডুবলেন; ওই যে, যে ছেলেটা তোমাদের রান্নাবান্না করে, রতন, ওর বাবা ওই কাঠকলে কাজ করত; তার মুখের কথায় তার বড়ছেলেকে, মানে রতনের দাদা মণিকে কাজে রেখেছিলেন সর্বেশ্বরবাবু, এখন ছেলেটি ছিল আন্ডারএজ। বাপ অভাবের তাড়নায় মিথ্যে বলে ছেলেকে কাজে ঢুকিয়েছিল। ডিউটি আওয়ার্সে কাঠ মেশিনে দিতে গিয়ে, নিজেই ছেলেটি বীভৎসভাবে মারা যায়, তারপর আর কি; যা হয়, ইউনিয়নবাজী, পলিটিক্স, কারখানায় তালা; শেষে এক মারোয়াড়ীর কাছে কারখানা বেচে দিয়ে সর্বেশ্বরবাবু নর্থ বেঙ্গল ছেড়ে চলে যান।”

অসীমাভ প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল লেপার্ডস নেস্ট কি করে বন্ধ হল সেটা, কিন্তু তার আগেই অনুপ্রিয়া উত্তেজিত হয়ে কিছু একটা বলতে বলতে ছুটে এল পিছন থেকে। দেখা গেল জীবনে প্রথমবার একটা জলজ্যান্ত ধনেশ পাখি দেখে খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়েছে সে। অসীমাভ অনেক চেষ্টা করল একটা ছবি তোলার, কিন্তু ধনেশ বাবাজী পাতার আড়ালেই বসে রইলেন, সামনা সামনি দেখা দিলেন না, যাতে ছবি তোলা যায়।

আবার নামা শুরু হল, কিন্তু  ওরা তিনজনে সুযোগ পেল না তারাশঙ্করকে আর প্রশ্ন করার। তবে একটা বড় জিনিস জানা গেল, কারখানা বন্ধের কারণ, এবার রতনকে জিজ্ঞাসা করলে রতন কি কিছু বলতে পারবে ? লেপার্ডস নেস্ট পৌছল যখন, তখন বাজে বিকেল পাঁচটা। ঘরে পৌছে সারাদিনের আর রাতের ক্লান্তি যেন ওদের সবাইকে চেপে ধরে বিছানায় শুইয়ে পাহারা দিল, যতক্ষণ না ঘুম আসে।

আটটায় রতনই এসে ওদের ঘুম থেকে তুলল।

-“সার ডাকছেন আপনাদের, দাদাবাবুরা…”

ঘুমে জড়ানো চোখে কোনোরকমে উঠে বাইরে গেল পাঁচজন। ওরা তিনজন, পল্লবী আর অনুপ্রিয়া। স্যারের জরুরী তলব; এখন বাকি কুম্ভকর্ণদের ঘুম ভাঙাতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাবে। রোজকার মতো স্যার লনে বসে চা খাচ্ছিলেন, ওদের দেখে বললেন,

-“তোদের আক্কেলটা কি, অ্যাঁ ? রাতে ঘুমোস কখন যে কাজ হয়ে গেলেই সব একেবারে হাইবারনেশনে ?”

এর উত্তর না দিয়ে একটু বোকা বোকা হাসি হাসে অসীমাভ।

-“যাক গে, শোন, কাল একটু লম্বা ট্যুর আছে, কাল গিয়ে একেবারে পরশু অথবা তরশু ফিরব।”

-“কোথায় যাব, স্যার ?”

-“ঝালং পয়েন্টের দিকে, সাখাম। পল্লবীকে বলেছিলাম না, ওইদিকে আর জয়ন্তীর দিকে দু’টো পয়েন্ট আছে ? তো সাখামটাতে সুবিধা হল ট্রেক এর ঝামেলাটা নেই, তো এক-দুদিন একটু খাটলে কাজটা মিটিয়ে নেওয়া যাবে। তারপর একদিন লেপচাখা, তারপর জয়ন্তীটা ক’দিন লাগে দেখতে হবে।”

-“তাহলে স্যার, কাল সকালে বেরোতে হবে ?”

-“অবশ্যই! তা সবাই দিনতিনেকের মত জামাকাপড় নিয়ে নিস; আর সকালের জন্য কাজ ফেলে রাখিস না। রাতেই সব গুছিয়ে নিয়ে দয়া করে, অ্যাই রিপিট দয়া করে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে আমাকে উদ্ধার কোরো।”

এই বলে একটা ব্যঙ্গের হাসি হাসলেন স্যার।

ঘরে ফিরেই অসীমাভ জিনিস গোছাতে তৎপর হয়ে উঠল, তা দেখে বেশ অবাক হয়েই শ্বেতাংশু মৈনাককে প্রশ্ন করল,

-“পোলাডা এত্ত তৎপর ক্যানো হইয়া উঠল ক’ দেহিনি ?”

-“তৎপর হব না ? কাল সকালে বেরোতে হবে, আপাতত তিনদিন এখানে ফেরার সীন নেই, এখন জিনিস গুছিয়ে রাতে রতনকে জেরা করব, আর আমরা তিনজনে স্যার শুয়ে পড়লে গোটা রিসর্টের চারপাশটা ভালো করে সার্চ করব…”

-“সার্চ করবি মানে ? ভূত খুঁজবি ? রাতে ?”

-“তো দিনের বেলা ভূত কোথায় পাওয়া যায় বললে বাধিত হতাম…”

এর পর আর কোনো কথাই বলে না শ্বেতাংশু। মানুষের ভয়ের চেয়ে কৌতুহলের পাল্লা যে ভারী, সেটা বোঝা যায় তাদের হাবভাবেই। কাল মৈনাক ঘরে থাকলেও, রাতে বাইরে বেরিয়ে বাকী দুই মক্কেল প্রবল ভয় পেয়েছিল। কিন্তু আজই আবার দল বেঁধে রাতের অন্ধকারে ভূতের সন্ধানে বেরোনোটা কারোরই অযৌক্তিক বা, বেপরোয়া মনে হল না। বরং বাকী দু’জনেও হাত লাগাল জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে। প্রায় সওয়া ন’টা নাগাদ গোছাগুছি শেষ করে, খাবারের ডাক আসেনি দেখে বাইরে বেরোলো তিনজনে। বাইরে কাউকে দেখতে না পেয়ে এবং স্যারের ঘরে আলো জ্বলে উঠল দেখে সেদিকে যাওয়াই সাব্যস্ত করল। স্যারের ঘরের দরজায় পৌছে বেশ চমকেই গেল ওরা। ঘরের দরজা বাইরে থেকে তালা দেওয়া।

-“তাহলে ঘরে আলো জ্বালল কে ?” -মৈনাক বলে ফেলে।

-“কি রে তোরা এখানে ? খেতে চ…” -পেছন থেকে স্যারের আবিভাব হয়।

চমকে উঠে পেছনে তাকায় তিনজনে, শ্বেতাংশু বলে,

-“স্যার, আপনার ঘরে আলো জ্বলল দেখে আমরা এদিকে এলাম।”

-“সে কি রে ! নেভাতে ভুলে গেছিলাম নাকি ?”

-“না স্যার, জ্বলছিল না, জ্বলল… আমরা আলোটা জ্বলতে দেখলাম…”

-“কি আবোল তাবোল বকছিস ?”

এই বলে স্যার মুখ বাড়িয়ে দেখলেন আলোটা তখনো জ্বলছে। পকেট থেকে চাবি বার করে ঘরের দরজাটা খুললেন তিনি। ভেতরে ঢুকলেন, পেছনে তিনজন। ঘরে আলো জ্বলছে ঠিকই, কিন্তু অন্য কারোর চিহ্নমাত্র নেই। ঘরের আনাচে, কানাচে, বাথরুমে, এমনকি খাটের তলাতেই, কারোর কোন অস্তিত্ব পাওয় গেল না। স্যার আলোর সুইচটা কয়েকবার অন-অফ করে বললেন;

-“কিছু না, কতদিনের অযত্নে পড়ে থাকা সুইচ স্প্রিং-এর গন্ডগোলে অমন নিজে নিজে অন হয়ে গেছে, চল চল, খেতে চল… রতনের মায়ের আবার শরীর খারাপ, আজ রাতে ও থাকতে পারবে না, বাড়ি গেছে…”

স্যারের পেছন পেছন হাঁটতে থাকা অসীমাভ সেটা শুনে মুখটা ব্যাজার করে নিজের ডানহাতের তালুতে একটা ঘুষি মারল।

খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘরে এসে প্রথম মুখ খুলল অসীমাভ,

-“পোড়া কপাল আমার… আজই রতনকে বাড়ি যেতে হল, তার মধ্যে সন্ধ্যেবেলা স্যারের ঘরে কে ঢুকল কে জানে…”

-“ভাই, স্যারের খারাপ সুইচের থিওরিটা কি বেশী লজিকাল নয় ?” – শ্বেতাংশু প্রশ্ন করে।

-“দেখ ভাই, আমি এখানে আসা ইস্তক, সবেতে লজিক খুঁজেছি, আর পারছি না…” -উত্তর দেয় মৈনাক।

স্যারের ঘরে আলো নিভে গেলে, এবং আকমল আবার সুরাপান করে ঘুমের দেশে চলে গেলে ফ্ল্যাশলাইট হাতে তিনজনে ঘরের বাইরে বেরোয়। সাবধানে গোটা রিসর্টের সীমানা বরাবর ঘুরে নেয়, তাদের কটেজ, স্যারের কটেজ, রতনের ঘর, বাকী সবকটা জায়গা। সীমানার কাছে দাঁড়িয়ে জঙ্গলটাকে খুব সাধারণ মনে হল, এমনকি ঘ্যাঁষঘ্যাঁষে শব্দটাও নেই আজকে। কাল যেখানে অসীমাভ গোঁসা করে গিয়ে বসেছিল, তার খানিকটা আগে একটা একটা বাউন্ডারি ওয়াল আছে। খুব উঁচু নয়, তবে পাঁচিলের গায়ে স্তুপাকার করে ফেলে রাখা মাটির ওপর দাঁড়ালে পাঁচিলের ওপারটা দেখা যায়।

-“ওই দেখ, ওই যে গাছের গুঁড়িটা দেখছিস, অসীম কাল তোর ওপর রাগ করে ওটার ওপর বসেই কাঁদছিল…”

-“অ্যাই, আমি কখন কেঁদেছি রে ?”

-“ওই হল, প্রলাপ বকছিলি তো…”

-“দেখ শ্বেত, বাজে কথা বলবি না কিন্তু… খুব খারাপ হয়ে যাবে…”

এমন সময় আবার ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।

-“লে হালুয়া… চল চল ঘরে চল, ভিজে যাব…”

এই বলে তিনজনেই তাদের কটেজের দিকে ঘোরে। কিন্তু এমন সময় স্পষ্ট শুনতে পায়, কথা বলার শব্দ। দু’টো মেয়েলি গলা কোনো অজানা ভাষায় কথা বলছে। মাঝে মাঝে হাসির শব্দও পাওয়া যাচ্ছে। তিনজনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনল, তারপর ঠাহর করে বুঝল, শব্দটা আসছে ঠিক পাঁচিলের পেছন থেকে…

অসীমাভ পা টিপে টিপে পাঁচিলের কাছে গিয়ে দেয়ালে কান পাতে। হ্যাঁ, স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, পাঁচিলের ওপার থেকে। এবার সন্তর্পণে সে মাটির ঢিবিটার ওপর উঠে পড়ে। সেটা খুব একটা চওড়া না হলেও দু’পাশে কোনোরকমে উঠে পড়ে মৈনাক আর শ্বেতাংশু। অসীমাভ পাঁচিলের অপরপ্রান্তে আলো ফেলে; আর তিনজনেই বোকা বনে যায়।

কেউ নেই পাঁচিলের ওপারে। টর্চের আলো এদিকে ওদিকে ফেলেও কিছু দেখা যায় না। আর ভোজবাজির মতো বাতাসে মিলিয়ে গেছে মেয়েলি দু’টো গলার শব্দ। 

যাঁদের মনে নেই, তাঁদের মনে করিয়ে দিই, এই লেখাটি কিন্তু একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা।

<<—————————– Read Previous Installment

One Comment on “Somewhere In the Jungle of North Bengal… Part XII

  1. Pingback: Somewhere In the Jungle of North Bengal… Part XIII – Libberish

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: