ক’দিন ধরেই, সোহিনীর চোখটা বড় সমস্যা করছিল, চোখ দিয়ে জল পড়া, মাথা ধরা। বোধহয় পাওয়ার বেড়েছে। কাজের চাপে আজ নয় কাল, কাল নয় পরশু করে ঠিক হয়েছিল, এই মঙ্গলবার সুকোমল তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরিয়ে, সোহিনীকে কাছের একটা আই হসপিটাল-এ নিয়ে যাবে, একসাথে দু’জনের চোখই পরীক্ষা করে নেবে।
-“আমি কিন্তু চিনি না ডাক্তার কোথায় বসে; তুমি লেট কোরো না কিন্তু!”
-“আরে না না! আমি ঠিক ম্যানেজ করে বেরিয়ে আসব, তুমি চাপ নিও না!”
-“চাপ কি নিচ্ছি আর সাধে? তোমার যা ভুলো মন!”
তারপরের ঘটনাটা যে কিভাবে ঘটল, কেন ঘটল, আন্দাজ করা একটু মুশকিল, সবার পক্ষে!
সকাল দশটায় অফিস ঢুকেছে সুকোমল, জানে ঠিক সাড়ে পাঁচটায় অফিস থেকে বেরোবে, একঘন্টায় বাড়ি, তারপর সোজা সোহিনীকে নিয়ে ডাক্তারখানা।
সমস্যা হল, ঠিক সাড়ে তিনটে নাগাদ নতুন ক্লায়েন্ট এল মিটিং-এর জন্য। মিটিং-এ ঢুকে, টেকনিক্যাল প্রেসেন্টেশনের চতুর্থ স্লাইডে যেতে না যেতেই সে বেমালুম ভুলে গেল সন্ধ্যের ডাক্তার দেখানোর কথা। একঘন্টার ওপর প্রেসেন্টেশন, তারপর কোয়েশ্চেন-আন্সার সেশনের এবং আরও কিছু আলোচনা করে মিটিং শেষ হল ঠিক পৌনে ছ’টা। তারপর, তার ম্যানেজার আর ক্লায়েন্টের ঝোলাঝুলিতে, ডিনার। আর ডিনারের চক্করে এমন এক রেস্টোরেন্ট-এ যাওয়া হল, যেখানে বিন্দুমাত্র সিগন্যাল থাকে না।
পাক্কা সাড়ে আটটায়, গাড়ির সীটে বসে স্টার্ট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মনে পড়ল তার, সোহিনী-ডাক্তার-চোখ, ঠিক এই ক্রমবিন্যাসে। ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখল ফোন তার ব্যাটারির শেষবিন্দুতে, আর সার্ভিস প্রোভাইডার জানান দিচ্ছে, সোহিনীর নম্বর থেক মোট ১৯টা মিসড কল এসেছিল। সোহিনীকে ডায়াল করতে গিয়েই সুইচড অফ হয়ে গেল ফোনটা। আর কোনো দিকে না তাকিয়ে, ঝড়ের বেগে ফাঁকা বাইপাস দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে সোজা বাড়ি ঢুকল সুকোমল।
ডাইনিং-এ একটামাত্র আলো জ্বলছে। আর গোটা বাড়ি অন্ধকার। সোহিনী ডাইনিং-এর সোফায় বসে আছে, তার চোখে জল। সুকোমল চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঢুকতেই, সে অগ্নিদৃষ্টি হানল তার দিকে;
-“কোথায় ছিলে?”
-“না… মানে আমার ক্লায়েন্ট মিটিং… আগে থেকে ঠিক ছিল না…”
-“রাত আটটা অবধি ক্লায়েন্ট মিটিং,নাকি?”
-“না না, মানে… ওই… ডিনার…”
সোহিনীর গলার পারদ চড়ে;
-“ডিনার? ওই গিলেই যাও খালি! গেলনচন্ডী কোথাকার। আজ কোথাও যাওয়ার ছিল?”
সুকোমল তাড়াতাড়ি ব্যাপারটাকে হাল্কা করার চেষ্টা করে;
-“একদম ভুলে গেছি, হিনি! সকাল অব্দি মনে ছিল… কিন্তু”
সোহিনী মাথা নিচু করে, দু’টো হাত জোর করে নিজের মুখে সামনে ধরে।
-“থাক না! থাক! আর কেন? কেন শুধু শুধু নাটক করছ যে তোমার কিছু যায়-আসে? অফিস-বাড়ি, বাড়ি-অফিস, এটার বাইরে কিছু জান, তুমি?”
-“না, হিনি, আমি সত্যি বল…”
তাকে থামিয়ে দিয়ে সোহিনী বলে ওঠে,
-“সত্যি? গত সপ্তাহ ধরে আলোচনা চলেছে, পরশু তুমি নিজে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করেছ, আজ সকাল পর্য্যন্ত এটা নিয়ে কথা হয়েছে, আর বিকেলবেলা তুমি ভুলে গেছ? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?”
-“তুমি জান তো আমি ভুলে যাই, আমার এডি…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই, আবার সোহিনী চেঁচিয়ে ওঠে;
-“সেই এক কথা! এক যুক্তি! ওই এক কথা বললেই সাত খুন মাফ, তাইতো? তোমার থেরাপিস্ট কি বলেছে তোমায় তুমি নিজে বলেছ আমায়, মনে আছে, নাকি সেটাও ভুলে গেছ? তোমার নিজের এফর্ট ছাড়া, আর লাইফস্টাইল চেঞ্জ ছাড়া, কোনও কিছু পালটাবে না? আর সবচেয়ে বেশি জরুরী, সবকিছুতে নিজের রোগের দোহাই দেওয়া বন্ধ করতে হবে?”
-“আমার মনে আছে, কিন্তু… অফিসের স্কেডিউলের জন্য, কিছুই পারছি না… তুমি তো সবই জান…”
-“ওই অজুহাত না, তোমার আমি বিয়ের আগে থেকেই শুনে আসছি। বিয়ের পর, লকডাউনে বাড়িতে বসে রইলে, না এক্সারসাইজ করলে, না মেডিটেট করলে, শুধু ‘ভুলে গেছি’, ‘ভুলে গেছি’ বলে কাটিয়ে দিলে! ডিসগাস্টিং! তোমার নিজের কোনও ইচ্ছা নেই বদলাবার। তুমি জান, বদলে গেলে তখন তো আর এডিএইচডি-এর দোহাই দেওয়া যাবে না! তাই এভাবে পুষে রাখছ, রোগটাকে!”
সুকোমল সোহিনীর পাশে সোফায় বসতে যায়;
-“হিনি, আমার ভুল হয়েছে, আমি…”
সোহিনী আবার ঝাঁঝিয়ে ওঠে;
-“সোফায় বসবে না! কতবার তোমাকে বলেছি রাস্তার জামাকাপড় পড়ে সোফায়, বিছানায় বসবে না; কোনও কথা কানে তুলবে না! যত্তসব নোংরা স্বভাব।”
-“আচ্ছা! বসছি না, সরি! সরি!”
সোহিনী এত সহজে ঠান্ডা হবে না, সেটা ভালোই জানে সুকোমল। তবু, সে আমতা আমতা করে বলে,
-“ডাক্তার সাড়ে ন’টা অবধি বসে বাড়ির চেম্বারে। এখন বেরোলে…”
-“আমি কোত্থাও যাবো না। আমার কিছু ভালো লাগছে না, ক্ষিদে পেয়েছে, রান্নাবান্না কিচ্ছু নেই, নিজে তো গান্ডেপিন্ডে গিলে এসেছ! এখন আমি যাব না চোখ দেখাতে।”
সুকোমল চুপ করে থাকে কয়েক মুহুর্ত। তারপর বলে ওঠে।
-“আমি খাবার অর্ডার করে দিচ্ছি! চাওম্যান থেকে চাইনিজ প্ল্যাটার করে দিচ্ছি।”
এই বলে সে সোহিনীর উত্তরের তোয়াক্কা না করে, পকেট থেকে ফোন বার করে ফুড ডেলিভারি অ্যাপ-এ অর্ডার করতে থাকে। সোহিনী কোনও উত্তর করে না; সারাদিনের পরে ক্লান্তি, অবসাদ, ক্ষুধা, এবং এতক্ষণ চেঁচানোর পর, সে প্রকৃতপক্ষেই ক্লান্ত। খাবার আসতে সময় লাগবে ২৫ মিনিট, দেখাল অ্যাপ-এ। সেই ফাঁকে চুপ করে বাথরুমে গিয়ে স্নান সেরে, কাচা জামাকাপড় পড়ে এল সুকোমল।

প্রায় আধঘন্টা হয়ে গেছে তাও খাবার আসছে না দেখে সোহিনী জিজ্ঞেস করল,
-“কোথায়, খাবার? আধঘন্টা তো হয়েই গেল।”
সোহিনীর কথায় ফোনে অ্যাপটা খুলে, সুকোমল বুঝতে পারল, খাবার অর্ডার হয়নি। ক্রেডিট কার্ডের ওটিপিটা চেকআউট পেজে টাইপ করে, ‘সাবমিট’ বাটনটা টিপতে ভুলে গেছে সে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে, সোহিনীর মুখের দিকে তাকাল সে। আর তার মুখের দিকে তাকিয়েই, সোহিনী বুঝে গেল, কিছু একটা হয়েছে।
-“কি হল? কি দেখলে? কতদূর?”
সুকোমল কি বলবে ভেবে পায় না; সে কোনরকমে বলে,
-“আসলে ট্রান্সাক্সান-টা ফেইল করেছিল, আমি করে দিয়েছি, আবার!”
-“ফেইল করেছিল মানে? তুমি তো বললে অর্ডার হয়ে গেছে, ২৫ মিনিট লাগবে আসতে?”
-“হ্যাঁ… না… মানে, আমি… ওটিপিটা সাবমিট করতে ভুলে গেছিলাম…”
দু’সেকেন্ডের নীরবতা, আর তারপর ঘরে যেন বাজ পড়ল!
-“এটাও ভুলে গেলে? একটা স্বার্থপর নোংরা লোক তুমি! নিজের খাওয়া হয়ে গেছে বলে আর একটা অর্ডার ঠিক করে হল, না হল না, সেদিকে কোনও খেয়ালই নেই তোমার! পুরো তোমার মায়ের মত! হবে না! জেনেটিক্স যাবে কোথায়?”
এই প্রথম, সুকোমলের গলার আওয়াজ চড়ল-
-“কথায় কথায় মায়ের সঙ্গে তুলনা কর কেন? মায়ের মত কি করেছি আমি?”
-“কি করেছ? বাড়ি আসতে মনে থাকে না, হাতে ফোনটা আছে, ওটিপিটা সাবমিট হচ্ছে কিনা দেখছ না! তুমি কোনও মানুষের পর্যায়েই পড় না!”
-“ঠিক আছে, আমি পড়ি না, তুমি পড় তো? সেটা নিয়েই খুশি থাক! কথায় কথায় এমন ভাবে বিহেব করবে যে আমার চেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ, আমার চেয়ে খারাপ স্বামী কারও হতে পারে না! কোনোদিনও না!”
-“নিজের খালি ‘আমি সব চেঞ্জ করব’ ‘আমি সব চেঞ্জ করব’ বলা, আর আসলে চেঞ্জ করার মধ্যে একটা তফাত আছে; সেটা বোঝার তোমার ক্ষমতা নেই, আর চেঞ্জ হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা, বা সাহসও নেই তোমার!”
-“চেঞ্জ করার ইচ্ছা? তুমি কতটা হেল্প করেছ আমাকে? কতটা সাপোর্ট করেছ? একটা দিনে ১০টা কাজ ঠিক করে, একটা কাজ ভুল করলে বা ভুলে গেলে, তুমি সেটাতেই ফোকাস করে থাক! কথায় কথায় খোঁচা মেরে, বিদ্রুপ করে থাক! আমি তিন মাস আগে ডিনারের পরে হাঁটতে বেরোচ্ছিলাম, ৪ দিনের পর, একদিন ক্লান্ত লাগছিল বলে গেলাম না, মনে আছে, তুমি কি বলেছিলে? তুমি বলেছিলে, ‘হয়ে গেল! এবার এক সপ্তাহ পেরোল না! নতুন রেকর্ড!’ বলেছিলে?”
-“আর তুমি তার বদলে কি করলে? হাঁটতে যাওয়া বন্ধই করে দিলে! ব্রাভো! একবার ভেবে দেখ আমি কি বলি, কেন বলি।“
-“হ্যাঁ বন্ধ করেছিলাম! কারণ আমার খারাপ লেগেছিল তোমার ওইভাবে বলাটা। আমার ঘেন্না করেছিল নিজেকে, মনে হয়েছিল আমি সব ব্যাপারেই ব্যার্থ! ইউজলেস, ওয়ার্থলেস একটা মানুষ। যখন চারদিনের এফর্ট-এ একটা ভালো শব্দও তুমি আমাকে শোনাওনি, তার বদলে, একদিন হাঁটতে যাইনি বলে, যা শোনালে, তারপর কারোর ইচ্ছে করে? মনে হয় সবই যখন ভুল হচ্ছে, তাহলে আর সংশোধন করে লাভটা কি? যাক না, সব শেষ হয়ে যাক।”
-“সেই! তোমার সব কাজের পেছনেই যুক্তি ঠিক আছে! তবু স্বীকার করবে না, যে ভুল করেছ!”
-“আমি তো বলেছি ভুল করেছি!, ভুল করেছি আমি! আমার জন্মানোই পাপ! আমার সব ভুল হয়ে গেছে, আমি কারোর স্বামী হওয়ারই যোগ্য নই; আমি কারো… ভদ্রসমাজে থাকারই যোগ্য নই! আমার তোমাকে কেন, কাউকেই বিয়ে করা উচিত হয়নি!”
-“তাহলে করলে কেন? এভাবে তিলে তিলে আমার জীবনটা নষ্ট করে দিচ্ছ কেন?”
-“তুমি করছ না? তোমার ক্রিটিসিজম এর চশমা, আর তোমার মেজাজ দিয়ে, দিচ্ছ না আমাকে শেষ করে? প্রতিদিন! প্রতিদিন বাড়ি ফিরি ভাবতে ভাবতে, জানি না আজ আবার কোন ভুলের প্রায়শ্চিত্ত আমাকে করতে হবে তোমার সামনে! আমি আর পারছি না!”
ড্রয়িং-ডাইনিং থেকে বেডরুম হয়ে ব্যালকনিতে চলে যায় সুকোমল, তার চোখের কোলে এক-দু ফোঁটা জল।
প্রথমে প্রেম, তারপরে অগ্নিসাক্ষী করে একসাথে চলার শপথ, তারপর কেন যে একসাথে চলার এই রাস্তাটা এরকম এবড়ো খেবড়ো হয়ে গেল, কিছুতেই বোঝা গেল না। যে মানুষটাকে একসময় এক মুহুর্ত না দেখে থাকতে ইচ্ছে হত না, এখন মনে হয়, থাক না, নিজের জন্যেও তো কিছু সময় দরকার? চেনা মুখটা আজ কেমন অচেনা হয়ে গেছে। দু’টো মানুষ, একসাথে আছে, তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হবে না, এটা অসম্ভব! কিন্তু এরকম দিনগুলোর পুনরাবৃত্তি যেন বড্ড বেশিই হচ্ছে আজকাল। আর এরকম ঘটনাগুলো ঘটলেই, সুকোমলের মনে হয়; ‘তারা কি ভুল করে ফেলল?’ তাদের কি একসাথে থাকার সিদ্ধান্ত ভুল? মনে হচ্ছে এই সম্পর্কে সোহিনী বা সে, কেউই খুশি থাকতে পারছে না।
সব কি আবার নতুন করে শুরু করা যায়না? এই ভুল শোধরানোর কি কোনও উপায় নেই?
