অন্য তরঙ্গ – তৃতীয় পর্ব

একটা সপ্তাহ কেটে যায় কোনরকমে। মা আর খুব একটা কিছু সামনাসামনি বলার চেষ্টা করেননি, তবে বহু আত্মীয়ের আচমকা ফোন আসাতে, সুকোমল বুঝতে পারছিল, যে তার মা নানা লোককে ফোন করে নানা কথা বলছেন, এবং বেশিরভাগই অতিরঞ্জিত। বাবা আর মা কে যখন স্টেশনে ছেড়ে আসল সে, তখনও মা ঠিক করে কথা বলেননি তার সাথে।

অনেকেই মনে করতে পারেন যে এটাতো প্রতিটা বাঙালি বা ভারতীয় বাড়িতেই হয়ে থাকে, কিন্তু ব্যাপারটা সেরকম নয়। সত্যি কথা বলতে, সুকোমলের একসময় বাবার থেকেও মা-এর সাথে হৃদ্যতাটা বেশী ছিল; বাবা তার কাছে সবসময় একটা অনুপ্রেরণার কাজ করেছে, কিন্তু মা তার কাছে আপনার লোক ছিল, মায়ের কাছে সে কোনও কথা লুকোত না, এবং অনেকক্ষেত্রেই, তার মায়ের চোখ দিয়েই দেখত দুনিয়াটাকে।

কিন্তু তার এই মাতৃভক্তিতে ভাঁটা পড়ে, বিয়ের পর থেকে। না না, ব্যাপারটাকে ‘সহজাত’ বলে এড়িয়ে যাবেন না! সুকোমল কখনো চায়নি যে তার মা এবং সোহিনীর মধ্যে কিছু একটা সমস্যা তৈরী হোক; সেটা সোহিনীও চায়নি। কিন্তু ব্যাপার হল, বিয়ের ক’দিন পর থেকেই, সুকোমলের মায়ের ব্যবহার বদলে যায়; ঠিক তার ঠাকুমা কে যেমন কট্টরভাবে তার মায়ের সাথে ব্যবহার করতে দেখেছিল সে, ঠিক সেরকমই ব্যবহার শুরু করেন তিনি।

সোহিনীর সাথে বিয়ের আগে, সুকোমলের সম্পর্ক ছিল প্রায় ১০ বছরের; কলেজ জীবন থেকেই তারা সবার আগে ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ তারপর প্রেমিক-প্রেমিকা, আর সবশেষে স্বামী-স্ত্রী; তাদের মধ্যে ঝগড়া যে হয়নি সেটা একেবারেই না, কিন্তু তিক্ততা ছিল না, কোন লুকোছাপা ছিল না; কিন্তু বিয়ের পর, সমীকরণটা পালটাতে শুরু করল; মা সোহিনীর আড়ালে এমন কিছু মন্তব্য করতেন সোহিনী বা তার পরিবারের সম্পর্কে, সেগুলো সোহিনীকে বলার মত নয়। এবং সুকোমলের কিছু বন্ধু, যারা অনেক আগেই ছাদনাতলা ফেরত, তারাও তাকে এই পরামর্শ দেয় তাকে,

-“মা আর বউয়ের মধ্যে, একটা ব্যালেন্স করে চলতে হয়!”

 তবে আর বেশিদিন সুকোমলকে আর কিছু বলতে, বা লুকোতে হল না। যা এতদিন মা আড়ালে বলছিলেন, এবার তিনি শুরু করলেন সামনাসামনি সোহিনীকে বলতে। কেন সোহিনী বিয়ে পর তার পদবী বদলাল না, কেন ডকুমেন্ট-এ স্বামীর নাম যোগ করল না, সে কোন পোশাক পড়ল, বা অফিসের কাজে লেট হওয়াটা যে ঠিক ‘বউমাচিত’ নয়, সেই নিয়ে প্রতি মুহুর্তে তিনি কিছু না কিছু বলতেন। সোহিনী উত্তর করত না, আর করলেও সেটা কখনোই ঝগড়ার পর্য্যায়ে যেত না। বরং সুকোমলই সোহিনীর হয়ে বহুবার গিয়ে মায়ের সাথে ঝগড়া করে এসেছে; সেটা নিয়ে আবার মামা/মাসি/পিসি কে ফোন করে মা বলা শুরু করলেন, “ছেলেটা বউমার কথায় নাচে, আর বউমার কথায়, তার হয়ে আমার সাথে এসে ঝগড়া করে যায়।” এখন, এ ব্যাপারটা সহজাত, যেটা শতকরা ৭০-৮০ শতাংশ মায়েদেরই হয়ে থাকে ছেলের বিয়ের পর; একটা বড় পরিবর্তন ঘটেছে সংসারে, নিউটইনের তৃতীয় সূত্র মেনে এটা তারই সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া। সেখানে দরকার থেরাপি, ওষুধপত্র। সুকোমল বলেওছিল, সে যে সাইকায়াট্রিস্টকে দেখায়, তাকে দেখানোর কথা; কিন্তু সেটা শুনেই মা তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন,

-“তার মানেটা কি? আমি পাগল? তোরা আমাকে পাগল প্রমাণ করতে চাইছিস?”   

সুতরাং, মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের এই হাঁড়ির হাল নিয়ে, নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের বারোটা বাজাতে থাকে সুকোমল এবং সোহিনী। এবার তাদের সমীকরণটাও পাল্টাতে শুরু করে; সুকোমলের বাড়ি ফিরতে ভাল লাগত না, মনে হত একটা বিচ্ছিরি টানাপোড়েনের মধ্যে ফিরতে হচ্ছে; তার শান্তির জায়গা ছিল শুধু সোহিনী, এখন সোহিনীরও মন মেজাজ বিগড়ে থাকত। সবকিছুর পর, গোটা বাড়িতে তাদের প্রাপ্য একটামাত্র বেডরুমের নিরাপদ আশ্রয়ে, বিছানায় গা এলিয়েই সুকোমল ঘুমের দেশে তলিয়ে যেত।

আশেপাশে অবশ্য প্রবচন দেওয়ার লোকের কোনও অভাব ছিল না; সুকোমলের মায়ের, তাদের পরিবারে এবং আত্মীয়মহলে বাচাল, এবং অসংবেদনশীল বলে দূর্নাম ছিল। আড়ালে, লোকজন এই নিয়ে কানাকানি করলেও, তার মায়ের সামনে এমন হাবভাব দেখাত, এবং এমন মন দিয়ে তাঁর সমস্ত কথা শুনত বা, বলা ভাল ‘গিলত’; যে কেউ বলবে না এরাই আড়ালে অন্য কথা বলে। ফলে মায়ের মনে হতে থাকে, সুকোমল তার বউয়ের চক্করে পড়ে, বা বউয়ের কথা শুনেই তার সমস্ত দোষ দেখতে পাচ্ছে; আদতে তিনি পারফেক্ট! ইহজগতের এ হেন বিষয় নেই যা সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল নন, বা তিনি কখনো কোনোকারণে ভুল করতে পারেন।

মায়ের এই আত্মপ্রত্যয়ের দম্ভ, বাড়ির সমস্যা কে আরও গুরুতর করে চলেছিল দিন দিন।

সারদিন অফিস করে ফিরে, সোহিনীকে রান্না করতে হবে, বা সকালে উঠে অফিস যাওয়ার আগে মা কে রান্নায় সাহায্য করতে হবে। রান্নার লোক রাখা যাবে না, দুনিয়ার সবই রান্নার লোক নাকি ‘আনহাইজিনিক’, তাদের রান্না খেলেই অবধারিত মৃত্যু। একদিন মা বলে দিলেন,

-“তোমরা বাবা অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা কর, রান্না বান্না সব নিয়ে মহা সমস্যায় পড়া গেছে!”

এখানে মায়ের প্রচেষ্টা ছিল, যে তার ‘খোকা’ কখনই এ বাড়ি ছেড়ে বেরোতে পারবে না, আর স্বামীর জন্য সোহিনী বাধ্য হবে আপোস করতে, মাথা নোয়াতে। কিন্তু তার হিসাবে যে এমন গন্ডগোল হয়ে যাবে, এটা তিনি একেবারেই বুঝতে পারেননি।

সোহিনী এবং সুকোমল, দু’জনেরই চলছিল ‘ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম’; মায়ের এই ঘোষণার মাসখানেকের মধ্যেই, সুকোমলের ডাক পড়ল সেক্টর ফাইভে অফিস জয়েন করার, সোহিনীর অফিস কসবায়, আর অফিস থেকে বার বার তার কাছে আর্জি আসছিল অন্তত সপ্তাহে তিনদিন অফিস আসার। এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে, তাদের দু’জনের সেভিংস দিয়ে, একটা ছিমছাম গোছের ফ্ল্যাট একেবারে কিনে ফেলেই জামশেদপুরের পাট চোকায় দু’জনে।

জামশেদপুরের বাড়িটা সুকোমলের ঠাকুর্দার তৈরী করা, সে জানত, বাবা প্রাণ থাকতে ওই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবেন না, আর তাই মা-ও আটকা পড়ে রইলেন সেখানে। ছেলে-বউমার কলকাতার বাড়িতে পাকাপাকি ভাবে চলে আসার তাঁর ইচ্ছেটার অঙ্কুরে বিনাশ হল। তাই সুকোমল-সোহিনী কলকাতা চলে যাওয়ার পর, তিনি মনের ঝাল মেটাতে, ছেলে-বউমার সাথে কথাবার্তা বন্ধ করলেন,  আত্মীয় পরিজনদের জনে জনে ফোন করে বলতে থাকলেন,

-“অফিস মোটেই ডাকে নি! আমার ছেলে ওই মেয়ের কথায় পৈতৃক ভিটে ছেড়েছে।”

সেটা সুকোমল বা সোহিনী, কারোরই নিয়ন্ত্রণে ছিল না। বাড়ির পরিবেশ, ক্রমাগত মায়ের সঙ্গে একটা ঠান্ডা লড়াই, বা কখনো সন্মুখ সমরও চলে থাকার বিয়ের প্রথম ক’টা বছর, তাদের সম্পর্কের গণিতকে একেবারেই পাল্টে দিয়েছে; বন্ধু > প্রেমিক-প্রেমিকা > স্বামী-স্ত্রী, কথাটাতে তারা এখনো বিশ্বাস করলেও, স্বামী-স্ত্রী ব্যাপারটা ঠিক যেভাবে শুরু হয়েছে, সেটা কোনও সদ্য বিবাহিত দম্পতির কাছেই অভিপ্রেত নয়।

তাই কখনো ক্যান্ডেললিট ডিনার, সিনেমা হলের কর্ণার সীট, আর উদ্দেশ্যহীন লং-ড্রাইভের মধ্যে, দু’জনের দু’জনকে পাশে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মোটেই কমেনি, কিন্তু একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরী হয়ে গেছে মাঝখানে, যেটার জন্য মা দায়ী ঠিকই, কিন্তু এখন সেটার প্রহরী সুকোমলের এডিএইচডি আর সেই সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা সোহিনীর ক্লান্তি।

ফ্ল্যাটের সব আলো নিভে এসেছে, শুধু বেডরুমের জানলার ফাঁক দিয়ে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোটা এসে মেঝেতে পড়েছে। সোহিনী অনেকক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে।

কিন্তু সুকোমলের ঘুম আসছিল না।

সে চুপচাপ শুয়ে সোহিনীর হৃৎস্পন্দনের শব্দ শুনছিল। এত বছর একসাথে থেকেও, এই শব্দটা তার এখনো নতুন লাগে। হঠাৎ মনে হল, কতদিন সে ঠিক করে এভাবে শুধু সোহিনীর পাশে থাকা অনুভব করেনি। কখনো ফোন, কখনো ল্যাপটপ, কখনো মাথার ভেতরের হাজারটা অসমাপ্ত ভাবনা- সবকিছু মিলিয়ে সে যেন কোথাও পুরোপুরি থেকেও নেই।

পাশ ফিরে তাকায় সুকোমল। আধো আলোয় সোহিনীর মুখটা দেখাচ্ছে ক্লান্ত, কিন্তু নিশ্চিন্ত। দিনের শেষে, সমস্ত ক্লান্তি আর অভিমান পেরিয়ে, এই মুখটাই তার কাছে ঘর ফেরার সম্বল ছিল।

তবু, কোথাও যেন একটা ফাঁক রয়ে গেছে।

ভালোবাসার অভাব নেই, চেষ্টারও হয়তো ঘাটতি নেই, অথচ দু’জনের মাঝখানে এমন একটা দূরত্ব জমে উঠেছে, যেটা ধরা যায় না, মাপা যায় না, শুধু টের পাওয়া যায়। সুকোমলের মনে হল, কি একটা প্রশ্নের উত্তর সে যেন অনেকদিন ধরে খুঁজে চলেছে; প্রথমে বিয়ের পর থেকে, তারপর জামশেদপুর ছাড়ার পর থেকে। কিন্তু প্রশ্নটাই ঠিক কী, সেটা সে জানে না।

কাল আবার অফিস। আবার রোজকার জীবন।

আবছায়ার মত এই চিন্তাটা মাথায় আসতেই, আর কোনও কিছু না ভেবে, সুকোমল ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল – অনেক না বলা কথা আর অনেক না বোঝা ভাবনা বুকে নিয়েই।

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.