অন্য তরঙ্গ – প্রথম পর্ব

ভূমিকা

আমার গল্পগুলো সাধারণত শুরু হয় কারোর সাথে কোনও কিছু আলোচনা করার পর, না হলে কোনও একটা স্বপ্ন দেখার পর।

এই গল্পটা শুরু হয়েছিল একটা দুঃস্বপ্ন থেকে। মিথ্যে বলে লাভ নেই,, এই গল্পের প্রথম বীজ আমার মাথায় অঙ্কুরিত যেদিন হয়েছিল, তারপর নানান কারণে, আমার জীবনের আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। এবং তখন যে ভাবনাটা ছিল, সেটা কখনোই ‘তরঙ্গের সিকোয়েল লিখব’ এরকম ধারণা করে শুরু করিনি। গল্পটা যত আকারে বড় হয়েছে, ততই একের পর এক স্তর যোগ হয়েছে, এবং তারপর মনে হয়েছে এটাকে তরঙ্গের সিকোয়েল হিসাবে লেখাই যায়, তাতে মূল ভাবের কোনোই পরিবর্তন হবে না, বদলে, যারা তরঙ্গ পড়েছে, এবং মনে রেখেছে, তারা একটা সুন্দর যোগাযোগ বুঝতে পারবে।

আর, একগাদা চরিত্র সংজ্ঞায়িত করার আর ব্যাখ্যা করার সময় বাঁচল। তবে, কেউ তরঙ্গ না পড়লে, কোনও মারাত্মক জিনিস বুঝবেন না, বা হারাবেন না, এরকম নয়।

সময়, প্রেম, আর আদর্শ জীবন- এই নিয়ে আমাদের অনেক সময়ই ভাবতে বা ভুগতে হয়। আমি মনে করি, এই তিনটে জিনিস একসাথে সহাবস্থান করতে পারে না কখনোই। আর এটা আমার উপলব্ধি, কথার কথা নয়।

আমি মনে করি, প্রেম আর সময়, এই দু’টো জিনিসকে পাথেয় ধরলে, তৃতীয়টা অপ্রাসঙ্গিক, বা বাহুল্য হয়ে যায়।

তাই, এই গল্পের নায়ক-নায়িকা, তাই আপনি, আমি… যে কেউ হয়ে উঠতে পারে।

আর যারা আমার মতো ৯০ দশকের সন্তান, তারা এই বইয়ে ব্যবহার করা সমস্ত তথ্যসূত্র এবং উক্তির কারণ এবং প্রাসঙ্গিকতা খুব সহজেই বুঝতে পারবেন।

-“আরও-র সার্ভিসের জন্য ফোন করতে বলেছিলাম, করেছিলে?” – প্রশ্ন করে সোহিনী।

কথাটা শুনেই সুকোমলের মনে পড়ে সকালে অফিস বেরোনোর সময়ও মাথায় ছিল কথাটা, কিন্তু স্টেয়ারিং এ বসে ই এম বাইপাসে গাড়ি উঠতেই, সেটা বেমালুম মাথা থেকে উধাও হয়ে গেছে; হয়তো সোহিনী না বললে আর মনেই পড়ত না। সে দাঁত দিয়ে জিভ কেটে চুক চুক শব্দ করে উত্তর দেয়,

-“এই রে! একদম ভুলে গেছি! আরে তুমি আমাকে দুপুরবেলা মনে করাবে তো?

সোহিনী বেশ বিরক্ত হয়ে বলে,

-“তোমাকে রোজ সকালে মনে করাচ্ছি, তাতে হচ্ছে না? এই নিয়ে চার দিন হয়ে গেল! রোজ রোজ মিনারেল ওয়াটারের ব্যারেল কিনতে হচ্ছে, তোমার কোনও হুঁশ আছে? সকাল হলে অফিস বেরিয়ে যাচ্ছ, সন্ধ্যে বেলা ফেরত আসছ, কোনো কিছুর দায়িত্ব নেওয়া নেই! ব্লিচিং পাউডার এনেছ?”

সুকোমলের কিছুতেই মনে পড়ে না কখন সোহিনী বলেছিল তাকে ব্লিচিং পাউডারের কথা! কিন্তু কথাটা ঘোরানোর জন্য সে বলে ওঠে,

-“ব্লিচিং পাউডার? কি হবে?”

-“আমার শ্রাদ্ধে লাগবে! কাল তোমার বাবা-মা আসছেন না? ওনাদের ভাতের সাথে মেখে খাওয়াবো!”

-“তাতেও মায়ের টিটকিরি মারা কমবে বলে মনে হয় না! ওনাকে ‘শোধন’ করতে হলে ব্লিচিং পাউডার নয়, মিউরিয়েটিক অ্যাসিড লাগবে! তাও আমার মায়ের যা মুখের যা পিএইচ লেভেল, উনি অ্যাসিডও পেগদুয়েক নীট মেরে দিয়ে ঢেঁকুর তুলে বলবেন ‘পড়েরটা অন-দ্যা-রক্স দিও, বউমা’!”

কোনওরকমে হাসি চাপার চেষ্টা করে, গম্ভীর হয়ে সোহিনী বলে;

-“বাজে বোকো না তো! বাথরুমে শ্যাওলা ভরে আছে, রোজ রোজ জমাদার এসে ফিরে যাচ্ছে, একে এই তল্লাটে জমাদার পাওয়াই দুষ্কর, তার ওপর তোমার রোজ রোজ একই ভুল! সংসারটা কি আমার একার? নাকি আমি চাকরি করি না?”

-“আহা! ভুলেই তো গেছি, কালই এনে দেব! আর একদিন নাহয় শ্যাওলাভরা বাথরুমেই স্নানটা করে নিলে! পা পিছলে গেলে আমি না হয় মল

কথাটা শেষ করার আগেই ঝাঁঝিয়ে ওঠে সোহিনী;

-“সরি! আই অ্যাম রিয়েলি সরি যে তোমাকে একটা সামান্য কাজ বলেছি! ভুল হয়ে গেছে আমার, ক্ষমা করে দাও!”

সোহিনী তার ল্যাপটপের সামনে থেকে উঠে চলে যায় কিচেনের দিকে।

একটু খারাপই লাগে সুকোমলের। মানছে তার ভুলে যাওয়ার রোগটা একটু বেশিই, কিন্তু ব্লিচিং এর ব্যাপারটা নিয়ে এরকম ভাবে না বললেও হয়ত পারত সোহিনী।

কোনও কথা না বলে সুকোমল নিজের ল্যাপটপটা খোলে, তার কপাল ভালো আরও-র ওয়েবসাইট থেকে সার্ভিস কল বুক করা যায়, তাড়াতাড়ি সেটা করে, ফোনে ব্লিঙ্কিট থেকে ব্লিচিং পাউডার অর্ডার দিয়ে সে সোজা চলে যায় রান্নাঘরে। সোহিনী গ্যাস ওভেনের সামনে দাঁড়িয়ে কি একটা যেন ভাজছে।

-“কল বুক করে দিয়েছি, আর ব্লিচিং পাউডার ১৫ মিনিটে চলে আসছে।” নির্বীকার ভাবে বলে সুকোমল।

সোহিনী তার দিকে তাকায়, তার মুখ গম্ভীর।

-“ব্লিঙ্কিট থেকে আনালে?”

-“হ্যাঁ।“

-“কত পড়ল?”

-“ওই যে, ৫০০ গ্রামের কৌটো, ১৪৭ টাকা।”

-“মানে নাইট সার্জ, স্মল কার্ট ফি, ডেলিভারি সব দিয়ে, ৮০ টাকার কৌটোটা ১৪৭ টাকায় কিনলে?”

-“হ হ্যাঁ মানে ভুলে গেছ

সোহিনী আবার বিরক্ত স্বরে বলে ওঠে,

-“কর টাকা নষ্ট! তোমার টাকা, তুমিই তো ওড়াবে!? যে জিনিসটা বাড়ি ফেরার পথে মনে করে আনলে ৮০ টাকায় হয়ে যায়, সেটা ১৪৭ টাকা দিয়ে কেনাটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ! আমিই বোকা আসলে।” 

এবার একটু চড়া গলায় কথা বলে সুকোমল;

-“হ্যাঁ! ভালো, যাও। কাজ না করলেও বিপদ, করলেও মুখঝামটা; আমার আর সহ্য হয় না! ভুলে গেছি, স্বীকার করে নিলাম, এখন এনে দিচ্ছি, না! উনি ক’টা টাকা বেশি দেওয়া নিয়ে আবার কথা শোনাচ্ছেন! ভালো লাগে না, ধুর!”

সোহিনীর উত্তরের তোয়াক্কা না করেই, নিজের স্টাডিতে গিয়ে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয় সুকোমল। বাইরে থেকে গজগজানি শোনা যায় কিছুক্ষণ। সে চুপ করে তার কম্পিউটারে সামনের চেয়ারে বসে পড়ে। রোজ রোজ সামান্য কারণে ঝগড়া! আর সোহিনীর সমস্যা হল একবার কোন কিছু  নিয়ে শুরু করলে থামতেই চায়না! বাইরে সে শুনতে পারছে এক এক করে, প্রথমে তাকে তার ‘বাবা মা-এর শিক্ষার অভাব’ জাতীয় উপাধিতে ভূষিত করার পর, সোহিনী এক এক করে বলে চলেছে, আজ অবধি সে যত নাকি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই ইতিহাসের সবচেয়ে ঐতিহাসিক ভুল হল, সুকোমলকে বিয়ে করা। সুকোমল আর না শুনে, কানে হেডফোন লাগিয়ে কম্পিউটারে কিছু হাবিজাবি জিনিসপত্র দেখতে থাকে।

প্রায় আধঘন্টা পর, সুকোমল হেডফোনটা খুলে, ঘর থেকে বেরোয়। টেবলে থালায় খাবার বেড়ে রাখা আছে, আর উঁকি মেরে দেখল, সোহিনী তাদের বেডরুমে, খাটে বসে মন দিয়ে ল্যাপটপে কাজ করছে, চোখে উঠেছে চশমা; অর্থাৎ মামুলি ইমেইলের রিপ্লাই নয়, কিছু জরুরী কাজের ডেডলাইন আছে, যেটা নিয়ে বসেছে।

হয়ত তাই অত রেগে গেছিল আজ! ডেডলাইনের প্রেশারটা সুকোমলের ওপর দিয়ে গেল কিছুটা।

সুকোমল চুপচাপ খেয়ে দেয়ে থালাটা নামিয়ে আস্তে করে গিয়ে বিছানায় গিয়ে বসে। আর একদম সঙ্গে সঙ্গেই, ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলে, একটুও না নড়ে সোহিনী বলে ওঠে,

-“কাল ভজার মা আসবে না, জানি তুমি রোজই ভুলে যাও, কিন্তু এঁটো থালাটা মেজে দিয়ে এলে ভালো হয়!”

কথা না বাড়িয়ে সুকোমল আবার রান্নাঘরে ফেরত যায়; থালাটা মেজে ধুয়ে তুলে দিয়ে আসে; কিন্তু এবার খাটে বসার আগেই শুনতে পায়;

-“সিঙ্ক-এর আশেপাশে যে জলটা বাসন ধোবার সময় ছিটিয়েছ, সেটা মুছে এসেছ তো?”

স্বভাবতই, এই খেয়ালটা সুকোমলের ছিল না, সে আবার রান্নাঘরে গিয়ে জলটা মোছে, আর তারপর এসে সটান বিছানায় শুয়ে পড়ে।

-“আমার রাত হবে, তুমি শুয়ে পড়!”  -সোহিনী নিচুস্বরে বলে ওঠে।

মনে মনে ভাবে সুকোমল, তা আর বলতে! এখন তোমার কাজ আছে; আর কোনোদিন আমার একটা কল, বা মিটিং বাড়িতে এসে হলে, বাড়ি মাথায় তোলা হয়ে যেত! আর তার ডেডলাইন বলে সাত খুন মাপ।

সোহিনীর দিকে পিঠ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে সে। মনে চলতে থাকে হাজার চিন্তা; মনে হয় এভাবে একসাথে থাকার কি মানে আছে? শুধু দু’জনের একসাথে থাকা, ওই রুমমেট-এর মত, শুধু বিয়ে করেছে, লোকে স্বামী-স্ত্রী বলে জানে বলেই কি একসাথে থাকা? নিজেদের কোনো আত্মিক টান আছে কি? না থাকলে কোথায় গেল? এককালে কলেজে লোকের তাদের প্রেমের উদাহরণ টেনে কথা বলত!  

এসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ে সুকোমল, আর তার প্রায় ঘন্টাখানেক পড়, ল্যাপটপ বন্ধ করে সোহিনী শুয়ে পড়ে তারই পাশে।

সকালে সুকোমলের ঘুম ভাঙে ঠিক ৭টায়, এবং রোজের মতই বিছানা ছাড়তে আরও আধঘন্টা লাগিয়ে দেয় সে। মোবাইলটা নিয়ে বাথরুমে ঢুকে কমোডে, মানে যেটাকে সোহিনী তার ‘সাধনবেদী’ বলে থাকে, তাতে বসে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করতে করতেই অনেকক্ষণ চলে যায়। সোহিনী উঠে, প্রাতঃরাশ এবং চা তৈরী করে, বাথরুমের দরজায় ধাক্কা দিয়ে চিল্লামিল্লি করার পর তার হুঁশ হয়, আর তখন তড়িঘড়ি ২-৩ মগ জল মাথায় ঢেলে বেরিয়ে আসে বাথরুম থেকে।

-“তোমার জন্য বাড়ি থাকলেই লেট-এ লগ-ইন হয় আমার। একটা দিন তো মোবাইল টা ছাড়া যেতে পার?”

কথাটার উত্তর না দিয়ে, বেডরুমের দিকে এগিয়ে যায় সুকোমল। মিনিটা পাঁচেকের মধ্যে জামাকাপড় পড়ে, বেরিয়ে এসে দেখে, স্টাডিতে সোহিনী তার ল্যাপটপ নিয়ে কাজে বসছে, সামনে ধুমায়িত চায়ের কাপ।

-“টেবলে তোমার লাঞ্চ প্যাক করা আছে, নিয়ে যেও।”

-“তোমার ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম আজকে?” প্রশ্ন করে সুকোমল।

মুখটা ব্যাজার করে সোহিনী উত্তর দেয়,

-“নিয়েছি কি আর সাধে? আপনার জন্মদাতা এবং জন্মদাত্রী দুপুরে উদয় হয়ে যদি দেখেন তাঁদের জন্য কেউ বরণডালা সাজিয়ে বসে নেই, তাহলেই আবার ফিরতি ট্রেনে জামশেদপুর চলে যাবেন!”

মোজা পড়তে পড়তে সুকোমল উত্তর দেয়,

-“যাবে তো আপদ যাবে! বাদ দাও তো! আসা মানে তো সেই রোজ টোন-টিটকিরি আর খুঁত ধরা! আর আমার মায়ের জ্ঞানবানী ফল্গুধারার মতো বইতে শুরু করলেই আমার ফল ও ফলা দুই-ই টাকে উঠে যায়!”

-“থাক বাবা! ফেরত যাওয়া মানে প্রথমে তোমাকে ফোন করে বিলাপ, তারপর তোমার পিসি, মাসি, কাকীমা, জ্যেঠিমা করে গুষ্টির সবাইকে ফোন করে আমাকে সাপ-সাপান্ত করবেন

এবার সুকোমলের মায়ের গলা নকল করে সোহিনী বলে,

-“ছেলেটা আমার কেমন একটা হয়ে গেল! কোন এক কায়েতের মেয়েকে বিয়ে করে এনে আমার ছেলেটা, সংসার সব উচ্ছন্নে দিল!”

সুকোমল হেসে ফেলে।

-“বলছি, এই প্রথমবার আমাদের ফ্ল্যাটে মা-বাবা আসছে!”

সোহিনী ঝাঁঝিয়ে ওঠে;

-তো? পা ধোয়া জল খেতে হবে?”

-“আরে ধুর বাবা! চটছ কেন? বলছি, প্রথমবার আসছে, তো বাড়িতে পা ফেলা মাত্র বুঝিয়ে দিও যে সংসারটা তোমার, তাঁর নয়। খালি আমি বাড়ি ফেরা পর্য্যন্ত ব্লিচিং-ফিচিং খাইয়ে দিও না, কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে! জানো তো বাবা-মায়ের মেডিক্লেইম নেই, সেই আমাদেরই ট্যাঁকের কড়ি খসিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে

সোহিনী রেগেমেগে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল, সুকোমলের কথায় বিষম খেয়ে যায় হাসির দমকে। সে একটু সামলে উঠলে, সুকোমল বলে,

-“সরি! রাগ কোরো না, আজ যত তাড়াতাড়ি পারব বেরিয়ে আসব অফিস থেকে। যাতে তোমাকে একা সব ঝেলতে না হয়! টাটা।”

এই বলে সে তড়িঘড়ি দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়, এবং ঠিক ৩০ সেকেন্ড পর আবার হন্তদন্ত হয়ে ঢোকে, সোহিনীর ‘কি হল আবার’-এর তোয়াক্কা না করে, তার কপালে একটা চুমু দিয়ে, আবার একই বেগে বেড়িয়ে যায়।

এই মুহুর্তটার জন্য সোহিনীর মুখে একটা প্রশান্তির হাসি আসছিল, কিন্তু সেটা মাঝখানেই বিরক্তি আর রাগে বদলে যায়, যখন তার চোখে পড়ে, যথারীতি, সোহিনীর সক্কাল সক্কাল উঠে প্যাক করা লাঞ্চবক্স সুকোমল টেবলেই ফেলে অফিস চলে গেছে। 

শুধু এটুকু বলে রাখি, আপনি এখনো আন্দাজও করতে পারছেন না, গল্প কোনদিকে যাচ্ছে! দেখা হবে পরের পর্বে!

নীল

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.