ਵਾਹਿਗੁਰੂ ਜੀ ਕਾ ਖਾਲਸਾ ਵਾਹਿਗੁਰੂ ਜੀ ਦੀ ਫਤਹਿGuru Gobind Singh
যদি খুব একটা ভুল না করি, তাহলে ‘অমৃতসর’ কথাটাকে একটু বাংলা করলে যেটা দাঁড়াবে, সেটা হল ‘অমৃতসায়র’ মানে অমৃতের পুকুর, বা দিঘী। এখন যে শহরের মূল আকর্ষণ হল একটা পবিত্র পুকুর, যার জলকে আপামর শিখ সম্প্রদার ‘অমৃত’ বলে সম্বোধন করে, সে শহরের নাম ‘অমৃতসর’ ছাড়া আর কিছু হতে পারে বলে আমার মনে হয় না।

যাই হোক, তিন মাস হল দিল্লী এসেছি, কাজের জায়গায় শান্তি থাকলেও, ‘কতদিন বেড়াতে যাইনি’ এই চিন্তাটা একবার বেড়িয়ে আসার পরের দিন থেকেই আবার শুরু হয়! আর সেখানে শেষ বেড়াতে গেছি জানুয়ারি মাসে! আর দিল্লী আসার আগে শারীরিক এবং মানসিক ভাবে যে বাঁশ-ডলা খেয়েছিলাম, তারপর একবার ‘ওয়ান্ডালুষ্ট’-এ মন না দিলে মনে ঠিক শান্তি আসবে না!
তবে মিথ্যে বলে লাভ নেই, এই প্ল্যানটা আসে অসীমের মাথায়। এবং প্রথমত প্ল্যানটা ছিল এরকম; নয়া দিল্লী থেকে অমৃতসর হল মোটামুটি ৪৭২ কিলোমিটার মত, তো যে মাসের দ্বিতীয় শনিবার ছুটি থাকবে, সেই শনিবার ভোর ভোর বেড়িয়ে সোজা বাঘা (মানে ওয়াঘা) বর্ডার, সেখান থেকে শহরে ফিরে বিশ্রাম, পরের দিন সকালে বাবা হারমান্দির সাহিব মানে স্বর্ণমন্দির আর জালিয়নওয়ালা বাগ ঘুরে, আবার রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন।
তারপর, অসীমের মাথাতেই বুদ্ধি খেলল;
-“ভাই, শুক্রবার রাতটা নষ্ট করে কি হবে? চল শুক্রবার রাতেই বেড়িয়ে যাই!”
-“রাতে বেড়িয়ে যাবি কোথায়?”
-“কেন, চন্দীগড় অবধি গিয়ে রেস্ট নিয়ে আবার সকালে বেরোবো!”
আমি ভেবে দেখলাম, ব্যাপারটা মন্দ হয়না! যদি রাত ৮টা নাগাদ দিল্লী ছাড়তে পাড়ি, ৪-৫ ঘন্টা ড্রাইভ করে চন্দীগড় পৌঁছে ভালো করে ঘুমিয়ে আবার সক্কালবেলা বেরোলে সময়টাও বেশি পাওয়া যাবে, ধকলটাও কম যাবে।

সেরকম প্ল্যান করেই, সক্কাল সক্কাল ব্যাগ গুছিয়ে চলে এলাম অফিস, সাড়ে ছ’টা-সাতটা নাগাদ বেড়িয়ে ভান্সত কুঞ্জ-এ গিয়ে দিদির গাড়িটা নিয়ে, তারপর একত্রে যাত্রা!
কিন্তু প্রথমেই বাধ সাধল কপাল! ছ’টা নাগাদ জানতে পারলাম, সামনের ‘মাফলার’(না বুঝতে পারলে ‘বাম্পার’ পড়ুন) সমস্যার দরুন, দূরপাল্লার জন্য কিঞ্চিত অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে দিদির গাড়ি! তাহলে উপায়?
একে তাকে ফোন করে গাড়ি যোগাড় করার চেষ্টা করে যখন হল না, তখন দুম করে জুমকার থেকে একটা বাদামী রঙের সুইফট ডিজায়ার বুক করে ফেললাম; কিন্তু সেখানে মুশকিল হল, গাড়িতে পিকআপ-ড্রপ নেই, আমাকে নিজেকেই নিতে যেতে হবে, আর গাড়ি রয়েছে পিতমপুরা-এ, সেটা আমার অফিস, মানে ওখলা থেকে যেভাবেই যাই না কেন, দেড় ঘন্টা লাগবেই লাগবে!
দু’বার মেট্রো বদলি করে গেলাম পিতমপুরা, দু’দাগ তেল সমেত গাড়িটা নিয়ে, পাম্প থেকে তেল ভরাচ্ছি, এমন সময় অসীম ঘোষ-এর আবির্ভাব ঘটল। এবার যাত্রার জন্য এক্কেবারে তৈরী হয়ে গাড়িতে বসে দেখলাম, রাত দশটা বেজে গেছে, তো অসীমকে বললাম,
-“তাহলে, সহযোগী? এবার কি উপায়?”
-“চল, দিল্লী ছেড়ে বেরোই তো আগে! তারপর কুরুক্ষেত্র হলে কুরুক্ষেত্র, নাহলে আম্বালা গিয়ে বিশ্রাম নিয়ে নেব নাহয়!”
-“উত্তম প্রস্তাব!”
এই কথা বলে গাড়ি ছাড়লাম, পিতমপুরা-এর দিকে চলে আসায়, সহজেই কার্নাল বাইপাস হয়ে চন্দীগড়-এর পথে রওনা হয়ে পড়লাম। সোনীপথ-এ একটা ধাবা দেখে, সেখানে নৈশভোজ সেরে নিয়ে, আবার গাড়ি ছাড়লাম। সারাদিন অফিস করার পড়েও, বহুদিন পড়ে স্টেয়ারিং-এ বসে আর লম্বা, সুন্দর রাস্তা পেয়ে ক্লান্তি আসছিল না, চালিয়ে গেলাম কুরুক্ষেত্র অবধি।

রাত তখন প্রায় দু’টো, সমস্যা ছিল একটাই, গাড়ির ফাস্টট্যাগটা চালু না থাকায়, ক্যাশ-ইউপিআই করে করে প্রচুর সময় এবং টাকা নষ্ট হচ্ছিল! নাহলে আরও অনেক রাস্তাই চলে যেতে পারতাম এতক্ষণে। একখানা চায়ের গুমটি খোলা পেয়ে, এক-এক কাপ চা খেলাম দু’জনে, আর ঠিক করলাম, কাল গাড়ির মালিককে লাইন-এর নিয়ে, নতুন ফাস্টট্যাগ চালু করতেই হবে, নাহলে সময় আর পয়সা দু’টোই ধ্বংস হবে!
আবার গাড়ি ছাড়লাম, আমার মনে মনে একটা জেদ ছিলই, আর যখন দেখলাম আম্বালা পেড়োনোর পরও ঘুম আসছে না, তখন অ্যাক্সিলেটরের চাপ বাড়িয়ে ভোর ৪টে নাগাদ চন্দীগড় পৌঁছে, একখানা পদের হোটেলে (মানে যার এসি কাজ করে, আর বাথরুম পরিস্কার) একটা ঘর নিয়ে ঘুমাতে শুলাম।
ঘন্টা ৩-৪ ঘুমের পর, ঘুম ভেঙ্গে গেল, এবং আর এল নাই, তাই দু’জনে স্নান-টান সেরে, ১০টা নাগাদ চন্দীগড় ছাড়লাম। গন্তব্য সিধে বাঘা (ওয়াঘা) বর্ডার। বিকেলে সেখানে কুচকাওয়াজ দেখতে হলে সাড়ে চারটের মধ্যে পৌঁছানো জরুরী!

বেরোনোর পর, প্রথম টোল বুথেই ফাস্টট্যাগ চালু করে নিলাম, আর প্রথম ভদ্রস্থ ধাবাতে খানদুই করে পরোটা সাঁটিয়ে নিলাম, যাতে এই প্রাতরাশেই বিকেল অবধি টানা যায়! এবার আর বাধা নেই, পেট ভর্তি, গাড়ির ট্যাঙ্কও ভর্তি, ফাস্ট ট্যাগও কাজ করছে, আর পাঞ্জাবের রাস্তায় স্পীড লিমিট নেই! সুতরাং, মনের আনন্দে ফিফথ গিয়ারে গাড়ি ফেলে এগোতে থাকলাম বাঘা বর্ডারের দিকে!
বিকেল ৪টে নাগাদ দেখতে পেলাম, সামনে একটা বড় প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘India-Pakistan Border – 1 KM’ এবং তার ঠিক নিচে ‘Lahore – 23KM’! সত্যি বলছি, ওই লেখাটা দেখার পড়, মনে হল এই যে প্রায় দেড়দিন ধরে গাড়ি চালাচ্ছি, সেটা আমার সার্থক হল এখন!

গাড়ি পার্ক করে, স্টেডিয়াম-এ গিয়ে বসলাম,
আর তখনই টের পেলাম, কলকাতা আর দিল্লীর গরমটা খানিক সয়ে গেলেও, বাঘা বর্ডারের গরমটা এক্কেবারেই নেওয়া যাচ্ছে না, একে তো আমার ঘাম বেশী হয়, তার ওপর ওই গরমে, দু’জনের এক্কেবারেই ঘেমে নেয়ে একাক্কার কান্ড হয়ে গেল! এ হেন অবস্থায়, জনগনের উৎসাহ দেখে আমাদের পিলে চমকে গেল! মানে, ঘেমে নেয়ে একশা হচ্ছি, তারই মধ্যে জনগন নানা গানের তালে তালে পাকিস্তানের বর্ডারে, মানে গেট-এর এপারে গিয়ে দলে দলে নেচে আসছে! কি জ্বালা!




যাই হোক, তারপর কুচকাওয়াজ এবং পতাকা অবনমন হল। দেখে তাড়াতাড়ি গাড়িতে বসে এসি চালিয়ে মনে-প্রাণে শান্তি এল। আধঘন্টায় পৌছোলাম অমৃতসর, আর সেখানে ‘হল বাজার’-এ একটা ভালোগোছের হোটেল দেখে উঠে পড়লাম।
অসীমের শখ হল, বাজারে ঘুরতে যাবে! আমি কৃতাঞ্জলিপুটে তাকে বললাম,
-“ভিক্ষে চাই না ভাই, কুত্তা ঠেকাও! কাল আরও ৫০০ কিলোমিটার ড্রাইভ করতে হবে আমায়, তুমি যাও, ধরনীর পথে পথে ঘুরে মজা নাও, আমি স্নান করে বডি ফেলব।”

আমি ভালো করে স্নান টান করে এক গ্লাস ওআরএস গুলে খেয়ে সবে বিছানা নিয়েছি কি নিইনি, অসীম ঘোষের প্রত্যাবর্তন ঘটল!
-“কি হল রে? এত তাড়াতাড়ি?” আমি শুধোলাম…
-“ধুর! সব বন্ধ হয়ে গেছে!” আক্ষেপের সুরে জানাল অসীম…
যাই হোক, একেবারে নৈশভোজ সেরে এসে, শোয়ার প্রস্তুতি নিলাম। সকালে স্বর্ণমন্দির আর জালিয়ানওয়ালা বাগ হয়ে আবার দিল্লী ফেরা, সুতরাং সকালে দেরী করা যাবে না এক্কেবারেই।
হরমন্দির সাহিব, প্রথম তৈরী হয় ১৬০৪ খৃষ্টাব্দে, পঞ্চম গুরু অর্জন-এর দ্বারা, এরপর বার বার আফগান আক্রমনে ধ্বংস হওয়ার পর, এখন যে রূপটা আমরা দেখতে পাই, সেটা তৈরী হয়েছে ১৭৭৬ সালে। মুঘল এবং রাজপুত স্তাপত্যের নিদর্শন দেখা যায় এর গঠনের মধ্যে। তবে স্বর্ণমন্দিরের গায়ের সোনার পাত, রত্ন, এবং সাদা মার্বেলের কাজ, সেটা হয় ১৮০১-৩৯, মহারাজা রঞ্জিত সিং-এর আমলে।

এবার স্বর্ণমন্দিরের কথা উঠলেই আপনা আপনিই অপারেশন ব্লু স্টারের কথা চলে আসে, তবে সত্যি কথা বলতে আমার বেশ অবাক লাগে; কারণ হেমকুন্ড সাহিব-এর ট্রেকের সময় আমি যে আন্তরিকতা এবং সৌজন্য পেয়েছিলাম শিখদের কাছ থেকে, তারপর খালিস্তান, মৌলবাদ এই ব্যাপারগুলো ভাবতে কেমন লাগে।
পঞ্জাবের প্রতি আমার একটা আলাদা জায়গা আছে, কারণ, দেশভাগের সময় বাংলা আর পঞ্জাব, অনেক সয়েছে; গোটা দেশের থেকে অনেক বেশি সয়েছে বলে আমার মনে হয়।

সক্কাল সক্কাল উঠে বেড়িয়ে, মন্দিরে ঢোকার পড় বুঝতে পারলাম, যদি একেবারে ভেতরে ঢুকতে হয়, তাহলে যা সময় লাগবে, তাতে দিল্লী ফিরতে রাত কাবার হয়ে যাবে, তাই অগত্যা গোটা মন্দির চত্তর একবার চক্কর মেরে, সোজা চলে গেলাম লঙ্গরখানায়; রুটি, কালি ডাল, কাঢ়ি, এবং চালের পায়েস দিয়ে প্রাতরাশ করে এগিয়ে গেলাম জালিয়নওয়ালা বাগ-এর দিকে।
যাঁরা ‘সর্দার উধম’ সিনেমাটা দেখেছেন, তাদের কাছে জালিয়নওয়ালা বাগ-এ ঢোকাটা একটা জলজ্যান্ত দুঃস্বপ্নের মত মনে হতে পারে, আমার কাছেও হয়েছিল। বাগানের মাঝখানে সেই কুয়ো, যেখানে ঝাঁপ দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে অনেকে বা পরে যেটাকে লাশ ফেলে রাখার জন্য ব্যবহার হয়; দেওয়ালে গুলির দাগ, সব মিলিয়ে আমার মত যাঁরা আছেন, তাদের কাছে রক্ত গরম করা, বার একটা ভেতর থেকে চাপা ভয়ের উদ্রেক হতেই পারে।


-“এখনো কারোর কাছে ক্ষমা চায়নি, জানিস তো?” বিরবির করে বলে ওঠে অসীম…
-“যে জাতটা তখন এই ক্লাসের স্যাডিস্ট ছিল, তাদের আজকে কি অবস্থা হয়েছে ভাবতে পারিস?” আমি একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে উত্তর দিই…
দু’জনে চুপচাপ বেড়িয়ে আসি, ভারতের ইতিহাসের জঘন্যতম মাস-মার্ডার, জেনোসাইড-এর স্মারক থেকে…
ফেরার পথে একবার রাস্তা হারিয়েছিলাম, মানে প্রত্যেক ট্যুরের মত, একবার আমাকে মাঠে না নামিয়ে শান্তি হয়নি গুগল ম্যাপের; সেটা ছাড়া নির্বিঘ্নেই দিল্লী ফিরে আসি, রাত আটটা নাগাদ।
-“শুধু একটাই আফসোস রয়ে গেল, বুঝলি!” গাড়ি চালাতে চালতে বলেছিলাম অসীমকে;
-“কি আফসোস?” প্রশ্ন ছুটে আসে…
-“দরজাটা যদি খুলে দিত, মাত্র তো ২৩ কিলোমিটার দেখাচ্ছিল, টুক করে লাহোরে একটু ঢুঁ মেরে এলে হত!”
আশা করবেন না, যে আবার রোজ রোজ লেখা শুরু করব! আজ লিখলাম, আবার কবে লিখব জানি না! তবে আবার কলকাতা ছেড়া দিল্লীবাসী হয়েছি, আর অদূর ভবিষ্যতে কলকাতা ফেরার আশা আছে বলে মনে হয় না! এবার দেখি কপালে কি আছে!
শান্তির আশায়,
নীল
