ব্যোমকেশ-ification !

যাঁরা আমাকে চেনেন, তাঁরা জানেন আমার শরদিন্দু, এবং ব্যোমকেশ নিয়ে ঠিক কিরকম emotion জড়িয়ে আছে; মানে সেটা নিজের শর্ট-ফিল্ম-এ ব্যোমকেশ-এর ক্যামেও থেকে পরে আবার ব্যোমকেশের চরিত্র নিয়ে কাজ করা, সে সবই জানা আছে, আমার পরিচিতদের, নাহলে Wikipedia-তে “Byomkesh Bakshi in Other Media” একবার search করে দেখুন, বুঝে যাবেন কি বলতে চাইছি;

যাই হোক, যে কোনও সুত্রে, আমি খবর পাই (কোন সুত্রে সেটা বলা যাবে না), এবং খবরটা পাই ব্যাপারটা সংবাদমাধ্যমে আসার অনেক আগেই, যে দীপক অধিকারী ব্যোমকেশ-এর চরিত্রে অভিনয় করতে চলেছেন;

এক মুহুর্তের জন্য যে বুকটা ধুক করে ওঠেনি, সে মিথ্যেটা বলব না। self-proclaimed আঁতেল হিসাবে দেব-এর ‘diction’ এবং অভিনয়ের সমালচনা আমি বহুবার করেছি, সে মিথ্যেটাও বলব না। আর আমার এই ব্লগেই যে কিভাবে রিমেক বাংলা সিনেমাকে শেষ করে দিচ্ছে লিখেছি, সেটাও অস্বীকার করব না।

কিন্তু এই অতিমারি পরবর্তী দেশে, শুধু বাংলা কেন, সব ভাষার সিনেমারই চরিত্র বদলে গেছে, ওটিটি-এর রমরমায় দর্শক হয়ে উঠেছে হলবিমুখী এবং মারাত্মক রকম অধৈর্য্য, তাই ভালো ছবিও সিনেমা হলে মুখ থুবড়ে পড়ার পরে ওটিটি তে প্রশংসা পেয়েছে (উল্লেখ্য – ‘লাল সিং চাড্ডা’) এবং তার উল্টোটাও ঘটেছে।

কিন্তু এরকম অবস্থায় দেব ‘গোলন্দাজ’ তৈরী করেছেন, ‘বাঘা যতীন’ তৈরী করছেন, ‘রঘু ডাকাত’ তৈরী করছেন। অনেক বেছে বেছে প্রোজেক্ট নিচ্ছেন, যেগুলো অবশ্যই ‘রিমেক’ নয়, এবং সিনেমা হলে বাঙালি দর্শক টানার এবং প্রশংসা পাওয়ার ক্ষমতা রাখে।

তাই আজকের দেব, আর ৫-৭ বছর আগেকার দেবকে কখনোই এক সমীকরণে রাখা যাবে না, মানে রাখলে বিরাট অপরাধ হবে।

আর সংবাদমাধ্যমে খবরটা পাওয়ার পর, আমার এক বন্ধু একটা খুব সুন্দর কথা বলে;

“ভাই, শুধু দেব কেন, আজকে যদি কেউ যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের লোককে কেউ ব্যোমকেশ অফার করে, সে কি রিফিউজ করবে? করা সম্ভব?”

সে যাই হোক, আজ আমাদের আলোচ্য বিষয় ‘ব্যোমকেশ ও দূর্গরহস্য’

যাঁরা Neil Gaiman-এর ‘American Gods’-এ একটা কথা বলা হয়, সেটা হল, এই পৃথিবীতে যত জায়গায় ‘এক্সডাস’ হয়েছে, ততগুলো ‘জীসাস ক্রাইস্ট’-এর ভার্সান আছে, যেমন ইহুদি জীসাস হলে মোসেস, সেরকমই, মেক্সিকান, মায়ান, সবরকম জীসাস-এর ভার্সান আছে।

ব্যোমকেশও কতকটা তাই; মানে শরদিন্দুর লিখে যাওয়া ব্যোমকেশ আর পর্দার ব্যোমকেশ আলাদা, আর প্রত্যেকটা পর্দার ব্যোমকেশ আলাদা। উত্তম কুমারের ব্যোমকেশ, আর আবীর চট্টোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ, বার রাজিত কাপুরের ব্যোমকেশ প্রত্যেকে আলাদা।

তা দেব-এর ব্যোমকেশও যে আলাদা হবে, সেটা বলাই বাহুল্য। দেব সবার আগে নায়ক, তারপর অভিনেতা, তাই ব্যোমকেশ যে বেশী নায়কোচিত হবে, সেটা পর্দায় ব্যোমকেশ-এর প্রথম দর্শন থেকেই চোখে পড়ে। জয় বাবা ফেলুনাথ-এর ক্লাইম্যাক্স কে ট্রিবিউট দিয়ে ব্যোমকেশ-এর ইন্ট্রোডাকশান সীন এবং হালকা ঝারপিট দিয়ে বোঝাই যাচ্ছিল, এই ব্যোমকেশ অন্যরকম, কিন্তু সেটা কোনভাবেই ফেলনা বা খেলো নয়।

এবার আসি সিনেমাটার কথায়, ‘দূর্গরহস্য’ বৃহত্তম ব্যোমকেশ কাহিনী, এবং আমার সবচেয়ে পচ্ছন্দের। আর গল্পটার সবচেয়ে সুন্দর জিনিস হল, এত চরিত্র আর এতগুলো স্তর রয়েছে গল্পটাতে, যদি কেউ গল্পতে অতিরিক্ত পরিবর্তন না করে, তাহলে খারাপ হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই, এবং ভরসার কথা হল, সত্যবতীকে ব্যোমকেশ-এর সঙ্গে পুরন্দর পান্ডের কাছে নিয়ে আসা ছাড়া, আর কোনও বড় পরিবর্তন করেননি বিরসা দাসগুপ্ত।

আগে ভালো লাগার জায়গাগুলো বলি, তারপর খারাপের দিকে যাব নাহয়?

সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে বেশি মাথা ঘামাচ্ছি না, তবে মধ্যপ্রদেশের যেখানে চিত্রায়ণ হয়েছে, দূর্গের রুক্ষতা আর সৌন্দর্য্য দুটোই চোখে পড়ার মত হয়েছে, আর আবহাসংগীত নিয়ে একটা কথাই বলব, ‘ব্যোম সত্যান্বেষী’ আমি বার বার শুনছি, লুপে…

পার্শ্বচরিত্র প্রতেকে খুব ভাল, সত্যম ভট্টাচার্য্যর মণীলাল বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছে বলে মনে হচ্ছিল, রজতাভ দত্ত এবং শান্তিলাল মুখোপাধ্যায় ছাড়াও প্রত্যেকেই যথেষ্ট সপ্রতিভ। সেখানে কোনও খামতি নেই।

সত্যবতী হিসেবে রুক্মিণী মৈত্র যথাযথ, আমি সত্যবতী নিয়ে কোনওদিনই বেশী ঘাঁটাঘাঁটি করি না কারণ আমার আজ অবধি দিব্যা মেনন ছাড়া কোনও সত্যবতীকেই পচ্ছন্দ হয়নি, কারণ শরদিন্দু কখনোই সত্যবতীকে ডানাকাটা পরী হিসাবে বর্ণণা করেননি, বরং করেছেন উল্টোটাই। কিন্তু নায়কোচিত ব্যোমকেশ-এর যে নায়িকাচিত সত্যবতী হবে, সেটাও আমি মেনে নিলাম।

মানতে পারলাম না অম্বরিশ ভট্টাচার্য্যের অজিত-কে। তাকে অজিত কম, লালমোহনবাবু বেশি লাগছে। মানে অজিত কখনোই কমিক রিলিফ ছিল না, বা ভাঁড়ামো করত না, এখানে অনেক ক্ষেত্রেই অজিতের অজিতের হাবেভাবে ভাঁড়ামো ব্যাপারটা ফুটে উঠেছে, যেটা আমার ভালো লাগেনি। অম্বরিশবাবু খুব ভালো অভিনেতা; নিঃসন্দেহেই, কিন্তু এখানে আমার ঠিক পচ্ছন্দমত হল না।

আর ভাল লাগেনি সিনেমার শেষটা, যেটা আমার ‘rushed’ লেগেছে মানে, রহস্য সমাধানটা যেন দুম করে হয়ে গেল, ব্যোমকেশের সেই ‘ইউরেকা’ মোমেন্টটার জন্য অপেক্ষাই করে গেলাম, দেখা পেলাম না; আর ১৫-২০ মিনিট রানটাইম বাড়লে মন্দ হত না। কারণ ঘনীভূত রহস্যের পর, সমাধানের ভোরের আলো টা দেখার আগেই, দিনের আলো ফুটে গেল যেন।

কিন্তু এবার কথা হল, আদতে সিনেমাটা কেমন? এক কথায়, ভালো, বেশ ভালো। মানে সিনেমা হল থেকে বেড়োনোর পর, আপনার মনে হবে না সময় নষ্ট করলেন। আমি তুলনা করছি না, কারণ তুলনা করতে থাকলে অনেকেই অনেক কিছু বলতে পারেন; আমি সে দলে নই (অন্তত আর নই)।

শেষে একটা কথাই বলব, প্রত্যেকে নিজের মত করে ব্যোমকেশ, আর প্রত্যেকের শরদিন্দুর সোর্স মেটিরিয়াল নিয়ে নিজের চিন্তাভাবনা, নিজস্ব গল্পবলার ধরণ থাকবে, প্রত্যেকটিকে আলাদা ভাবে ভাবার দরকার আছে, কারণ, ‘অবলম্বনে’ কথাটা বিশেষ জরুরী এখানে। তাই, দেব-এর ‘ব্যোমকেশ-ification’ দেখে আসুন, ভালো লাগবে…

শান্তির আশায়

নীল      

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.