ত্রিশঙ্কু

এক

ছেলেটা রাত দুটোর সময় হাতের কাজটা শেষ করে বিছানায় পৌঁছায়। বিছানার এক কোণে তার স্ত্রী গভীর ঘুমের দেশে। মাথাটা বুকের কাছে নিয়ে গিয়ে, তার হৃৎস্পন্দন শোনে ছেলেটা; মনে হয় সিস্টোল আর ডায়াস্টোল একই ছন্দে চলছে দু’জনের, যেরকম ভাবে একসাথে চলার পথটাও মিশে গেছে। তার আলিঙ্গন ঘুমের ঘোরে বুঝতে পারে না মেয়েটি, সে অকাতরে ঘুমোচ্ছে। ছেলেটি অনেকক্ষণ তার সহধর্মিনীর হৃদয়ের শব্দ শোনে। তার ইচ্ছে করে কবিতা লিখতে, পাতা ভরে; কিন্তু রাতজাগার ক্লান্তিতে শরীর দেয় না। একটু পড়ে সে-ও ঘুমিয়ে পড়ে।

দুই

চিনির বলদ, কথাটা অনেক শুনেছে লোকটা; এরকম ভাবে যে জানতে পারবে, বোঝেনি। কিন্তু এখন আর কিই বা করার আছে, বাড়িতে থাকা, স্বপ্নের মত কাজ সব ভেবে আর সেদিন অন্যদিকে তাকায় নি; মনে হল সেদিন বোধহয় সব ভুল ভেবেছিল, আর আজ সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে পিছুডাকের কোনও জায়গা নেই। সামনেই যেতে হবে, আর আবার মস্তিষ্কের বদলে মনের কথা শুনলে, সব ওলট পালট হয়ে যাবে তার, তবুও কিছু একটা করতে হবেই। কারণ নিজের অবস্থাটাকে ধ্রুবক মনে করে বসে থাকলে সেটা পাল্টানো যাবে না, আর না পাল্টালে…

তিন

বাড়িটাতে একজন মারা গেছেন দু’দিন আগেই। আর তাই মেয়েটিকে আসতে হয়েছে তার পরিবারের হয়ে সম্মান এবং নিয়মরক্ষা করতে, কারণ সামাজিক আচরণ তাকেই বলে।

বাড়িটারও বয়স হয়েছে, শহরের একপ্রান্তে চারপাশে গজিয়ে ওঠা অত্যাধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট-এর ভীড়ে একটু সেকেলে হয়ে এখনও টিকে আছে। বাড়ির জীবিত বাসিন্দাদের দেখে বুক কেঁপে উঠল মেয়েটার, নুব্জ, প্রায় চলৎশক্তিরহিত দুই বৃদ্ধা এবং তাদের দেখভাল করার এক মধ্যবয়সী মহিলা।

বাড়ির সক্ষম সদস্যরা থাকে অনেক দূরে, জীবিকা নির্বাহের খাতিরে, কিছু করারও নেই, বাড়িটার মতই জরাগ্রস্থ এই শহরে পড়ে থেকে কবে কার ভাল হয়েছে।

“কতদিন পড়ে এলে…”

“অনেকদিন এখানে কেউ আসে না…”

মেয়েটার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল; তার মনে হল বাড়িটাতে দু’টো মৃত মানুষ এক এক করে দিন গুনছে, যেদিন শহরের সবাই জানতে পারবে, তারা অনেকদিন আগেই মারা গেছে, শুধু এই বাড়ির চার দেয়াল, তাদের আত্মাদের বেঁধে রেখেছে…

সব ঘটনা এবং চরিত্র কাল্পনিক, দয়া করে আমার ফাঁসি দেবেন না…

শান্তির আশায়

নীল…

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.