বিবিধের মাঝে দেখ…

কলকাতা, বা নিজের শহর ছেড়ে বেরোবার পর, অনেকের মত আমারও মনে অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ ছিল। যে রাজ্যগুলোকে ‘গো-বলয়’ নামে আখ্যা দিয়ে এককালে তাচ্ছিল্য করেছি, সেইরকম এক রাজ্যে কর্মস্থল হওয়া মানে একরকম “টকের জ্বালায় পালিয়ে গিয়ে তেঁতুলতলায় বাসা” গোছের অবস্থা।

কিন্তু যখন কলকাতা ছেড়েছি, তখন যে অবস্থায় ছেড়েছি, তখন যদি কেউ বলত, “ভালো চাকরী আছে, উত্তর কোরিয়া চলে যা” তখন উত্তরে ‘না’ বলার আগে, আমি বারদুয়েক ভাবতাম অবশ্যই। যাই হোক, আজ দু’বছর হতে চলল, আমি আমার ‘হোমটাউন’-এর বাইরে, আর আমার কিছু জিনিস এর মধ্যে উপলব্ধি হয়েছে। সেগুলোর কথাই বলব আজকে।

আমি দিল্লী এসেছি ২০২৪-এর এপ্রিল মাসে, আর আগস্ট মাসে কলকাতার বুকে ঘটে গেছে আর জি করের ঘটনা, এবং তার পর যা যা হয়েছে সেই সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে, সেটা কারোরই অজানা নয়। সারা দেশে ডাক্তার এবং সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ, কন্সপিরেসী থিওরী, আদালতের রায় নিয়ে অসন্তোষ, সবই দেখেছি।

আগস্টের পরে, ২০২৪-এর নভেম্বরে, সেই কলকাতাতেই এক ৩৪ বছরের জীনগতভাবে ‘হোমো সেপিয়েন্স’ ৭ মাসের একটি শিশুকে ধর্ষণ করল, পক্সো কোর্ট তাকে মৃত্যুদন্ড দিল।

অভয়া কান্ডের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই, ২০২৫-এর জুন মাসে, কসবায় এক আইনের ছাত্রীকে গণধর্ষণ করা হল। ধর্ষকের পলিটিক্যাল অ্যালায়েন্স নিয়ে রুলিং-অপোজিশন কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করল।

আই আই এম ক্যালকাটা ক্যম্পাসে এক যুবতীর ধর্ষণ।

সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ কলকাতায় ২০ বছর বয়সী এক যুবতীকে জন্মদিনের পার্টিতে নিমন্ত্রনের অছিলায় গণধর্ষণ করল দু’জন, জানা গেল তাদের সাথেও নাকি কোন এক রাজনৈতিক দলের যোগ রয়েছে!

অক্টোবর মাসে দুর্গাপুরে এক ডাক্তারীর ছাত্রীর গণধর্ষণ।

এবার আপনারা যাঁরা কলকাতায় বসে এই লেখাটা পড়ছেন, তারা আমাকে গালি দেবেন; “দূর মশাই! নিজে ভারতের ‘রেপ ক্যাপিটালে’ বসে এভাবে কলকাতা তথা পশ্চিমবাংলার নিন্দে করতে লজ্জা করে না?”

একটু দাঁড়ান; আমার স্টকে আরও আছে!

২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে, অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে তিরুভান্নামালাই-এর পথে, রাত্রিবেলা গাড়ি করে ফিরছিলেন এক মা এবং মেয়ে। তামিলনাড়ু বর্ডারের কাছে, নাইট গার্ডে থাকা দুই কনস্টেবল, গাড়ি থামিয়ে, অন্যত্র নিয়ে গিয়ে, মায়ের সামনে মেয়েকে গণধর্ষণ করে। পরে সেই দুই কনস্টেবলের চাকরী যায়।

এই ক’দিনের আগে ঘটনা, মুম্বাই-এ একজন গ্রেপ্তার হয়েছে ২.৫ মাসের একটি কুকুছানাকে ধর্ষণের অপরাধে।

শেষ ঘটনাটা আমি শুধু যোগ করলাম বোঝানোর জন্য, যে কোনদিকে চলেছি আমরা; কিন্তু এবার তার আগের ঘটনাগুলোতে আসি।

এই প্রতিটা ঘটনার মধ্যে কি মিল আছে জানেন? প্রতিটা ঘটনার পর, ৯০% খবরের কাগজ একটা বাঁধাধরা লাইন লিখেছে;

“এই ঘটনা রাজ্যের নারী-সুরক্ষার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছে”

 একই লাইন, বার বার, নানা ভাষায়, সর্বত্র লেখা হয়েছে। প্রশ্ন তো উঠছে, কিন্তু তার উত্তর কে দেবে? আছে কারোর কাছে?

এইবার প্রশ্ন উঠবে, “আপনি যেখানে থাকেন, সেখানকার ঘটনাগুলোও লিখুন!”

হ্যাঁ মশাই, যদি পরিসংখ্যান ধরি, তাহলে রাজ্য হিসাবে, ১,২ এবং ৩ নম্বরে আছে যথাক্রমে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ এবং উত্তরপ্রদেশ। মিডিয়া ও রাজ্য পুলিশের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ রাজস্থানে প্রায় রিপোর্টেড ৩,০০০ ধর্ষণ, আর  দিল্লীতে ১৯০১।  

ঠিক আছে? শান্তি? এবং যে কথাটা বলার চেষ্টা করছি, সেটা শুনুন একটু;

যদি এন সি আর বি, মানে ন্যাশানাল ক্রাইম ব্যুরোর পরিসংখ্যান এবং রিপোর্ট দেখি, তাহলে দেখতে পাব; ভারতে গড়ে ৩১-৩৩ হাজার ধর্ষণ হয়ে থাকে, আর হয়ে থাকে মানে যেটা পুলিশের নজরে আসে, সেটা। আনরিপোর্টেডের খবর কেউ জানে না। ২০২০ সালে এটা কম হয়, কারণ অতিমারী, এবং আবার সেটা বেড়ে  যায় ২০২১-২২ সালে।

দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা ২০২০-তে ছিল প্রায় ৩,৭০,০০০, যেটা ২০২২-এ বেড়ে গিয়ে হয় ৪,৪৫,০০০। ২০২২ থেকে ২৩-এ, দেশের মোট নথিভুক্ত (cognizable) অপরাধ, যার মধ্যে হিংসাত্মক অপরাধ প্রধান অংশ, সেটা ৭.২% বেড়ে হয়েছে ৬২,৪০,০০০।

উল্লিখিত পরিসংখ্যানগুলি ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB) ও সরকারি সারাংশ রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে; প্রকৃত অপরাধের সংখ্যা আরও বেশি হওয়া অসম্ভব নয়। এটা গোটা দেশের কথা বলছি আমি, কোনও রাজ্যের কথা নয়, এবং কোন রাজ্যের এতে কত যোগদান আছে, সেটাও বলছি না। খুব সোজা একটা কথায় আসি।

আমরা জানি, রাজ্য-এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিভেদ এবং পরস্পরের দিকে আঙ্গুল তোলা নতুন কিছু নয়; যে দলই হোক না কেন। আর তার চেয়ে আরও ভাল জানি, ‘উন্নয়ন’ নামক বস্তুটি কোনও রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী বা দলের অভিধানে কোনওদিনও ছিল না, বা নেই।

কিন্তু, কথা হল, আমাদের দেশটার নাম ‘ভারত’ বা ‘ইন্ডিয়া’ বা ‘হিন্দুস্থান’। এর আগে ‘ইউনাইটেড স্টেটস’ বা শেষে ‘যুক্তরাষ্ট্র’ কথাটা আছে কি? আর যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে, আমাদের দেশ চলে কি? মানে আমেরিকার মত, স্টেট বর্ডারের সাথে সাথে, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা পাল্টে যায় কি?

যায় না। গোটা ভারত, একই সংবিধানের আওতায়, একই আইনের ঘেরাটোপে বাঁধা আছে।

আর আমাদের নিজেদের অজান্তেই, এই ‘আমার রাজ্য, তোমার রাজ্য’ এই ন্যারেটিভ, এক রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, আমরা নিজেরাই এই বিভেদের রাজনীতির আগুনে ঘি ঢেলে গেছি, ধর্মীয় বিচ্ছিন্নতাবাদের থেকে অনেক বেশি, বিভেদের অস্ত্র করে তুলেছি আমরা ‘আঞ্চলিকতা’ কে।

তাই নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের বিবিধের মধ্যে, এই দেশের ‘মিলন মহান’ হল- নারী নির্যাতন, পশু নির্যাতন এবং হিংসাত্মক অপরাধ।

আমার এই লেখাটার একটাই উদ্দেশ্য, সেটা হল, ‘হারিয়ানায় বেশী ধর্ষণ হয় শিক্ষার অভাবে’, ‘কেরালতে ধর্ষণ হয় সবচেয়ে বেশী সাক্ষরতার হার সত্ত্বেও’, ‘কালচারালি সুপিরিয়র কলকাতাতেও ধর্ষণ হয়’, এই ন্যারেটিভগুলো আমরাই তৈরী করেছি, আমরাই লালন পালন করেছি, আর এখন সেটাই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সবচেয়ে বড় প্রোপাগন্ডা হয়ে আমাদের কাছেই ফেরত আসছে, সুদে আসলে।

সময় এসেছে, এই ন্যারেটিভটা ভাঙ্গার, সময় এসেছে একবার উপলব্ধি করার, যে রাজ্যের গন্ডী কতগুলো কাল্পনিক রেখামাত্র, বাস্তবে, একটাই দেশ, সব সমস্যাই দেশের সমস্যা, জাতীয় সমস্যা।

এই লেখাটা আসলে আমাদের collective denial-এর বিরুদ্ধে- যে অস্বীকার আমাদের বিশ্বাস করায় সমস্যা “ওদের রাজ্যে”, “ওদের কালচারে”, “ওদের শাসনে”, অথচ একই অপরাধ, একই হিংসা, একই ব্যর্থতা সারা দেশ জুড়ে প্রতিদিন ঘটে চলেছে। যতদিন আমরা রাজ্যের সীমানার আড়ালে লুকিয়ে জাতীয় ব্যর্থতাকে অস্বীকার করব, ততদিন এই অস্বীকারই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে থেকে যাবে।

কিন্তু? আদতে কিছুই হবে না! তবু, শেষ করার আগে আমার পচ্ছন্দের একটা গানের ক’টা লাইন রেখে যাই; এর থেকে যাঁর যা মানে বোঝার, ন্যারেটিভ তৈরী করার, করে নেবেন।      

“তুমি বলবে আমার বেনিয়া পুকুর, তোমার বেহালা
তুমি গন্ডি কেটে দেখিয়ে দেবে পশ্চিম বাংলা
হয়ত কেরালার আকাশ এর একটু বেশি নীল ,
তবু সেটাও কি নয় আমার পৃথিবী?”

শান্তির আশায়,

নীল

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.