কম্পিউটারকে যদি যন্ত্রগনক বলা হয়, তাহলে সেই হিসাবে আমি AI কে যন্ত্রবুদ্ধি বলতেই পারি, আর এখন এই ২০২৬ যে সেই যন্ত্রবুদ্ধির বছর, সেটাতে কোনো সন্দেহই নেই।
এখন আজকের এই লেখার বিষয় না কারণ হল একটাই, সেটা হল, এই যে যন্ত্রবুদ্ধি, এটা আমাদের চাকরী খাবে, না অকর্মন্য করবে, নাকি আল্ট্রন বা স্কাইনেট এর মত মনুষ্যের ধ্বংসের কারণ হতে চাইবে, সেটা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই; এখন সেই বিতর্কে কার্বনজাত মনুষ্যবুদ্ধি যুক্ত প্রাণী হওয়ার কারণে, আমার কিছু বলার অবশ্যই থাকবে।
এখন আমার মত সেকেলে লোক, যে এখনো ফাউন্টেন পেন, দম দেওয়া ঘড়ি ইত্যাদি ব্যবহার করে, সেরকম লোকের যে এই যন্ত্রবুদ্ধির বিরুদ্ধে অনেককিছুই বলার থাকবে, তাতে আশ্চর্যের কিছুই নেই, কিন্তু তার পক্ষেও আমার বেশকিছু কথা বলার আছে, সেগুলোই আগে বলে নিই, যন্ত্রবুদ্ধির বাপের শ্রাদ্ধ করার জন্য মেলা সময় রয়েছে।
প্রথমে শুরু করি যে আমরা, সাধারণ মানুষ, গ্রাহক, মানে কনজিউমাররা যন্ত্রবুদ্ধি বলতে ঠিক কি বুঝি; সবার আগে বলে দিই, এই যন্ত্রবুদ্ধি হালে বাজারে আশা কোনও জিনিস নয়, বহুদিন ধরে যন্ত্রবুদ্ধির ভিত, মানে মেশিন লার্নিং এবং নিউরাল নেটওয়ার্ক জাতীয় জিনিসের অস্তিত্ব রয়েছে, কাজ হচ্ছে, তবে অনেক বড় পরিসরে। আজ যন্ত্রবুদ্ধি বলতে আমাদের হাতে যা এসেছে, তা হল এইসব জিনিসের বাণিজ্যিক ব্যবহার।
এখনো যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ‘AI মানে কি?’ শতকরা ৭০% লোকেই উত্তর করবেন,
-“ওই তো! ChatGPT!”
এখন, তারা যে খুব একটা ভুল বলছে, সেটা আমি একবারও বলব না, কারণ ChatGPT আমাদের প্রথম যন্ত্রবুদ্ধির বাণিজ্যিক প্রয়োগের জলজ্যান্ত উদাহরন দিয়েছে। তারপর, সেই রাস্তা ধরে এসেছে Gemini, Grok, Perplexity, Claude ইত্যাদি। এখন এই সবকটার মধ্যে ঠিক কি মিল আছে, বলুন তো?
এরা সবাই “এলএলএম” মানে “লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল” বা “বৃহৎ ভাষা রূপরেখা”।
অর্থাৎ, যারা মানুষের ভাষা বুঝতে এবং সে অনুযায়ী উত্তর দিতে পারে, এবং তার জন্য সে বিশ্লেষণ করে বা /করতে পারে। মানে ধরুন, আপনি কোনো বিষয়ে জানতে চাইছেন, আগে আপনি কি করতেন? গুগলে সার্চ করে প্রথম পাতার উপরদিকের এক বা একাধিক রেজাল্ট নিয়ে পড়তে শুরু করলেন। একই প্রশ্ন আপনি যদি ChatGPT কে করেন, তাহলে সে কি করবে, অনেকগুলো রেজাল্ট পড়ে, জেনে, জানিয়ে আপনাকে একটা সারাংশ জানিয়ে দেবে, তার সাথে বলে দেবে সে কোন তথ্যটা সে কোথা থেকে নিয়েছে।
খাটনি কমল আপনার?
অবশ্যই কমল! আমি যে কাজটা করি, সেখানে আমাকে প্রায়শই ‘প্রেস রিলিজ’ লিখতে হয়। এখন ৪-৫ পাতার প্রেস রিলিজ পুরোটা লেখার বদলে, আমি আধ-এক পাতা প্রম্পট লিখলাম, বাকিটা এ আই লিখে দিল।
সুবিধে না?
অবশ্যই সুবিধে, কিন্তু মনে রাখবেন, এখানে প্রম্পটটার আকারও বড়। আপনি যদি মনে করেন এক লাইন লিখে ৪-৫ পাতার আর্টিকল পেয়ে যাবেন, তাহলে খুব বড় ভুল করেছেন। আর যদি এক-দু লাইনের প্রম্পট লিখে আপনার কাজ, কাজ মানে যে কাজের জন্য আপনি বেতন পাচ্ছেন, সেটা মিটে যায়, তাহলে অভিনন্দন, এআই যেকোনো দিন আপনার চাকরী খেয়ে নিতে পারে।
এটা খুব জরুরী একটা ব্যাপার, যেটা নিয়ে আমাদের কথা বলা দরকার, যে ‘এআই কি আমার চাকরী খেয়ে নিতে পারে?’ উত্তরটা হ্যাঁ, এবং না।

দেখুন, ছবি, ভিডিও, গান সবকিছু জেনারেট করার জন্যই এআই কে ‘ট্রেইন’ করতে হয়, ধরুন যেমন একটা বাচ্ছা ছেলে, ছবি আঁকার জন্য সাদা পাতার ওপর কার্বন পেপার দিয়ে ছাপ তোলে, সেইরকম। মানে কোনো রেজান্ট দেওয়ার জন্য, এআই-এর একটা রেফারেন্স অবশ্যই দরকার। আজ যদি আমি একটা প্রম্পট দি, যে এই ছবিটাকে যামিনী রায়ের স্টাইলে বদলে দাও, তাহলে আমার কাছে কি প্রশ্ন আসে, ‘যামিনী রায়টা কে?’ না, কারণ এআই আগেই যামিনী রায়ের সমস্ত ছবি, সমস্ত ইতিহাস ইন্টারনেট থেকে গুলে খেয়েছে। আমার প্রম্পট পেলে, সে যামিনী রায়ের ছবির মধ্যে প্যাটার্ন খোঁজে, যেটা তাঁর নিজস্ব স্টাইল, এবং সেটার আদলে, সে ছবিটা তৈরী করে দেয়।
এখানে আদল কথাটা খুব জরুরী।
এআই কোনও মৌলিক চিন্তা করতে সক্ষম নয়; তার কাজ রিপিটেটিভ প্যাটার্নগুলোকে জেনে, তারপর সেটার আদলে উত্তর দেওয়ার, এখন আপনার কাজ যদি রিপিটেটিভ হয়, যদি একট প্যাটার্ন থাকে, তাহলে এআই সে প্যাটার্ণ রেকজনাইজ করবে, সেটাকে নকল করবে, এবং আপনাকে হেল্প করবে, বা ডাইনোসরে পরিণত করবে।
কিন্তু আপনার কাজ যদি পুরোপুরি আপনার ‘সৃজনশীলতা’র ওপর নির্ভরশীল হয়, যেখানে সবটাই মৌলিক চিন্তা, কোনও প্যাটার্ন নেই, তাহলে এআই কোনওদিন আপনার চাররি খেতে পারবে না।
কিন্তু এবার আসি, আসল সমস্যায়, আসল ‘ভয়ের’ কথায়;
জানেন কি, নভেম্বর থেকে গোটা পৃথিবীতে কম্পিটার র্যামের দাম মারাত্মক ভাবে বেড়ে গেছে? আমি ক’দিন আগেই লিখেছিলাম, ১২৮ জিবি DDR5 র্যামের দাম এখন ১০ গ্রাম সোনার থেকে বেশি! জানলে ঠিক আছে, না জানলে শুনুন, কেন বেড়েছে।
এই যে এআই আপনি ব্যবহার করছেন, এগুলোকে ট্রেইন করতে, এবং কোটি কোটি ইউজারের জন্য ব্যবহারযোগ্য করতে, প্রচুর শক্তিশালি সার্ভারের, প্রচুর শক্তিশালি কম্পিটার বা ডেটা সেন্টারের দরকার হয়। আর এইসব ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণে ‘এইচবিএম’ বা ‘হাই ব্যান্ডউইথ মেমোরি’ ফলে আমাদের, সাধারণ কঞ্জিউমারদের স্টকপাইল কমে গিয়ে, র্যাম তৈরীর কাঁচামাল চলে যাচ্ছে ইন্ডাস্ট্রীয়াল অ্যাপ্লিকেশন এর দিকে, Open AI, Grok ইত্যাদি এআই রা মোটামুটি পৃথিবীর সব মেমোরি কিনে নিয়ে বসে আছে। র্যাম তৈরীর তিন ‘জায়েন্ট’ স্যামসাং, এস কে হাইনিক্স এবং মাইক্রন, তাদের যে র্যাম তৈরী হবে, এখনো হয়নি, সেটাও বেচে দিয়ে বসে আছে!
কারণ এখন এ আই এর থেকে বড় পণ্য এর কিছু নেই; আর সবাই তাদের নিজস্ব “প্রোডাক্ট” কে আরও শক্তিশালী, আরও বেশি ইউজারবেস কে সাপোর্ট করার জন্য তৈরি করছে, এবং তার জন্য চাই ব্যাপক পরিমাণ ডেটা সেন্টার গ্রেড হার্ডওয়ার, এবং অবশ্যই, হাই ব্যান্ডউইথ মেমোরি।
এখন, তাহলে সমস্যা কোথায়? ২০২০-২২ এ যখন ক্রিপ্টো মাইনিং-এর হিড়িক পড়েছিল, তখনও তো এভাবেই দাম বেড়েছিল গ্রাফিক্স কার্ড-এর; বেড়েছে, আবার কমে যাবে!
সমস্যা কি জানেন? র্যাম হল কম্পিউটার তৈরীর একটা অপরিহার্য উপাদান, গ্রাফিক্স কার্ড নয়! কারণ বিনা গ্রাফিক্স কার্ড-এ কম্পিউটার চললেও, বিনা র্যামে চলা অসম্ভব!
এখন যে হারে র্যাম বিক্রি হচ্ছে, তাতে পৃথিবীর সিলিকন ভান্ডারে টান পড়বে, আর সেটা হলে এক এক করবে দাম বাড়বে (এখনই বাড়ছে!) সমস্ত জিনিস, যাতে সিলিকন ব্যবহার হয় (এখানে সিলিকন বলতে আমি বালির কথা বলছি না, আমি বলছি রিফাইন্ড সিলিকন ওয়েফারের কথা, সেই ওয়েফারের উৎপাদন ক্ষমতা কিন্তু সিমিত!) সেরকম জিনিসের, মানে মোবাইল, গাড়ি, সমস্ত স্মার্ট আপ্লায়েন্স এর দাম।
আর তারপর সাধারণ কনজিউমারদের জন্য র্যামের, গ্রাফিক্স কার্ডের, প্রসেসরের দাম যেখানে পৌছোবে, ‘পার্সোনাল কম্পিউটার’ হয়ে যাবে সকলের ধরাছোঁয়ার বাইরে!
আর তখনই, এতদিন ধরে যারা ব্যাপক হারে নিজেদের ডেটা সেন্টার আপগ্রেড করেছে, তারা পার্সোনাল কম্পিউটিংকে সাব্রস্ক্রিপশন, বা সার্ভিস হিসাবে বাজারে ছাড়বে তাদের ইচ্ছেমত দামে। সবাই বলবে “ক্লাউড কম্পিউটিং-ই তো ভবিষ্যৎ!” আর আপনিও সেটা নিজের ডেটা সিকিওরিটিকে জলাঞ্জলি দিয়ে, মেনে নিতে বাধ্য হবেন, কারণ আপনার কম্পিউটার দরকার, এবং, আপনার বছরে ৪০০ টাকায় ChatGPT ব্যবহার করার অভ্যেস হয়ে গেছে।
আসলে, নিজের অজান্তেই, আপনি স্মার্টফোনের মত, এবার যন্ত্রবুদ্ধিতে আসক্ত হয়ে পড়ছেন।
ভাবুন! আপনার মনে হতে পারে, “আমার তো মোবাইলেই কাজ চলে যায়, আমার কম্পিউটার কোন কাজে লাগবে?” তাহলে বলি, আপনি ভাগ্যবান! কিন্তু যদি কোনওদিন হঠাৎ করে আপনার কম্পিউটার দরকার পড়ে, আপনি দেখবেন, হয়তো বাজার থেকে ‘কম্পিউটার’ জিনিসটাই উঠে গেছে!
শেষের সে দিন ভয়ংকর! এই যন্ত্রবুদ্ধির বুদবুদ ফাটবে, সেটা আজ না হলে ক’বছর পর, কিন্তু যত তারাতাড়ি ফাটবে, ততই মানবজাতির মঙ্গল!
