আমি কাউকে আমায় সমর্থন করতে বলছি না, কাউকে বলছি না যে আমার কথাগুলোকে বেদবাক্য বলে মেনে নিতে। আমি কোথাও দাবী করিনি যে আমি বিরাট বড় ফিল্ম-সিনেমা বোদ্ধা। বরঞ্চ আমি স্বীকার করছি, কোনও বড় ফিল্ম ইন্সটিট্যুটের চৌহদ্দীর আশেপাশে যাওয়ার আমার সুযোগ হয়নি। কোনোদিন দেখিনি টালিগঞ্জের কোনও স্টুডিওর শুটিং ফ্লোর। আর আমি এ-ও জানি, এই সামান্য ব্লগের লেখায় কারো কিচ্ছু যায় আসে না। তবে,  আমার যোগ্যতা একটাই, আমি বাংলা তথা বিশ্ব সিনেমার একজন একনিষ্ঠ দর্শক। তাই আমি পুরোপুরি আমার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে, আমার নিজের মনোভাবটাকে প্রকাশ করছি। তাই আপনারাও, দয়া করে মতামত জানাতে পিছপা হবেন না। আর আমি প্রথমেই আমার নিজের ক্ষুদ্রতা, তুচ্ছতার কথা স্বীকার করে নিয়েছি; তাই ব্যক্তিগত আক্রমনের সময় এই যুক্তিগুলো না তুলে অন্য যুক্তি দেখিয়ে অপমান করলে খুশি হব।

 

এবার লেখার মূল বিষয়ে আসি। বাংলা সিনেমার সাথে ‘শনির দশা’ কথাটা আমি কেন একবাক্যে উচ্চারণ করছি। শুধু সিনেমা কেন, যে কোনো সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্যের পথ যায় চড়াই উতরাইয়ের মধ্যে দিয়ে। উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে। তাই মধ্যযুগের স্থবিরতার পর রেনেসাঁ এসেছিল, এবং তাই সেটাকে ‘নবজাগরণ’ বলা হয়। কারণ কেউ ঘুমিয়ে না পড়লে তো তাকে খামোখা জাগাবার দরকার পড়ে না! যে কোনো দেশকে, জাতিকে তাই এইভাবেই চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তাই ‘শনির দশাই’ কালক্রমে ‘স্বর্ণযুগে’ পরিনত হয়, বা ঘটে তার উল্টোটা।

যদি গোটা পৃথিবীর সিনেমার ইতিহাস নিয়ে একটু নাড়াঘাঁটা করি, মানে ধরুন একেবারে ‘লুমিয়ের’ ভ্রাতৃদ্বয়ের সিনামাটোগ্রাফ আবিস্কার করা থেকে আজ অবধি; তাহলে আমরা দেখতে পাব, বিশ্ব-চলচ্চিত্রের ম্যাপে, ভারতবর্ষ কতবড় ছাপ ফেলে। এবং সেই ছাপের মধ্যে কতটা বাংলার, সেটা হয়তো আর নতুন করে বলতে হবে না। এখন, বাংলা সিনেমা কি ছিল আর কি হল- বলে যদি আমি আজকের যুগের সঙ্গে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের তুলনা টানি, তাহলে সবাই আমাকে এখনই গালাগাল করা শুরু করবে, এবং সেটা করাই হবে বাঞ্ছনীয়। কারণ সিনেমার ব্যাপারে ‘তুলনা’ ব্যাপারটা একেবারেই চলে না; আর দু’টো যুগের সিনেমার তো নয়ই। দাদাসেহেব ফালকে যখন ‘হরিশ্চন্দ্র’ তৈরী করেছেন, সেটাও একেবারে আলাদা সময় ছিল। আর, ঋত্বিক ঘটক যখন ছবি করেছেন, সেই যুগটাও ছিল আলাদা।  আর একটা যুগ ভালো, আর অন্যটা খারাপ, এটা কখনই তুলনামূলক আলোচনার বিষয় নয়। আমি তাই বর্তমান সময়ে বাংলা সিনেমার আগের থেকে কতটা অবনতি হয়েছে, সে আলোচনায় যাচ্ছি না।  আমি একটু বোঝাতে চাই- কেন যেটা হচ্ছে, সেটা এখনকার জন্য ভালো নয়।

খুব লম্বা এবং বোরিং একটা গৌরচন্দ্রিকা হল ঠিকই, কিন্তু এটা না হলে আমার প্রেক্ষিতটা বোঝাতে সমস্যা হত।

২০১৮ সালই ধরুন। কতগুলো বাংলা সিনেমা হলে চলেছে ভালো করে? একটু নাম করুন তো? বা কতগুলো সিনেমার ভালো করে প্রচার হয়েছে, যাতে আপনি জেনেছেন সেটার ব্যাপারে ? কয়েকটার নাম করি ?

‘এক যে ছিল রাজা’, ‘উমা’, ‘আসছে আবার শবর’, ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’,  ‘ব্যোমকেশ গোত্র’, ‘বিদায় ব্যোমকেশ’, ‘হামি’, ‘কিশোর কুমার জুনিয়র’, ‘মনোজদের অদ্ভূত বাড়ি’,  আর ওই ধরুন ‘হইচই আনলিমিটেড’, ‘ভিলেন’, ‘টোট্যাল দাদাগিরি’- এইসব।

এই যে সিনেমাগুলোর কথা বললাম, মধ্যে ৮ খানার প্রযোজক/পরিবেশক কিন্তু শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস বা ‘এসভিএফ এন্টারটেইনমেন্ট’। বাকি  ৪টের মধ্যে ২খানা হল ‘উইন্ডোজ প্রোডাকশান’-এর, একটা দেবের হোম প্রোডাকশান অন্যটা আর একটি প্রোডাকশান হাউসের। তা এরকম অবস্থা দেখলে একটাই শব্দ মাথায় আসে; ‘মোনোপলি’। আপনি প্রতিবাদ করে বলতেই পারেন, কেন মশাই, পয়সা যে খুশি দিক না কেন? ছবি তো হচ্ছে, তাতে আপনার কি?

svf-1515763282

একচ্ছত্র আধিপত্য…

আমার কি, বলি? এই ধরুন ‘গুপ্তধনেরে সন্ধানে’; সিনেমাটা মন্দ নয়, হলে দেখতে গিয়ে বেশ উপভোগই করেছিলাম। কিন্তু জানেন কি, সেইসময় আর একটা সিনেমা বেরিয়েছিল, ‘আলিনগরের গোলকধাঁধা’? মনে পড়ছে? সেই সিনেমাটা কি হল? সেটা ভেঙ্কটেশের সঙ্গে বিজ্ঞাপনে পাল্লা দিতে পারল না বলে, অকালেই প্রাণত্যাগ করল, নাকি সেটাও অ্যাডভেঞ্চার-থ্রিলার বলে পয়সার চাপে বাজার থেকে বেড়িয়ে গেল? আর  এখনো পর্যন্ত কোনো স্ট্রিমিং সার্ভিসে সেটার খোঁজ নেই কেন?  শুধু আলিনগর কেন; মেঘনাদবধ রহস্য? এই হালে সেটাকে নেটফ্লিক্সে পাওয়া গেল। তাই শুধু প্রচারের আলো না পেয়ে আর টাকার প্রতিযোগিতায় না পেরে বহু সিনেমা অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে, মুক্তি পায়নি। আর আপনি বলবেন, মনোপলি নয়?

দেখুন, হতে পারে ভেঙ্কটেশের বিপুল অর্থের জন্য তারা ইন্ডাস্ট্রির ‘দুধের সর’ মানে ‘ক্রিমি লেয়ার’ কে নিয়েই কাজ করে। কিন্তু টাকাই যে সিনেমা বানানোর শেষ কথা নয়, আর একজন নতুন পরিচালকও যে কত ভালো সিনেমা বানাতে পারে, সেটা যুগে যুগে বার বার প্রমাণ হয়ে গেছে। প্রমাণ করে দিয়ে গেছে দেশে বিদেশে বার বার সেরার শিরোপা পাওয়া পথের পাঁচালি। তাই শুধু অর্থের অভাবে একটা অপেক্ষাকৃত কম খরচের সিনেমা বড় পর্দায় পৌছতে পারল না, এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কিছুই হতে পারে না।

শুধু তাই নয়, হালে বলিউডের অনেক অনেক কম বাজেটের ‘অন্ধাধুন’, ‘তুম্বাড়’ থেকে ‘স্ত্রী’ ,‘মুক্কাবাজ’, ‘ডেথ ইন দ্যা গঞ্জ’, নিউটন নজর কেড়েছে, এবং বার বার প্রমাণ করেছে ‘সবার ওপর গল্প সত্য’।

এবার একটু আসি ‘স্ট্রিমিং সার্ভিসের’ কথায়; নেটফ্লিক্স আর অ্যামাজন প্রাইম আসার পর থেকেই ভারতে স্ট্রিমিং সারভিস তৈরীর ঢল পড়ে গেছে; একতা কাপূর থেকে শুরু করে জি (zee) নেটওয়ার্কস, কেউই পিছপা হচ্ছে না। কিন্তু এইসব স্ট্রিমিং সারভিসের কন্টেন্টের যে কি হাল, সেটা কয়েক সপ্তাহ আগেই লিখেছিলাম। আর টলিউডের একমাত্র, নিজস্ব স্ট্রিমিং সারভিস ‘হৈচৈ’ এখনো ব্যাপারটাকে সঠিক গুরুত্ব দিতে পারে নি। কারণ অরিজিনাল কন্টেন্ট তৈরীর নামে যেসব ওয়েব সিরিজ হচ্ছে, এবং ‘অরিজিনাল মুভি’ ও যা যা বেরোচ্ছে, সেগুলো কোনোটাই পাতে দেওয়ার মত নয়। সবাইকে বুঝতে হবে, নেটফ্লিক্স, পৃথিবীর বৃহত্তম স্ট্রিমিং সারভিস একদিনে হয়নি। তারা প্রথমেই অরিজিনাল কন্টেন্টের পেছনে টাকা ঢালেনি। তাই হৈচৈ যদি মনে করে ওয়েব-ওনলি কন্টেন্ট তৈরী করব, কিন্তু টাকা খরচ করব না,  আর শুধু  যৌনদৃশ্যের লোভ দেখিয়ে, লাস্যের সুড়সুড়ি দিয়ে আর ‘ফিমেল ফর্ম অবজেক্টিফাই’ করে দর্শক টানব, তাহলে সেটা বিরাট বড় ভুল হবে। সেটা কখনো হয়নি, হবেও না।

45245998_1949209091781891_1657810689961492480_n

Clinging to the Past ???

এবার শেষ, এবং প্রধান ব্যাপারে আসি। আমি শুরুই করেছি যে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ‘তুলনামূলক’ আলোচনা করার চেষ্টা বাতুলতা মাত্র। কিন্তু আমাদের বাংলা ইন্ডাস্ট্রির যারা ধারক ও বাহক, তারা সেটা একেবারেই ভাবেন না। তাদের ধারণা, এই তুলনা এনেই দর্শক টানা সম্ভব। আর তাই সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘জাতিস্মর’ (অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি), ‘এক যে ছিল রাজা’ (সন্ন্যাসী রাজা),  পুরোনো বাংলা ছবি থেকে ‘অনুপ্রাণিত’। শুধু তাই নয়, তাঁর পরের ছবি ‘সাহ জাহান রিজেন্সি’ একেবারে বলে কয়ে ‘চৌরঙ্গি’র রিমেক। আর অপর্ণা সেন ‘ঘরে বাইরে’ তৈরী করছেন, আবার…

কেন?

ঘরে বাইরে তৈরী হবে, আর লোকে সত্যজিৎ রায়ের সাথে তুলনা করবে না, সেটা অসম্ভব। আর সাহ জাহান রিজেন্সি-ও কিভাবে চৌরঙ্গির সাথে তুলনা টানা আটকাবে, সেটা ভেবে পাচ্ছি না।  এবার আমি ধরে নিচ্ছি, আমি না হয় তুলনা না করেই সিনেমাটা দেখতে গেলাম, কিন্তু প্রশ্নটা তবু রয়ে যায়।

কেন?

দেখুন, আমার কাছে সিনেমা হল একটা কথাবলা, চলেফিরে বেড়ানো গল্প, সবার আগে; তারপর অন্য কিছু। তা যে গল্পটা আমি দেখেছি, পড়েওছি সেটা নিয়ে আবার সিনেমা বানিয়ে নতুন কি পাওয়া যাবে? গল্পটা কি বদলাবে? না! তাহলে কি আমি ‘এক্সিকিউশন’ দেখতে হলে ছুটব? পারছি না… মানে আমি অতবড় আঁতেলও নই।

তাহলে কি বাঙালির সৃজনক্ষমতা তলানিতে ঠেকেছে? তাহলে কি সত্যিই নস্টালজিয়া ভাঙিয়ে খাওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই?

আমি জানি না…

কেন? নিজের লেখা গল্প/চিত্রনাট্যে কি ভালো ছবি এনারা করেননি? চতুষ্কোণ, হেমলক সোসাইটি, ৩৬ চৌরঙ্গি লেন, ইতি মৃণালিনী; সবকটাই যথেষ্ট ঝরঝরে চিত্রনাট্যের চকচকে সিনেমা।

কিন্তু বাংলা ছবিতে এনারাই একমাত্র পরিচালক নন। বাংলার ঘরের সিরিয়াল দেখা ‘মা-মাসি-কাকা-জ্যাঠা’দের মনে একটা বিশেষ জায়গা করে নিয়েছেন নন্দিতা-শিবপ্রসাদ জুটি। কিন্তু বেশিরভাগ ছবিতেই তাঁরা মেলোড্রামা নিয়ে খেলা করেন এবং দর্শক কেঁদে ভাসিয়ে দেন। কয়েকটা ছবি তাদের যে ভালো হয়নি এটা বলব না, কিন্ত যেটা নিয়ে সবচেয়ে ‘হাইপ’ ছিল, অর্থাৎ ‘প্রাক্তন’; সেটার মত বস্তাপচা সিনেমা আমি দু’টো দেখিনি।

কৌশিক গাঙ্গুলি ‘শব্দ’, ‘সিনেমাওয়ালা’, ‘অপুর পাঁচালি’র পর ‘কিশোর কুমার জুনিয়র’-এর মত দূর্বল চিত্রনাট্য নিয়ে ছবি করলে, মনঃক্ষুণ্ণ হওয়ার অধিকার আমাদের থাকে বৈকি!

বাংলা ছবির বাকি ‘পরিচালক’দের নাম আমি আর করলাম না। তাঁরা আছেন তাঁদের মতন, মনে করছেন অনেক বড় বড় বাঘ মারছেন দু’বেলা। তাদের শান্তি। তাই আমার ক্ষোভ তাঁদের কাছে, যারা বাংলা ছবির কাছ থেকে আমাদের এক্সপেকটেশন বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের আত্মসন্তুস্টি, আমার কাছে ‘গাছে তুলে মই কেড়ে নেওয়া’র সমান বলে আমার মনে হয়।

এবার একটু ‘সাম-আপ’ করা যাক।

এতক্ষণ কি দেখলাম? ভেঙ্কটেশের মোনোপলি, কন্টেন্টের অধঃপতন, আর অতীত আঁকড়ে পড়ে থাকা বাঙালির সৃজনশীলতার ভান্ডারে টান। এখনো মনে হচ্ছে স্বর্ণযুগ? আমার তো নয়। সকলে যতই দোহাই দিক, ‘জনগন’ এটা চায় না, ওটা চায় না, ভালো গল্প, ভালো সিনেমা বার বার সে কথা ভুল প্রমাণ করে দিয়েছ। আর বাঙালি চিরকাল পথপ্রদর্শক, চিরকাল এক্সপেরিমেন্ট করার, অন্যরকম ভাবার ‘আইকন’ হয়েছে সে, যুগে যুগে। তাই আজ একটা সংকীর্ণ, সাধরণ চিন্তাভবনা নিয়ে যদি বাঙালি কুয়োর ব্যাং হয়েই পড়ে থাকতে চায়, তাহলে সেটা দুঃখজনক শুধু নয়, ধিক্কারযোগ্যও বটে।

 

শান্তির আশায়…

 

নীল…

Advertisements

3 Comments on “বাংলা সিনেমার শনির দশা…

  1. Will talk about Praktan first. When I see people around are swooning over this film and considering it as the most important lesson from the handbook of How to be a Good Wife I feel utterly helpless. The message that the film belted out is highly derogatory for a woman with the least amount of self esteem.If such films are applauded then we are sadly and steadily receding to the dark ages.
    Now about Ek je chilo Raja. The film missed the grandeur of the time and the magnificence and depth of the characters. But of course it is entirely my understanding . What must have struck people acquainted with that particular dialect is how badly it was spoken by some of the actors. Added to all these was the costume designing. Should have been more careful in this area if the film is a period piece.

    Liked by 1 person

  2. SVF এর monopoly আছে বলেই বড় মাপের ফ্লপ সিনেমা গুলো থাকা সত্বেও চালিয়ে যাচ্ছে…আর এক কালের বিখ্যাত সিনেমার গল্প গুলো নিয়ে রিমেক করায় রিস্ক টা একটু কম… গল্পের দুর্বলতা, বিজ্ঞাপন দিতে না পারার সাথে সাথে হিন্দি বা ইংরেজী সিনেমার প্রভাব টা মনে হয় বলা উচিত ছিল…

    Liked by 1 person

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: